ঢাকা ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
প্রথম সেমিতে ইতিহাসের বাঁশি ‘দাবি না মানলে বিশ্বকাপে যেতেন না কোচ’, চাঞ্চল্যকর তথ্য ফেডারেশনের ইতিহাস গড়া নরওয়ের বীরদের বরণে রাস্তায় লাখো মানুষ ‘শুধু এমবাপ্পেকে নয়, পুরো ফ্রান্সকেই থামাতে হবে’ মেসির মুখোমুখি হওয়ার আগে যা বললেন নিকো ও’রেইলি ‘স্পেনকে ভয় নয়, সম্মান’ মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে ইংল্যান্ড! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘লাকি’ জার্সি পরে খেলবে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার ২ মাস পর রেফারির মৃত্যু ১৩ বছর পর আবারও ক্রোয়েশিয়ার কোচ স্লাভেন বিলিচ হালান্ডকে পাস না দেওয়ায় সরলথকে আত্মহত্যা করার বার্তা! বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ ৪ দলের মধ্যে কার বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার সিরাজগঞ্জে ব্যতিক্রমী 'আর্জেন্টিনা বটগাছ' ফেসবুকে ভিসি-প্রশাসনের সমালোচনা, জকসু সদস্য জাহিদকে তলব ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে: সড়ক পরিবহণমন্ত্রী ইবির প্রধান ফটকের জুলাই স্মৃতি মুছে ‘জুলাই ফলক’ তৈরির পরিকল্পনা অনলাইনে মাদক-বাণিজ্যের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি: কুতুবদিয়ার ৪ জেলের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ১ ‘মাদক বহনকারীরা জেলে, কিন্তু কারবারিরা সংসদে কেন?’ ফতুল্লায় অটোরিকশার ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, খোলা হলো তিস্তা ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার নতুন ডিরেক্টর ড. মাইক মিলার কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ায় রাঙামাটির ৬ উপজেলায় বন্যার শঙ্কা সাতকানিয়ায় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াল সিস্টেম গ্রুপ সংসদের বিভিন্ন কক্ষে ছাদ দিয়ে পানি পড়ার অভিযোগ হুইপের তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবে কুতুবদিয়ার ৫ জেলে নিখোঁজ বৃষ্টির সময় কেন দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না? বরিশালে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ দেখলেন প্রধানমন্ত্রী

কোয়ারেন্টাইন

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ০৩:১৩ পিএম
আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৫১ পিএম
কোয়ারেন্টাইন
ছবি: খবরের কাগজ

২১৩০ সাল। পৃথিবী একটি নির্জন বর্জ্যভূমি। শতাব্দীর দূষণে পৃথিবীর আবহাওয়া দূষিত। শত বছরের চলমান যুদ্ধে মানুষ বেঁচে নেই বললেই চলে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় কিছু মানুষ বেঁচে আছে। তবে তারা আইসোলেটেড। কোয়ারেন্টাইনে আছে। একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। ভয়াবহ পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। হিরোশিমা-নাগাশাকির মতো পুরো পৃথিবী বিধ্বস্ত। অ্যাটোম বোমার বিষক্রিয়া পুরো গ্রহে ছড়িয়ে পড়েছে।

 এই বিষক্রিয়া এবং জীবাণু অস্ত্রের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষার জন্য গ্রহের জীবিত মানুষ সাপ-ব্যাঙের শীতনিদ্রা যাপনের মতো কোয়ারেন্টাইনে আছে। পৃথিবী থমকে গেছে। অন্ধকারে ছেয়ে আছে একসময়কার আলোকোজ্জ্বল নগরীগুলো। যেখানে ছিল বিশাল বিশাল আকাশচুম্বী অট্টালিকা। সেখানে জমে আছে পাহাড়সমান উঁচু আবর্জনার স্তূপ। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে গেছে প্রশস্ত রাস্তাঘাট। অলিগলিতেও জীবিত প্রাণীদের চলাচল নেই। অর্ধভগ্ন যানবাহনগুলো কাত হয়ে পড়ে আছে এখানে সেখানে। মরীচিকারা তাদের শাসন করছে। ক্যানসারের জীবাণুরা মৃত্যুর হুলিয়া নিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপাচ্ছে। সবকিছু স্থবির। এই স্থবিরতা শত বছরের। জনমানবহীন ধ্বংসস্তূপের আড়ালে-আবডালে বিলুপ্তপ্রায় সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত বছর বয়সী ডালাপালাবিহীন পুড়ে যাওয়া বৃক্ষরাজি।

বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে মানবসভ্যতা পৌঁছেছিল উন্নতির চরম শিখরে। তারা গড়েছিল টাইপ-২ সভ্যতা। যে সভ্যতায় অধিবাসীরা গ্রহান্তরে আবাস গড়ে তোলে। তাদের নিজস্ব শক্তির আয়ত্তের পাশাপাশি টাইপ-২ সভ্যতার মানুষ যখন তখন মহাকাশ ভ্রমণে পারঙ্গম। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম। তারা অন্যান্য গ্রহকে টেরাফর্ম করার ক্ষমতা রাখে। আণবিক স্তরে পদার্থকে ম্যানিপুলেট করতে সক্ষম। এমনকি তারা জীবনের নতুন রূপ তৈরি করতে পারে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় পৃথিবী ধ্বংসের আগে মানুষ সভ্যতার শীর্ষ বিন্দুতে আরোহন করেছিল।

চাঁদে মানুষের কলোনি রয়েছে। মঙ্গল গ্রহেও মানুষ আবাস গেড়েছে। মানবতা পৃথিবীর বাইরে প্রসারিত হয়েছে। চাঁদে এবং মঙ্গলে উপনিবেশ রয়েছে। বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপায় মানুষ ফাঁড়ি তৈরি করেছে। কিন্তু মানুষের কৃতিত্বের প্রকৃত শিখর ছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, বা আইএসএস। যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

ভয়ংকর মারণাস্ত্র ব্যবহারের আগে জনসংখ্যার অধিকাংশই অন্য গ্রহের উপনিবেশে পালিয়ে গেছে। কিন্তু যারা পৃথিবীতে থেকে গিয়েছিল তারা ছিল অভাবগ্রস্ত অথবা দুঃসাহসী। একসময়ের সমৃদ্ধ শহরগুলোর ধ্বংসাবশেষে নিজেদের তুচ্ছ অস্তিত্ব হিসেবে খুঁজে পেয়েছিল।

বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে এলিজা নামে এক তরুণী ছিল। সে এই ধ্বংসাবশেষ এবং বিপর্যস্ত পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সে আশা ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়। এক প্রাণচঞ্চল তরুণী। পজিটিভ ভাবনার মানুষ। দুঃসাহসিক এক নারী। খাবারহীন থাকলেও রাতগুলো উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে কাটায়।

একদিন একটি পুরনো গবেষণাগারের ধ্বংসাবশেষে এলিজার চোখ পড়ে অসাধারণ একটি মেশিনের ওপর। টাইম মেশিন। সে সায়েন্স ফিকশনের বইগুলোতে এ ধরনের ডিভাইস সম্পর্কে পড়েছিল। তবে কখনই এগুলো বিশ্বাস করত না। এমন আজব যন্ত্রের অস্তিত্ব যে আসলে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল; এটি এর আগে সে আমলে নেয়নি। কিন্তু এখন সে বিভ্রান্তির দোলাচলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। একটি মসৃণ রুপালি বাক্স। আবছা আলোতে মৃদুভাবে গুনগুন করছিল।

লোভ সামলাতে পারল না এলিজা। সে টাইম মেশিনের ভিতরে বসল। ২০৩০ সালের পৃথিবীকে সে নিয়ন্ত্রণ সেট করল। এমন একটি সময় যখন পৃথিবী ছিল অক্ষত। ছিল সমৃদ্ধ। আধুনিকতার সর্বোচ্চ পর্যায়। তখনকার প্রযুক্তি কেমন ছিল? মানুষের জীবনযাপন কেমন উন্নত ছিল? সে আসলে দেখতে চেয়েছিল পৃথিবী থেকে কী হারিয়ে গেছে? যা দেখে ভবিষ্যতের জন্য কিছু আশা-ভরসা মনেপ্রাণে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করেছিল।

টাইম মেশিনটি শব্দ করল। এলিজার মনে আনন্দ উত্তেজনার ঢেউ খেলে গেল। সে চরম প্রশান্তি অনুভব করল। কারণ, তার সময় পরিভ্রমণ সঠিক ছিল। ১০০ বছর আগের পৃথিবীতে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু যখন সে এসেছিল তখন দেখতে পেল যে, পৃথিবী তার কল্পনার মতো নয়। হ্যাঁ, আকাশচুম্বী বিল্ডিংগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। যেন সেই ইমারতগুলো আকাশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। পৃথিবীর বাতাস দূষণমুক্ত ছিল। পানি বিশুদ্ধ ছিল। আলো নির্মল ছিল। তবে লোকেরা এলিজার নিজের সময়ের চেয়ে সুখী ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ লোভ এবং স্বার্থপরতায় ভরা ছিল। প্রযুক্তি তাদের এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, তারা ভোগ-বিলাসে হারিয়ে গিয়েছিল।

এলিজা তার নিজের সময়ে ফিরে যেতে চাচ্ছিল। সে পুরোপুরি হতাশ এবং মোহগ্রস্ত। সে সময় অ্যালেক্স নামে একজন সুদর্শন যুবকের সঙ্গে তার দেখা হয় । সে পার্কের বেঞ্চে বসে একটি বই পড়ছিল। বইটির নাম- সাইবার যুদ্ধের পাগলা ঘোড়া। এলিজা বইয়ের নাম দেখে চমকে উঠেছিল। যে যুদ্ধের ভয়াবহতায় একটি গ্রহ বিপর্যস্ত হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ছেলেটি সেই যুদ্ধ বিষয়ক বই পড়ছে। এলিজা তার সম্পর্কে না জেনেই ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু ছিল যা এলিজাকে আকৃষ্ট করেছিল। সে দয়ালু এবং নম্রভদ্র ছিল। সে এলিজার মতোই আশাবাদী চোখ দিয়ে পৃথিবীকে ভাবত।

তারা এমনভাবে কথোপকথন শুরু করেছিল যেন অনেক আগে থেকেই একে অপরকে চিনত। যেন তারা অবিচ্ছেদ্য ছিল। অ্যালেক্স এলিজাকে বলল, ‘আমি অ্যালেক্স। তোমার নাম কী?’
এলিজা খানিক হেসে প্রশ্নের উত্তর দিল, ‘আমি এলিজা।’
অ্যালেক্স এলিজাকে বসতে ইশারা করল। অ্যালেক্স বলল, ‘দেখো আমাদের পৃথিবীটা কি সুন্দর! তোমাকে খুব চেনাচেনা লাগছে। আমাদের মধ্যে কি এর আগে দেখা হয়েছিল? আমরা কি ফেসবুক বন্ধু?’

ফেসবুকের কথা সে এই প্রথম শুনল। মনে মনে সে ভাবল ১০০ বছর আগে পৃথিবীতে নিশ্চয়ই এমন বন্ধুত্ব ছিল। 
এলিজা জানত যে, টাইম মেশিনের শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তার নিজের সময়ে ফিরে আসতে হবে। এলিজা তার নিজের সময়ে ফিরে এসেছে। 
তারপর, একদিন অলৌকিক কিছু ঘটেছিল। একদল বিজ্ঞানী কেবল মনের শক্তি ব্যবহার করে কোনো যন্ত্র ছাড়াই সময়ের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করার কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। এলিজা ছিল বিজ্ঞানীদের পরীক্ষার জন্য প্রথম স্বেচ্ছাসেবকদের একজন।

কিন্তু এর মধ্যে পৃথিবীতে বিশ্বযুদ্ধ শুরু গিয়েছিল। একটি বড় বিপর্যয় ঘটেছিল। যুদ্ধ বেশির ভাগ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। টিকে থাকা মানুষদের দূষিত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামী করে রেখেছিল। এলিজা মরিয়া হয়ে অ্যালেক্সের খোঁজ করল, কিন্তু সে তাকে কোথাও খুঁজে পেল না।

