ঢাকা ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০, বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Khaborer Kagoj

প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:১২ এএম
প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে

উন্নয়ন বাজেট বা এডিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ জোগানের বড় একটি অংশ আসে বিদেশি ঋণ থেকে। বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে এ অর্থ ব্যবহৃত হয়। এডিপিতে মোট প্রকল্পের ৩০ শতাংশ হচ্ছে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প। সে হিসাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার অধীনে প্রায় ৪ শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে বেশি হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। তারপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। দ্বিপক্ষীয় দেশের মধ্যে ভারত, চীন, জাপান ও রাশিয়া থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে অন্য দেশ থেকেও ঋণ নেওয়া হয়। তার পরিমাণ কম। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে যে ঋণ নেওয়া হয় তা নমনীয়। এর সুদহার কম ও পরিশোধের মেয়াদ ৩০ থেকে ৪০ বছর। অন্যদিকে, দ্বিপক্ষীয় দেশের মধ্যে চীন, রাশিয়া ও ভারতের ঋণের শর্ত কঠিন এবং পরিশোধের সময়ও কম থাকে। 

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহৃত বিদেশি ঋণের পাহাড় জমেছে পাইপলাইনে। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে গত এক দশকে পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে কয়েক গুণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনে যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ আটকে রয়েছে, তার পরিমাণ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী দেশীয় মুদ্রায় এর অঙ্ক প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে অন্তত ১৫টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন সংস্থার কাছে এই টাকা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোর অদক্ষতা, দুর্বল তদারকিসহ নানা কারণে ওই টাকা আটকে রয়েছে বছরের পর বছর।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাইপলাইনে বিদেশি ঋণ আটকে থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কারণ একটি ঋণচুক্তি সই হওয়ার পর তা পাইপলাইনে চলে আসে। আমাদের দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর। এই ঋণ ছাড় হতে আরও বেশি সময় লাগে। প্রকল্পের মেয়াদ সময়মতো শেষ না হওয়ার কারণেই পাইপলাইনে টাকার পাহাড় জমেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রিজার্ভের এই দুর্দিনে পাইপলাইনে আটকে থাকা বিদেশি সহায়তা বা ঋণের দ্রুত ছাড়ের উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থ ছাড় দ্রুত হলে ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা লেনদেনের ভারসাম্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকে মজুত রিজার্ভে স্বস্তি ফিরবে। সবশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ১৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে। তবে নিট রিজার্ভ আরও কম।

ইআরডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পাইপলাইনে আটকে থাকা বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৪৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। আলোচ্য অর্থবছরে এটি ছিল ৫০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং লেনদেনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের যথাযথ ব্যবহার সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পাইপলাইনে বিশাল অঙ্কের বিদেশি ঋণ আটকে রয়েছে। রিজার্ভের এই দুর্দিনে জমে থাকা ঋণ দ্রুত ছাড় করাতে পারলে ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভে স্বস্তি আসবে।’ চলমান ডলারসংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ছে। ‍উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে নেওয়া কঠিন শর্তের অনেক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এ কারণে দ্রুত বাড়ছে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ, যা আগামী বছরগুলোয় আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ  করতে হবে। তা না হলে প্রকল্পের খরচ বেড়ে যাবে। পাইপলাইনে আটকে থাকার এটাও একটা বড় কারণ। পাইপলাইনে জমে থাকা ঋণ দ্রুত ছাড় করতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে হবে। ধীরগতির প্রকল্প কাজের গতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে আটকে থাকা বিপুল বিদেশি ঋণের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে। আমরা আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গলদ দূর করুন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৩৬ এএম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গলদ দূর করুন

