ঢাকা ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, খোলা হলো তিস্তা ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার নতুন ডিরেক্টর ড. মাইক মিলার কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ায় রাঙামাটির ৬ উপজেলায় বন্যার শঙ্কা সাতকানিয়ায় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াল সিস্টেম গ্রুপ সংসদের বিভিন্ন কক্ষে ছাদ দিয়ে পানি পড়ার অভিযোগ হুইপের তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবে কুতুবদিয়ার ৫ জেলে নিখোঁজ বৃষ্টির সময় কেন দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না? বরিশালে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ দেখলেন প্রধানমন্ত্রী বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চাই: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প বিদেশি বিনিয়োগে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করবে সরকার: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সাতকানিয়ায় বন্যায় ১০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি চা-শিল্পের সংকট ও টেকসই উন্নয়নের পথ নাগেশ্বরীতে এইচএসসিতে ধার করা ট্যাগ অফিসারে পরীক্ষা! হাসপাতালের নিকৃষ্ট সিন্ডিকেট নির্মূল করুন ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি ফরিদপুরে বৃষ্টির মধ্যে গাছের নিচে আশ্রয়, বজ্রপাতে নিহত ১ ১৫ হাসপাতালে হেমাটোলজি মেশিন দিল 'ইজিমেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড' বন্যার্তদের পাশে তৌসিফ, দিলেন আর্থিক সহায়তা বদ্বীপ থেকে ডিজিটাল ক্যানভাস: বাংলাদেশি লোকশিল্পের রূপান্তর স্পেন জাতীয় ফুটবল দলকে কেন বলা হয় ‘লা রোজা’? ম্যাচ বিরতিতে বারবার কুলকুচি কেন করেন ফুটবলাররা? জাহিদ হাসানের ‘পথহারা মন’ ধোলাইখালে সড়ক ধসে যান চলাচল বন্ধ ডাকসুর ভিপিসহ ছাত্রশিবির ছাড়লেন কেন্দ্রীয় ৯ নেতা ফ্রান্সকে কেন লে ব্লুজ বলা হয়? ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল ঘিরে আটলান্টায় কঠোর নিরাপত্তা জয়পুরহাটে মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় বৃদ্ধের মৃত্যুদণ্ড

মাইনুল এইচ সিরাজী এর 'মধ্যরাতের আতঙ্ক'

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
মাইনুল এইচ সিরাজী এর 'মধ্যরাতের আতঙ্ক'

আজ আমি বাসায় একা।
এটা আমার জন্য অভূতপূর্ব। ভয়েরও। আমি জানি না রাতটা কীভাবে কাটবে। কোন আতঙ্ক অপেক্ষা করছে আমাকে কাবু করে দেওয়ার জন্য!