তারপর, দূরে সে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। এটা অ্যালেক্স ছিল। সে এলিজাকে ডাকছিল। এলিজা তার দিকে ছুটে গেল। অ্যালেক্সকে দেখতে পেয়ে তার হৃদয় আনন্দে ভরে গেল। কিন্তু যখন সে কাছে এলো, সে দেখতে পেল যে, সে একা নয়। অ্যালেক্স একটি ছোট শিশুর হাত ধরেছিল। একটি মেয়ে। মেয়েটি দেখতে ঠিক তারই মতো।

/আবরার জাহিন

ব্যাঙের শিক্ষা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ পিএম
ব্যাঙের শিক্ষা
এঁকেছেন মাসুম

এক বনে ছিল ছোট্ট এক কুনোব্যাঙের ছানা, নাম তার টুপ্পু। টুপ্পু দেখতে যেমন গোলগাল আদুরে, তেমনি তার স্বভাব ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারা দিন সে টুপটাপ করে এখানে-সেখানে লাফিয়ে বেড়াত। কিন্তু তার একটা মস্ত বড় দোষ ছিল–সে কারও কথা শুনত না, বড়দের দেওয়া কোনো নিয়মকানুন বা শিক্ষা একদম পাত্তা দিত না। সে মনে মনে ভাবত, ‘আমি তো এত সুন্দর লাফাতে পারি, পোকা ধরতে পারি, আমার আবার নতুন করে শিক্ষার কী দরকার?’
বর্ষাকাল শুরু হতেই বনের চারপাশ পানিতে থই থই করতে লাগল। টুপ্পুর বাবা-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘টুপ্পু, বর্ষার সময় বনের বড় দীঘিটায় কিন্তু একদম যাবে না। ওখানে একটা মস্ত বড় বোয়াল মাছ আর একটা ধূর্ত বক ওঁৎ পেতে থাকে। বড়দের কাছ থেকে আগে শেখ, কীভাবে বিপদে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।’
টুপ্পু তার স্বভাবসুলভ কায়দায় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ধুর! আমি সব জানি। আমার চেয়ে ভালো কে লাফাতে পারে? আমার কোনো শিক্ষার দরকার নেই।’
এই বলে সে নিজের খেয়ালে গান গাইতে গাইতে দীঘির দিকে রওনা দিল।
দীঘির পাড়ে এসে টুপ্পু মনের সুখে লাফালাফি শুরু করল। ঠিক তখনই পাশের একটা কচুরিপানার আড়ালে বসে থাকা এক মস্ত বুড়ো কচ্ছপ তাকে দেখে বলল, ‘খোকন ব্যাঙ, এভাবে খোলা জায়গায় থেকো না। আকাশের দিকে তাকিয়েছ? ওই দেখো, বকপাখি উড়ছে। বিপদ চেনার শিক্ষাটা অন্তত নাও!’
টুপ্পু কচ্ছপ দাদুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। সে বলল, ‘আরে দাদু, বক তো সাদা ধবধবে, দেখতে কত সুন্দর! ও কেন আমার ক্ষতি করবে? তোমরা বড্ড বেশি ভয় পাও।’
কিছুক্ষণ পর টুপ্পুর খুব খিদে পেল। সে দেখল দীঘির জলের ওপর সুন্দর একটা লালচে রঙের ফড়িং ভাসছে। ফড়িংটা অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করছে। টুপ্পু তো ভারি খুশি! সে ভাবল, ‘বাহ্! আজ তো চমৎকার শিকার পেয়েছি।’
এক লাফে ফড়িংটা ধরতে যাবে, এমন সময় দীঘির অভিজ্ঞ এক বুড়ো কোলাব্যাঙ দূর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুপ্পু, থামো! ওটা আসল ফড়িং নয়। ভালো করে লক্ষ করো, ওটা বোয়াল মাছের জিভের ডগা! শিকারি মাছেরা ওভাবে শিকার ভোলায়। বড়দের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নাও!’
কিন্তু টুপ্পু তো কারও বারণ শোনার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, ‘সবাই আমাকে শুধু জ্ঞান দিতে আসে!’ সে কথা না শুনেই দিল এক মস্ত লাফ।
যেমন লাফ দেওয়া, অমনি জলের নিচ থেকে হা করে বেরিয়ে এল বোয়াল মাছের মস্ত বড় মুখ! টুপ্পু তো ভয়ে হিম হয়ে গেল। একদম শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারল বড়দের কথা না শোনার পরিণতি কী। বোয়াল মাছটি কামড় দেওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে টুপ্পু তার সর্বশক্তি দিয়ে উল্টো দিকে একটা আছাড় খেয়ে লাফ দিল। কোনোমতে বোয়াল মাছের ধারাল দাঁত থেকে বেঁচে সে ডাঙায় এসে আছাড় খেয়ে পড়ল।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। ডাঙায় পড়তেই তার মাথার ওপর এসে পড়ল একটা মস্ত বড় ছায়া। ওপর থেকে ধপাস করে নেমে এল বকপাখির দীর্ঘ ঠোঁট! বকের ঠোঁট টুপ্পুর পিঠ ছুঁইছুঁই, ঠিক তখনই তার মাথায় খেলে গেল মায়ের একটা কথা, ‘বিপদে পড়লে কখনো সোজা পালাবি না টুপ্পু, সব সময় আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাবি।’
টুপ্পু আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাতে শুরু করল। বকপাখিটা বারবার ঠোঁট চালাল, কিন্তু টুপ্পুর আঁকাবাঁকা লাফের কৌশলের কাছে প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শেষমেশ টুপ্পু একটা ঘন কাঁটাঝোপের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল, যেখানে বকের ঠোঁট পৌঁছাতে পারল না।
কাঁটাঝোপের ভেতর বসে টুপ্পু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, বড়দের দেওয়া শিক্ষার কত দাম। যদি সে বোয়াল মাছের কৌশলটা আগে থেকে শিখে রাখত, তবে আজ তার এই অবস্থা হতো না। আর যদি মায়ের দেওয়া ওই ছোট্ট শিক্ষাটা মাথায় না রাখত, তবে এতক্ষণে সে বকের পেটে চলে যেত।
বিকেলের দিকে বিপদ কেটে গেলে টুপ্পু গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে এল। তার চোখে তখন অনুশোচনার জল। সে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি বড় ভুল করেছি। শিক্ষা ছাড়া জীবনে কখনো নিরাপদ থাকা যায় না। আজ থেকে তোমরা আমাকে যা শেখাবে, আমি মন দিয়ে তা শিখব।’
সেই থেকে টুপ্পু বনের সবচেয়ে লক্ষ্মী আর বুদ্ধিমান ব্যাঙ হয়ে উঠল। এখন সে আর অহংকার করে না, বরং বড়দের প্রতিটি কথা ও শিক্ষা পরম আদরে মেনে চলে।