পত্রিকা খুললেই চোখ আটকে যায় স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবরে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হননি এমন কম লোকই আছেন সমাজে। একদিকে অসুস্থ রোগীকে নিয়ে আত্মীয়-পরিজন থাকেন চিন্তিত, অপরদিকে কিছু হাসপাতালের সেবাদানকারীর দুর্ব্যবহার রোগী ও তার আত্মীয়স্বজনদের মন বিষিয়ে তোলে। এমনই হাজারও অভিযোগ এখন হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে। কয়েক দিন আগে সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু। ভুলভাল চিকিৎসাসেবা এবং ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে সমালোচনার ঝড় বইছে। ওষুধের যে ফর্দ তা নিয়ে ফার্মেসি থেকে ফার্মেসি ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হতে হয়। এর ওপর ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি। একসময় বয়স হলে মুরব্বিদের হাতে শোভা পেত পানের বাটা। এখন ওই বয়সী মানুষের হাতে দেখা যায় ওষুধের বাক্স। খাদ্যচক্রেও ঢুকে পড়েছে বিষ। যার প্রভাবে মানুষ দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। জটিল রোগ এখন মানুষের দেহে বাসা বাঁধছে। খবরের কাগজ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ‘নির্দেশনার আড়ালে চাপা পড়ে আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গলদ’!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো নির্দেশনা নতুন করে দিলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না; বরং গলদ দূর করতে হবে। নয়তো এর আড়ালে চাপা পড়ে থাকবে সব অপকর্ম। কেন শর্ত মানা হচ্ছে না কিংবা মানানো যাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখে সেই অনুসারে পদক্ষেপ নিতে হবে। যখনই ঘটনা ঘটে তখনই বলা হয়, জনবলসংকটে মনিটরিং করা যায় না। বছরের পর বছর এমনটাই চলছে। জনবল বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না কেন, সেটাও খুঁজে দেখা দরকার।

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ১০ দফা নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই নির্দেশনার সবই পুরোনো। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নেওয়ার সময়ই এসব শর্ত দেওয়া থাকে। কোন ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানে কী করা যাবে, কী করা যাবে না তা উল্লেখ থাকে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিয়মের তোয়াক্কা না করে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য যত্রতত্র নামমাত্র হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে প্রতারণা করছে। এখনো ১ হাজার ২০০টির ওপর প্রাইভেট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিবন্ধন নেই। প্রাইভেট চিকিৎসা সেক্টর এখন ‘সোনার ডিম’। যার ফল ভোগ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বেসরকারি উদ্যোক্তা চক্র। যদি আইন মেনে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়, তবে এই সোনার ডিম ভেঙে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখনই কোনো অঘটন ঘটে, তখনই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে আর সেটি কার্যকর হয় কি না, তা দেখার কেউ নেই।

তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনিস্টিক সেন্টার ব্যবস্থাপনা শাখার জনবল মাত্র ২০ জন। যারা সারা দেশের নানা ধরনের সমন্বয়ে কাজ করেন। নতুন নিবন্ধন দেওয়া, নবায়ন করা, যাচাই-বাছাই, পরিদর্শন, তদন্ত সবকিছুই করেন। সেই সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাও দেখভাল করার মূল দায়িত্ব তাদের। শুধু ঢাকায়ই বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। 

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল আমিন গত কয়েক দিনে দেশে স্বাস্থ্য খাতের অস্থিরতা প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, দেশের প্রাইভেট চিকিৎসাসেবা খাত এখন সরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের চেয়ে অনেক বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় সবাই ব্যস্ত সরকারি সেবা খাতে। বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মনিটরিং করার মতো সামর্থ্য নেই অধিদপ্তরের। সেই সঙ্গে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা ধরনের কারণে আইন-বিধি উপযুক্ত মাত্রায় কার্যকর হয় না। ফলে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই লাভ হবে না। সরকারের উচিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা। সে জন্য প্রয়োজন এ খাতে ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার। এই অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ যেসব গলদ রয়েছে সবার আগে তা চিহ্নিত করে দূর করতে হবে। আইন, বিধি, নির্দেশনা কার্যকর করার আগে দরকার কাজের স্বচ্ছতা। এটি করতে পারলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও বেশি গতিশীল হবে।

বিবাহবিচ্ছেদ ঠেকাতে কাউন্সেলিং সেবা জরুরি

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:০৪ এএম
বিবাহবিচ্ছেদ ঠেকাতে কাউন্সেলিং সেবা জরুরি

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে বিয়ের হার বেড়েছে। বেড়েছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদও। কিন্তু বিচ্ছেদ হওয়া দম্পতিদের একটি বড় অংশের রয়েছে সন্তান। বিচ্ছেদের ফলে ওই মা-বাবার জীবনের সমস্যার সমাধান হলেও বড় সমস্যায় পড়ছে তাদের সন্তানরা। কারণ তারা মা-বাবা দুজনকেই চায়। তাদের কাছে মা-বাবা দুজনই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালোবাসার জায়গা। তাই মা-বাবার বিচ্ছেদ সন্তানদের জীবনের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানদের অনেকেই পরবর্তী সময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। অনেকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরিবার সংকটে পড়ছে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পরবর্তী জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাদের সংসারেও এর প্রভাব পড়ছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দুই সিটি করপোরেশন মিলে তালাক হয়েছে ৯ হাজার ৩০৫টি। এ হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে প্রায় ২৬টি দাম্পত্য সম্পর্ক। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় তালাকের ঘটনা ঘটছে একটিরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনগতভাবে বাংলাদেশে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি খুব সহজ হওয়ায় তাদের সন্তানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তী সময়ে অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ এবং মা-বাবা কে কীভাবে, কতখানি সময় দেবেন সন্তানের স্বাভাবিক জীবনের জন্য, তা নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

