ঢাকা ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
চট্টগ্রামে চাঁদা না পেয়ে দিনদুপুরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে  হামলা-লুটপাট,২ কোটি টাকা দাবি সংবিধান সংশোধনে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন, বিরোধী দলের ওয়াকআউট শ্রাবণে কী হবে কড়াইল বস্তিবাসীর! ইরানের টার্গেটে ট্রাম্পসহ যেসব বিশ্বনেতা গাইবান্ধার আলোচিত হরিদাস চন্দ্র অর্থ পাচার মামলায় রিমান্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় জাককানইবির শিক্ষার্থী নিহত ফরাসি স্বপ্নের কাণ্ডারি এমবাপ্পে যশোর শহরের নিম্নাঞ্চল জলাবদ্ধ ভাসমান ছেঁড়া স্যান্ডেলে ইঁদুরের আশ্রয়: যেন বন্যার্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি ১৪ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় ডুবছে গাজীপুর ফরাসি সৌরভ, না স্প্যানিশ সৌন্দর্য ১৪ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল পে-স্কেল বাস্তবায়নে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তামাটে পাতার মাঝে আগুনের শিখা রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের বাস চলাচল বন্ধ ইয়ামালের আলোয় স্পেনের স্বপ্ন ‘স্পাইডার’ আলভারেজ: ফুটবলের জন্যই যার জন্ম বিশ্বকাপ কি এবার সত্যিই ‘বিশ্বের’ হবে? প্রথম সেমিতে ইতিহাসের বাঁশি ‘দাবি না মানলে বিশ্বকাপে যেতেন না কোচ’, চাঞ্চল্যকর তথ্য ফেডারেশনের ইতিহাস গড়া নরওয়ের বীরদের বরণে রাস্তায় লাখো মানুষ ‘শুধু এমবাপ্পেকে নয়, পুরো ফ্রান্সকেই থামাতে হবে’ মেসির মুখোমুখি হওয়ার আগে যা বললেন নিকো ও’রেইলি ‘স্পেনকে ভয় নয়, সম্মান’ মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে ইংল্যান্ড! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘লাকি’ জার্সি পরে খেলবে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার ২ মাস পর রেফারির মৃত্যু ১৩ বছর পর আবারও ক্রোয়েশিয়ার কোচ স্লাভেন বিলিচ হালান্ডকে পাস না দেওয়ায় সরলথকে আত্মহত্যা করার বার্তা!

ছোটবেলায় নজরুল

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ০৮:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৬ মে ২০২৪, ০৮:৫৩ পিএম
ছোটবেলায় নজরুল
ছবি: সংগৃহীত

সবারই তো ছোটবেলা থাকে। কাজী নজরুল ইসলামেরও ছিল। তো কেমন ছিল আমাদের জাতীয় কবির ছোটবেলা? 

কেন তিনি দুখু মিয়া
কবির জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯   খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। বাবা কাজী ফকির আহমদ। মা জাহেদা খাতুন ছিলেন ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী। মায়ের ষষ্ঠ সন্তান নজরুল। নজরুলের জন্মে কাজীবাড়ি সেদিন আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছিল। নজরুলের বড় ভাই কাজী সাহেবজান। বড় ভাইয়ের পর আরও চার ভাই ছিলেন। তবে বড় ভাই ছাড়া বাকি চার ভাই নজরুলের জন্মের আগেই একে একে বাবা-মায়ের কোল খালি করে চলে যান। তারপরই নজরুলের জন্ম।

সে কারণেই নজরুলের বাবা-মায়ের মনে ভয় কাজ করেছিল। যে কারণে ভালো নাম হিসেবে রইল কাজী নজরুল ইসলাম। ডাক নাম দুখু মিয়া। নজরুলের পর একটি ছোট ভাই হলো। ছোট ভাইয়ের নাম কাজী আলী হোসেন। আর ছিলেন তাদের একমাত্র বোন উম্মে কুলসুম। সাজেদুন্নেসা নামে এক বৈমাত্রেয় বোনও ছিলেন। নজরুলের দাদা কাজী আমিনুল্লাহ। নানা তোফায়েল আলী।

কাজী বংশের কথা
নজরুল ইসলামের নামের আগে কাজী শব্দটি তার বংশীয় উপাধি। চুরুলিয়া গ্রাম এবং কাজী পরিবারের একটি ইতিহাস আছে। মোঘল আমলের সময় বিহারের রাজধানী পাটনার হাজিপুর থেকে একটি পরিবার এসেছিল চুরুলিয়ায়। তখন দিল্লির সিংহাসনে ছিলেন সম্রাট শাহ আলম। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সে সময় এই চুরুলিয়া গ্রামে একটি আদালত বসেছিল। এই আদালতেরই কাজী ছিলেন পাটনা থেকে আসা সেই পরিবারের কোনো একজন কাজী। কাজী সাহেব তখন থেকে পরিবার নিয়ে চুরুলিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

সেই পরিবারেরই নাম হয়ে যায় কাজী পরিবার। পরে ওই পরিবারের আর কেউ কাজী হিসেবে যুক্ত না হলেও ‘কাজী’ পদবি রয়ে যায়। কাজী পরিবার সম্রাটের দরবার থেকে অনেক জমিজমা পেয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই ধনদৌলত সবই চলে গেল। রয়ে গেল শুধু বংশগৌরব। আর রইল বিদ্যাচর্চার ঝোঁক। জ্ঞানের প্রতি আসক্তি তাদের রক্তের ধারা। 