ইশপের গল্প শিয়াল ও ছাগল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
শিয়াল ও ছাগল
এঁকেছেন মাসুম

একদা এক চালাক শিয়াল ছিল। একদিন পানি খেতে গিয়ে সে এক কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে কিছুতেই উপরে উঠতে পারল না। 
ইতোমধ্যে এক বোকা ছাগল কুয়ার কাছে এসে শিয়ালকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই, এই কুয়ার জলটা কেমন?’ 
শিয়াল বলল, ‘ভাই, সত্যি কথা বলতে আমি তো এর চেয়ে মিঠে জল আজ পর্যন্ত খাইনি। এসো, তুমিও খেয়ে দেখো একবার।’
পানি খেতে বোকা ছাগলও কুয়াতে নামল। তখন ছাগলও একই সমস্যায় পড়ল। 
শিয়াল বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, যাতে আমরা দুজনেই এই কুয়া থেকে বেরোতে পারব। তুমি তোমার পেছনের পায়ে ওপর দাঁড়াও। আমি তোমার গা বেয়ে উঠে আর তোমার শিং ধরে এক লাফে কুয়া থেকে উপরে উঠে যাব।’
‘কিন্তু আমার কী হবে?’ ছাগল বলল, ‘আমি বেরোব কীভাবে?’ 
‘ঠিক একই ভাবে। তুমি আমার পিঠে উঠে বাইরে বেরিয়ে যাবে।’ 
বোকা ছাগল কিছুই বুঝল না কিন্তু শিয়ালের কথায় রাজি হয়ে গেল। তখনই চালাক শিয়াল তার পিঠে পা রেখে কুয়া থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর চলে যেতে লাগল।
ছাগল চিৎকার করল। শিয়াল বলল, ‘বোকা ছাগল বয়স বেড়েছে। বুদ্ধি বাড়েনি। এবার বসে থাকো কুয়ার মধ্যে।’

