ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে? চোখের জলে শেষ হলো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ মুহূর্তের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন, পর্তুগালের বিদায় প্রথমার্ধে গোলশূন্য পর্তুগাল-স্পেন বালোগুনকে আটকাতে পারল না বেলজিয়াম, আবেদন নাকচ ফিফার পর্তুগাল-স্পেনের একাদশ ঘোষণা বালোগুনের পর এবার ওলিসে, ফিফার দ্বারস্থ ফ্রান্স পর্তুগাল-স্পেন ম্যাচে কে জিতবে, সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী গ্রামসরকার গঠন করলে নেতৃত্ব বিকশিত হবে: মির্জা ফখরুল মিরপুরে অফিসার্স কোয়ার্টারে অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস সাভারে এনসিপির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ৩ টন জিরা আমদানি ১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে শুরু গ্র্যান্ড আমেরিকান ফুড ফেস্টিভ্যাল সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু নওগাঁয় মানত পূরণে সাঁতরে নদী পার হতে গিয়ে গৃহবধূর মৃত্যু সরিষাবাড়ীতে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল ছেলে ৪,৮০০ কর্মী ছাঁটাই করছে মাইক্রোসফট আফগানিস্তানের উন্নয়নে নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন: জাতিসংঘ তুরস্ককে এফ-৩৫ না দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতানিয়াহুর আহ্বান জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড বিশ্বে জাহাজভাঙা শিল্পে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সরকার: পাটমন্ত্রী তানধান ডিপিটি রিনিউয়েবল ডিভিশনের সৌর ও লিথিয়াম পাওয়ার সলিউশন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সূচনা বাংলাদেশের উন্নয়নে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাইকা প্রেসিডেন্ট চলতি বছরে সুদানে অন্তত ৩৩০ শিশু হতাহত: জাতিসংঘ জুলাইয়ের প্রথম পাঁচদিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ দেশের স্বার্থে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ধসের শঙ্কা: রাঙামাটিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরতে মাইকিং নাটোরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে হিন্দু যুবক কারাগারে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ৫ম শ্রেণির ছাত্রের বিষপান

নারী মস্তিষ্ক: এক অনন্য নকশা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:২৯ পিএম
নারী মস্তিষ্ক: এক অনন্য নকশা
ছবি: এআই

নারীদের মস্তিষ্কের গঠন এবং কার্যকারিতা পুরুষের মস্তিষ্ক থেকে বেশ আলাদা। নারীদের মস্তিষ্কে হরমোনের প্রভাব (এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন) বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে, যা আবেগ, স্মৃতি এবং চাপ মোকাবিলায় পরিবর্তন আনে। এসব হরমোন নারীদের মস্তিষ্কে আবেগিক, মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের মতো সময়ে। 

গবেষণাগুলো আরও নির্দেশ করেছে যে, নারীদের মস্তিষ্কের বাম ও ডান মস্তিষ্কের মধ্যে একযোগিতা বেশি থাকে। যা তাদের ইনটুইটিভ চিন্তাভাবনা, সহানুভূতি এবং ভাষাগত যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এই বৈশিষ্ট্য নারীদের আবেগিক দিক থেকে আরও সংবেদনশীল এবং তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো পরিচালনা করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য ছয়টি বিষয় যা নারী-পুরুষের মনস্তাত্বিক বিষয়ে পার্থক্য তৈরি করে। 

ঘৃণার অনুভূতি শনাক্তকরণে নারীরা এগিয়ে

নারী মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘আবেগিক বুদ্ধিমত্তা’। নারীরা সাধারণত নিজেদের এবং অন্যদের আবেগের প্রতি বেশ সংবেদনশীল এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীর আবেগের প্রকাশ অনেক ভালো। উদাহরণস্বরূপ, সাইকোলজি টুডে এর একটি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা মুখাবয়বে ঘৃণার প্রকাশ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।