হাতেখড়ি
দুখুর হাতেখড়ি হয়েছিল তার পিতার কাছেই। এক দুই গুনতে শেখা, অক্ষর চেনা, এর পরই শুরু হলো তার স্কুলজীবন। স্কুল মানে মক্তব। মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মৌলভী কাজী ফজলে আহমদ। তিনি খুব ভালো আরবি ও ফারসি জানতেন। তার কাছেই দুখু কোরআন পড়তে শিখেছিলেন। নজরুলের ফারসি ভাষা শেখার শুরুটাও হয়েছিল তার হাতেই। তখন মক্তবে পড়ানো হতো আরবি, ফারসি আর বাংলা।

এ ছাড়া নজরুল তার বাবার চাচাতো ভাই কাজী বজলে করিম অর্থাৎ করিম চাচার কাছ থেকেও শিক্ষা নিয়েছিলেন। বজলে করিম ছিলেন উর্দু ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী। বাংলাতেও ভালো দখল ছিল। ভীষণ কবিতাপাগল। চাচা-ভাতিজার সম্পর্কও ছিল খুবই মধুর। নজরুলের শিশু মনে ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন এই করিম চাচা। প্রায়ই করিম চাচার সঙ্গে মুখে মুখে ছড়া কাটতেন।

ছোট হুজুর
নজরুলের বয়স যখন মাত্র আট পেরিয়ে নয়, বাবা কাজী ফকির আহমদ চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। বেড়ে গেল সংসারের অভাব-অনটন। বাবা মারা যাওয়ার এক বছর পর মক্তব থেকে নিম্নপ্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। কিন্তু লেখাপড়াকে দূরে ঠেলে সংসারের অভাব মেটাতে কাজে নামতে হলো। ১০ বছর বয়সেই চাকরি পেলেন মক্তবে। ছোট্ট হুজুরকে মেনেও নিল সবাই। মক্তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি মাজারের খাদেমগিরি আর মসজিদের ইমামতির কাজও করতে থাকলেন। পাশাপাশি চলল কাব্যচর্চা।

কাব্যচর্চা ও লেটোর দল
নজরুলের কাব্যচর্চার হাতেখড়ি হয়েছিল বজলে করিম চাচার হাতেই। কাব্যরসিক করিম চাচা নিজের অজান্তেই স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে লাগলেন নজরুলের মনে। করিম চাচার নিজের একটা লেটোর দল ছিল। তখন আসানসোল-রানীগঞ্জ অঞ্চলে লেটোগানের খুব প্রচলন ছিল।

লেটোর দলে গান আর নাচ দুটো একসঙ্গে পরিবেশন হতো। সেই সঙ্গে যাত্রাভিনয়ের কিছু ঢং জুড়ে দিয়ে একটা গল্প ফুটে উঠত। দুটো দলের আসর বসত। এক দল অন্য দলের প্রতিপক্ষ। সুরে সুরে নেচেগেয়ে অভিনয় করে প্রতিপক্ষের উত্তর দেওয়া হতো। 

পরিচয় একটাই- মানুষ
নিজের দলের জন্য কবিতা লিখতেন চাচা বজলে করিম নিজেই। গ্রামের লোকের কাছে সেগুলোর খুব কদর ছিল। নজরুলকে তিনি সব সময় কাছে কাছে রাখতেন। গান শুনতে শুনতে, নাচ আর অভিনয় দেখতে দেখতে মুখে মুখে ছড়া বানিয়ে ফেলতেন নজরুলও। আরবি, ফারসি, বাংলা, ইংরেজি মিশিয়ে অদ্ভুত আর অসাধারণ সব পদ্য তৈরি করে ফেলতেন। একসময় তিনিও হয়ে উঠলেন লেটোর দলের একজন। প্রথমে বজলে করিম চাচার দলেই কাজ শুরু করলেন। তবে তখন তিনি দুখু মিঞা নামেই পরিচিত ছিলেন।

রাতারাতি তিনি হয়ে উঠলেন খুদে গ্রাম্য কবি। তাকে খুদে ওস্তাদ হিসেবেও মেনে নিয়েছিল লেটোর দলগুলো। লেটোর দলে কাজ করে নজরুলের কিছু অর্থ উপার্জন হতো। চুরুলিয়া এবং এর আশপাশের গ্রামগুলোতেও কয়েকটি নামকরা লেটোর দল ছিল। নিমশাহ, চুরুলিয়া আর রাখাখুড়া- এই তিন গ্রামের লেটোর দলই দুখু মিয়াকে নিজের দলে টানতে চাইত।

চাচা বজলে করিমের লেটোর দলে কাজ করার পাশাপাশি অন্য দলগুলোতেও কাজ করতেন তিনি। কোনো দলের জন্য গান, কোনো দলের জন্য পালাগান, কবিগান লিখে দিতেন। এসব জায়গা থেকেও কিছু পয়সা আসত। এমনি করেই তার জগৎ বড়ো হতে থাকে। নতুন নতুন বন্ধুও জুটতে থাকে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান কোনো জাতপাত ভেদাভেদ করতেন না। তার কাছে মানুষের পরিচয় ছিল একটাই- মানুষ। 

ব্যাঙাচি
লেটোর দলের সঙ্গে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন বলে অনেক কিছু দেখেছেন। নতুন পরিবেশ, প্রকৃতি, মানুষ। ছোট্ট দুখু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে পা ফেললেন কৈশোরে। এই কিশোর কবির গুণমুগ্ধ ছিলেন তখনকার বিখ্যাত কবিয়াল শেখ চকোর। মাঝে মাঝে তিনি আদর করে দুখুকে ‘ব্যাঙাচি’ বলে ডাকতেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘এই ব্যাঙাচি বড় হয়ে সাপ হবে।’

