ঢাকা ২ বৈশাখ ১৪৩১, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

যে নারী জান্নাতে আল্লাহর প্রতিবেশী হতে চেয়েছেন

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৬ পিএম
যে নারী জান্নাতে আল্লাহর প্রতিবেশী হতে চেয়েছেন
ইংরেজিতে ‌'জান্নাত' লেখা ছবি। ইন্টারনেট

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা মুজাদালা, সুরা হাশর, সুরা মুমতাহিনা, সুরা সাফ, সুরা জুমুআ, সুরা মুনাফিকুন, সুরা তাগাবুন, সুরা তালাক ও সুরা তাহরিম তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে ২৮তম পারা পড়া হবে। এই অংশে তালাক, পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবন, স্ত্রীর ভরণপোষণ, বৈঠকের আদব, আনসারদের সুসংবাদ, কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণনীতি, নবিজির গুণাগুণ, আজান হলেই জুমার নামাজে যাওয়া, দুনিয়াতে নারীর জান্নাতের সুসংবাদ, মানুষের বিভক্তি ও আল্লাহর পথে ব্যয়সহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। 

মায়ের সঙ্গে স্ত্রীকে তুলনার বিধান
নিজ স্ত্রীকে স্থায়ীভাবে হারাম নারীর হারাম অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘জিহার’ বলে। যেমন- স্ত্রীকে এ কথা বলা, তুমি কিংবা তোমার ওই অঙ্গ আমার মা-বোনের মতো ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটেছিল। সাহাবি আওস ইবনে সামেত (রা.) স্ত্রীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার স্ত্রী খাওলা (রা.)-এর আর্তনাদকে কেন্দ্র করে শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান দিয়ে সুরা মুজাদালার শুরুর আয়াতগুলো নাজিল হয়। আওস খাওলাকে বললেন, ‘তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো’, অর্থাৎ, ‘তোমাকে আমার জন্য আমার মায়ের মতো হারাম করলাম।’ ইসলামপূর্ব যুগে এই বাক্যটি স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দেওয়ার জন্য বলা হতো। খাওলা পেরেশান হয়ে রাসুলের দরবারে এসে সমাধান পেলেন না। ইসলামে তখনো এ সম্পর্কে বিধান নাজিল হয়নি। তিনি নবিজির সঙ্গে বাদানুবাদ শুরু করে দিলেন। পরে খাওলা কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। তখন আল্লাহ এর সমাধান দিয়ে সুরা মুজাদালার ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। সেখানে বলা হয়, স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকবে না যতক্ষণ না স্বামী ‘কাফ্ফারা’ আদায় করে। আর জিহারের কাফ্ফারা হলো ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখা বা ৬০ জন অসহায় ব্যক্তিকে খাওয়ানো। 

সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠে যে সওয়াব
কোরআনের ৫৯তম সুরা হাশর মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ২৪। এ সুরায় আল্লাহর প্রশংসা, অপরাধের কারণে বনু নজিরকে মদিনা থেকে বহিষ্কারের প্রসঙ্গ, বিনাযুদ্ধে অর্জিত সম্পদের বণ্টননীতি, আনসারদের সুসংবাদ, মুনাফিকদের নিন্দা ও তাকওয়ার বিবরণ রয়েছে। সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তিলাওয়াতে রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘যে সকালে তিনবার ‘আউজুবিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ পড়ে সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন; যারা তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকে। এ সময়ে সে মারা গেলে শহিদের মৃত্যু লাভ করবে। যে এটি সন্ধ্যায় পড়বে, তা হলে তার একই মর্যাদা রয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩০৯০) 

সুরা মুমতাহিনায় যে বিষয়ের আলোচনা
কোরআনের ৬০তম সুরা মুমতাহিনা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, এর আয়াত সংখ্যা ১৩। এ সুরায় কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণনীতি, কিয়ামতের দিন কেউ কারও উপকারে না আসা, ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ, বিশ্বাসী মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার, ঈমানদার নারী কাফেরের জন্য হারাম এবং মুসলমান পুরুষের জন্য কাফের নারী হারাম হওয়ার বিবরণ রয়েছে। 

সুরা সফের বিষয়বস্তু
কোরআনের ৬১তম সুরা সফ। এটি মদিনায় অবতীর্ণ, এর আয়াত সংখ্যা ১৪। এ সুরায় আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা, অঙ্গীকারের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার জন্য মুসলমানদের প্রতি কঠোর সতর্কতা, তাদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা, বনি ইসরাইল, জিহাদ, নবিজির ব্যাপারে ইসা (আ.)-এর সুসংবাদ, জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম, আল্লাহর সাহায্য, মুমিনদের গুনাহ মাফ ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। 

