পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল গ্রহ আকারে অর্ধেক ও ভরের দিক থেকে মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ। নিকটতম অবস্থানে থাকলেও পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মাইল। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, লাল এই গ্রহটির অভিকর্ষজ টান আমাদের পৃথিবীর জলবায়ু ও বরফ যুগের ধরনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেমন পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমনি মঙ্গলের অভিকর্ষজ টান দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্ল্যানেটারি অ্যাস্ট্রফিজিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন কেন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন? তিনি মূলত পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তনের সঙ্গে মঙ্গলের টানের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
শুরুতে অধ্যাপক স্টিফেন ভেবেছিলেন মঙ্গলের প্রভাব খুবই সামান্য হবে। কিন্তু কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে সৌরজগতের আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মঙ্গলের ক্ষীণ টানও পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অক্ষের হেলানো অবস্থায় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই পরিবর্তনগুলো সরাসরি পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছানোর পরিমাণকে প্রভাবিত করে, যা হাজার থেকে লক্ষ বছর ধরে জলবায়ুর রূপরেখা নির্ধারণ করে।
বিজ্ঞানের ভাষায় কক্ষপথের এই পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনকে ‘মিলানকোভিচ চক্র’ বলা হয়। এটি মূলত পৃথিবীতে বরফ যুগের শুরু ও শেষ হওয়ার প্রধান কারণ। পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত পাঁচ বা ছয়টি বড় বরফ যুগ এসেছে। বর্তমানে আমরা ‘কোয়াটারনারি’ নামক একটি বরফ যুগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে শুরু হয়েছিল।
গবেষক দলটি দেখেছেন, মঙ্গলের প্রভাবে পৃথিবীতে বরফ জমার স্তরে ছোট ছোট কিছু চক্র তৈরি হয়। এর মধ্যে একটি চক্র প্রায় ১ লাখ বছরের এবং অন্যটি প্রায় ২৩ লাখ বছরের। এই আবিষ্কারটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা বুঝতে বিজ্ঞানীদের নতুন পথ দেখাবে। মহাকাশের দূরবর্তী কোনো গ্রহ যে আমাদের পরিবেশের ওপর এতটা প্রভাব রাখতে পারে, তা এই গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।