আমি অতটা ভিতু নই। কিন্তু আমার ছোট্ট এই জীবনে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি যে, ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। এখন হঠাৎ হঠাৎ সময়ে-অসময়ে সেসব ঘটনা মনে হলে আমি আঁতকে উঠি। আর ভয় পেলে বোধ হয় মানুষের গলাও শুকিয়ে যায়। গলা শুকানোর সঙ্গে আমার আরেকটা উপসর্গ যোগ হয়-মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা অনুভূতি খেলা করে। যেন একটা সাপ আমার পিঠ বরাবর নামছে-উঠছে।
আজ রাতে আমি একা। সেই অনুভূতিগুলো আস্তে আস্তে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
বেশির ভাগ আতঙ্কের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে হোস্টেলে। আমাদের কলেজটা পাহাড়ি এলাকায়। হোস্টেলের অবস্থান কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেশ খানিকটা দূরে। তখন আমি মাত্র হোস্টেলে উঠেছি। বেশি কিছু জানা ছিল না। 
একদিন শহর থেকে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। হোস্টেল গেটের অন্তত আধা কিলোমিটার আগে রিকশা ছেড়ে দিয়েছি। এই জায়গাটা বেশ উঁচু। রিকশা উঠতে চায় না। আমি হাঁটা ধরলাম। মিনিট বিশেক হাঁটলেই হোস্টেলে পৌঁছে যাব।
শীতকাল। ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। মাফলারটা মাথায় আর গলায় ভালো করে পেঁচিয়ে নিলাম। অন্ধকারে সাবধানে হাঁটছি। একটু ভয়ও করছে। কিছুটা সামনে রাস্তার পাশে একটা আগুনের কুণ্ডলী দেখা গেল। নিশ্চয়ই কেউ আগুন পোহাচ্ছে। নিমেষেই ভয় দূর হয়ে গেল আমার। আমি এগিয়ে গেলাম কুণ্ডলীর দিকে।
ভাপা পিঠার দোকান। এক বৃদ্ধ মহিলা মাটির চুলায় পিঠা বানাচ্ছেন। পাটালি গুড়ের ঘ্রাণ আর পিঠার ভাপে মুগ্ধ হয়ে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।
মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পকেটে কত টাকা আছে?’
আমি বললাম, ‘আছে। পিঠার দাম কত?’
‘একটা দশ টাকা।’
‘আমাকে একটা দেন।’
‘দাঁড়াও, বানিয়ে দিচ্ছি।’
মাটির পাত্রে পিঠার উপকরণ সাজালেন মহিলা। চালের গুঁড়া, নারকেল আর পাটালি গুড়। আমি বললাম, ‘গুড় একটু বাড়িয়ে দিয়েন।’ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। আমার বুকটা ধক করে উঠল। এই হাসিটা অন্য রকম। স্বাভাবিক নয়। চোখ-মুখ কিছুই স্বাভাবিক নয়।
হঠাৎ আমার মনে হলো, মহিলা এতক্ষণ যে পিঠাগুলো বানালেন সেগুলো কই? আশপাশে কোনো ক্রেতাকে তো দেখছি না! ঝোঁকের বশে আমি বলেই ফেললাম, ‘আপনার আগের পিঠাগুলো কই?’
মহিলা আবার অস্বাভাবিক মুচকি হেসে বললেন, ‘বেচা হয়ে গেছে। দশ টাকা করে।’
একটা ঢোক গিলে আমি বললাম, ‘কারা কিনল?’
রাস্তার পাশের জঙ্গলের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে মহিলা বললেন, ‘ওরা।’
সঙ্গে সঙ্গে ঝম ঝম শব্দ শুনতে পেলাম আমি। জঙ্গলের দিক থেকে আসছে। যেন নূপুর পরে হেঁটে যাচ্ছে কেউ।
এখানে অতিপ্রাকৃত কিছু একটা ঘটছে- এটা মনে হতেই আমি লক্ষ করলাম, চুলায় ফুঁ দিচ্ছেন তিনি, মুখ থেকে আগুন বেরিয়ে জ্বলে উঠছে চুলা! 
আমি বোধ হয় একটা চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু চিৎকারটা বের হয়েছে বলে মনে হয়নি। পিঠের ওপর সাপের আনাগোনাও টের পেয়েছি। 
রাতে সিকিউরিটির লোকজন রাস্তার পাশ থেকে আমাকে উদ্ধার করেছে। পরদিন সকালে এই ঘটনা ঘটার কারণ আদ্যোপান্ত জানতে পারলাম।
আমাদের হোস্টেল ডাইনিংয়ের বাবুর্চি ছিলেন এই মহিলা। দুই পায়ে নূপুর পরতেন। মৃগী রোগ ছিল তাঁর। হোস্টেলের ছাত্রদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে ওষুধ কিনতেন। সাহায্য নেওয়ার ধরনটা ছিল ব্যতিক্রম। দশ টাকা নিতেন। কমও না, বেশিও না।
কিন্তু তিনি বাঁচতে পারেননি। রান্না করার সময় হঠাৎ মৃগী রোগ দেখা দিয়েছিল। আগুনে পুড়ে মারা যান তিনি।
এরপর হোস্টেলের আশপাশে তাঁকে অনেকেই দেখেছে নানান বেশে। বেশির ভাগ সময় ভাপা পিঠা বানান তিনি। একাকী পথ চলার সময় তিনি দেখা দেন। নূপুরের শব্দও শোনা যায়। ঝম ঝম।
আমাদের হুজুর স্যার বলেন, এটা আসলে জিন। জিনেরা নানান আকৃতি ধারণ করতে পারে-মানুষ, বিড়াল, কুকুর, সাপ। এই জিনটা বাবুর্চি মহিলাকে বেছে নিয়েছে। জিনেরা বাস করে পাহাড়ে, গর্তে, খোলা মাঠে, তিন রাস্তার মোড়ে আর মানুষের বাসাবাড়িতে। ভালো জিন ছাদে অবস্থান করে মানুষকে পাহারা দেয়। খারাপ জিন থাকে বাথরুমে।