জুমার নামাজের গুরুত্ব
সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনেরা, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে শিগগির ধাবিত হও, ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ করো, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’ জুমা মুসলমানদের সমাবেশের দিন। সপ্তাহের সেরা দিন। আমলের দিন। আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে জামাতে পড়ার তাগিদ দিয়েছেন। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আজানের সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ ফেলে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ না দিলেও জুমার নামাজের ব্যাপারে দিয়েছেন। 

যে নারী জান্নাতে আল্লাহর প্রতিবেশী হতে চেয়েছেন 
প্রাচীন মিসরের ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন আসিয়া বিনতে মুজাহিম। তিনি ছিলেন এক আল্লাহ বিশ্বাসী মহীয়সী নারী। ছিলেন মানুষের প্রতি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তার স্বামী ফেরাউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করত। সে ছিল অত্যাচারী ও বদমেজাজি বাদশাহ। আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন ঠিকই কিন্তু ফেরাউনের দুশ্চরিত্রের কোনো স্বভাব তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। তিনি এক আল্লাহর ওপর ইমান আনেন। নিজের স্ত্রী অন্যের উপাসনা করে— এমন খবর জানতে পেরে ফেরাউন স্ত্রীকে বোঝাতে থাকেন। কিন্তু আসিয়া সত্য ধর্মের ওপর পর্বতের মতো অবিচল, অটল। ফেরাউন বিশেষ লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে আসিয়াকে হত্যার আদেশ দেয়। ফেরাউনের সৈন্য-সামন্ত তাঁর হাত-পা বেঁধে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে ফেলে রাখে। ক্ষতবিক্ষত করা হয় শরীর। তবুও তিনি ঈমান ছাড়েননি। জীবনের বিনিময়ে ঈমান রক্ষা করেন। দুনিয়ার রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন জান্নাতে আল্লাহর পাশে একটি ঘর। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জন্য আপনার কাছে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন। আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন। আমাকে মুক্তি দিন অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১১) 

এ ছাড়া তারাবির আজকের অংশে আল্লাহ এবং শয়তানের দল, কৃপণতা, কানাঘুষা, আল্লাহর প্রশংসা, আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী, ইহুদি সম্প্রদায়, রিসালাতের উদ্দেশ্য, কাফেরদের পরিণতি, ইবাদতের জন্য মুমিনের আফসোস ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

এলো খুশির ঈদ

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০ এএম
এলো খুশির ঈদ
কোলাকুলির ছবি। ইন্টারনেট

সারা মাস রোজা রাখার পর মুমিন বান্দার জীবনে পুরস্কার হিসেবে আসে ঈদের দিন। ঈদ আরবি শব্দ, যার অর্থ ফিরে আসা। হাদিসে আছে, “রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় গেলেন, তখন মদিনাবাসীরা দুটি দিবসে আনন্দ করত। খেলাধুলা করত। নবিজি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুটি দিনের কোনো তাৎপর্য আছে?’ তারা বলল, ‘আমরা জাহেলি যুগে এ দুটি দিনে খেলা করতাম।’ নবিজি (সা.) তখন বললেন, ‘আল্লাহ এ দুদিনের পরিবর্তে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটি দিন দিয়েছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।” (আবু দাউদ, ১১৩৪)

শুধু খেলাধুলা ও আমোদ-ফুর্তির যে দুটি দিবস ছিল, তা আল্লাহ নেয়ামতের মাধ্যমে পরিবর্তন করেছেন। নেয়ামত হলো—আল্লাহর কাছ থেকে কিছু অর্জন করা। তার নেয়ামত ও দানে সিক্ত হওয়া। তাই এ দিবসটিতে বান্দা তার স্রষ্টার শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে শালীন আমোদ-ফুর্তি, সাজসজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করবে। তবেই আল্লাহর দেওয়া ঈদ সার্থক হবে। 

