নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলার পরও রংপুরে থামানো যাচ্ছে না মাদকের বিস্তার। বিভাগের আট জেলার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম- সবখানেই সহজলভ্য হয়ে উঠছে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন ও ফেনসিডিল। এই মরণনেশায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে কিশোর ও তরুণরা। ফলে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক অস্থিরতা। মূলত সীমান্তঘেঁষা অবস্থান, পাচারের সহজ রুট আর দুর্বল সামাজিক প্রতিরোধের সুযোগ নিয়ে গোটা রংপুর বিভাগই এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম মাদক ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে।
সীমান্তের কাছাকাছি রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় মাদক পরিবহনে অন্তত ৩৭টি রুট ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। রংপুরের কেডিসি, কেরানিপাড়া, নূরপুর গোমস্তাপাড়া, সেন্ট্রাল রোড, শালবন মিস্ত্রীপাড়া, হারাগাছ ও পীরগাছাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে মাদকের রমরমা কারবার।
রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরের সীমান্ত হোসেন বলেন, রংপুরে এখন নারী মাদক ব্যবসায়ী বেশি দেখা যাচ্ছে। আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
মাদক নির্মূলে মডার্ন মোড় এলাকায় স্থানীয় যুবকদের নিয়ে গঠিত কমিটির সদস্য আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘কিছু জায়গায় রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেশের বিদ্যমান আইন দুর্বল হওয়ায় আসামিরা দ্রুত বের হয়ে যায়। তাই আইন সংশোধন ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে মাদক পাচারের সুনির্দিষ্ট কিছু রুট রয়েছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর হয়ে বিভিন্ন পথে মাদক রংপুরে ঢোকে এবং সেখান থেকে ঢাকায় যায়। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইনজেকশন, ইয়াবা ও হেরোইন প্রবেশ করছে। দিনাজপুরের বিরল, বোচাগঞ্জ ও হাকিমপুর হয়ে মাদক বগুড়া ও ঢাকায় পাচার হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১৩ হাজার ৫১০টি অভিযান চালিয়েছে। এতে ৪ হাজার ২৫১টি মামলায় ৪ হাজার ৪৪৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার হয় ১ হাজার ২৩৬ কেজি গাঁজা, ৫ হাজার ৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৬২৪ গ্রাম হেরোইন, ১ লাখ ৩৫৬ পিস ইয়াবা এবং বিপুল পরিমাণ বুপ্রেনরফিন ও ট্যাপেন্টাডল।
অন্যদিকে র্যাব-১৩ ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৩২টি অভিযানে ১৯৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম বলেন, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উভয় দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং বিদ্যমান আইন সংশোধন করা উচিত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মাসুদ হোসেন বলেন, ‘বিজিবি ও র্যাবের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চলছে। তবে দুর্গম সীমান্ত দিয়ে রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক ঢুকে পড়ছে। আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তাই আইন সংশোধন হওয়া উচিত।’ তিনি জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণে আগে যে কূটনৈতিক বৈঠক হতো, তা দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে মাদক নির্মূলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’