সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন। এতে করে কোটাসংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই অবসানের পথে। ইতোমধ্যেই আপিল বিভাগের রায়ে স্বাক্ষর করেছেন সাত বিচারপতি। রায়ের কপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, গতকাল কোটা সংস্কারসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করেছেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো অনেকটা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ছাত্র আন্দোলনকে পুঁজি করে সহিংসতার পথ বেছে নেয় রাজনৈতিক কুচক্রী মহল। তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অফিস, স্থাপনা ধ্বংস করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করেছে। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন আর শান্তিপূর্ণ থাকেনি। সেতু ভবনের ৫৫টি গাড়ি পুড়ে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিআরটিএ ভবনে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। দুর্যোগ ভবনে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। মিরপুর বিআরটিএ অফিসের ১২১ কোটি টাকার ডিআইসি ধ্বংস করা হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নথি। গান পাউডার দিয়ে এমনভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে, যা দেখে বোঝাই যাচ্ছে এটা শিক্ষার্থীদের কাজ নয়। এতে অবশ্যই দক্ষ ও পেশাদার লোক জড়িত।
বীভৎস তাণ্ডবে তছনছ বিভিন্ন ভবন। মেট্রোরেলের দুই স্টেশনে কেবলই ধ্বংসের চিত্র। নাশকতার এসব ধকল কাটাতে এক বছর লাগবে বলে জানিয়েছেন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এমন ভয়ানক নাশকতার তাণ্ডব, সেই সঙ্গে সমানতালে চলেছে লুটপাট। সভ্যসমাজে কখনো এটি আশা করা যায় না। নরসিংদীর কারাগার থেকে ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়েছে। এর মধ্যে ৯জন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। ৭জন আনসার উল্লাহ বাংলা বাহিনীর এবং ২জন নারী জেএমবির সদস্য। এদিকে দুর্বৃত্তদের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কারাগারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কারাগার থেকে বের হওয়া জঙ্গিরাও সারা দেশে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। অনেকে অস্ত্র ও গুলিসহ পালিয়েছে। তারাও দেশে বড় ধরনের নাশকতা করতে পারে। অবিলম্বে এসব অস্ত্র উদ্ধার ও কয়েদিদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সহিংসতা ও নাশকতাকারীদের ধরতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি। পুলিশের আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র সরকার উৎখাত করতে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ঢাকাসহ সারা দেশে গতকালও সহিংসতা হয়েছে। এতে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত ৫ শতাধিক। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ৯৩ জন। ইতোমধ্যে বহু প্রাণ ঝরে গেছে। দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ এখনো সুবিধাজনক মনে করছে না সরকার। এ জন্য সরকারের মধ্যে অস্বস্তি রয়ে গেছে। সরকার মনে করছে, এতদিন ধরে চলা সহিংসতায় বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি জড়িত।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে কোনো কিছু স্পষ্ট করেনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা আন্দোলন বন্ধ রাখবে নাকি চালিয়ে যাবে, তা জানা যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান এবং বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, কারফিউ বলবৎ থাকলে সাধারণ ছুটিও বাড়তে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলবে।
সারা দেশে জনমনে চরম অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। স্বাভাবিক জনজীবন চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। একটি বিশেষ পরিস্থিতি চললেও বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেছেন, দেশের পরিবেশ বিনষ্টকারী ও নাশকতাকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা সব বিষয়ে সতর্ক থেকে কাজ করছি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য।
যারা নাশকতা সৃষ্টি করছে এবং জানমালের নিরাপত্তার জন্য যারা হুমকিস্বরূপ তাদের যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সব ইন্টারনেট সেবা উন্মুক্ত করে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে কারফিউ তুলে নিতে হবে। জনজীবনের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসুক সেটিই প্রত্যাশা।