বাবা-মায়ের সান্নিধ্য আর ভালোবাসা না পাওয়ায় অনেক শিশু মাদকাসক্তও হয়ে পড়ছে। এভাবে বিপন্ন শিশুদের পরিসংখ্যান দিন দিন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একটি শিশুর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মা-বাবার যে ভূমিকা, তা থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে শিশুরা বঞ্চিত হওয়ার মারাত্মক প্রভাব তাদের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তৈরি করে। সমাজে স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে বসবাসের ক্ষেত্রে পরিচয় তৈরি এবং পারিবারিক শাসনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়াই এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা শিশুকে সব সময় মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রাখে এবং শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিকূলতা তৈরি করে। এই প্রতিকূলতা শিশুকে নির্মম জীবনযাপনে ঠেলে দেয় এবং নানাবিধ সহিংসতার মুখোমুখি করে।

বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার, সাইকোথেরাপিস্ট অ্যান্ড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর, সায়ক লোহানী বলেন, ‘আমাদের দেশে কাউন্সেলিং এখনো এতটা পরিচিতি নয়, বিশেষ করে ম্যারেজ কাউন্সেলিং। বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন তিন মাসের পরিবর্তে আরও বেশি হওয়া উচিত। ওই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনর্গঠন করার বিষয়ে কাউন্সেলিং নেওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সন্তান বর্তমান থাকলেও কাউন্সেলিং সেবায় আনা প্রয়োজন তাদের ভবিষ্যতের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য। এই অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সেলিং সেবায় অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব।’

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের চারটি মূল নীতির একটি হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ফলে শিশুর ওপর দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলে। এ জন্য শিশুবান্ধব আইন কার্যকর করতে হবে। যাতে শিশুদের জীবন বিপন্ন না হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বিচ্ছেদ বা তালাক ঠেকাতে অন্তর্বর্তীকালীন সালিশ প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করা অতি জরুরি। সালিশ পরিষদে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে তাদের সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একটি পরিবারকে বিচ্ছেদ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।

সাইবার প্রতারণা বন্ধে সচেতন হোন

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৩৭ এএম
সাইবার প্রতারণা বন্ধে সচেতন হোন

বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়, এটা সত্য। কিন্তু এর থেকেও ধ্রুব সত্য যে, এর প্রভাবে এ দেশের তরুণ-তরুণী এমনকি সব শ্রেণির মানুষই একরকম বন্দিত্বের গ্লানি ভোগ করছে। সাইবার প্রতারণা ও বিশ্বায়নের হাত ধরে প্রবেশ করেছে গ্লোবাল ভিলেজে। দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নারী সাইবার ও অন্যভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ নারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। বাকিরা চল্লিশোর্ধ্ব। আর ভুক্তভোগীদের ৪০ শতাংশ ঢাকা বিভাগ বা ঢাকার আশপাশের বাসিন্দা। বাকি ৬০ শতাংশ নারী অন্যান্য বিভাগের। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এর একটি সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

সূত্র মতে, ২০২৩ সালে ‘উইমেন সাপোর্ট’ সেন্টারে ১৫ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ পড়ে এবং ফোনের মাধ্যমে আরও অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, আইডি হ্যাক, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও করে ব্ল্যাকমেলিং, ইমপার্সোনাল ব্ল্যাকমেলিং, ছদ্মবেশে হয়রানি, কৌশলে ফোন নম্বর নিয়ে হয়রানি, ক্রেডিট কার্ডে প্রতারণা, বিকাশ প্রতারণা, অনলাইনসহ নানা ধরনের প্রতারণা।

