মানবদেহের অন্ত্রে থাকা লাখো কোটি ভাইরাস রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্প্রতি ইঁদুরের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের এই ভাইরাসগুলো শর্করা বিপাক প্রক্রিয়ায় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। গত ১১ মার্চ ‘সেল হোস্ট অ্যান্ড মাইক্রোব’ সাময়িকীতে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহে মানুষের নিজস্ব কোষ বা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ভাইরাসের সংখ্যা বেশি। অন্ত্রে থাকা এই ভাইরাসপুঞ্জকে একত্রে ‘গাট ভাইরোম’ বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট জেরেমি বার বলেন, শরীরের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে থাকলেও ভাইরাসের ভূমিকা এখনো অনেকটা রহস্যবৃত। এই নতুন গবেষণাটি ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় রোগের চিকিৎসায় ভাইরাসভিত্তিক থেরাপির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
চীনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞানী আইকুন ফু এবং তার দল এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। অন্ত্রের অধিকাংশ ভাইরাস মূলত ‘ব্যাকটেরিওফাজ’, যা ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, যখন অন্ত্রের ভাইরাসের ভারসাম্য নষ্ট করা হয়, তখন ইঁদুরগুলোর শর্করা হজম করার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়ার পর তাদের রক্তে দ্রুত গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভাইরোম সরাসরি শরীরের টি-সেল নামক রোগপ্রতিরোধকারী কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে শরীর বিশেষ কিছু প্রোটিন নিঃসরণ করে, যা রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ মিশতে বাধা দেয়। ভাইরাসের অনুপস্থিতিতে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত রক্তে শর্করা প্রবেশ করে। গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে তৈরি মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রের কৃত্রিম মডেলে (অর্গানয়েড) পরীক্ষা করেও একই ধরনের ফলাফল পেয়েছেন।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞানী করিন মরিস বলেন, অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার সময় এখন থেকে আমাদের ভাইরাসগুলোর কথা মাথায় রাখতে হবে। কারণ ভাইরাস ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার এই সম্পর্ক আগে কখনোই এভাবে উপলব্ধি করা যায়নি। তবে মানুষের শরীরে এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে এবং বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস কীভাবে বিপাক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আইকুন ফু এখন এই ভাইরোম পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের নতুন ওষুধ বা কৌশল উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন।


