মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মানুষের গল্প চিরকাল রহস্যময়। সুড়ঙ্গের শেষে তীব্র আলো, চোখের সামনে জীবনের সব স্মৃতি ভেসে ওঠা কিংবা স্বর্গীয় কোনো দৃশ্যের অবতারণা–এসব অভিজ্ঞতার কথা আমরা সিনেমা বা উপন্যাসে হরহামেশা দেখি। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ বা মৃত্যুর নিকটবর্তী অভিজ্ঞতা।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি কেবল কল্পনা নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্ক ও মনস্তত্ত্বের এক গভীর এবং বাস্তব অনুভূতি। মজার বিষয় হলো, মৃত্যুর এত কাছ থেকে ফিরে আসার পর মানুষ সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ঘটে ঠিক তার উল্টো। এই অভিজ্ঞতা অধিকাংশ মানুষকে আরও সুখী, জীবনমুখী ও মৃত্যুভয়হীন করে তোলে।
ভিন্নধর্মী সব অভিজ্ঞতা
মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়া সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না। মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর ক্রিস ফ্রেঞ্চের মতে, এই অনুভূতিগুলো প্রধানত ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ভাগে বিভক্ত। শুরুতে গবেষকরা কেবল ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার বিষয়টিও সামনে আসছে। ফ্রেঞ্চ বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম হতে পারে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে এটি জীবনের অন্য যেকোনো অভিজ্ঞতার মতো বাস্তব মনে হয়।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির মধ্যে একজনের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হতে পারে। এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমত, কেউ হয়তো খুব বিস্ময়কর কিছু দেখছেন কিন্তু সেটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, অনেকে নরকের মতো ভয়াবহ দৃশ্য দেখেন, যেখানে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও কষ্টের চিত্র ফুটে ওঠে। তৃতীয়টি সবচেয়ে রহস্যময়–একটি অন্তহীন শূন্যতা, যেখানে মানুষ নিজেকে অনন্তকালের জন্য একা ভেসে থাকতে দেখে।
তবে অধিকাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুন্দর হয়। তারা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শূন্যে ভেসে থাকার অনুভূতি পান। অনেকে দেখেন এক উজ্জ্বল আলোর সুড়ঙ্গ, যা তাদের প্রশান্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। এই সময়ে তারা অসীম শান্তি ও ভারমুক্ত অনুভব করেন। এই বিশেষ মুহূর্তটি তাদের পরবর্তী জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মস্তিষ্কের ভেতর যা ঘটে
বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় অনুভূতির পেছনে অলৌকিক কিছু না খুঁজে বরং মস্তিষ্কের জটিল প্রক্রিয়াকে দায়ী করছেন। নিউরোসাইকোলজিস্টদের মতে, যখন মস্তিষ্ক মৃত্যুর মুখোমুখি হয় বা চরম চাপের মধ্যে থাকে, তখন তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বদলে যায়। একে বলা হয় ‘ডিস্টার্বড বডিলি মাল্টিসেন্সরি ইন্টিগ্রেশন’। অর্থাৎ, শরীরের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্যগুলো যখন একসঙ্গে জট পাকিয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক এমন এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি করে।
মস্তিষ্কের ডান দিকের ‘টেম্পোরোপ্যারিয়েটাল কর্টেক্স’ অংশটি আমাদের দৃশ্য, শ্রবণ ও স্পর্শের অনুভূতিগুলোকে সমন্বয় করে। চরম সংকটের মুহূর্তে এই অংশ অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠলে মানুষ অলৌকিক বা শরীরের বাইরের কোনো দৃশ্য দেখতে শুরু করে। ফ্রেঞ্চ বলেন, ‘এই অনুভূতির জন্য কাউকে প্রকৃতপক্ষে মরতে হয় না, বরং সে যদি মনে করে যে সে মারা যাচ্ছে, তবে মস্তিষ্ক এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।’
রূপান্তরিত জীবন
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মানুষের জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। গবেষকরা দেখেছেন, এই অভিজ্ঞতার পর মানুষ বৈষয়িক চাওয়া-পাওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর যারা ফিরে এসেছেন, তাদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুভয় আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তারা জীবনের অর্থ খুঁজতে বেশি আগ্রহী ও অন্যদের প্রতি অনেক বেশি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।
অনেকের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতা বা পুনর্জন্মের প্রতি বিশ্বাস বেড়ে যায়। তারা টাকা-পয়সা জমানোর চেয়ে পরোপকারে বেশি আনন্দ পান। তবে সব প্রভাব ইতিবাচক হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি অভিজ্ঞ ব্যক্তির জীবন দর্শনের আমূল পরিবর্তনের কারণে দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। তবু সার্বিকভাবে, এই অভিজ্ঞতা মানুষকে এক পূর্ণতর জীবনের স্বাদ দেয়।
মৃত্যু ছাড়া কি সম্ভব?
মৃত্যুর ঝুঁকি না নিয়ে কি এই অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব? বিজ্ঞান বলছে, উত্তরটি ইতিবাচক কিন্তু বেশ কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী ধ্যানের মাধ্যমে অনেকে এই স্তরে পৌঁছাতে পারেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত ধ্যান করছেন, তারা মৃত্যুর পরিস্থিতি ছাড়া একই ধরনের অনুভূতি লাভ করতে সক্ষম। তারা কোনো ভয় ছাড়াই নিজেদের মনকে শরীরের বাইরে অনুভব করতে পারেন।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য ধ্যান ছাড়া এই অনুভূতির স্বাদ পাওয়ার বিকল্প পথ নেই বললেই চলে। মৃত্যুর চূড়ান্ত আতঙ্কই মূলত মস্তিষ্কের সেই গোপন সুইচটি অন করে দেয়। সব মিলিয়ে, মৃত্যুর নিকটবর্তী এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে আমাদের মস্তিষ্ক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের শান্ত ও আশ্বস্ত রাখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে। এটি কেবল এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় নয়, বরং জীবনের প্রতি নতুন করে ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার এক অনন্য মাধ্যম। সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস


