গত কয়েক দিন ধরে আন্দোলন ও সহিংসতার পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশ। কারফিউ শিথিল এবং অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা চালুর মধ্য দিয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক রূপে ফিরছে জনজীবন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষের চলাচল আগের তুলনায় অনেক বেশি। পরিবহনের সংখ্যাও ছিল অনেক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর অবস্থান ও টহলের ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
রাজধানীর বাইরেও একই ধারায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। পোশাক কারখানা খুলেছে। এতে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে কিছু শিল্পকারখানায়। শিল্পকারখানা খুলে দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ব্যবসায়ীরা। ইন্টারনেট সংযোগও সীমিত আকারে চালু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বিভিন্ন জেলা ও মিল থেকে রাজধানী ঢাকায় ডিম, মুরগি, সবজি, চিনি, আটা, তেলসহ অন্যান্য পণ্যভর্তি ট্রাক আসতে শুরু করেছে। তার পরও সরবরাহ-সংকট কাটেনি। নিত্যপণ্যের বাজার এখনো চড়া। গত কয়েক দিনের সহিংসতায় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। করোনার ধাক্কায় অর্থনীতিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় চলমান অনিশ্চয়তা উচ্চ মূল্যস্ফীতি তথা অর্থনীতিতে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বিপাকে পড়েছে গরিব, অসহায় ও খেটে খাওয়া মানুষ। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় গত কয়েক দিন টিসিবির কার্ডধারী ১ কোটি পরিবার ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের ওপর খড়্গ নেমে আসে। সংসার চালানো তখন দায় হয়ে যায়। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ অস্বাভাবিক চাপে পড়েছে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায়।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম রাজধানীর বাজার ঘুরে পণ্যের দাম ও সরবরাহের খোঁজ নেন। তিনি জানান, কারফিউর মধ্যেও পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচের মতো পচনশীল পণ্যের সরবরাহে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, সে জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ফলে সরবরাহ নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হবে না বলে আশা করেন তিনি।
এক বছর ধরে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। মানুষের আয় বাড়ছে না। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। গত বছরের আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে উঠেছিল, যা অর্থবছরের সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। যা এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ বলা যায়। অন্যদিকে জাতীয় মজুরির হার বৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এসব বিষয় সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে নতুন করে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তথ্যমতে, এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় প্রতিদিন দেশের ক্ষতি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। স্থানীয় মুদ্রার যা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। গত আট দিন প্রায় অচলাবস্থা থাকায় দেশের অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রায় অচল ছিল। এতে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে অর্থনীতিতে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে সঠিক কর্মকৌশল ও নীতি গ্রহণ করবেন। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটিই প্রত্যাশা।