আজ সব কথা আমার হুড়মুড়িয়ে মনে আসছে। আজ রাতে বাসায় আমাকে একা থাকতে হবে।
বাবার এক বন্ধু মারা গেছেন সকালে। তাঁর বড় ছেলে বিদেশ থেকে আসতে রাত হবে। সকালে জানাজা। মা-বাবা গেছেন ও বাড়িতে। একা থাকতে যে আমার এত ভয়, মা-বাবা তো জানেন না। আমিও-বা কী করে বলি। কলেজে পড়ি আমি। এসব কথা কি বলা যায়?
দোয়া-দরুদ যা মুখস্থ আছে, সব পড়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসবে না জানি। তবু চেষ্টা করতে থাকলাম। প্রথম চেষ্টা উল্টো থেকে ভেড়া গোনা-দশ, নয়, আট...।
না, ঘুম আসছে না। এপাশ-ওপাশ করছি। খাটের শব্দেও আঁতকে উঠছি। বাথরুমে যাওয়া দরকার। কিন্তু হুজুর স্যার যে বললেন বাথরুমে খারাপ জিন থাকে!
উপায় নেই। বিসমিল্লাহ পড়ে বাথরুমের লাইট জ্বালালাম। আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে ওঠার জোগাড়। আচ্ছা, এটা আমি তো! নাকি জিন! আমাদের বাড়িতে জিন থাকার সম্ভাবনা কতটুকু? ভাবতে ভাবতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। এবার মনে পড়ল, আমাদের বাড়িটা তিন রাস্তার মোড়ে! সর্বনাশ, জিন তো থাকবেই! ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে আপাদমস্তক কাঁথায় ঢেকে ফেললাম নিজেকে।একটু তন্দ্রা এসেছিল মনে হয়। খস খস শব্দে সেটাও ছুটে গেল। খাটের নিচ থেকে শব্দটা আসছে। কেউ যেন পা ঘষে ঘষে হেঁটে যাচ্ছে। আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠল। কী হতে পারে? ইঁদুর-বিড়াল তো এভাবে হাঁটে না। বিড়াল! জিনেরা বিড়ালের বেশ ধরতে পারে। কাঁথা মুড়িয়ে নিজেকে আরও লুকানোর চেষ্টা করলাম। না, বিড়াল হতে পারে না। বিড়াল নিঃশব্দে হাঁটে। অন্য কিছু। সাহস করে উঠে লাইট জ্বালালাম। দুরু দুরু বুকে উঁকি দিলাম খাটের নিচে। নিজেকে বোকা মনে হলো। ফ্যানের বাতাসে ফুলে ওঠা একটা পলিব্যাগ এদিক-ওদিক ছুটছে।
মনে মনে হাসলাম কিছুক্ষণ। মনের বাঘকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বাসায় কি লেবু আছে? দরকার। গলা শুকিয়ে এসেছে। লেবুর শরবত খাওয়া দরকার। আরও একটা কারণে লেবু থাকা উচিত। বাসায় লেবু থাকলে জিন আসে না। হুজুর স্যার বলেছেন।

ফ্রিজ খুলে লেবু খুঁজছি। ঝুম ঝুম শব্দে কান খাড়া হয়ে গেল। নূপুরের শব্দ। কোত্থেকে আসছে?
ভয় ছাড়িয়ে চিন্তার জট লেগে গেল। মাথাটা ঘুরে উঠল হঠাৎ। তাল সামলানোর আগেই কলিংবেল বেজে উঠল। এত রাতে কে এল আবার। আমার চিন্তা কাজ করছে না। এলোমেলো পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছেন। বাবার বন্ধু। যিনি আজ সকালে মারা গেছেন। আর বাবুর্চি মহিলাটা।
ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলাম আমি। বাবা-মা উঠে এসে বললেন, ‘কী রে, এত রাতে দরজা খুলেছিস কেন?’

