কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতায় দেশজুড়ে অর্থনীতির চাকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকসহ দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয় ইন্টারনেট সেবা। এর ফলে সংকটে থাকা অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থায় অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার সাময়িক হিসাব করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট(র্যাপিড)।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, অচলাবস্থার সময় দেশের অর্থনীতিতে দৈনিক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬০ কোটি ডলার বা ৭ হাজার ৮০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় দিনে মোট আর্থিক ক্ষতি ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বন্দরে কাজ হয়নি। সারা দেশে পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ ছিল। শ্রমিকরা কাজে উপস্থিত হতে পারেননি। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত এসেছে। এই ক্ষতি সহজেই পূরণ হওয়ার নয়।
রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাকশিল্প। মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ আয় এই খাত থেকে আসে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই খাত। পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এরই মধ্যে জানিয়েছে, তাদের প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে গত ছয় দিনে এই খাতের ক্ষতির অঙ্ক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
উদ্যোক্তারা বলেছেন, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যেখানে আমাদের স্থিতিশীল একটি পরিবেশ দরকার ছিল, সেখানেই বড় ধাক্কাটি লেগেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অর্থনীতিতে নতুন করে আরেক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তাদের মতে, এই মুহূর্তে বেশি দরকার দেশের স্থিতিশীলতা। গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরবরাহব্যবস্থা। এ কারণে সব ধরনের ব্যবসা ও শিল্পকারখানা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তথ্যমতে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে গত ছয় দিনে তাদের ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমানে মানুষের জীবনযাপনের একটি বড় অংশ ই-কমার্সের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট না থাকায় এটিও বন্ধ রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ছয় দিনে এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ইন্টারনেট না থাকায় পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রম যেমন চলছে না, তেমনি ফ্রিল্যান্সিংও প্রায় বন্ধ।
দেশে সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখের মতো ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। তাদের কাজও থমকে আছে। এতে তাদের ১৩-১৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। সহিংসতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে স্টিল, সিরামিক ও সিমেন্ট খাত। পুঁজিবাজারও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কর অফিস ও ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকায় আয়করও আদায় হচ্ছে না।
সারা দেশে সাধারণ ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় চেক ব্যবহার করে নগদ অর্থ তুলতে না পেরে দুর্ভোগে পড়েছেন অগণিত মানুষ। সহিংস আন্দোলনের সময় ইন্টারনেটসহ সবকিছু বন্ধ থাকায় দেশের প্রধান ও বৃহৎ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সহিংসতায় সড়ক, মহাসড়ক ও সেতু বিভাগের বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, সহিংসতায় বিদ্যুৎ খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। চলমান পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। কারফিউর কারণে শ্রমিকরা ঠিকমতো কর্মস্থলে যেতে পারেননি। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যে ক্ষতি হয়ে গেছে এটা সহজে মেটানো যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার তার কার্যালয়ে সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি বলেন, তার একটা ধারণা ছিল এ ধরনের একটা আঘাত আসতে পারে।
নাশকতাকারীদের আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার রাজধানীর সরকারি স্থাপনাগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের সেবা থেকে রাজধানীবাসী বঞ্চিত হচ্ছে। এতে রাজধানীতে যানজটের ভোগান্তি বেড়েছে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে সঠিক কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। কারফিউ তুলে নিয়ে দ্রুত দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার উদ্যোগী হবে। দেশ ও মানুষের কল্যাণে সব আঘাত সামলে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, অচিরেই সব কালো মেঘ কেটে যাবে। অগ্রগামী বাংলাদেশ আরও উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে, সেটাই প্রত্যাশা।