একাকিত্ব অনুভবে নারী-পুরুষের বয়সের ভিন্নতা

একাকিত্ব বৃদ্ধির জন্য বয়সকে দায়ী করা হলেও, সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারী ও পুরুষ একাকিত্বের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন বয়সে অনুভব করেন। জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা মাঝবয়সে বেশি একাকিত্ব অনুভব করেন, যেখানে নারীরা বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্বের শিকার হয়। এটি সম্ভবত সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার গতির কারণে ঘটে।

বিশ্রামে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কম সময় কাটান

স্পেনের বার্সেলোনায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নারীদের তুলনায় বেশি সময় বিশ্রাম নেন এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রম সময় কাটান। উদাহরণস্বরূপ, পুরুষরা গড়ে ১১৩ মিনিট এবং নারীরা ১০১ মিনিট তাদের দৈনিক জীবনে বিশ্রামের জন্য রাখেন। যার মধ্যে টিভি দেখা, সামাজিক কর্মকাণ্ড বা সাংস্কৃতিক ইভেন্টে অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, নারীরা তাদের বিশ্রামমূলক কার্যক্রমে পুরুষদের চেয়ে বেশি সন্তুষ্টি অনুভব করেন।

নারীদের যোগাযোগের ধরনে ভিন্নতা 

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, পুরুষরা সাধারণত বিমূর্ত ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করেন। যেখানে তারা বিশেষ কোনো বিষয় বা বৃহত্তর উদ্দেশ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দেন। অন্যদিকে, নারীরা অধিকতর নির্দিষ্ট এবং বিস্তারিতভাবে কথা বলেন। এটি একটি সূক্ষ্ম মানসিক পার্থক্য, যা নারী-পুরুষের যোগাযোগের ধরনে ভিন্নতা সৃষ্টি করে।

শিশু অবস্থায় ব্যক্তিত্বের পার্থক্য 

মনোবিজ্ঞানীরা পাঁচটি প্রধান ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেন, যার মধ্যে রয়েছে উত্তেজনা, সহানুভূতি, উদ্বৃত্ততা, চিন্তার উদ্বেগ এবং দায়বদ্ধতা। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯-১৩ বছর বয়সী মেয়ে শিশুদের মধ্যে অধিকতর দায়িত্বশীলতার প্রবণতা দেখা গেছে এবং এই বৈশিষ্ট্যটি ৯ থেকে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত আরও বেড়ে গেছে। তবে, ছেলে শিশুদের মধ্যে চিন্তার উদ্বেগ কমে গেছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রেম এবং রোমান্সের ক্ষেত্রে এক্সট্রোভার্ট পুরুষরা এগিয়ে

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক্সট্রোভার্ট পুরুষরা তাদের রোমান্টিক জীবন সম্পর্কে বেশি সন্তুষ্ট থাকে। যেখানে নারীদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে। এক্সট্রোভার্ট পুরুষরা সহজে রোমান্টিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এবং তাদের কর্মজীবনেও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। তবে, নারীদের মধ্যে এই প্রবণতাগুলো কিছুটা কম দেখা যায়।

সুতরাং নারীরা সাধারণত পরিবার, বন্ধু এবং কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে অনেক বেশি মানসিক তৃপ্তি পায়। এই সামাজিক সংযোগ নারীদের মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে 

/এসএল

বর্ষাকালে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
বর্ষাকালে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা

বর্ষা প্রকৃতিতে এনে দেয় স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু এই ঋতুর সঙ্গে বাড়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা, অপরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কিছু শারীরিক সমস্যা বেশি দেখা দেয়। সামান্য অসচেতনতা বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই বর্ষায় নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি

বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ভেজা কাপড়, দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকা কিংবা শরীরের ভাঁজে ঘাম জমে থাকার কারণে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বিশেষ করে কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচে বা পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, লালচে দাগ বা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে ফেলা, শরীর শুকনো রাখা এবং পরিষ্কার সুতির পোশাক পরা জরুরি।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)

বর্ষাকালে অনেকেই কম পানি পান করেন। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক পরে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি থাকলে নারীদের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, তলপেটে ব্যথা বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