জাহ্নবী

ব্যাঙের শিক্ষা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ পিএম
ব্যাঙের শিক্ষা
এঁকেছেন মাসুম

এক বনে ছিল ছোট্ট এক কুনোব্যাঙের ছানা, নাম তার টুপ্পু। টুপ্পু দেখতে যেমন গোলগাল আদুরে, তেমনি তার স্বভাব ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারা দিন সে টুপটাপ করে এখানে-সেখানে লাফিয়ে বেড়াত। কিন্তু তার একটা মস্ত বড় দোষ ছিল–সে কারও কথা শুনত না, বড়দের দেওয়া কোনো নিয়মকানুন বা শিক্ষা একদম পাত্তা দিত না। সে মনে মনে ভাবত, ‘আমি তো এত সুন্দর লাফাতে পারি, পোকা ধরতে পারি, আমার আবার নতুন করে শিক্ষার কী দরকার?’
বর্ষাকাল শুরু হতেই বনের চারপাশ পানিতে থই থই করতে লাগল। টুপ্পুর বাবা-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘টুপ্পু, বর্ষার সময় বনের বড় দীঘিটায় কিন্তু একদম যাবে না। ওখানে একটা মস্ত বড় বোয়াল মাছ আর একটা ধূর্ত বক ওঁৎ পেতে থাকে। বড়দের কাছ থেকে আগে শেখ, কীভাবে বিপদে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।’
টুপ্পু তার স্বভাবসুলভ কায়দায় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ধুর! আমি সব জানি। আমার চেয়ে ভালো কে লাফাতে পারে? আমার কোনো শিক্ষার দরকার নেই।’
এই বলে সে নিজের খেয়ালে গান গাইতে গাইতে দীঘির দিকে রওনা দিল।
দীঘির পাড়ে এসে টুপ্পু মনের সুখে লাফালাফি শুরু করল। ঠিক তখনই পাশের একটা কচুরিপানার আড়ালে বসে থাকা এক মস্ত বুড়ো কচ্ছপ তাকে দেখে বলল, ‘খোকন ব্যাঙ, এভাবে খোলা জায়গায় থেকো না। আকাশের দিকে তাকিয়েছ? ওই দেখো, বকপাখি উড়ছে। বিপদ চেনার শিক্ষাটা অন্তত নাও!’
টুপ্পু কচ্ছপ দাদুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। সে বলল, ‘আরে দাদু, বক তো সাদা ধবধবে, দেখতে কত সুন্দর! ও কেন আমার ক্ষতি করবে? তোমরা বড্ড বেশি ভয় পাও।’
কিছুক্ষণ পর টুপ্পুর খুব খিদে পেল। সে দেখল দীঘির জলের ওপর সুন্দর একটা লালচে রঙের ফড়িং ভাসছে। ফড়িংটা অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করছে। টুপ্পু তো ভারি খুশি! সে ভাবল, ‘বাহ্! আজ তো চমৎকার শিকার পেয়েছি।’
এক লাফে ফড়িংটা ধরতে যাবে, এমন সময় দীঘির অভিজ্ঞ এক বুড়ো কোলাব্যাঙ দূর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুপ্পু, থামো! ওটা আসল ফড়িং নয়। ভালো করে লক্ষ করো, ওটা বোয়াল মাছের জিভের ডগা! শিকারি মাছেরা ওভাবে শিকার ভোলায়। বড়দের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নাও!’
কিন্তু টুপ্পু তো কারও বারণ শোনার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, ‘সবাই আমাকে শুধু জ্ঞান দিতে আসে!’ সে কথা না শুনেই দিল এক মস্ত লাফ।
যেমন লাফ দেওয়া, অমনি জলের নিচ থেকে হা করে বেরিয়ে এল বোয়াল মাছের মস্ত বড় মুখ! টুপ্পু তো ভয়ে হিম হয়ে গেল। একদম শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারল বড়দের কথা না শোনার পরিণতি কী। বোয়াল মাছটি কামড় দেওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে টুপ্পু তার সর্বশক্তি দিয়ে উল্টো দিকে একটা আছাড় খেয়ে লাফ দিল। কোনোমতে বোয়াল মাছের ধারাল দাঁত থেকে বেঁচে সে ডাঙায় এসে আছাড় খেয়ে পড়ল।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। ডাঙায় পড়তেই তার মাথার ওপর এসে পড়ল একটা মস্ত বড় ছায়া। ওপর থেকে ধপাস করে নেমে এল বকপাখির দীর্ঘ ঠোঁট! বকের ঠোঁট টুপ্পুর পিঠ ছুঁইছুঁই, ঠিক তখনই তার মাথায় খেলে গেল মায়ের একটা কথা, ‘বিপদে পড়লে কখনো সোজা পালাবি না টুপ্পু, সব সময় আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাবি।’
টুপ্পু আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাতে শুরু করল। বকপাখিটা বারবার ঠোঁট চালাল, কিন্তু টুপ্পুর আঁকাবাঁকা লাফের কৌশলের কাছে প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শেষমেশ টুপ্পু একটা ঘন কাঁটাঝোপের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল, যেখানে বকের ঠোঁট পৌঁছাতে পারল না।
কাঁটাঝোপের ভেতর বসে টুপ্পু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, বড়দের দেওয়া শিক্ষার কত দাম। যদি সে বোয়াল মাছের কৌশলটা আগে থেকে শিখে রাখত, তবে আজ তার এই অবস্থা হতো না। আর যদি মায়ের দেওয়া ওই ছোট্ট শিক্ষাটা মাথায় না রাখত, তবে এতক্ষণে সে বকের পেটে চলে যেত।
বিকেলের দিকে বিপদ কেটে গেলে টুপ্পু গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে এল। তার চোখে তখন অনুশোচনার জল। সে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি বড় ভুল করেছি। শিক্ষা ছাড়া জীবনে কখনো নিরাপদ থাকা যায় না। আজ থেকে তোমরা আমাকে যা শেখাবে, আমি মন দিয়ে তা শিখব।’
সেই থেকে টুপ্পু বনের সবচেয়ে লক্ষ্মী আর বুদ্ধিমান ব্যাঙ হয়ে উঠল। এখন সে আর অহংকার করে না, বরং বড়দের প্রতিটি কথা ও শিক্ষা পরম আদরে মেনে চলে।

