দক্ষিণ আফ্রিকার এক গুহায় পাওয়া প্রায় ২০ লাখ বছরের পুরোনো দাঁত থেকে মানব বিবর্তনের নতুন রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই দাঁতের প্রোটিন বিশ্লেষণ করে আদিম মানব প্রজাতি ‘প্যারানথ্রোপাস রোবাস্টাস’-এর জিনগত ও প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের নতুন তথ্য আবিষ্কার করেছেন। এই গবেষণা মানব বিবর্তনের ধারাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মানব প্রজাতির দূরবর্তী আত্মীয় ‘প্যারানথ্রোপাস রোবাস্টাস’-এর জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করছেন। ধারণা করা হয়, এই প্রজাতি প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১৭ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করত। তারা সোজা হয়ে হাঁটতে পারত এবং তাদের চোয়াল ও দাঁত ছিল বিশাল।
আফ্রিকার জীবাশ্ম রেকর্ড ও মানব বিবর্তন
বর্তমানে মানুষের বহু দূরবর্তী আত্মীয় ও পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যারা লাখ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে অস্ট্রালোপিথেকাস প্রোমিথিউস, এ. আফ্রিকানাস (তাউং চাইল্ড), এ. সেডিবা এবং পি. রোবাস্টাস-এর আদিম হোমিনিন বা প্রাচীন মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। একই সঙ্গে হোমো প্রজাতির আদি সদস্য (এইচ ইরেক্টাস/আর্গাস্টার, এইচ হ্যাবিলিস) এবং পরবর্তী হোমিনিন (এইচ নালেদি) ও হোমো স্যাপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ)-এর অস্তিত্বও পাওয়া গেছে।
জীবাশ্মগুলো থেকে জানা যায়, এই আদিম আত্মীয়রা ৩৬ লাখ ৭০ হাজার বছর আগে এ. আফ্রিকানাস থেকে কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। তারা দুই পায়ে হাঁটা, সরঞ্জাম তৈরি এবং মস্তিষ্কের বিকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় মাইলফলকও নথিভুক্ত করেছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রজাতি হোমো স্যাপিয়েন্স দক্ষিণ আফ্রিকায় ১ লাখ ৫৩ হাজার বছর আগে আবির্ভূত হয়েছিল।
রহস্য উন্মোচনে প্রোটিন বিশ্লেষণ
১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম পি. রোবাস্টাসের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। তবে এতদিন এই প্রজাতি সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত ছিল। এই প্রজাতির মধ্যে কতটা বৈচিত্র্য ছিল? তাদের আকারের পার্থক্য কি লিঙ্গভেদে ছিল নাকি এটি একাধিক প্রজাতির উপস্থিতি নির্দেশ করত? অন্যান্য হোমিনিন বা প্রাচীন মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
আফ্রিকা ও ইউরোপের আণবিক বিজ্ঞান, রসায়ন ও প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজির গবেষকদের একটি দল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চেয়েছিলেন। তবে প্রাচীন ডিএনএ ব্যবহার করে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব ছিল না, কারণ আফ্রিকার উষ্ণ জলবায়ুতে প্রাচীন ডিএনএ ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে না।
তবে বিজ্ঞানীরা ‘প্যালিওপ্রোটিওমিক্স’ বা প্রাচীন প্রোটিন বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ক্র্যাডল অব হিউম্যানকাইন্ড’ বা মানবজাতির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত সোয়ার্টক্রান্স গুহা থেকে পাওয়া পি. রোবাস্টাস প্রজাতির চারটি জীবাশ্মের দাঁতের এনামেল থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করেন।
গবেষকরা জানান, লাখ লাখ বছরের পুরোনো প্রোটিন দাঁত ও হাড়ে লেগে থাকায় উষ্ণ আবহাওয়াতেও ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে। এই প্রোটিনগুলোর মধ্যে একটি জীবাশ্মের জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণে সাহায্য করে। এই প্রোটিন বিশ্লেষণ করে তারা জানতে পারেন, চারটি জীবাশ্মের মধ্যে দুটি পুরুষ এবং দুটি নারী ছিল।
নতুন দিগন্ত উন্মোচন
এই আবিষ্কার মানব বিবর্তনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি আফ্রিকার প্রাচীনতম মানব জিনগত তথ্য সরবরাহ করে আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সম্পর্ক এবং জীবাশ্মগুলো বিভিন্ন প্রজাতির কি না, সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
গবেষণায় আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এনামেল তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জিন ‘এনামেলিন’-এর গঠনে সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। দুটি নমুনার অ্যামিনো অ্যাসিডের সঙ্গে আধুনিক মানুষ, শিম্পাঞ্জি ও গরিলার মিল পাওয়া যায়। কিন্তু বাকি দুটির অ্যামিনো অ্যাসিড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা এখন পর্যন্ত আফ্রিকান গ্রেট এপসের মধ্যে শুধু প্যারানথ্রোপাসের মধ্যে দেখা যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি জীবাশ্মের মধ্যে উভয় ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ২০ লাখ বছরের পুরোনো প্রোটিনে প্রথমবারের মতো ‘হেটারোজাইগোসিটি’ (একটি জিনের দুটি ভিন্ন সংস্করণ থাকা) পর্যবেক্ষণের ঘটনা এটি।
প্রোটিন অধ্যয়ন করার সময় নির্দিষ্ট মিউটেশনগুলোকে বিভিন্ন প্রজাতির নির্দেশক বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, পি. রোবাস্টাসের জন্য অনন্য একটি মিউটেশন আসলে সেই গোষ্ঠীর মধ্যেই পরিবর্তনশীল ছিল- কিছু ব্যক্তির মধ্যে এটি ছিল, অন্যদের মধ্যে ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন প্রোটিনে একটি প্রোটিন মিউটেশন পর্যবেক্ষণ করার প্রথম ঘটনা (এই মিউটেশনগুলো সাধারণত প্রাচীন ডিএনএতে দেখা যায়)।
গবেষকরা মনে করছেন, তারা হয়তো একটি একক পরিবর্তনশীল প্রজাতির পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন পূর্বপুরুষের জটিল এক বিবর্তনীয় ধাঁধার মুখোমুখি হয়েছেন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, জীবাশ্মের গঠন ও আকৃতি বিশ্লেষণের সঙ্গে প্রাচীন প্রোটিনের তথ্য মিলিয়ে দেখলে প্রাচীন হোমিনিনদের বিবর্তনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
তবে পি. রোবাস্টাস জীবাশ্মগুলোর ভিন্ন পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে আরও দাঁতের এনামেল প্রোটিনের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এর জন্য গবেষকরা দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যান্য স্থান থেকে আরও পি. রোবাস্টাসের নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছেন।
এই গবেষণাটি আফ্রিকার জীবাশ্ম সংরক্ষণের গুরুত্বকেও তুলে ধরেছে। গবেষক দলটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সতর্ক ছিল। গবেষক দলটি জীবাশ্মের ন্যূনতম ক্ষতি নিশ্চিত করে এবং স্থানীয় গবেষণাগারগুলোকে সম্পৃক্ত করে পুরো কাজটি সম্পন্ন করেছে, যা জীবাশ্মবিজ্ঞানের গবেষণায় স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একে উপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