স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর
নজরুল প্রায় দুই বছর বিভিন্ন লেটোর দলে কাজ করেছিলেন। দেই বছর পর হঠাৎ তার লেখাপড়ার তাগিদ অনুভব হলো। ব্যস, ছেড়ে দিলেন লেটো গানের দলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কাজ করা। এদিকে সংসারের অভাব মেটাতে গিয়ে বড় ভাই সাহেবজানেরও লেখাপড়া হলো না। মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে বড় ভাইকে চাকরি জোটাতে হয়েছিল কয়লাখনিতে।

অথচ কথায় আছে, কাজী বাড়ির বিড়ালও নাকি লিখতে পড়তে জানে। কিন্তু কাজী ফকিরের কোনো ছেলেরই লেখাপড়া হবে না, তা তো আর হয় না। নজরুলের স্মৃতিশক্তি ছিল যেমন প্রখর তেমনি খুব মেধাবীও ছিলেন। লেখাপড়ার আকাঙ্ক্ষা তার প্রবল ছিল। গ্রামে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরও অভাব ছিল না। গ্রামের সেই শুভাকাঙ্ক্ষীরাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে দুখু আবার স্কুলে যাক। তাই নজরুল ভর্তি হলেন নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটে।

এখানে লেখাপড়ার খরচ কম। স্কুলটি কাশিমবাজারের মহারাজাদের। স্কুলটি ছিল বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার মাথরুন গ্রামে। তাই মাথরুন স্কুল নামে পরিচিতি পেয়েছিল। ১৯১১ সালে এই মাথরুন স্কুলে নজরুল ভর্তি হয়েছিলেন ফিফথ ক্লাসে অর্থাৎ ষষ্ঠ শেণিতে। এক বছর লেখাপড়ার পর অর্থের অভাবে ১৯১২ সালে মাথরুন স্কুল ত্যাগ করেন।

মদনের বৌ
প্রায়ই বাসুদেবের দলের সঙ্গে গান করে বেড়াতেন নজরুল। একবার বাসুদেবের দল দুটো বায়না পেয়েছিল। মদনের দোকান ঘরের পাশে একটা টিনের চালা ঘরে মহড়ার আসর বসত। কিন্তু আসর শুরু হলেই মদনের বৌ আর বেটি ঘরের সব কাজ ফেলে গান শুনতে বসে যেত। গান শুনতে শুনতে তারা এমনই মগ্ন হয়ে যেত যে, রাতের রান্নাটা পর্যন্ত ভালো করে করত না।

স্কুল ফাঁকি দিয়ে
প্রায় ১০-১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হতো নজরুলকে। এই সুযোগে কখনো কখনো স্কুল ফাঁকিও দিতেন তিনি। পাশের বাড়ির সহপাঠী বন্ধুকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে নেমে পড়তেন খেলাধুলায়। মন খারাপ হলে তো সারা দিনই কাটিয়ে দিতেন শুকনি বিলের ধারে এক বটগাছ তলায়। ওখানে বসে কৃষক, পথিকের সঙ্গে গল্পের আসর জমাতেন, বাঁশি বাজাতেন। 

ভাঙা হারমোনিয়ামে
নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে তিনি বেশ অনেকটা সময় ছিলেন। এ বাড়িতে একটা ভাঙা হারমোনিয়াম ছিল। হারমোনিয়ামটি ঠিক করে দিতে প্রায়ই বলতেন নজরুল। শেষে নিজেই একদিন তিন বন্ধুকে নিয়ে হারমোনিয়ামটি ঠিক করে ফেললেন। তারপর থেকে প্রতিদিন বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে গান গাওয়া শুরু করলেন। তখন তার গান শুনতে উঠোন ভরে যেত লোকে।

একমাত্র নজরুল
দরিমার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপিন চন্দ্র চক্রবর্তী ভীষণ রাগী ছিলেন। অন্য ছাত্ররা তো তাকে ভীষণ ভয় পেতই, নজরুলও খুব ভয় পেতেন। তবে প্রধান শিক্ষক কিন্তু নজরুলকে খুবই স্নেহ করতেন। নজরুল কিন্তু স্নেহ অর্জন করে নিয়েছিলেন। কীভাবে? প্রধান শিক্ষক প্রায়ই বিভিন্ন ক্লাসে যেতেন। ছাত্রদের লেখাপড়ার খবর নিতেন।

তেমনি একদিন প্রধান শিক্ষক এলেন নজরুলদের ক্লাসে। ক্লাসে পড়া ধরতে গিয়ে প্রায় সব ছাত্রকেই নিলডাউন করিয়ে ছিলেন। শুধুমাত্র নজরুলকে ছাড়া। কারণ পুরো ক্লাসে নজরুলই একমাত্র ছাত্র ছিলেন যিনি পড়া দিতে পেরেছিলেন। যতই দুরন্তপনা করুন না কেন, নজরুল কিন্তু লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলেন।

পঞ্চুর এয়ারগান
একবার নজরুলের মনে হলো বন্দুক চালানো শিখবেন। বন্দুক না থাকলেও বন্ধু পঞ্চুর একটা এয়ারগান ছিল। ওটা দিয়েই চর্চা চালাতে লাগলেন। বন্ধুরা ভেবেছিল নজরুল বুঝি পাখি শিকার করতে ভালোবাসে। তাই এয়ারগানের প্রতি তার এত আগ্রহ। কিন্তু না, নজরুল তো পাখিদের ভালোবাসেন। সত্যিই তাই, নজরুলের নিশানা পাখি নয়, ইংরেজ।