গল্পের শিক্ষা: শত্রুকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা
ট্রিওন্ডা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন চমক। আর এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই চমকের নাম ট্রিওন্ডা। এটি তৈরি করেছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে এই বলই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রিওন্ডা নামের অর্থ হলো ‘তিনটি ঢেউ’। এই নামটি রাখা হয়েছে কারণ এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো–এই তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে। বলটির লাল, সবুজ ও নীল রংও তিন স্বাগতিক দেশের প্রতি সম্মান জানায়।
ট্রিওন্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নতুন চার-প্যানেলের নকশা। সাধারণ ফুটবলের তুলনায় এতে কম অংশ জোড়া লাগানো হয়েছে। ফলে বাতাসে বলটি আরও স্থিরভাবে উড়ে এবং খেলোয়াড়দের পাস, শট ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। বলের গভীর সেলাই ও বিশেষ বাইরের আবরণ ভেজা আবহাওয়াতেও ভালো গ্রিপ দেয়।
এই বলের ভেতরে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক ৫০০ হার্টজ মোশন সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে শত শত তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। ফলে অফসাইড, বলে স্পর্শ হয়েছে কি না বা বিতর্কিত মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
বলটির গায়ে তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতীকও রয়েছে। কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারকা বলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া সোনালি রঙের নকশা বিশ্বকাপ ট্রফির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
শুধু একটি ফুটবল নয়, ট্রিওন্ডা আধুনিক প্রযুক্তি, সুন্দর নকশা এবং খেলাধুলার আনন্দকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। তাই এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পায়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজরও রয়েছে এই বিশেষ বলটির দিকে।

প্রজাপতির অভিমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
প্রজাপতির অভিমান
এঁকেছেন মাসুম

