বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এক সুবর্ণ জানালায় দাঁড়িয়ে। যদি সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না হয়, তা হলে এই জনমিতিক সুযোগ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যাগত প্রোফাইল নজরকাড়া। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ, যার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম ১৫-৬৪ বছর বয়সী। ২০২৪ সালের হিসাবে প্রায় ৬৭.৫ শতাংশ জনগণ কর্মক্ষম বয়সভুক্ত এবং দেশের গড় বা মধ্যম বয়স এখন মাত্র ২৮ বছর। কর্মক্ষম তরুণ-যুবা জনসংখ্যার এই আধিক্য বাংলাদেশকে এক বিশাল মানবসম্পদের ভাণ্ডারে পরিণত করেছে। যথাযথ শিক্ষা, নতুন যুগের উপযোগী দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে এই যুবসমাজ অর্থনীতি ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবনী শক্তি জোগাতে পারে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন যাত্রায় গতি সঞ্চার করতে পারে। কিন্তু বিপরীতে, যদি এই জনমিতিক সুবিধাকে কাজে না লাগানো যায়- তা হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে বরং বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনমিতিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের এই ‘সুবর্ণ জানালা’ চিরকাল খোলা থাকবে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। আর আয়ু বৃদ্ধির ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিপরীতে নির্ভরশীল শিশু ও বৃদ্ধের অনুপাত ধীরে ধীরে বাড়বে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে ২০৪০-এর দশক থেকেই বাংলাদেশের অনুকূল বয়সগঠন কমতে শুরু করবে। তখন বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। হিসাব বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ৬৫ বছরের ঊর্ধ্ব জনগণের অনুপাত প্রায় ১৫ শতাংশ হবে এবং সেই সময় শিক্ষিত তরুণদের চেয়ে বয়স্ক নির্ভরশীলের সংখ্যা বেশি দেখা দেবে। অর্থাৎ আগামী দুই দশক মূল সময়, যখন আমরা আমাদের যুবসমাজের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উত্থান ঘটাতে পারি। এই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে বাংলাদেশ ‘উন্নত হওয়ার আগে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার’ ঝুঁকিতে পড়বে।
এই জানালাটা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আর ফিরে আসবে না। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো সময়মতো তাদের বিশাল যুব জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে আজ শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা বিশাল বিনিয়োগ করেছে নতুন যুগের শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায়। বাংলাদেশ যদি এখন এই পথে না হাঁটে, তা হলে আমাদের ভবিষ্যতে চরম খেসারত দিতে হবে।
চিন্তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে কিছুটা স্পষ্ট। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তবে তাদের সবাইকে গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। যুব বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এর সঙ্গে আছে দক্ষতার ঘাটতি, চাকরি খুঁজছে লাখো তরুণ। কিন্তু নিয়োগদাতারা খুঁজে পাচ্ছেন না যথাযথ দক্ষ কর্মী। অধিকাংশ অসংগঠিত খাতে কাজ করছে, যেখানে নেই কাজের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
শিক্ষাব্যবস্থা, এখানেও মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষা এখনো মূলধারায় আসেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ১০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী টিভিইটি বা ভোকেশনাল ধারায় যায়। শিক্ষা বাজেট জিডিপির দুই শতাংশেরও কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যোগসূত্র কম। ফলে সনদধারী হলেও বাস্তব দক্ষতাবিহীন একজন তরুণ খুব সহজে কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যান।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অবকাঠামো ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। কিছু নতুন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তবে বাস্তবতা হলো প্রতিবছর দুই কোটিরও বেশি তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। অথচ মাত্র কয়েক লাখের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি অদক্ষ। মানে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
এদিকে বিশ্বজুড়ে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে কর্মসংস্থানের চিত্র। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সবুজ প্রযুক্তি মতো খাতে আগামী দশকে তৈরি হবে কোটি কোটি নতুন চাকরি, আবার অদক্ষদের জন্য ঝুঁকিও বাড়বে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ প্রচলিত চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে। যদি তারা নতুন আঙ্গিকে প্রশিক্ষণ না নেয়। যারা সময় থাকতে নিজেদের দক্ষতা উন্নত করবে, তারাই থাকবে টিকে থাকার দৌড়ে। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলে আমাদের জনমিতিক ডিভিডেন্ড এক বিভীষিকায় পরিণত হতে পারে।
তাই এখন দরকার সাহসী, দূরদর্শী ও সমন্বিত নীতিনির্ধারণ। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার দরকার, ল্যাবভিত্তিক বিজ্ঞান শিক্ষা, সমস্যা সমাধানমুখী চিন্তা, প্রযুক্তিগত ও সফট স্কিল একসঙ্গে শেখানোর পরিবেশ। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে মূলধারায় আনতে হবে, এ জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। তৃতীয়ত, শিল্প ও শিক্ষা খাতের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, নারী ও প্রান্তিক তরুণদের জন্য আলাদা সহায়তা লাগবে, যেন কেউ পিছিয়ে না পড়ে।
তরুণরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে তারা হতে পারে চাকরি-সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা। উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রযুক্তিচর্চা যদি আমরা স্কুল থেকে শুরু করি, তা হলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু পোশাক খাতনির্ভর হবে না, বরং ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যাল, কৃষিপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতেও গর্ব করার মতো সক্ষম দেশে পরিণত হতে পারবে।
এই মুহূর্তটা সিদ্ধান্তের সময়। এখনই যদি বিনিয়োগ, সংস্কার ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে না আসা হয়, তা হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নামক এই মহামূল্যবান সুযোগ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত?
/আবরার জাহিন