যারা অন্য দেশ থেকে এ দেশে এসেছে। আর এ দেশের মানুষকে পরাধীন করে রেখেছে। তাই খ্রিষ্টান গোরস্থানের সারি সারি ইট বাঁধানো বেদিতে এয়ারগানের গুলি ছুড়ে চর্চা করতেন নজরুল। নজরুলের কাছে গোরস্থানের এক একটা বেদি এক একটা ইংরেজ। একটা বেদি বড় লাট, একটা বেদি ছোটলাট, একটা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, একটা এসডিও। চুনকাম করা ইটের দেয়ালে এয়ারগানের গুলি লাগলেই খুশিতে উল্লাস করেন নজরুল। খ্রিষ্টানদের গোরস্থানে কিছুটা হাত পাকিয়ে তারপর গেলেন বাগানে।

বাগানে সারি সারি পেঁপে গাছ। গাছে তখন বড়ো বড়ো পেঁপে ধরেছিল। হাত পাকানোর জন্য পেঁপেগুলো বেশ কাজে দিল। তিন দিনেই হাত পাকল নজরুলের। ছোট দারোগা, বড় দারোগা কল্পনা করে অনেক পেঁপের গায়ে এয়ারগানের গুলি ছুড়লেন তিনি। কাল্পনিক আরও অনেক বিশ্বাসঘাতক বাঙালিকেও নিশানা করতে থাকলেন। আর বললেন, ‘দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াতে হবে। এমনিতে ওরা যাবে না। ওদের মেরেই তাড়াতে হবে।’ 

বাঁদরে কলা খেয়েছে
এক ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির থাকতেন নজরুল। পড়াশোনার পাশাপাশি নানা কাজে তাদের সাহায্য করতেন। এক দিন ব্যাপারীবাড়ির বউ নজরুলকে বললেন গাছ থেকে কলার কাঁদি পেড়ে আনতে। কলার কাঁদি পাড়তে গিয়ে নজরুল দেখলেন বেশ কিছু কলা পেকে রয়েছে।

তিনি করলেন কী, বেছে বেছে পাকা কলাগুলো খেয়ে নিলেন। আর বাকি কলাগুলো বাড়িতে নিয়ে এলেন। ব্যাপারীর বউ তো অবাক! বললেন, সব কাঁচা! কাঁদিতে পাকা কলাও তো দেখেছিলাম। পাকাগুলো গেল কোথায়? নজরুল বললেন, পাকাগুলো বাঁদরে খেয়ে ফেলেছে। 

দে গরুর দড়ি ছেড়ে
একবার নজরুল যাত্রাপালা দেখে ফিরলেন অনেক রাতে। বাড়ির সবাই ঘুম। কিন্তু পেটে যে তার ভীষণ খিদে। উঠানে পা রেখেই ভাবতে লাগলেন কী করবেন। ভালো একটা বুদ্ধি এল মাথায়। তিনি করলেন কী, হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘চোর চোর! চোর গরু নিয়ে গেল।’ চিৎকার শুনে বাড়ির লোক ছুটে বেরিয়ে এল। দড়ি ছাড়া গরুগুলোকে ধরে গোয়ালে রাখল।

কিন্তু কোনো চোরের দেখা পাওয়া গেল না। গরু বাঁচাতে পেরে বাড়ির কর্তা তো ভীষণ খুশি। তখন মাথায় হাত বুলিয়ে কর্তা বললেন, ‘ক্ষুধা লাগে না তোর? যা ভাত খা গিয়ে।’ নজরুল তো ভীষণ খুশি। তিনিও এটাই চাইছিলেন। এত রাতে ঘরেও ঢোকা হলো। কোনো কৈফিয়তও দিতে হলো না। আবার পেটে ভাতও জুটল। সবই হলো গরুর উছিলায়। তাই খুশিতে বলে উঠলেন, ‘দে গরুর দড়ি ছেড়ে।’ আসলে নজরুল নিজেই গরুর দড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ন্যায়বিচার
নজরুল তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বরাবরের মতো সেবারও ক্লাসে ফার্স্ট। ফারসিতে পেয়েছিলেন ৯৮ শতাংশ নম্বর। এদিকে ক্লাসের বেশির ভাগ ছাত্রই ফারসিতে ফেল করে বসল। ফেল করা ছাত্রদের নিয়ে মহা মুশকিলে পড়লেন ফারসি শিক্ষক মৌলভী জহুরুল হক। ছাত্রদের পাস করাতে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে সব ছাত্রকে পাঁচ নম্বর গ্রেস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

পাঁচ নম্বর গ্রেস দেওয়া হচ্ছে শুনে নজরুল হাজির হলেন প্রধান শিক্ষকের কাছে। সবাইকে পাঁচ নম্বর দিলে তিনিও তো পাঁচ নম্বর পাওনা। দাবি জানালেন তাকেও পাঁচ নম্বর দিতে হবে। কিন্তু তাকে পাঁচ নম্বর দিতে কিছুতেই রাজি নন প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ বিতর্ক হলো।

তবু নজরুল সেই পাঁচ নম্বর উদ্ধার করতে পারলেন না। তখনই নজরুল বললেন, ‘যে স্কুলে ন্যায়বিচার নেই, সেখানে নজরুল পড়বে না। আপনারা হয়তো আমাকে স্কুল সার্টিফিকেট দেবেন না। তাতে আমার কিছু আসে যায় না।’ ক্লাস এইটের সার্টিফিকেট না নিয়েই নজরুল স্কুল ছাড়লেন।

