ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলা যশোর। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে এই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক প্রবেশ করে। পরে সেগুলো জেলার বিভিন্ন শহর, বাজার ও গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের পাশাপাশি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মাদক নিয়ন্ত্রণে জোরদার অভিযানের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য অভিযান অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে। যদিও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে উন্মুক্ত পরিবেশে মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়, যার নেপথ্য ভূমিকায় থাকে এলাকার কিশোর গ্যাং। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে যশোর শহর, শহরতলি ও আট উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক মাদক কারবারির মধ্যে বিক্রেতার ধরন অনুযায়ী ১০০ জনকে তালিকাভুক্ত ও ১৩ জনকে শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে শনাক্ত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। যশোর শহর, শহরতলির কয়েকটি স্পট, বেনাপোল, শার্শা, অভয়নগর ও চৌগাছায় এসব মাদক কারবারির অবস্থান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যশোরের বেনাপোল, শার্শা ও চৌগাছার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা মাদক প্রবেশের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল এলাকা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক মাদক পরিবহনের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে উঠে এসেছে। এসব অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, কোরেক্স উইন, ট্যাপেন্টাডল ও আইস। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় ফেনসিডিল কেনাবেচা তুলনামূলক বেশি। আর শহর ও উপজেলা সদরে ইয়াবার বিস্তার বাড়ছে। গাঁজা সহজলভ্য হওয়ায় তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহারও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যশোর এমএম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন জানান, মাদকের কারণে শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি থেকে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা, কিশোর গ্যাং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, মাদকাসক্তদের কারণে পরিবারে অশান্তি, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অনেক যুবক দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অপরাধ চক্রের সদস্য হয়ে উঠছে।
যশোর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু জানান, শুধু অভিযান নয়, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন এবং তরুণদের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
সচেতন নাগরিক সমাজ যশোরের সভাপতি অধ্যক্ষ পাভেল চৌধুরী জানান, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্পৃক্ত করে যৌথভাবে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
যশোর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পারভীন আক্তার জানান, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, আবার অনেকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ৫টি ক্যাটাগরিতে অভিযান চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজ ও নাশকতা সৃষ্টিকারী, ছিনতাই বা ডাকাতি, যা অব্যাহত রয়েছে। গত ছয় মাসে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ কেনাবেচায় জড়িত শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ৪৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানান, সীমান্তে আমাদের টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিন অভিযান চলমান রয়েছে। অভিযানে মাদকসহ চোরালান পণ্য জব্দ করা হচ্ছে।