দেশের প্রতিটি উপজেলায় এক বা একাধিক পুষ্টিবিদের সরকারি পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের (বিবিএফ) চেয়ারপারসন ও সিনিয়র সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক ডা. স্বপন কুমার রায়।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং সরকার ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়েও পুষ্টিবিদদের জন্য সরকারি পদ সৃষ্টির নীতিগত সম্মতি রয়েছে। দ্রুতই এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) টিএসসি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী 'নিউট্রি ক্যারিয়ার ফেস্ট ২০২৬' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন, শেকৃবি নিউট্রিশন ক্লাব এবং দ্য নিউট্রিফিকেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের লক্ষ্য পুষ্টিবিজ্ঞান ও পুষ্টি পেশার বহুমুখী ক্যারিয়ার সম্ভাবনা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা।
অধ্যাপক এস. কে. রায় বলেন, পুষ্টিবিদদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করে। পড়াশোনা শেষে কোথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ থাকে। অথচ আশির দশকে আমাদের দেশে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের উচ্চতা দেখেই অপুষ্টির চিত্র স্পষ্ট বোঝা যেত। সেই কঠিন সময় আমরা অনেকটাই অতিক্রম করেছি। তবে এখন অপুষ্টির পাশাপাশি নতুন করে স্থূলতা (ওবেসিটি) একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ বাস্তবতায় পুষ্টিবিদদের চাহিদাও বাড়ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ নিউট্রিশনের (আইপিএইচএন) উপপরিচালক (জনস্বাস্থ্য পুষ্টি) ডা. রওশন জাহান আক্তার আলো বলেন, "ডাক্তার চিকিৎসা করে, ইঞ্জিনিয়ার অবকাঠামো তৈরি করে, আর পুষ্টিবিদ একটি সুস্থ-সবল জাতি গড়ে তোলে। দেশের তরুণরা পুষ্টিবিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে, এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।"
তিনি জানান, প্রতিটি হাসপাতালে পুষ্টিবিদ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে একজন করে পুষ্টি কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে অগ্রসর হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এক বা একাধিক পুষ্টিবিদের পদও সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শিগগিরই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়েও পুষ্টিবিদ বা নিউট্রিশন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও পুষ্টিবিদ খুরশীদ জাহান বলেন, পুষ্টি সম্পর্কে শুধু পুষ্টিবিদদের নয়, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। তাই শিক্ষার প্রতিটি স্তরের পাঠ্যক্রমে পুষ্টি বিষয়ক অন্তত একটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
তিনি বলেন, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা অপরিহার্য। একটি শিশুর সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে যেমন মায়েদের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, তেমনি প্রত্যেক মানুষের নিজের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কেও সচেতন হওয়া দরকার।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জীবনে সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
শেকৃবি নিউট্রিশন ক্লাবের সভাপতি শাহরিয়া সিফাত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের সংগঠন শিক্ষার্থীদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুষ্টি খাতে ক্যারিয়ার গঠনের বাস্তব দিকনির্দেশনা পাবেন এবং ভবিষ্যতে দক্ষ জনবল হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, পুষ্টিবিদরা যেমন মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করেন, তেমনি কৃষিবিদরা নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের তরুণরাই ভবিষ্যতে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নেতৃত্ব দেবে।
দুই দিনব্যাপী এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, পুষ্টিবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, করপোরেট প্রতিনিধি ও উন্নয়নকর্মীরা অংশগ্রহণ করছেন।
আয়োজকদের মতে, এ আয়োজন শিক্ষার্থী ও তরুণ পুষ্টিবিদদের জন্য পেশাগত দিকনির্দেশনা, দক্ষতা উন্নয়ন, নেটওয়ার্কিং এবং পুষ্টি খাতে কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্ভাবনা সম্পর্কে জানার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
অনিন্দ্য বিশ্বাস/এএফ