যোনিপথের সংক্রমণ

বর্ষার আর্দ্র পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক নারী যোনিপথে চুলকানি, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা অস্বস্তির মতো সমস্যায় ভোগেন। অনেকেই লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, যা পরবর্তী সময়ে সমস্যা জটিল করে তুলতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ

বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু এবং বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার এবং পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা গুরুত্বপূর্ণ।

সর্দি-কাশি ও ভাইরাল সংক্রমণ

আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বর্ষায় ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা কিংবা ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। কর্মজীবী নারী বা যারা প্রতিদিন বাইরে যাতায়াত করেন, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বৃষ্টি ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় পরা, গরম পানীয় পান করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

ত্বকের নানা সমস্যা

বর্ষায় অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ব্রণ, অ্যালার্জি, র‍্যাশ, চুলকানি কিংবা একজিমার সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরও বেশি দেখা দেয়। মুখ পরিষ্কার রাখা, ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার এবং ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় না থাকা প্রয়োজন।

এছাড়া বর্ষাকালে কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করতে হয়। দীর্ঘ সময় ভেজা জুতা বা স্যান্ডেল পরে থাকলে পায়ের ত্বকে সংক্রমণ, দুর্গন্ধ কিংবা ফাঙ্গাস হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে পা ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া এবং শুকনো জুতা ব্যবহার করা উচিত।

বর্ষা যেমন প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি এই ঋতু কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও সঙ্গে নিয়ে আসে। তবে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ সমস্যাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিজের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রতিও গুরুত্ব দিন। কারণ একজন সুস্থ নারী মানেই একটি সুস্থ পরিবার এবং সুস্থ সমাজ।

নারীর স্বাবলম্বিতা সময়ের অন্যতম দাবি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
নারীর স্বাবলম্বিতা সময়ের অন্যতম দাবি

একসময় নারীর পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল পরিবার, সংসার আর সম্পর্কের গণ্ডিতে। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে সমাজের চাহিদাও। আজ একজন নারী শুধু পরিবারের দায়িত্বই পালন করেন না, তিনি অর্থনীতির চালিকাশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার, উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তাই বর্তমান সময়ে নারীর স্বাবলম্বিতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়, এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।

স্বাবলম্বিতা বলতে কেবল অর্থ উপার্জনের সক্ষমতাকেই বোঝায় না। এর অর্থ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচা এবং জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি অর্জন করা। একজন নারী যখন শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন, তখনই প্রকৃত অর্থে তিনি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নারীর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম–প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলেও ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি, হস্তশিল্প কিংবা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে অনেক নারী নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঘরে বসেই এখন অনেক নারী নিজের উদ্যোগ গড়ে তুলছেন এবং বৈশ্বিক বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছেন।

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতায় এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক নারী উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও পারিবারিক বা সামাজিক চাপে কর্মজীবন শুরু করতে পারেন না। কোথাও নিরাপত্তাহীনতা, কোথাও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, আবার কোথাও সমান কাজের জন্য সমান সুযোগ না পাওয়ার মতো সমস্যা তাদের পথকে কঠিন করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে নারীর আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না কিংবা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও সীমিত থাকে। ফলে স্বাবলম্বিতার পথ কেবল দক্ষতা অর্জনের নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনেরও।

নারীর স্বাবলম্বিতা গড়ে ওঠার প্রথম ভিত্তি হলো শিক্ষা। শিক্ষিত নারী নিজের স্বাস্থ্য, সন্তানের শিক্ষা, পারিবারিক পরিকল্পনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অধিক সচেতন হন। পাশাপাশি তিনি নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস পান। তাই মেয়েদের শিক্ষাকে কোনোভাবেই বিলাসিতা নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি। নিজের আয় থাকলে একজন নারী শুধু নিজের প্রয়োজনই পূরণ করতে পারেন না, পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। গবেষণায় দেখা যায়, নারীর আয় বাড়লে পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ একজন স্বাবলম্বী নারী কেবল নিজের নয়, পুরো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

তবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মানসিক স্বাবলম্বিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী আজও নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন, নিজের সাফল্যকে ছোট করে দেখেন কিংবা সব সময় অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেন। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস–এই তিনটি বিষয় মানসিক স্বাবলম্বিতার মূল ভিত্তি। পরিবার ও সমাজ যদি ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়, তাহলে তারা আরও দৃঢ় ও আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

নারীর স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের শুধু গৃহস্থালির কাজ শেখানো নয়, আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জনেও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে ছেলেদেরও শেখাতে হবে যে সংসার, সন্তান পালন কিংবা পরিবারের দায়িত্ব কেবল নারীর একার নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমান দায়িত্ববোধই একটি সুস্থ পরিবার গড়ে তোলে।

রাষ্ট্র এবং কর্মক্ষেত্রেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার–এসব উদ্যোগ আরও বেশি নারীকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের নারীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য কমানোও জরুরি।

স্বাবলম্বিতা মানে একা চলা নয়; বরং নিজের সক্ষমতার ওপর ভর করে সম্মানজনক জীবন গড়ে তোলা। একজন স্বাবলম্বী নারী পরিবারকে শক্তিশালী করেন, সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ দেখান। তাই নারীর স্বাবলম্বিতা কেবল নারীর অধিকার নয়, এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত।

/এসএল

নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

পদোন্নতি পেয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছেন, সহকর্মীদের প্রশংসাও পেয়েছেন। তবু মনে হচ্ছে, ‘আমি আসলে এতটা যোগ্য নই’, ‘একদিন সবাই বুঝে যাবে আমি এই জায়গার যোগ্য নই।’ এমন অনুভূতি অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। অথচ বাস্তবে তাদের দক্ষতা, পরিশ্রম ও অর্জন নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। এই মানসিক অবস্থাকেই বলা হয় ইমপোস্টার সিন্ড্রোম।

এটি কোনো মানসিক রোগ নয়; বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্যকে নিজের যোগ্যতার ফল হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন, হয়তো ভাগ্য, অন্যের সাহায্য বা কাকতালীয় কারণে তিনি সফল হয়েছেন। ফলে নতুন দায়িত্ব, পদোন্নতি কিংবা বড় কোনো সুযোগ এলেই আত্মবিশ্বাসের বদলে ভয় ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষ উভয়েই ইমপোস্টার সিন্ড্রোমে ভুগতে পারেন। তবে করপোরেট, প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্রে কর্মরত অনেক নারী এটি তুলনামূলক বেশি অনুভব করেন। কারণ শুধু ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

শৈশব থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়–ভুল করা যাবে না, সব সময় নিখুঁত হতে হবে, বিনয়ী থাকতে হবে এবং নিজের সাফল্য নিয়ে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। অন্যদিকে ছেলেদের ঝুঁকি নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া বা নিজের অর্জন তুলে ধরতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই ভিন্ন সামাজিকীকরণ নারীদের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে তারা নিজের সাফল্যকে ছোট করে দেখেন, কিন্তু সামান্য ব্যর্থতাকেও নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ মনে করেন।