ইশপের গল্প শিয়াল ও ছাগল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
শিয়াল ও ছাগল
এঁকেছেন মাসুম

একদা এক চালাক শিয়াল ছিল। একদিন পানি খেতে গিয়ে সে এক কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে কিছুতেই উপরে উঠতে পারল না। 
ইতোমধ্যে এক বোকা ছাগল কুয়ার কাছে এসে শিয়ালকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই, এই কুয়ার জলটা কেমন?’ 
শিয়াল বলল, ‘ভাই, সত্যি কথা বলতে আমি তো এর চেয়ে মিঠে জল আজ পর্যন্ত খাইনি। এসো, তুমিও খেয়ে দেখো একবার।’
পানি খেতে বোকা ছাগলও কুয়াতে নামল। তখন ছাগলও একই সমস্যায় পড়ল। 
শিয়াল বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, যাতে আমরা দুজনেই এই কুয়া থেকে বেরোতে পারব। তুমি তোমার পেছনের পায়ে ওপর দাঁড়াও। আমি তোমার গা বেয়ে উঠে আর তোমার শিং ধরে এক লাফে কুয়া থেকে উপরে উঠে যাব।’
‘কিন্তু আমার কী হবে?’ ছাগল বলল, ‘আমি বেরোব কীভাবে?’ 
‘ঠিক একই ভাবে। তুমি আমার পিঠে উঠে বাইরে বেরিয়ে যাবে।’ 
বোকা ছাগল কিছুই বুঝল না কিন্তু শিয়ালের কথায় রাজি হয়ে গেল। তখনই চালাক শিয়াল তার পিঠে পা রেখে কুয়া থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর চলে যেতে লাগল।
ছাগল চিৎকার করল। শিয়াল বলল, ‘বোকা ছাগল বয়স বেড়েছে। বুদ্ধি বাড়েনি। এবার বসে থাকো কুয়ার মধ্যে।’