ঈদকে কেউ নেয়ামত হিসেবে নিয়েছেন। কেউবা নিছক আমোদ-ফুর্তি হিসেবে নিয়েছেন। যারা তাকে নেয়ামত হিসেবে নিয়েছেন, তারা কত ভাগ্যবান। হাদিসে এসেছে, ‘এ ঈদের রাতে কেউ যদি জাগ্রত থাকে অর্থাৎ রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত করে, ওই দিন তার অন্তর জীবিত থাকবে, যেদিন সব অন্তর মারা যাবে।’ (ইবনে মাজাহ, ১৭৮২)

ঈদের রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মানুষ এ রাতে নানা পাপাচারে লিপ্ত হয়। কেউ যদি রাত জেগে না থাকতে পারে, তাহলে এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলেই সারা রাত জেগে থেকে ইবাদত করার সওয়াব পাবে। ফজরের নামাজ পড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ঈদের নামাজের প্রস্তুতি নিতে হবে। এ দিনের সুন্নতগুলো আদায় করা উচিত। এর মধ্যে মিসওয়াক ও গোসল অন্যতম। আলি (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। নতুন জামা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা পরতেন। সুগন্ধি লাগাতেন। মিষ্টি জাতীয় কিছু খেতেন।’ (তিরমিজি, ৫৪৩)

ঈদুল ফিতরে মিষ্টি জাতীয় কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত। বুরাইদা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহারের দিনে ঈদের নামাজের আগে খেতেন না।’ (তিরমিজি, ৫৪২)

তাকবির বলে ঈদগাহের দিকে যাত্রা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন।’ (মুসতাদরাক, ১১০৬)

হেঁটে যাওয়া উত্তম। এক পথ দিয়ে গিয়ে অন্য পথ ধরে আসা ভালো। হাদিসে আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে পথ বিপরীত করতেন।’ (বুখারি, ৯৮৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। 

ঈদের নামাজের আগে কোনো নফল নামাজ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিনে বের হয়ে দুই রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। এর আগে ও পরে অন্য কোনো নামাজ আদায় করেননি। (বুখারি, ৯৮৯)। তবে নামাজের আগে ফিতরা দিতে হবে। অভাবীদের খোঁজখবর নিতে হবে। তাদের খাবার খাওয়াতে হবে। সম্ভব হলে তাদের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটাই হলো ঈদের আনন্দ। ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে। খুতবা শোনা ওয়াজিব। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিনে সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন, ‘আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনাদের ভালো কাজগুলো কবুল করুন।’ নামাজ শেষে দোয়া ও ইস্তেগফার পড়া ভালো। 

ঈদের দিনে বর্জনীয় কিছু কাজ রয়েছে। যথা—ঈদের দিনে রোজা রাখা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (বুখারি, ১৯৯০) 

ঈদের দিনে শালীন পোশাক পরিধান করতে হবে। অপসংস্কৃতি বহন করে এমন পোশাক পরা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্যতা রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ, ৪০৩১)

ঈদ একটি ইবাদত। আনন্দ ও ফুর্তির মাঝেই এ ইবাদত করা যায়। এ ব্যাপারে কোরআনে এসেছে, ‘বলো, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত। সুতরাং এ নিয়ে যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮) 

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

চাঁদ দেখে ঈদ পালনের বিধান

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০০ পিএম
চাঁদ দেখে ঈদ পালনের বিধান
চাঁদের ছবি। ইন্টারনেট

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রমজান পালন করবে এবং চাঁদ দেখে ঈদুল ফিতর পালন করবে।’ (বুখারি, ১০৮১)

হাদিসের আলোকে সচেতন মুমিন-মুসলমানরা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা পালন শুরু করেন এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলেই ঈদুল ফিতর পালন করেন। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরিত সুন্নতকে সামনে রাখা আমাদের প্রয়োজন। সুন্নতের আলোকে আমরা দেখি, তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া রমজান পালনের অনুমতি দেননি। ‘চাঁদ দেখে রমজান বা ঈদ পালনের’অর্থ এ নয়—যে কেউ যেখানে ইচ্ছা চাঁদ দেখলেই ঈদ করা যাবে। এ হাদিসের অর্থ হলো, চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে তোমরা রোজা পালন করো এবং চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে ঈদুল ফিতর পালন করো। চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার সুন্নাহ নির্দেশিত পদ্ধতি হলো—শাসক বা প্রশাসকের কাছে সাক্ষ্য গৃহীত হওয়া। 

