স্বপ্নপুরী বনের এক শান্ত কোণে ছিল এক চমৎকার ফুলের বাগান। সেখানে যেমন ছিল সুগন্ধি গোলাপ, তেমনি ছিল বড় বড় সূর্যমুখী এবং নানান রঙিন ফুলের সমাহার। নামের মতোই বাগানটি ছিল স্বপ্নপুরীর মতোই। এই বাগানেই বাস করত রঙিন পাখনার বুদ্ধিমান এক প্রজাপতি, যার নাম ছিল চিত্রা। আর ঠিক তার উল্টো স্বভাবের ছিল এক দুষ্টু ঘাসফড়িং, যাকে সবাই ফড়িংরাম বলে ডাকত।
চিত্রা ছিল খুব পরিশ্রমী। সে সারা দিন ফুলে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করত আর ভবিষ্যতের কঠিন সময়ের জন্য ছোট ছোট মাটির পাত্রে ফুলের মধু জমিয়ে রাখত। সে জানত যে প্রকৃতির আবহাওয়া সব সময় একরকম থাকে না। অন্যদিকে ফড়িংরাম ছিল ভীষণ অলস। তার একমাত্র কাজ ছিল সারা দিন ঘাসের ডগায় বসে পা দুলিয়ে গান গাওয়া আর পরিশ্রমী পতঙ্গদের নিয়ে মজা করা।
একদিন প্রচণ্ড রোদে চিত্রা যখন একটা বড় সূর্যমুখী ফুলের ভেতর থেকে মধু সংগ্রহ করছিল, তখন ফড়িংরাম তাকে দেখে খুব হাসাহাসি শুরু করল। সে চিত্রার কঠোর পরিশ্রম দেখে ব্যঙ্গ করে বলল যে, এই মিষ্টি রোদে যখন নেচে বেড়ানোর কথা, তখন চিত্রা কেন মিছেমিছি খাটুনি করে শরীর নষ্ট করছে।
চিত্রা তার কথায় কান না দিয়ে শান্তভাবে তাকে সামনের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। সে বোঝাল যে, এখন প্রকৃতি অঢেল খাবার দিলেও বৃষ্টির দিনে বাগান যখন পানিতে ডুবে যাবে, তখন খাবারের খুব অভাব হবে। ফড়িংরাম তার কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল এবং ভাবল চিত্রা বড্ড বেশি দুশ্চিন্তা করে।
হঠাৎ একদিন আকাশের মুখ ভার হয়ে এল। কালো মেঘে ছেয়ে গেল চারদিক এবং শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। একদিন, দুই দিন করে টানা কয়েকদিন বৃষ্টির অবিরাম ধারা বাগানের নিচু জমিগুলোয় পানি জমে গেল এবং সব ফুলের পাপড়ি বৃষ্টির তোড়ে ঝরে পড়ল।
চিত্রা তার গাছের কোটরে বানানো নিরাপদ ও শুকনো ঘরে বেশ আরামেই ছিল। তার কাছে আগে থেকে জমানো অনেক মধু আর রেণু ছিল, তাই তাকে খাবারের জন্য বাইরে বের হতে হলো না। সে নিশ্চিন্তে জানালার ধারে বসে মেঘ বৃষ্টির খেলা দেখছিল আর উপভোগ করছিল।
কিন্তু ফড়িংরামের অবস্থা হলো করুণ। বৃষ্টির তোড়ে তার থাকার জায়গাটুকু ভেসে গেল। ভিজে চপচপে হয়ে সে ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার পেটে ভীষণ খিদে, অথচ চারদিকে খাবারের কোনো চিহ্ন নেই। সব ফুল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সে এক ফোঁটা মধুও কোথাও খুঁজে পেল না। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে মনে মনে খুব অনুতপ্ত হলো।
অবশেষে উপায় না দেখে ফড়িংরাম অতি কষ্টে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চিত্রার ঘরের দরজায় গিয়ে পৌঁছাল। সে খুবই করুণ স্বরে চিত্রার কাছে সাহায্য চাইল এবং তাকে আশ্রয়ের জন্য মিনতি করল। চিত্রা ছিল যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি দয়ালু। সে ফড়িংরামের এই দশা দেখে তাকে ভেতরে নিয়ে এল এবং শুকনো পাতা দিয়ে তার গায়ের পানি মুছিয়ে দিল। এরপর সে তাকে জমানো খাবার থেকে পেট ভরে খেতে দিল।
খাবার খেয়ে ফড়িংরামের শরীরে শক্তি ফিরে এল। সে মাথা নিচু করে স্বীকার করল যে চিত্রার কথাই ঠিক ছিল। অলসতা করে সে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছে। চিত্রা তাকে পরম মমতায় বোঝাল যে, সময় থাকতে কাজ গুছিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে কোনো কষ্টে পড়তে হয় না।