গল্পের শিক্ষা: শত্রুকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা
ট্রিওন্ডা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন চমক। আর এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই চমকের নাম ট্রিওন্ডা। এটি তৈরি করেছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে এই বলই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রিওন্ডা নামের অর্থ হলো ‘তিনটি ঢেউ’। এই নামটি রাখা হয়েছে কারণ এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো–এই তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে। বলটির লাল, সবুজ ও নীল রংও তিন স্বাগতিক দেশের প্রতি সম্মান জানায়।
ট্রিওন্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নতুন চার-প্যানেলের নকশা। সাধারণ ফুটবলের তুলনায় এতে কম অংশ জোড়া লাগানো হয়েছে। ফলে বাতাসে বলটি আরও স্থিরভাবে উড়ে এবং খেলোয়াড়দের পাস, শট ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। বলের গভীর সেলাই ও বিশেষ বাইরের আবরণ ভেজা আবহাওয়াতেও ভালো গ্রিপ দেয়।
এই বলের ভেতরে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক ৫০০ হার্টজ মোশন সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে শত শত তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। ফলে অফসাইড, বলে স্পর্শ হয়েছে কি না বা বিতর্কিত মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
বলটির গায়ে তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতীকও রয়েছে। কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারকা বলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া সোনালি রঙের নকশা বিশ্বকাপ ট্রফির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
শুধু একটি ফুটবল নয়, ট্রিওন্ডা আধুনিক প্রযুক্তি, সুন্দর নকশা এবং খেলাধুলার আনন্দকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। তাই এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পায়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজরও রয়েছে এই বিশেষ বলটির দিকে।

প্রজাপতির অভিমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
প্রজাপতির অভিমান
এঁকেছেন মাসুম