রাষ্ট্রীয়ভাবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হলে বা চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলেই শুধু ঈদ করা যাবে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সমাজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ঈদ পালন করতে নির্দেশ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন সব মানুষ ঈদুল ফিতর পালন করবে সে দিনই ঈদুল ফিতরের দিন এবং যেদিন সব মানুষ ঈদুল আজহা পালন করবে, সে দিনই ঈদুল আজহার দিন।’(তিরমিজি, ৩/১৬৫)

আলেমরা এ বিষয়ে একমত—রমজানের রোজা ও ঈদ  চাঁদ দেখেই পালন করতে হবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, তবে তোমরা ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (মুসলিম, ১০৮১)

এখন প্রশ্ন হলো, কতজন মানুষকে চাঁদ দেখতে হবে? তার উত্তর আছে হাদিসে, ‘আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে এমন এক ব্যক্তির চাঁদ দেখাই যথেষ্ট, যার দ্বীনদার হওয়া প্রমাণিত অথবা বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার হিসেবে পরিচিত।’ (আবু দাউদ, ২৩৪০)। 

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

ঈদুল ফিতরে যা করবেন এবং যা করবেন না

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:০০ এএম
ঈদুল ফিতরে যা করবেন এবং যা করবেন না
প্রতীকী ছবি। ইন্টারনেট

করণীয়: ঈদের দিন ভোরবেলা ফজর নামাজ জামাতে আদায় করার মাধ্যমে দিনটি শুরু করা উচিত। এ দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘তিনি দুই ঈদের দিনে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ (সুনানে কুবরা, বাইহাকি, ৬১৪৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) যে পথে ঈদগাহে যেতেন সে পথে ফিরে না এসে অন্য পথে ফিরতেন। যাতে উভয় পথের লোকদের সালাম দেওয়া ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। (জাদুল মায়াদ, ১/৪৩২-৪৩৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, ৫৬৬৭)

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম। ঈদের নামাজের আগে খাবার গ্রহণ করা সুন্নত। (বুখারি, ৯৫৩)

ঈদের নামাজ আদায় ও খুতবা শোনা ওয়াজিব। আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও ফিতরা আদায় করাও ইবাদত। 

বর্জনীয়: বিজাতীয় সংস্কৃতি উদযাপন না করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’(আবু দাউদ, ৪০৩১)

জুয়া, মদ, জিনা-ব্যভিচার ও মাদকদ্রব্য সেবন না করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা দল পাওয়া যাবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) মনে করবে।’(বুখারি, ৫৫৯০)

অশালীন পোশাকে রাস্তায় বের না হওয়া: রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একদল নারী যারা পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ মানুষের মতো হবে, অন্যদের আকর্ষণ করবে এবং অন্যরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথার চুলের অবস্থা হবে উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। ওরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না, যদিও তার সুগন্ধি বহুদূর থেকে পাওয়া যায়।’ (মুসলিম, ২১২৮)

লেখক: খতিব, বনানী আত-তাকওয়া জামে মসজিদ

ঈদের নামাজ আদায় করবেন যেভাবে

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
ঈদের নামাজ আদায় করবেন যেভাবে
ঈদের নামাজ আদায়ের পুরোনো ছবি। ইন্টারনেট

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে বিশেষভাবে নামাজ আদায়ের জন্য আদেশ করেছেন। যেহেতু বছরে মাত্র দুইবার ঈদের নামাজ পড়তে হয়, তাই এই নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই জটিলতা ও দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হয়। তাই ঈদের নামাজের আগে কিছু নিয়মকানুন ও আদায় পদ্ধতি ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

যাদের ওপর জুমার নামাজ ওয়াজিব, তাদের ওপর ঈদের নামাজ ওয়াজিব। আল-জামিউস সগির গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘একই দিনে দুটি ঈদ একত্র হয়েছে। প্রথমটি হলো সুন্নত আর দ্বিতীয়টি হলো ফরজ। তবে দুটির কোনো একটিকেও ছেড়ে দেওয়া যাবে না।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্য এক বা দুই বর্শা পরিমাণ ওপরে উঠলে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। (আবু দাউদ, ২/৩৬১)