ঝালরুটি আর চা
সিয়ারসোল রাজবাড়ি থেকে নজরুল মাসিক সাত টাকা বৃত্তি পেতেন। সেই টাকা-পয়সা সবই থাকত তার বিছানার তলায়। তার অগোছাল ছোট্ট বিছানাটি ছিল জানালার পাশে। রোজ সেই জানালার পাশে এক বিস্কুটওলা এসে হাজির হতো। বাঁশের ঝুড়িতে থাকত নানারকম বিস্কুট। পাউরুটিও থাকত নানা রকমের। লবণ মরিচ দিয়ে শক্ত করে বানানো এক ধরনের পাউরুটি ছিল তার কাছে।

 নাম ছিল ঝালরুটি। ঝালরুটি আর চা ছিল নজরুল আর বন্ধু শৈলর খুব পছন্দের। চার আনার ঝালরুটি হলেই তাদের হয়ে যেত। বৃত্তির টাকার বেশির ভাগই চলে যেত ওই রুটি ওয়ালার পকেটে। রুটিওলাও ছিল নাছোড় বান্দা। রোজই তাদের রুটি বা বিস্কুট কিছু না কিছু দিয়ে যেতই। টাকা না থাকলেও রুটি দিয়ে চলে যেত। যাওয়ার সময় শুধু বলে যেত, চার আনা ধার রইল। কখনো কখনো সেই ধার শোধ করতেন তার বন্ধুরা।


তথ্যসূত্র
আমার বন্ধু নজরুল: শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা: মুজফফর আহমদ, আমার শিল্পী জীবনের কথা: আব্বাসউদ্দীন আহমদ, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে: শৈলজানন্দ মুখপাধ্যায়, কিশোর নজরুল: হায়াৎ মামুদ

/আবরার জাহিন

ব্যাঙের শিক্ষা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ পিএম
ব্যাঙের শিক্ষা
এঁকেছেন মাসুম

এক বনে ছিল ছোট্ট এক কুনোব্যাঙের ছানা, নাম তার টুপ্পু। টুপ্পু দেখতে যেমন গোলগাল আদুরে, তেমনি তার স্বভাব ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারা দিন সে টুপটাপ করে এখানে-সেখানে লাফিয়ে বেড়াত। কিন্তু তার একটা মস্ত বড় দোষ ছিল–সে কারও কথা শুনত না, বড়দের দেওয়া কোনো নিয়মকানুন বা শিক্ষা একদম পাত্তা দিত না। সে মনে মনে ভাবত, ‘আমি তো এত সুন্দর লাফাতে পারি, পোকা ধরতে পারি, আমার আবার নতুন করে শিক্ষার কী দরকার?’
বর্ষাকাল শুরু হতেই বনের চারপাশ পানিতে থই থই করতে লাগল। টুপ্পুর বাবা-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘টুপ্পু, বর্ষার সময় বনের বড় দীঘিটায় কিন্তু একদম যাবে না। ওখানে একটা মস্ত বড় বোয়াল মাছ আর একটা ধূর্ত বক ওঁৎ পেতে থাকে। বড়দের কাছ থেকে আগে শেখ, কীভাবে বিপদে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।’
টুপ্পু তার স্বভাবসুলভ কায়দায় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ধুর! আমি সব জানি। আমার চেয়ে ভালো কে লাফাতে পারে? আমার কোনো শিক্ষার দরকার নেই।’
এই বলে সে নিজের খেয়ালে গান গাইতে গাইতে দীঘির দিকে রওনা দিল।
দীঘির পাড়ে এসে টুপ্পু মনের সুখে লাফালাফি শুরু করল। ঠিক তখনই পাশের একটা কচুরিপানার আড়ালে বসে থাকা এক মস্ত বুড়ো কচ্ছপ তাকে দেখে বলল, ‘খোকন ব্যাঙ, এভাবে খোলা জায়গায় থেকো না। আকাশের দিকে তাকিয়েছ? ওই দেখো, বকপাখি উড়ছে। বিপদ চেনার শিক্ষাটা অন্তত নাও!’
টুপ্পু কচ্ছপ দাদুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। সে বলল, ‘আরে দাদু, বক তো সাদা ধবধবে, দেখতে কত সুন্দর! ও কেন আমার ক্ষতি করবে? তোমরা বড্ড বেশি ভয় পাও।’
কিছুক্ষণ পর টুপ্পুর খুব খিদে পেল। সে দেখল দীঘির জলের ওপর সুন্দর একটা লালচে রঙের ফড়িং ভাসছে। ফড়িংটা অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করছে। টুপ্পু তো ভারি খুশি! সে ভাবল, ‘বাহ্! আজ তো চমৎকার শিকার পেয়েছি।’
এক লাফে ফড়িংটা ধরতে যাবে, এমন সময় দীঘির অভিজ্ঞ এক বুড়ো কোলাব্যাঙ দূর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুপ্পু, থামো! ওটা আসল ফড়িং নয়। ভালো করে লক্ষ করো, ওটা বোয়াল মাছের জিভের ডগা! শিকারি মাছেরা ওভাবে শিকার ভোলায়। বড়দের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নাও!’
কিন্তু টুপ্পু তো কারও বারণ শোনার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, ‘সবাই আমাকে শুধু জ্ঞান দিতে আসে!’ সে কথা না শুনেই দিল এক মস্ত লাফ।
যেমন লাফ দেওয়া, অমনি জলের নিচ থেকে হা করে বেরিয়ে এল বোয়াল মাছের মস্ত বড় মুখ! টুপ্পু তো ভয়ে হিম হয়ে গেল। একদম শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারল বড়দের কথা না শোনার পরিণতি কী। বোয়াল মাছটি কামড় দেওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে টুপ্পু তার সর্বশক্তি দিয়ে উল্টো দিকে একটা আছাড় খেয়ে লাফ দিল। কোনোমতে বোয়াল মাছের ধারাল দাঁত থেকে বেঁচে সে ডাঙায় এসে আছাড় খেয়ে পড়ল।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। ডাঙায় পড়তেই তার মাথার ওপর এসে পড়ল একটা মস্ত বড় ছায়া। ওপর থেকে ধপাস করে নেমে এল বকপাখির দীর্ঘ ঠোঁট! বকের ঠোঁট টুপ্পুর পিঠ ছুঁইছুঁই, ঠিক তখনই তার মাথায় খেলে গেল মায়ের একটা কথা, ‘বিপদে পড়লে কখনো সোজা পালাবি না টুপ্পু, সব সময় আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাবি।’
টুপ্পু আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাতে শুরু করল। বকপাখিটা বারবার ঠোঁট চালাল, কিন্তু টুপ্পুর আঁকাবাঁকা লাফের কৌশলের কাছে প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শেষমেশ টুপ্পু একটা ঘন কাঁটাঝোপের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল, যেখানে বকের ঠোঁট পৌঁছাতে পারল না।
কাঁটাঝোপের ভেতর বসে টুপ্পু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, বড়দের দেওয়া শিক্ষার কত দাম। যদি সে বোয়াল মাছের কৌশলটা আগে থেকে শিখে রাখত, তবে আজ তার এই অবস্থা হতো না। আর যদি মায়ের দেওয়া ওই ছোট্ট শিক্ষাটা মাথায় না রাখত, তবে এতক্ষণে সে বকের পেটে চলে যেত।
বিকেলের দিকে বিপদ কেটে গেলে টুপ্পু গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে এল। তার চোখে তখন অনুশোচনার জল। সে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি বড় ভুল করেছি। শিক্ষা ছাড়া জীবনে কখনো নিরাপদ থাকা যায় না। আজ থেকে তোমরা আমাকে যা শেখাবে, আমি মন দিয়ে তা শিখব।’
সেই থেকে টুপ্পু বনের সবচেয়ে লক্ষ্মী আর বুদ্ধিমান ব্যাঙ হয়ে উঠল। এখন সে আর অহংকার করে না, বরং বড়দের প্রতিটি কথা ও শিক্ষা পরম আদরে মেনে চলে।