কর্মক্ষেত্রেও নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নেতৃত্বের পদে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে একজন নারী যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পান, তখন অনেক সময় তাকে নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রমাণ দিতে হয়। কখনো সরাসরি, কখনো সূক্ষ্মভাবে তাকে শুনতে হয়–‘তুমি কি পারবে?’ কিংবা ‘এত বড় দায়িত্ব সামলানো সহজ নয়।’ এমন পরিবেশ আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে এবং ইমপোস্টার সিন্ড্রোমকে আরও গভীর করে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদের পদোন্নতি, পুরস্কার, বিদেশে প্রশিক্ষণ বা নানা সাফল্যের খবর দেখে অনেকেই নিজের যাত্রাকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের সাফল্যের দিকটাই দেখি, সংগ্রাম বা ব্যর্থতার গল্প খুব কমই সামনে আসে। এই অসম তুলনা আত্মসন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘদিন এই অনুভূতি থাকলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি (বার্নআউট) এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। অনেক নারী শুধু আত্মসন্দেহের কারণে পদোন্নতির আবেদন করেন না, নতুন চাকরির জন্য আবেদন করতে ভয় পান কিংবা নেতৃত্বের সুযোগ থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এতে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও একজন দক্ষ কর্মীকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় কাজে লাগাতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, নিজের অর্জনের একটি তালিকা তৈরি করা, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন হলে মেন্টর বা বিশ্বস্ত সহকর্মীর সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং নিজেকে অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের আগের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের এমন একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে তাদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং নেতৃত্বের সুযোগ সমানভাবে তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজেও মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শুধু নিখুঁত হওয়ার নয়, সাহসী হওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজের সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা দিতে হবে।

সাফল্যের পথে আত্মসন্দেহ আসতেই পারে। কিন্তু সেই সন্দেহ যেন নিজের সামর্থ্যকে আটকে না রাখে। একজন নারীর যোগ্যতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; তা গড়ে ওঠে তার জ্ঞান, পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর প্রচেষ্টায়। তাই নিজের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া, আত্মবিশ্বাসকে লালন করা এবং ‘আমি পারি’–এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করাই ইমপোস্টার সিন্ড্রোম থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

/এসএল

‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

সমাজে নারীদের ছোটবেলা থেকেই একটি বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে শেখানো হয়–ভদ্র হতে হবে, সবাইকে খুশি রাখতে হবে, কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। ফলে অনেক নারী নিজের ইচ্ছা, স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা মানসিক সুস্থতার চেয়ে অন্যের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখে যান। অথচ প্রতিটি মানুষের মতো একজন নারীরও নিজের সীমা নির্ধারণ করার অধিকার আছে। প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলার অধিকারও আছে। কারণ ‘না’ বলা অভদ্রতা নয়; বরং এটি আত্মসম্মান, আত্মরক্ষা এবং মানসিক স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

কেন নারীদের জন্য ‘না’ বলা এত কঠিন?

অনেক নারী জানেন যে, কোনো অনুরোধ গ্রহণ করলে তিনি কষ্ট পাবেন, তবু না বলতে পারেন না। কারণ এর পেছনে রয়েছে সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ। প্রথমত, আমাদের সংস্কৃতিতে নারীদের ত্যাগী ও সহনশীল হওয়ার গুণকে অতিরিক্ত মূল্য দেওয়া হয়। একজন ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রী কিংবা ভালো মা হওয়ার সঙ্গে যেন সবসময় অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার ধারণা জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক নারী মনে করেন ‘না’ বললে মানুষ হয়তো তাকে স্বার্থপর, অহংকারী বা অভদ্র ভাববে। এই ভয় থেকেই তারা নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন। তৃতীয়ত, শৈশবের পারিবারিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব পরিবারে সন্তানদের নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ কম থাকে, সেখানে বড় হয়ে নিজের সীমা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে যখন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে যায় 

ধরুন, অফিসে একজন সহকর্মী প্রায়ই নিজের কাজ আপনার ওপর চাপিয়ে দেন। আপনি ব্যস্ত থাকলেও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। পরিবারে সবাই ধরে নেয়, ঘরের সব দায়িত্ব আপনাকেই পালন করতে হবে। বন্ধুরা যেকোনো সময় সাহায্য চাইলে নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েই ছুটে যান। এভাবে প্রতিটি পরিস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে এক সময় মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিজের জন্য সময় থাকে না, ইচ্ছাগুলো হারিয়ে যায়, সম্পর্কগুলোও ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, এমনকি বার্নআউট পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