ঈদের নামাজের জন্য কোনো আজান ও ইকামত নেই। তবে জুমার নামাজের মতোই উচ্চ আওয়াজে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়। প্রথম রাকাতে এক তাকবির বলা হয় তাহরিমার (নামাজ শুরুর তাকবির) জন্য। তার পর তিনবার তাকবির বলতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবিরে উভয় হাত উঠিয়ে তা ছেড়ে দেবে এবং তৃতীয় তাকবির দিয়ে উভয় হাত বেঁধে নিতে হবে। এর পর সুরা ফাতেহা ও অন্য একটি সুরা পড়বে এবং তাকবির বলে রুকুতে যাবে। এর পর দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ফাতেহার সঙ্গে অন্য একটি সুরা মিলিয়ে শুরু করবে। তার পরে তিনবার তাকবির বলবে। প্রথম রাকাতের মতো দুই তাকবিরে উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠিয়ে ছেড়ে দেবে; অতঃপর তৃতীয় তাকবির দিয়ে হাত বাঁধতে হবে এবং চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যেতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, ৫৭৪৬-৫৭৪৭) 

ঈদের তাকবিরসমূহ দ্বীনের প্রতীক। তাই তা উচ্চৈঃস্বরে আদায় করা হয়। সুতরাং এর প্রকৃত চাহিদা হলো মিলিতভাবে পাঠ করা। প্রথম রাকাতে এই তাকবিরগুলো তাকবির তাহরিমার সঙ্গে যুক্ত করা ওয়াজিব। যেহেতু এ তাকবির ফরজ এবং প্রথমে হওয়ার প্রেক্ষিতে এটার শক্তি বেশি। আর দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবির ছাড়া অন্য কোনো তাকবির নেই। সুতরাং (ঈদের তাকবিরগুলো) তার সঙ্গে যুক্ত করাই ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি স্থান ছাড়া অন্য কোথাও হাত তোলা হবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, ১৫৯৯৬)। এর মধ্যে ঈদের তাকবিরসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে। 

নামাজের পর (ইমাম) দুটি খুতবা দেবেন। (বুখারি, ৯৫৮)। যে ব্যক্তির ইমামের সঙ্গে ঈদের নামাজ ছুটে গেছে, সে তা কাজা পড়বে না। কেননা এই প্রকৃতির নামাজ এমন কিছু শর্তসাপেক্ষেই ইবাদতরূপে স্বীকৃত হয়েছে, যা একাকী ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হতে পারে না। (শরহু মুখতাসারিত তহাবি লিল জাসসাস, ২/১৬১ )

যদি কোনো কারণে ঈদের দিন নামাজ আদায় সম্ভব না হয়, তা হলে এর পরে আর তা পড়বে না। কারণ জুমার মতো এক্ষেত্রেও মূলনীতি হলো, কাজা না করা। 

লেখক: খতিব, বঙ্গভবন জামে মসজিদ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঈদ

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০০ এএম
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঈদ
শিল্পীর তুলিতে আঁকা মোহরে নবুয়াত। ইন্টারনেট

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহোৎসব। মুসলিম জাতির সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। মনের সব কালিমা দূর করে—মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে একতা, সমদর্শিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ-সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের দিন। মনের হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, অহমিকা, আত্মম্ভরিতা, আত্মশ্লাঘা, লোভ, রাগ-ক্রোধসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজের পবিত্রতা ঘোষণা করার উপলক্ষ হলো ঈদ।

মহিমান্বিত দিনটির আনন্দ-উৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শিক কিছু চমকপ্রদ আয়োজন। চলুন জেনে নিই, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঈদ উদযাপন কেমন ছিল— 

১. রাসুলুল্লাহ (সা.) গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করতেন। (বুখারি,  ১/১৩০)

২. সুন্দর ও উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। (বায়হাকি, ৬৩৬৩)

৩. ঈদগাহে যাওয়ার আগে পানাহার করতেন। (বুখারি, ৯৫৩)

৪. তাকবির বলতেন। (সিলসিলাতুল আহাদিস, ১৭১)

৫. যাতায়াতের রাস্তা পরিবর্তন করতেন। (বুখারি, ৯৮৬)

৬. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। (তিরমিজি, ১২৯৫)

৭. ঈদগাহে শিশুদের সঙ্গে নিতেন। (সুনানে কুবরা বায়হাকি, ৬৩৪৯)

৮. ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। (ফাতহুল কাদির, ২/৫১৭)

৯. ঈদের খুতবা শোনা। (ইবনে মাজাহ, ১০৭৩)

১০. ঈদের রাতের আমল করতেন। (আত তারগিব ওয়াত তারহিব লিল মুনজেরি, ৬৫৬)

১১. বেশি বেশি দোয়া করতেন। (মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক, ৭৯২৭)

১২. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ঈদের রাতে  ইবাদতকারীর অন্তর মরবে না। (ইবনে মাজাহ, ১৭৮২)