ইশপের গল্প শিয়াল ও ছাগল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
শিয়াল ও ছাগল
এঁকেছেন মাসুম

একদা এক চালাক শিয়াল ছিল। একদিন পানি খেতে গিয়ে সে এক কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে কিছুতেই উপরে উঠতে পারল না। 
ইতোমধ্যে এক বোকা ছাগল কুয়ার কাছে এসে শিয়ালকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই, এই কুয়ার জলটা কেমন?’ 
শিয়াল বলল, ‘ভাই, সত্যি কথা বলতে আমি তো এর চেয়ে মিঠে জল আজ পর্যন্ত খাইনি। এসো, তুমিও খেয়ে দেখো একবার।’
পানি খেতে বোকা ছাগলও কুয়াতে নামল। তখন ছাগলও একই সমস্যায় পড়ল। 
শিয়াল বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, যাতে আমরা দুজনেই এই কুয়া থেকে বেরোতে পারব। তুমি তোমার পেছনের পায়ে ওপর দাঁড়াও। আমি তোমার গা বেয়ে উঠে আর তোমার শিং ধরে এক লাফে কুয়া থেকে উপরে উঠে যাব।’
‘কিন্তু আমার কী হবে?’ ছাগল বলল, ‘আমি বেরোব কীভাবে?’ 
‘ঠিক একই ভাবে। তুমি আমার পিঠে উঠে বাইরে বেরিয়ে যাবে।’ 
বোকা ছাগল কিছুই বুঝল না কিন্তু শিয়ালের কথায় রাজি হয়ে গেল। তখনই চালাক শিয়াল তার পিঠে পা রেখে কুয়া থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর চলে যেতে লাগল।
ছাগল চিৎকার করল। শিয়াল বলল, ‘বোকা ছাগল বয়স বেড়েছে। বুদ্ধি বাড়েনি। এবার বসে থাকো কুয়ার মধ্যে।’

গল্পের শিক্ষা: শত্রুকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা
ট্রিওন্ডা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন চমক। আর এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই চমকের নাম ট্রিওন্ডা। এটি তৈরি করেছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে এই বলই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রিওন্ডা নামের অর্থ হলো ‘তিনটি ঢেউ’। এই নামটি রাখা হয়েছে কারণ এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো–এই তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে। বলটির লাল, সবুজ ও নীল রংও তিন স্বাগতিক দেশের প্রতি সম্মান জানায়।
ট্রিওন্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নতুন চার-প্যানেলের নকশা। সাধারণ ফুটবলের তুলনায় এতে কম অংশ জোড়া লাগানো হয়েছে। ফলে বাতাসে বলটি আরও স্থিরভাবে উড়ে এবং খেলোয়াড়দের পাস, শট ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। বলের গভীর সেলাই ও বিশেষ বাইরের আবরণ ভেজা আবহাওয়াতেও ভালো গ্রিপ দেয়।
এই বলের ভেতরে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক ৫০০ হার্টজ মোশন সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে শত শত তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। ফলে অফসাইড, বলে স্পর্শ হয়েছে কি না বা বিতর্কিত মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
বলটির গায়ে তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতীকও রয়েছে। কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারকা বলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া সোনালি রঙের নকশা বিশ্বকাপ ট্রফির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
শুধু একটি ফুটবল নয়, ট্রিওন্ডা আধুনিক প্রযুক্তি, সুন্দর নকশা এবং খেলাধুলার আনন্দকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। তাই এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পায়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজরও রয়েছে এই বিশেষ বলটির দিকে।