হৃদির আঁকাআঁকি করতে ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। প্রজাপতি ছাড়া অন্য কিছু সে তেমন ভালো আঁকতে পারে না। গরু আঁকতে গেলে ঘোড়ার মতো হয়ে যায়, পাখি দেখতে লাগে মুরগির মতো, আর আপেল আঁকলে মনে হয় আতাফল। তাই তার ড্রয়িং খাতার প্রায় সব পাতাই ভরা প্রজাপতির ছবিতে। নানা রঙের, নানা ঢঙের প্রজাপতি। কোনোটা দেখতে যেন ফুলপরী, কোনোটা আবার রংধনুর টুকরো। হৃদির আঁকা প্রজাপতিগুলো এত সুন্দর হয় যে, এই বুঝি খাতার পাতা ছেড়ে উড়ে যাবে। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে গিয়ে বসবে। এতটাই জীবন্ত সেগুলো।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে হৃদি ড্রয়িং খাতা নিয়ে আঁকতে বসল। কিন্তু সেদিন তার মন খুব খারাপ। ক্লাসের রিতু তার একটা ছবি ছিঁড়ে ফেলেছিল। হৃদি ম্যাডামের কাছে বিচার দিয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম উল্টো বলেছিলেন–পড়তে এসে এত আঁকাআঁকি কীসের? কথাটা হৃদির খুব খারাপ লেগেছিল। তার মনে হয়েছিল, আঁকাআঁকি বুঝি কোনো অপরাধ।
মন খারাপ থাকলে যেমন হাত ঠিকমতো কাজ করে না, সেদিনও তেমনই হলো। সে একটা প্রজাপতি আঁকল বটে, কিন্তু পাখাগুলো কেমন ছেঁড়া-ছেঁড়া হয়ে গেল। রংগুলোও মলিন আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল। এমন সময় মা ডাকলেন, হৃদি, নাশতা করে যাও। ড্রয়িং খাতা খোলা রেখেই সে চলে গেল।
নাশতা খেয়ে ফিরে এসে হৃদি অবাক হয়ে গেল। যে পাতায় একটু আগে প্রজাপতিটা এঁকেছিল, সেই পাতাটা একেবারে সাদা! সে বিস্ময়ে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
– তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি।
হৃদি চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল, একটু আগে আঁকা সেই প্রজাপতিটাই কথা বলছে।
– আমার পাখাগুলো দেখো। কত ছেঁড়া! রংগুলোও কেমন বিশ্রী! তোমার অন্য প্রজাপতিগুলো আমাকে খেলায় নেয়নি। বলেছে আমি নাকি দেখতে সুন্দর না। ওরা সবাই বাগানে খেলছে। আর আমি একা।
জানালার বাইরে তাকিয়ে হৃদি আরও অবাক হলো–তার খাতার সব প্রজাপতি বাগানে উড়ছে! কেউ ফুলে বসছে, কেউ রোদে নাচছে, কেউ আবার একে অপরকে তাড়া করে খেলছে।
শুধু এই প্রজাপতিটাই একা দাঁড়িয়ে আছে। হৃদির খুব মায়া হলো। সে আস্তে করে বলল,
– আমি দুঃখিত। আসলে আমার মন খুব খারাপ ছিল। তাই তোমাকে ঠিকমতো আঁকতে পারিনি। তুমি যদি আবার খাতায় ফিরে আসো, আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর করে আঁকব।
প্রজাপতিটা একটু হাসল। তারপর বলল,
– তাহলে চোখ বন্ধ করো।
হৃদি চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখে প্রজাপতিটা আবার খাতার পাতায় ফিরে এসেছে। সে এবার খুব মন দিয়ে আঁকতে শুরু করল। পাখাগুলো সুন্দর করে গড়ল। তারপর লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, কমলা, সবুজ আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিল। এত যত্ন করে সে আগে কখনো কোনো ছবি আঁকেনি। আঁকা শেষ হলে প্রজাপতিটা যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল।
হৃদি এবার নিজেই চোখ বন্ধ করল, কারণ সে বুঝতে পেরেছে–মানুষের চোখের আড়ালেই কেবল এরা জীবন্ত হয়, আর জীবন্ত থেকে খাতায় ছবি হয়ে ফিরে আসে।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে জানালার ধারে একটি সুন্দর প্রজাপতি এসে বসেছে। সে উড়ে এসে একটু আগে হৃদির আঁকা প্রজাপতিটার পাশে দাঁড়াল। তারপর দুজনে একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়ে গেল। যাওয়ার আগে প্রজাপতিটা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার ছোট্ট মুখে ছিল মিষ্টি একটা হাসি। হৃদি বুঝতে পারল, ওটা শুধু বিদায়ের হাসি নয়। ওটা ছিল 
ধন্যবাদের হাসি।
আর সেই দিন থেকে সে আর কখনো মন খারাপ করে কোনো ছবি আঁকেনি। কারণ সে জানে, প্রতিটি ছবিরও হয়তো একটা ছোট্ট মন আছে। আর সেই মনটাকেও যত্ন করতে হয়।

টুনটুনির পুকুর

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
টুনটুনির পুকুর
এঁকেছেন মাসুম