প্রতারণা এখন চলছে হরেক রকমের। এসব অপরাধের নতুন উপকরণ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি সাইবার স্পেসে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নারীদের ছবি ব্যবহার করে তাদের এক ধরনের মানসিক নির্যাতনের মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ছদ্মবেশধারীদের মাধ্যমে নারীরা ইমপারসোনাল ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার বেশি হচ্ছেন। এ ছাড়া সাইবার বুলিং, আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো ও মোবাইল হ্যারাসমেন্ট, অনলাইন, ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে অভিযোগও বিস্তর। ইদানীং টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করে কোমলমতী শিশুদেরও এ জালে জড়িয়ে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে।

ছদ্মবেশে হাজার হাজার মানুষ ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা করছে। এতে নারীরাই বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে টিকটক মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে সারা দেশে মানব পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে একটি চক্র। এ চক্রের সদস্যরা গত বছরে ভারতে প্রায় ২ হাজারের বেশি তরুণীকে পাচার করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীরা ব্যাপকভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সের নারীরাই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক পরিচয় বা কাউকে না চিনে বন্ধু বানানো ঠিক নয়। এসব প্রতিরোধে নারীদের এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক হেনস্তার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ না করে চেপে যান। এতে সাইবার অপরাধীরা আরও অপরাধের সুযোগ পায়। দেশে যত সাইবার অপরাধ হয়, তার সব অভিযোগ পুলিশের কাছে আসেও না। বিচিত্র ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, অনেক মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। এসব অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা দিতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধেও বিশেষ করে ছাত্রীদের সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা দিলে এসব অপরাধ অনেকটা কমে আসবে।’

সাইবার প্রতারণা বন্ধে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে সামনে আসতে চান না। এ প্রবনতা অপরাধকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবে সমাজে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভুক্তভোগীদের এজন্য দরকারি আইনি সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ টিমকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। সাইবার অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি সাইবার প্রতারণা বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা বন্ধ করুন

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৩৭ এএম
ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা বন্ধ করুন

প্রবাসে গিয়ে ধনী হবেন, পরিবারের অভাব মেটাবেন- এ ধরনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজারও তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তাদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। কেউ কেউ পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। দুবাই ও ওমানে নতুন যাওয়া বাংলাদেশি তরুণরাই মূলত পাচারকারীদের প্রধান টার্গেট। যারা বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মিত চাকরি করেন কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করেন, কিন্তু বেশি বেতনের স্বপ্ন দেখেন এবং যারা কয়েক বছর ধরে চাকরি করে ভালো সঞ্চয় করেছেন, তারাও তাদের টার্গেট গ্রুপ। সাধারণত সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোর নাগরিকরা। তাদের সঙ্গে নিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিকরাও ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাচ্ছেন। দেশি-বিদেশি পাচারকারী চক্র এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারের ছক কষা হয় তুরস্ক ও দুবাইয়ে বসে।

গত শনিবার লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ইউরোপ যাত্রাকালে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে তিউনিসীয় উপকূলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ৯ জন অভিবাসীর অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া উপকূল থেকে ৫২ জনের অভিবাসী দল সাগরপথে ইউরোপ যাচ্ছিল। তিউনিসীয় উপকূলে তাদের বহনকারী নৌকাটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে ইউরোপ অভিমুখে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান। গত ১০ বছরে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ থেকে মোট ১৮টি রুটে লোকজন ইউরোপে যাওয়ার কমবেশি চেষ্টা করেন। পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে ইউরোপে ঢুকতে মোট ৯টি পথ আছে। বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে, যেটি সেন্ট্রাল সেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। এই পথে ৩৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন। গত কয়েক বছরে বলকান রুট দিয়েও প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বাংলাদেশি প্রবেশ করেছেন বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, বিভিন্ন দেশের উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ গমনের চেষ্টাকালে ২০২৩ সালে ৩ হাজারের বেশি অভিবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। লিবিয়া ও তিউনিসিয়ায় নৌবাহিনী তাদের নজরদারি জোরদার করেছে। ফলে বর্তমানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।

তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১০-১২টি জেলার মানুষ ঘুরেফিরে এভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যান নিয়মিত। যারা সাগর পাড়ি দেন, তারা জানেন বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও তারা ১৫-২০ লাখ টাকা দালালদের দিয়ে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় ওঠেন। 

রিক্রুটিং এজেন্টদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান খবরের কাগজকে বলেন, দালালদের দৌরাত্ম্য রোখা খুব কঠিন। এদের নেটওয়ার্ক দেশের বাইরেও। কাজেই মানুষকে সচেতন হতে হবে; যাতে দালালদের প্রলোভনে তারা সাড়া না দেন।

আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে হবে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে দালাল ও পাচারকারীদের প্রতারণার ফাঁদে যেন না পড়ে, সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়ে এ দেশের মানুষকে যেন লাশ হয়ে আর ফিরতে না হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা পরিহার করে বৈধপথ বেছে নিতে হবে। এতে নিজের জবীন যেমন বাঁচবে, তেমনি দেশের জন্যও কল্যাণকর হবে।

নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিন

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:১৯ এএম
নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিন

করোনা মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে দেশে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। একদিকে গ্যাসসংকট, ব্যাংক অর্থায়নের অভাব, ডলারের দামে অস্থিরতায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, শুল্কায়নব্যবস্থার জটিলতা, মজুরি বৃদ্ধি, বিদ্যুতের সমস্যা ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিও এর জন্য দায়ী। তথ্যমতে, গত বছর (২০২৩) নতুন বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এর আগে কিছু বিনিয়োগ হলেও নতুন বিনিয়োগের আশা কমেছে। শিল্পের সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো খাত বাদে গত বছর পোশাক, বস্ত্রসহ বিভিন্ন খাতে সম্পূর্ণ নতুন কারখানা গড়ে ওঠেনি একটিও। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হয়েছে। এতে কাজের নতুন ক্ষেত্রগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন বা হচ্ছেন। অনেকের বেতন বন্ধ রয়েছে বা কমেছে। রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের দিক থেকে সর্ববৃহৎ তৈরি পোশাকশিল্পে তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি ২০২৩ সালে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর গড়ে ২৬ থেকে ২৭ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ হিসাবে করোনার দুই বছরে অন্তত ৫২ থেকে ৫৪ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের বেশির ভাগেরই কর্মসংস্থান হয়নি। করোনার পর আরও দুই বছর কেটেছে। তেমন বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে বেকারের সংখ্যাও বেড়েছে।

আইএলওর সাম্প্রতিক সময়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এটি একটি অশনিসংকেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, অর্থাৎ পাঁচ বছরেও প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে বিনিয়োগের অবদান ছিল ২৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। অপরদিকে জিডিপিতে শিল্প উৎপাদন খাতের অবদানও কমেছে।

নতুন বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অর্থাৎ ধীরে চলা নীতি অনুসরণ করছেন। জ্বালানিসংকট ও ব্যাংক তহবিলের ঘাটতির কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হচ্ছেন না। দেশে এফডিআই আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস। তবু বিদেশি বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি।  শুধু ভারতের মতো অর্থনৈতিকভাবে বলিষ্ঠ দেশই নয়, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার ছোট অর্থনীতির দেশগুলোও এফডিআইয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে। ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ হওয়ার পরও জিডিপির শতাংশ হিসাবে এফডিআইয়ের দিক থেকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ।

কর্মসংস্থানের একটি বড় খাত হলো সিরামিকস। তথ্যমতে, গত বছর এই খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। যারা নতুন করে পরিকল্পনা করেছে, তারাও এখন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন স্থগিত রেখেছেন। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগ তেমন হয়েছে বলে মনে হয় না। ২০২৪ সালে শিল্প খাতে ভালো প্রবৃদ্ধি হবে না। অনেক ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতের পরিবর্তে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতি অনুসরণ করে বিনিয়োগ করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিল্পায়নের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে লক্ষ্য হিসেবে ধরার কারণে ব্যাংকের সুদহারও বেড়েছে। ফলে ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতিতে গেছে। ডলারসংকট মোকাবিলায় আমদানি আরও কঠোর করেছে। ফলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আনতে পারছেন না। এ অবস্থায় বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। যতদিন পর্যন্ত ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো না হবে, ততদিন পর্যন্ত শিল্পে বিনিয়োগ হবে না। এসব কারণে এবার শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া অর্থবছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। কাজেই দারিদ্র্যবিমোচনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রয়োজনে স্বল্প সুদের ‘টেকসই উন্নয়ন ফান্ড’ গঠন করতে হবে। 

পাশাপাশি শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিতকরণ, করপোরেট ট্যাক্স হ্রাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। বিনিয়োগে গতি আনতে এগুলো দ্রুত আমলে নিয়ে তা কার্যকরে সরকারকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।

এসব সংকট উত্তরণ থেকে রেহাই পেতে সবার আগে প্রয়োজন নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রেই নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। সে কারণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হবে, সেটিই প্রত্যাশা।