প্রজাপতির অভিমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
প্রজাপতির অভিমান
এঁকেছেন মাসুম

হৃদির আঁকাআঁকি করতে ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। প্রজাপতি ছাড়া অন্য কিছু সে তেমন ভালো আঁকতে পারে না। গরু আঁকতে গেলে ঘোড়ার মতো হয়ে যায়, পাখি দেখতে লাগে মুরগির মতো, আর আপেল আঁকলে মনে হয় আতাফল। তাই তার ড্রয়িং খাতার প্রায় সব পাতাই ভরা প্রজাপতির ছবিতে। নানা রঙের, নানা ঢঙের প্রজাপতি। কোনোটা দেখতে যেন ফুলপরী, কোনোটা আবার রংধনুর টুকরো। হৃদির আঁকা প্রজাপতিগুলো এত সুন্দর হয় যে, এই বুঝি খাতার পাতা ছেড়ে উড়ে যাবে। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে গিয়ে বসবে। এতটাই জীবন্ত সেগুলো।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে হৃদি ড্রয়িং খাতা নিয়ে আঁকতে বসল। কিন্তু সেদিন তার মন খুব খারাপ। ক্লাসের রিতু তার একটা ছবি ছিঁড়ে ফেলেছিল। হৃদি ম্যাডামের কাছে বিচার দিয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম উল্টো বলেছিলেন–পড়তে এসে এত আঁকাআঁকি কীসের? কথাটা হৃদির খুব খারাপ লেগেছিল। তার মনে হয়েছিল, আঁকাআঁকি বুঝি কোনো অপরাধ।
মন খারাপ থাকলে যেমন হাত ঠিকমতো কাজ করে না, সেদিনও তেমনই হলো। সে একটা প্রজাপতি আঁকল বটে, কিন্তু পাখাগুলো কেমন ছেঁড়া-ছেঁড়া হয়ে গেল। রংগুলোও মলিন আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল। এমন সময় মা ডাকলেন, হৃদি, নাশতা করে যাও। ড্রয়িং খাতা খোলা রেখেই সে চলে গেল।
নাশতা খেয়ে ফিরে এসে হৃদি অবাক হয়ে গেল। যে পাতায় একটু আগে প্রজাপতিটা এঁকেছিল, সেই পাতাটা একেবারে সাদা! সে বিস্ময়ে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
– তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি।
হৃদি চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল, একটু আগে আঁকা সেই প্রজাপতিটাই কথা বলছে।
– আমার পাখাগুলো দেখো। কত ছেঁড়া! রংগুলোও কেমন বিশ্রী! তোমার অন্য প্রজাপতিগুলো আমাকে খেলায় নেয়নি। বলেছে আমি নাকি দেখতে সুন্দর না। ওরা সবাই বাগানে খেলছে। আর আমি একা।
জানালার বাইরে তাকিয়ে হৃদি আরও অবাক হলো–তার খাতার সব প্রজাপতি বাগানে উড়ছে! কেউ ফুলে বসছে, কেউ রোদে নাচছে, কেউ আবার একে অপরকে তাড়া করে খেলছে।
শুধু এই প্রজাপতিটাই একা দাঁড়িয়ে আছে। হৃদির খুব মায়া হলো। সে আস্তে করে বলল,
– আমি দুঃখিত। আসলে আমার মন খুব খারাপ ছিল। তাই তোমাকে ঠিকমতো আঁকতে পারিনি। তুমি যদি আবার খাতায় ফিরে আসো, আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর করে আঁকব।
প্রজাপতিটা একটু হাসল। তারপর বলল,
– তাহলে চোখ বন্ধ করো।
হৃদি চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখে প্রজাপতিটা আবার খাতার পাতায় ফিরে এসেছে। সে এবার খুব মন দিয়ে আঁকতে শুরু করল। পাখাগুলো সুন্দর করে গড়ল। তারপর লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, কমলা, সবুজ আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিল। এত যত্ন করে সে আগে কখনো কোনো ছবি আঁকেনি। আঁকা শেষ হলে প্রজাপতিটা যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল।
হৃদি এবার নিজেই চোখ বন্ধ করল, কারণ সে বুঝতে পেরেছে–মানুষের চোখের আড়ালেই কেবল এরা জীবন্ত হয়, আর জীবন্ত থেকে খাতায় ছবি হয়ে ফিরে আসে।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে জানালার ধারে একটি সুন্দর প্রজাপতি এসে বসেছে। সে উড়ে এসে একটু আগে হৃদির আঁকা প্রজাপতিটার পাশে দাঁড়াল। তারপর দুজনে একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়ে গেল। যাওয়ার আগে প্রজাপতিটা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার ছোট্ট মুখে ছিল মিষ্টি একটা হাসি। হৃদি বুঝতে পারল, ওটা শুধু বিদায়ের হাসি নয়। ওটা ছিল 
ধন্যবাদের হাসি।
আর সেই দিন থেকে সে আর কখনো মন খারাপ করে কোনো ছবি আঁকেনি। কারণ সে জানে, প্রতিটি ছবিরও হয়তো একটা ছোট্ট মন আছে। আর সেই মনটাকেও যত্ন করতে হয়।