হৃদির আঁকাআঁকি করতে ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। প্রজাপতি ছাড়া অন্য কিছু সে তেমন ভালো আঁকতে পারে না। গরু আঁকতে গেলে ঘোড়ার মতো হয়ে যায়, পাখি দেখতে লাগে মুরগির মতো, আর আপেল আঁকলে মনে হয় আতাফল। তাই তার ড্রয়িং খাতার প্রায় সব পাতাই ভরা প্রজাপতির ছবিতে। নানা রঙের, নানা ঢঙের প্রজাপতি। কোনোটা দেখতে যেন ফুলপরী, কোনোটা আবার রংধনুর টুকরো। হৃদির আঁকা প্রজাপতিগুলো এত সুন্দর হয় যে, এই বুঝি খাতার পাতা ছেড়ে উড়ে যাবে। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে গিয়ে বসবে। এতটাই জীবন্ত সেগুলো।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে হৃদি ড্রয়িং খাতা নিয়ে আঁকতে বসল। কিন্তু সেদিন তার মন খুব খারাপ। ক্লাসের রিতু তার একটা ছবি ছিঁড়ে ফেলেছিল। হৃদি ম্যাডামের কাছে বিচার দিয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম উল্টো বলেছিলেন–পড়তে এসে এত আঁকাআঁকি কীসের? কথাটা হৃদির খুব খারাপ লেগেছিল। তার মনে হয়েছিল, আঁকাআঁকি বুঝি কোনো অপরাধ।
মন খারাপ থাকলে যেমন হাত ঠিকমতো কাজ করে না, সেদিনও তেমনই হলো। সে একটা প্রজাপতি আঁকল বটে, কিন্তু পাখাগুলো কেমন ছেঁড়া-ছেঁড়া হয়ে গেল। রংগুলোও মলিন আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল। এমন সময় মা ডাকলেন, হৃদি, নাশতা করে যাও। ড্রয়িং খাতা খোলা রেখেই সে চলে গেল।
নাশতা খেয়ে ফিরে এসে হৃদি অবাক হয়ে গেল। যে পাতায় একটু আগে প্রজাপতিটা এঁকেছিল, সেই পাতাটা একেবারে সাদা! সে বিস্ময়ে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
– তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি।
হৃদি চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল, একটু আগে আঁকা সেই প্রজাপতিটাই কথা বলছে।
– আমার পাখাগুলো দেখো। কত ছেঁড়া! রংগুলোও কেমন বিশ্রী! তোমার অন্য প্রজাপতিগুলো আমাকে খেলায় নেয়নি। বলেছে আমি নাকি দেখতে সুন্দর না। ওরা সবাই বাগানে খেলছে। আর আমি একা।
জানালার বাইরে তাকিয়ে হৃদি আরও অবাক হলো–তার খাতার সব প্রজাপতি বাগানে উড়ছে! কেউ ফুলে বসছে, কেউ রোদে নাচছে, কেউ আবার একে অপরকে তাড়া করে খেলছে।
শুধু এই প্রজাপতিটাই একা দাঁড়িয়ে আছে। হৃদির খুব মায়া হলো। সে আস্তে করে বলল,
– আমি দুঃখিত। আসলে আমার মন খুব খারাপ ছিল। তাই তোমাকে ঠিকমতো আঁকতে পারিনি। তুমি যদি আবার খাতায় ফিরে আসো, আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর করে আঁকব।
প্রজাপতিটা একটু হাসল। তারপর বলল,
– তাহলে চোখ বন্ধ করো।
হৃদি চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখে প্রজাপতিটা আবার খাতার পাতায় ফিরে এসেছে। সে এবার খুব মন দিয়ে আঁকতে শুরু করল। পাখাগুলো সুন্দর করে গড়ল। তারপর লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, কমলা, সবুজ আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিল। এত যত্ন করে সে আগে কখনো কোনো ছবি আঁকেনি। আঁকা শেষ হলে প্রজাপতিটা যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল।
হৃদি এবার নিজেই চোখ বন্ধ করল, কারণ সে বুঝতে পেরেছে–মানুষের চোখের আড়ালেই কেবল এরা জীবন্ত হয়, আর জীবন্ত থেকে খাতায় ছবি হয়ে ফিরে আসে।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে জানালার ধারে একটি সুন্দর প্রজাপতি এসে বসেছে। সে উড়ে এসে একটু আগে হৃদির আঁকা প্রজাপতিটার পাশে দাঁড়াল। তারপর দুজনে একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়ে গেল। যাওয়ার আগে প্রজাপতিটা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার ছোট্ট মুখে ছিল মিষ্টি একটা হাসি। হৃদি বুঝতে পারল, ওটা শুধু বিদায়ের হাসি নয়। ওটা ছিল 
ধন্যবাদের হাসি।
আর সেই দিন থেকে সে আর কখনো মন খারাপ করে কোনো ছবি আঁকেনি। কারণ সে জানে, প্রতিটি ছবিরও হয়তো একটা ছোট্ট মন আছে। আর সেই মনটাকেও যত্ন করতে হয়।

টুনটুনির পুকুর

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
টুনটুনির পুকুর
এঁকেছেন মাসুম

