পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য সমুদ্র ও মহাসাগর থাকলেও এমন একটি সমুদ্র রয়েছে, যা তার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যা ‘ডেড সি’ বা সাধারণভাবে ‘লবণ সমুদ্র’ নামে পরিচিত। এটি এমন এক হ্রদ, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে সাঁতার না জানলেও সহজেই ভেসে থাকতে পারে। চাইলে এই সমুদ্রে ভেসে ভেসে ঘুমিয়েও থাকা যায়! কোনো নৌকা লাগবে না, বাতাসভর্তি টিউব লাগবে না; শুধু ঝাঁপ দিন আর ভেসে থাকুন। দারুণ না ব্যাপারটা! এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই ডেড সি পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে পরিচিত।
ডেড সি মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। তবে আরেকটা ব্যাপার হলো, এই ডেড সি পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে নিচুস্থানে অবস্থিত। এই নদীতে কোনো প্রাণী বাঁচে না, এর মানে এই না যে এর জল বিষাক্ত, কেবল লবণের প্রভাবে এমনটা হয়। এই সমুদ্রটি জর্ডান নদী থেকে পানি পেলেও এর কোনো স্বাভাবিক নিষ্কাশন পথ নেই। অর্থাৎ পানি আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ফলে এখানে আসা পানির বেশিরভাগই সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং লবণ ও খনিজ পদার্থ পানিতে থেকেই যায়। বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় ডেড সি-তে লবণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই সমুদ্রের পানিতে লবণাক্ততার হার প্রায় ৩৪ শতাংশ বলে জানা যায়। যা পৃথিবীর সাধারণ সমুদ্রগুলোর তুলনায় প্রায় নয় থেকে দশ গুণ বেশি। পানিতে অতিরিক্ত লবণ থাকায় এর ঘনত্ব অনেক।
আমরা জানি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, ঘন তরলে কোনো বস্তু তুলনামূলকভাবে সহজে ভেসে থাকে। সে কারণে মানুষ ডেড সির পানিতে নামলেই শরীর আপনাআপনি ভেসে ওঠে। অনেক পর্যটককে দেখা যায়, আমোদ-ফুর্তি নিয়ে পানিতে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে বা পত্রিকা হাতে ছবি তুলতে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ডেড সি-তে মাছ, শামুক কিংবা অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। এমনকি সাধারণ জলজ উদ্ভিদও এখানে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয় এর অতিরিক্ত লবণের মাত্রা থাকায়। মূলত এ কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে ‘Dead Sea’। তবে পুরোপুরি প্রাণহীন বললেও ভুল হবে। কারণ কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব এখানে টিকে থাকতে সক্ষম।
ডেড সি শুধু তার ভাসমান বৈশিষ্ট্যের জন্যই পরিচিত নয়। অন্যতম আরেকটি দিক হলো, এর সম্পদ খনিজ। এই সমুদ্রের পানি ও কাদায় ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান রয়েছে। তা ছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসব খনিজ ত্বকের বিভিন্ন রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন- সোরিয়াসিস, অ্যাকজিমা উপশমে কার্যকর বলে প্রমাণিত। এ কারণে ডেড সি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অনেক স্পা সেবা কেন্দ্র। বর্তমানে পর্যটনের দিক থেকে ডেড সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর পর্যটক এই সমুদ্রে ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা নিতে আসেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পানিতে ভেসে থাকার এই বিস্ময় পর্যটকদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। যারা সাঁতার কাটতে পারে না, তাদের জীবনে একবার পানিতে ভেসে থাকার জন্য হলেও এখানে যাওয়া উচিত।
তারেক/
.jpg)
.jpg)