সীমা নির্ধারণ মানে সম্পর্ক ভাঙা নয়

অনেকের ধারণা, সীমা নির্ধারণ করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তিই হলো পারস্পরিক সম্মান এবং ব্যক্তিগত সীমার প্রতি শ্রদ্ধা।
যখন একজন নারী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পারছি না’, ‘এভাবে কথা বললে আমি অস্বস্তি বোধ করি’, অথবা ‘এই সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিতে চাই’, তখন তিনি সম্পর্ক শেষ করছেন না; বরং সম্পর্কের মধ্যে সম্মানজনক একটি কাঠামো তৈরি করছেন। যে সম্পর্ক শুধু একজনের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে না।

অনেক সময় নারীরা মনে করেন, সবাইকে সন্তুষ্ট রাখাই ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবে কেউই সবসময় সবাইকে খুশি রাখতে পারেন না। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মূল্য দেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। বরং একজন সুস্থ মানুষই পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। যখন একজন নারী নিজের সীমাকে সম্মান করতে শেখেন, তখন অন্যেরাও ধীরে ধীরে সেই সীমাকে সম্মান করতে শেখে।

কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘না’ বলা যায়?

‘না’ বলা একটি দক্ষতা, যা অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিষয়ে অস্বস্তি লাগলে সেই অনুভূতিকে অবহেলা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র বাক্যই যথেষ্ট–‘দুঃখিত, আমি এটা করতে পারছি না’, ‘এটি আমার জন্য সুবিধাজনক নয়’, অথবা ‘আমি এই সিদ্ধান্তে স্বচ্ছন্দ নই।’ তৃতীয়ত, অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের সময়, শক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শুরুতে অনেকেই আপনার নতুন সীমাকে মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। কারণ তারা আপনার সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ সম্পর্কগুলো নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেয়।

‘না’ বলা মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয় কিংবা অহংকার দেখানোও নয়। এটি নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

একজন নারী যখন নিজের সীমা নিজেই নির্ধারণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি জানিয়ে দেন যে তার সময়, অনুভূতি, স্বপ্ন এবং ব্যক্তিত্বেরও মূল্য আছে। আর এই উপলব্ধিই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন করে তোলে। কারণ একজন নারীর শক্তি শুধু সহ্য করার মধ্যে নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে সম্মান বজায় রেখে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে পারার মধ্যেও নিহিত।

/এসএল

ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কিছু নাম আজও যথাযথভাবে আলোচিত হয় না, অথচ তাদের অবদান যুগান্তকারী। তেমনই একজন অগ্রদূত ছিলেন ডা. যামিনী সেন। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অংশগ্রহণ ছিল নানা সামাজিক কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন তিনি নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সাহস দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

ডা. যামিনী সেনের জন্ম উনিশ শতকের শেষভাগে এমন এক সময়ে, যখন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, নারীর স্থান ঘরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি সেই ধারণাকে অস্বীকার করে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের পথ বেছে নেন। তার পরিবারের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

কলকাতা মেডিকেল কলেজে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো নানা জটিলতা ছিল। তবু যামিনী সেন চিকিৎসাশিক্ষায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সে সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটিশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। জাতিগত বৈষম্য, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা–সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি।

ইংল্যান্ডে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ অর্জন করেন এবং ব্রিটিশ চিকিৎসাব্যবস্থার কঠোর মানদণ্ডে নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করেন। 

দেশে ফিরে তিনি নারীর স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় অনেক নারী পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচবোধ করতেন। ফলে তাদের চিকিৎসা প্রায়ই অবহেলিত হতো। ডা. যামিনী সেন সেই সংকট দূর করতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। নারী রোগীদের প্রতি তার সহমর্মিতা, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন। চিকিৎসা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার তুলে ধরতেন। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি শুধু রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।

ডা. যামিনী সেনের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তার আত্মবিশ্বাস। ব্রিটিশ শাসকদের আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করা ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ের সামনে বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা ঔপনিবেশিক পরিচয় কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারে না। তার সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাবিদ্যা ও অন্যান্য পেশায় এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।

ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুর্গে নিজের মেধার পতাকা উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন–একজন বাঙালি নারীও বিশ্বমানের চিকিৎসক হতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করতে পারেন।

/এসএল