এক ছিল ছোট্ট গ্রাম, নাম তার আনন্দপুর। সেই গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটা সুন্দর পুকুর। কিন্তু পুকুরটার কোনো নাম ছিল না। তবে তোমরা চাইলে আমরা পুকুরটার একটা নাম দিতে পারি, যেমন ধরো, কানা পুকুর। 
সেই কানা পুকুরের পানি ছিল কাচের মতো পরিষ্কার। সেই পানিতে সাঁতার কাটত লাল-নীল মাছের দল। পুকুরের ধারে ছিল বড় বড় আম গাছ, আর সেই গাছের ডালে বাস করত ছোট্ট টুনটুনি পাখি। টুনটুনি যখনই মন খারাপ করত, তখনই পুকুরের দিকে তাকিয়ে গান গাইত। পুকুর যেন টুনটুনির দুঃখের বন্ধু ছিল।
গ্রামের বাচ্চারা রোজ দুপুরে পুকুরের ধারে খেলতে আসত। কেউ ডুব দিত শীতল পানিতে, কেউ বা পুকুরের পাড়ে বসে পানি ছুঁয়ে খেলত। পুকুরটা ছিল গ্রামের সবার খুব প্রিয়।
একদিন গ্রামে এল এক অচেনা লোক। তার নাম ছিল ঘোটন চৌধুরী। ঘোটন চৌধুরী খুব ধনী ছিলেন, কিন্তু তার ছিল শুধু টাকা জমানোর চিন্তা। তিনি গ্রামের সব পুকুর ভরাট করে সেখানে বড় বড় ঘরবাড়ি বানাতে চাইলেন। তিনি ভাবলেন, ‘পুকুর তো শুধু শুধু জায়গা নষ্ট করছে। এখানে বাড়ি বানালে আমি অনেক টাকা পাব।’ 
প্রথমেই তিনি আনন্দপুরের সেই সুন্দর পুকুরটা ভরাট করতে চাইলেন। গ্রামের মানুষরা খুব মন খারাপ করল। বাচ্চারা কাঁদছিল, ‘আমাদের পুকুরটা নষ্ট করে দিও না! আমরা দুপুরে এই পুকুরে সাঁতার কাটি, গোসল করি।’  
টুনটুনি পাখি গাছের ডালে বসে সব দেখল। সে দেখল, বড় বড় গাড়ি এসে পুকুরে মাটি ফেলছে। পুকুরের পানি কমে আসছে। মাছেরা ছটফট করছে। টুনটুনির বুকটা ব্যথায় ভরে গেল। সে ভাবল, ‘আমার বন্ধু পুকুরটা মরে যাচ্ছে!’ 
টুনটুনি উড়তে উড়তে গেল এক জ্ঞানী প্যাঁচার কাছে। প্যাঁচা মশাই সব শুনে বললেন, ‘মানুষকে বোঝাতে হবে পুকুর কেন দরকার। পুকুর শুধু পানির জায়গা নয়, পুকুর হলো গ্রামের প্রাণ।’ 
টুনটুনি আবার গ্রামের কাছে ফিরে এল। সে দেখল, বাচ্চারা আর পুকুরের কাছে খেলা করে না। পুকুরটা প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়ে গেছে। টুনটুনি তখন একটা বুদ্ধি বের করল।
সে রোজ সকালে পুকুরের ধারে উড়ে যেত। তারপর নিজের ছোট চঞ্চু দিয়ে মাটি থেকে একটা করে পানির ফোঁটা তুলে আনত। সেই ফোঁটাগুলো সে পুকুরের শুকনো অংশে ফেলত। গ্রামের মানুষ আর ঘোটন অবাক হয়ে দেখল।
একজন বলল, ‘আহা রে! ছোট্ট পাখিটা এই পুকুর বাঁচানোর চেষ্টা করছে!’ 
আরেক বৃদ্ধ লোক বলল, ‘আমরা এত বড় হয়েও যা বুঝিনি, এই ছোট্ট পাখিটা সেটাই বোঝাচ্ছে।’
টুনটুনির এই চেষ্টা দেখে গ্রামের সবার মন বদলে গেল। তারা বুঝতে পারল, পুকুর শুধু পানির জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও খুব দরকার। পুকুর না থাকলে গরম বেড়ে যাবে, মাছেরা বাঁচবে না, আর গ্রামের সৌন্দর্যও নষ্ট হবে।
সবাই মিলে ঘোটন চৌধুরীর কাছে গেল। তারা বলল, ‘চৌধুরী, আপনি পুকুরটা ভরাট করবেন না। আমরা পুকুরটা যেমন আছে তেমনই রাখতে চাই...।’ 
ঘোটন চৌধুরী সবার কথা শুনে খুব লজ্জা পেলেন। তিনি বুঝলেন, টাকা দিয়ে সব হয় না। ভালোবাসা আর পরিবেশের মূল্য অনেক বেশি। তিনি পুকুর ভরাট করা বন্ধ করে দিলেন। শেষে তিনি হাত জোড় করে বললেন, ‘আপনারা আজ আমার চোখ খুলে দিলেন, নয়তো আমি খুব বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছিলাম। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’ 
কিছুদিনের মধ্যেই পুকুরটা আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে উঠল। মাছেরা আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল। আর টুনটুনি পাখি প্রতিদিন পুকুরের ধারে বসে আনন্দে গান গায়। সে জানে, তার বন্ধু পুকুরটা বেঁচে গেছে।