টুনটুনির পুকুর

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
টুনটুনির পুকুর
এঁকেছেন মাসুম

এক ছিল ছোট্ট গ্রাম, নাম তার আনন্দপুর। সেই গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটা সুন্দর পুকুর। কিন্তু পুকুরটার কোনো নাম ছিল না। তবে তোমরা চাইলে আমরা পুকুরটার একটা নাম দিতে পারি, যেমন ধরো, কানা পুকুর। 
সেই কানা পুকুরের পানি ছিল কাচের মতো পরিষ্কার। সেই পানিতে সাঁতার কাটত লাল-নীল মাছের দল। পুকুরের ধারে ছিল বড় বড় আম গাছ, আর সেই গাছের ডালে বাস করত ছোট্ট টুনটুনি পাখি। টুনটুনি যখনই মন খারাপ করত, তখনই পুকুরের দিকে তাকিয়ে গান গাইত। পুকুর যেন টুনটুনির দুঃখের বন্ধু ছিল।
গ্রামের বাচ্চারা রোজ দুপুরে পুকুরের ধারে খেলতে আসত। কেউ ডুব দিত শীতল পানিতে, কেউ বা পুকুরের পাড়ে বসে পানি ছুঁয়ে খেলত। পুকুরটা ছিল গ্রামের সবার খুব প্রিয়।
একদিন গ্রামে এল এক অচেনা লোক। তার নাম ছিল ঘোটন চৌধুরী। ঘোটন চৌধুরী খুব ধনী ছিলেন, কিন্তু তার ছিল শুধু টাকা জমানোর চিন্তা। তিনি গ্রামের সব পুকুর ভরাট করে সেখানে বড় বড় ঘরবাড়ি বানাতে চাইলেন। তিনি ভাবলেন, ‘পুকুর তো শুধু শুধু জায়গা নষ্ট করছে। এখানে বাড়ি বানালে আমি অনেক টাকা পাব।’ 
প্রথমেই তিনি আনন্দপুরের সেই সুন্দর পুকুরটা ভরাট করতে চাইলেন। গ্রামের মানুষরা খুব মন খারাপ করল। বাচ্চারা কাঁদছিল, ‘আমাদের পুকুরটা নষ্ট করে দিও না! আমরা দুপুরে এই পুকুরে সাঁতার কাটি, গোসল করি।’  
টুনটুনি পাখি গাছের ডালে বসে সব দেখল। সে দেখল, বড় বড় গাড়ি এসে পুকুরে মাটি ফেলছে। পুকুরের পানি কমে আসছে। মাছেরা ছটফট করছে। টুনটুনির বুকটা ব্যথায় ভরে গেল। সে ভাবল, ‘আমার বন্ধু পুকুরটা মরে যাচ্ছে!’ 
টুনটুনি উড়তে উড়তে গেল এক জ্ঞানী প্যাঁচার কাছে। প্যাঁচা মশাই সব শুনে বললেন, ‘মানুষকে বোঝাতে হবে পুকুর কেন দরকার। পুকুর শুধু পানির জায়গা নয়, পুকুর হলো গ্রামের প্রাণ।’ 
টুনটুনি আবার গ্রামের কাছে ফিরে এল। সে দেখল, বাচ্চারা আর পুকুরের কাছে খেলা করে না। পুকুরটা প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়ে গেছে। টুনটুনি তখন একটা বুদ্ধি বের করল।
সে রোজ সকালে পুকুরের ধারে উড়ে যেত। তারপর নিজের ছোট চঞ্চু দিয়ে মাটি থেকে একটা করে পানির ফোঁটা তুলে আনত। সেই ফোঁটাগুলো সে পুকুরের শুকনো অংশে ফেলত। গ্রামের মানুষ আর ঘোটন অবাক হয়ে দেখল।
একজন বলল, ‘আহা রে! ছোট্ট পাখিটা এই পুকুর বাঁচানোর চেষ্টা করছে!’ 
আরেক বৃদ্ধ লোক বলল, ‘আমরা এত বড় হয়েও যা বুঝিনি, এই ছোট্ট পাখিটা সেটাই বোঝাচ্ছে।’
টুনটুনির এই চেষ্টা দেখে গ্রামের সবার মন বদলে গেল। তারা বুঝতে পারল, পুকুর শুধু পানির জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও খুব দরকার। পুকুর না থাকলে গরম বেড়ে যাবে, মাছেরা বাঁচবে না, আর গ্রামের সৌন্দর্যও নষ্ট হবে।
সবাই মিলে ঘোটন চৌধুরীর কাছে গেল। তারা বলল, ‘চৌধুরী, আপনি পুকুরটা ভরাট করবেন না। আমরা পুকুরটা যেমন আছে তেমনই রাখতে চাই...।’ 
ঘোটন চৌধুরী সবার কথা শুনে খুব লজ্জা পেলেন। তিনি বুঝলেন, টাকা দিয়ে সব হয় না। ভালোবাসা আর পরিবেশের মূল্য অনেক বেশি। তিনি পুকুর ভরাট করা বন্ধ করে দিলেন। শেষে তিনি হাত জোড় করে বললেন, ‘আপনারা আজ আমার চোখ খুলে দিলেন, নয়তো আমি খুব বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছিলাম। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’ 
কিছুদিনের মধ্যেই পুকুরটা আবার আগের মতো সুন্দর হয়ে উঠল। মাছেরা আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল। আর টুনটুনি পাখি প্রতিদিন পুকুরের ধারে বসে আনন্দে গান গায়। সে জানে, তার বন্ধু পুকুরটা বেঁচে গেছে।