কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন গড়িয়েছে ব্যাপক নাশকতা ও সহিংসতায়। এ পর্যন্ত সহিংসতা ও নাশকতার বলি হয়েছেন ১০৩ জন। গত শুক্রবার পর্যন্ত বেশ কিছু সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের গোয়েন্দারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে একটি রাজনৈতিক কুচক্রী মহল নাশকতামূলক কাজ করছে। তারা সরকারি অফিস ও বিভিন্ন জায়গা লক্ষ্য করে নাশকতার মাধ্যমে জ্বালাও-পোড়াও করছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আন্দোলনকারীরা এ পর্যন্ত সারা দেশে ৫৫টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ঘটিয়েছেন ২৮টি।
ঢাকার মিরপুর বিআরটিএ ভবন, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিজ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পুলিশ ফাঁড়ি, পুলিশ বক্স, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন, আদাবর থানা, মিরপুর ১০ নম্বর ফুটওভারব্রিজসহ বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগের কারণে দেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে সরকারি গাড়ি ও মূল্যবান সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ঢাকা নগরী যেন এক অঘোষিত যুদ্ধনগরী। এ রকম একটি অস্থির অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার অবশেষে কারফিউ জারি করেছে। কারফিউ জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শান্তি-শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমাল রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত। বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগিতায় সারা দেশে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। রবিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত কারফিউ থাকবে। গণমাধ্যম ও জরুরি পরিষেবা কারফিউর আওতামুক্ত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার স্পেন সফর বাতিল করেছেন।
নাশকতা ও সহিংসতায় বাস-রেল-নৌপথ অচল হয়ে পড়েছে। নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে ৬০০ কয়েদি পালিয়েছে বলে তথ্য এসেছে। নানা রকম গুজব ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এতে জনমনে একধরনের শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’ সারা দেশে দ্রুত ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর দাবি জানিয়েছে। সম্পাদক পরিষদ মনে করে, এভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় তথ্যগত ব্ল্যাক আউটের আশঙ্কা তৈরি করে। যার ফলে গুজব, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের খবর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
গত কয়েক দিনের সহিংসতা ও নাশকতায় যে অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে জনজীবন চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। বাস-ট্রেনসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নিত্যপণ্যসামগ্রী ঢাকায় আসতে পারছে না। পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সীমিত আয়ের মানুষের এখন না খেয়ে মরার অবস্থা। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।
আন্দোলনে সহিংসতা সমর্থন করে না বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গত শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারি চাকরিতে কোটা ন্যূনতম ৫ শতাংশ নামিয়ে আনা, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খুলে দেওয়াসহ ৮ দফা দাবি পেশ করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৩ সমন্বয়ক আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে এই ৮ দফা দাবি পেশ করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক। এটা যৌক্তিক সমাধানে যাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি। সংকট উত্তরণে সরকার শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলেছে। আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। মেধার ভিত্তিতে ৮০ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছে। এ সিদ্ধান্তটি সরকার যদি কয়েক দিন আগে নিত তা হলে এতগুলো মূল্যবান প্রাণ ঝরে যেত না। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, কোটা নিয়ে হাইকোর্টের পুরো রায় বাতিল চাইবে রাষ্ট্রপক্ষ। আজ (২১ জুলাই, রবিবার) আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা আলোচনার জন্য যেসব শর্তের কথা বলেছেন, তা ন্যায্য। শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশের জনগণের নৈতিক সমর্থন রয়েছে। এতগুলো প্রাণহানিতে সাধারণ জনগণ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। সরকার ও এর নীতিনির্ধারকদের সংকটের গভীরতা বিবেচনা করে বাস্তবতার নিরিখে একটি সুষ্ঠু-সুন্দর যৌক্তিক সমাধানে আসতে হবে। যেসব পরিবার আজ তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, সেই পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সহনশীলতার সঙ্গে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। আমরা সবাই প্রত্যাশ্যা করছি, অচিরেই এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।