এক ছিল ছোট্ট গ্রাম, নাম তার আনন্দপুর। সেই গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটা সুন্দর পুকুর। কিন্তু পুকুরটার কোনো নাম ছিল না। তবে তোমরা চাইলে আমরা পুকুরটার একটা নাম দিতে পারি, যেমন ধরো, কানা পুকুর। 
সেই কানা পুকুরের পানি ছিল কাচের মতো পরিষ্কার। সেই পানিতে সাঁতার কাটত লাল-নীল মাছের দল। পুকুরের ধারে ছিল বড় বড় আম গাছ, আর সেই গাছের ডালে বাস করত ছোট্ট টুনটুনি পাখি। টুনটুনি যখনই মন খারাপ করত, তখনই পুকুরের দিকে তাকিয়ে গান গাইত। পুকুর যেন টুনটুনির দুঃখের বন্ধু ছিল।
গ্রামের বাচ্চারা রোজ দুপুরে পুকুরের ধারে খেলতে আসত। কেউ ডুব দিত শীতল পানিতে, কেউ বা পুকুরের পাড়ে বসে পানি ছুঁয়ে খেলত। পুকুরটা ছিল গ্রামের সবার খুব প্রিয়।
একদিন গ্রামে এল এক অচেনা লোক। তার নাম ছিল ঘোটন চৌধুরী। ঘোটন চৌধুরী খুব ধনী ছিলেন, কিন্তু তার ছিল শুধু টাকা জমানোর চিন্তা। তিনি গ্রামের সব পুকুর ভরাট করে সেখানে বড় বড় ঘরবাড়ি বানাতে চাইলেন। তিনি ভাবলেন, ‘পুকুর তো শুধু শুধু জায়গা নষ্ট করছে। এখানে বাড়ি বানালে আমি অনেক টাকা পাব।’ 
প্রথমেই তিনি আনন্দপুরের সেই সুন্দর পুকুরটা ভরাট করতে চাইলেন। গ্রামের মানুষরা খুব মন খারাপ করল। বাচ্চারা কাঁদছিল, ‘আমাদের পুকুরটা নষ্ট করে দিও না! আমরা দুপুরে এই পুকুরে সাঁতার কাটি, গোসল করি।’  
টুনটুনি পাখি গাছের ডালে বসে সব দেখল। সে দেখল, বড় বড় গাড়ি এসে পুকুরে মাটি ফেলছে। পুকুরের পানি কমে আসছে। মাছেরা ছটফট করছে। টুনটুনির বুকটা ব্যথায় ভরে গেল। সে ভাবল, ‘আমার বন্ধু পুকুরটা মরে যাচ্ছে!’ 
টুনটুনি উড়তে উড়তে গেল এক জ্ঞানী প্যাঁচার কাছে। প্যাঁচা মশাই সব শুনে বললেন, ‘মানুষকে বোঝাতে হবে পুকুর কেন দরকার। পুকুর শুধু পানির জায়গা নয়, পুকুর হলো গ্রামের প্রাণ।’ 
টুনটুনি আবার গ্রামের কাছে ফিরে এল। সে দেখল, বাচ্চারা আর পুকুরের কাছে খেলা করে না। পুকুরটা প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়ে গেছে। টুনটুনি তখন একটা বুদ্ধি বের করল।
সে রোজ সকালে পুকুরের ধারে উড়ে যেত। তারপর নিজের ছোট চঞ্চু দিয়ে মাটি থেকে একটা করে পানির ফোঁটা তুলে আনত। সেই ফোঁটাগুলো সে পুকুরের শুকনো অংশে ফেলত। গ্রামের মানুষ আর ঘোটন অবাক হয়ে দেখল।
একজন বলল, ‘আহা রে! ছোট্ট পাখিটা এই পুকুর বাঁচানোর চেষ্টা করছে!’ 
আরেক বৃদ্ধ লোক বলল, ‘আমরা এত বড় হয়েও যা বুঝিনি, এই ছোট্ট পাখিটা সেটাই বোঝাচ্ছে।’
টুনটুনির এই চেষ্টা দেখে গ্রামের সবার মন বদলে গেল। তারা বুঝতে পারল, পুকুর শুধু পানির জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও খুব দরকার। পুকুর না থাকলে গরম বেড়ে যাবে, মাছেরা বাঁচবে না, আর গ্রামের সৌন্দর্যও নষ্ট হবে।
সবাই মিলে ঘোটন চৌধুরীর কাছে গেল। তারা বলল, ‘চৌধুরী, আপনি পুকুরটা ভরাট করবেন না। আমরা পুকুরটা যেমন আছে তেমনই রাখতে চাই...।’ 
ঘোটন চৌধুরী সবার কথা শুনে খুব লজ্জা পেলেন। তিনি বুঝলেন, টাকা দিয়ে সব হয় না। ভালোবাসা আর পরিবেশের মূল্য অনেক বেশি। তিনি পুকুর ভরাট করা বন্ধ করে দিলেন। শেষে তিনি হাত জোড় করে বললেন, ‘আপনারা আজ আমার চোখ খুলে দিলেন, নয়তো আমি খুব বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছিলাম। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’ 
কিছুদিনের মধ্যেই পুকুরটা আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে উঠল। মাছেরা আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল। আর টুনটুনি পাখি প্রতিদিন পুকুরের ধারে বসে আনন্দে গান গায়। সে জানে, তার বন্ধু পুকুরটা বেঁচে গেছে।