ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩১, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব খাবার খেতেন

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ০৮:৪০ এএম
আপডেট: ০৬ মে ২০২৪, ০১:১৩ পিএম
রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব খাবার খেতেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব খাবার খেতেন, তার ছবি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষ ছিলেন। রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। আর মানুষ হিসেবে জীবনমুখী বিভিন্ন প্রয়োজন থাকাটা স্বাভাবিক। পার্থিব জীবনের অন্যতম একটি প্রয়োজন ক্ষুধা নিবারণ। সুস্থ-সবলভাবে দুনিয়ায় থাকতে হলে খেতে হয়। খাওয়ার বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্থভাবে জীবনধারণের জন্য খেতেন। তবে খাওয়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। জীবনধারণের জন্য তিনি খেতেন। খাওয়ার জন্য জীবনধারণ করতেন না। কিছু কিছু খাবার ছিল তাঁর প্রিয়। আর কিছু খাবার খেতেন সাধারণ জীবনযাত্রার নিয়ম মেনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কী খেতেন, কী খেতে পছন্দ করতেন—এমন সব খাবারের নাম ও পরিচয় তুলে ধরা হলো।

গোশত
রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো ‘জাফাফ’ ছাড়া তৃপ্তিসহকারে রুটি ও গোশত খাননি। মালিক ইবনে দিনার (রা.) বলেন, আমি জানতে চাইলাম, জাফাফ কি? তিনি বললেন, মানুষের সঙ্গে একত্রে পানাহার করা। (শামায়েলে তিরমিজি, ৫৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর বাড়িতে গেলে তিনি বকরি জবাই করলেন। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘মনে হচ্ছে তারা জানে, আমি গোশত পছন্দ করি।’ (শামায়েলে তিরমিজি, ১৩২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন ধরনের গোশত খেতেন এবং খেতে পছন্দ করতেন, হাদিসের আলোকে সেসব গোশতের পরিচয় তুলে ধরা হলো—

    • গরুর গোশত: বেশ কিছু হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে গরু কোরবানি দিয়েছেন এবং গরুর গোশত খেয়েছেন। (মুসলিম, ১৩১৯)
      একবার হজের সফরে মিনায় অবস্থানকালে আয়েশা (রা.)-এর কাছে গরুর গোশত নিয়ে আসা হলো এবং তিনি জানতে চাইলেন, এটা কী? বলা হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি করেছেন। (বুখারি, ৫১৫০)
    • বকরির গোশত: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে বকরির সামনের রানের গোশত পরিবেশন করা হলো। তিনি তা খুবই পছন্দ করতেন। অতঃপর তিনি তা থেকে দাঁত দিয়ে কেটে কেটে খেলেন।’ (বুখারি, ৪৭১২)
      আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমরা ছোট বকরির পায়া রান্না করতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির পনেরো দিন পরও তা খেয়েছেন।’ (বুখারি, ৫১২২)
    • ভেড়ার গোশত: রাসুলুল্লাহ (সা.) ভেড়ার গোশতও খেতেন এবং ভেড়ার সামনের মাথার কাছের অংশ খেতে পছন্দ করতেন। (বুখারি, ৫৪৬২)
    • উটের গোশত: রাসুলুল্লাহ (সা.) উটকে শুধু বাহন হিসেবে ব্যবহার করেননি। উট কোরবানি করেছেন এবং এর গোশত খেয়েছেন। (মুসলিম, ৩০৫৪)
      জাবের বিন সামুরা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে উটের গোশত খেয়ে অজু করার এবং ছাগলের গোশত খেয়ে অজু না করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (মুসলিম, ৩৬০)
    • খরগোশের গোশত: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে খরগোশের গোশত খেয়েছেন এবং সাহাবিদেরও খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। (তিরমিজি, ১৪৭২)
      মক্কার অদূরে মাররাজ-জাহরান নামক স্থানে সাহাবিরা একটি খরগোশ ধরতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। অবশেষে আনাস (রা.) সেটিকে ধরলেন এবং আবু তালহা (রা.) খরগোশটিকে জবাই করে তার দুই ঊরু বা রান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে পাঠালেন এবং তিনি তা গ্রহণ করলেন। (বুখারি, ২৫৭২)
    • মোরগ বা মুরগির গোশত: আবু মুসা আশয়ারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মোরগের গোশত খেতে দেখেছি।’ (তিরমিজি, ১৮২৭) অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, ‘মুরগির গোশত খেতে দেখেছি।’ (মুসলিম, ৪৩৫৪)
    • হরিণের গোশত: সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া (রা.) কিছু দুধ, হরিণের গোশত ও শসা নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে সালাম না দিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, তুমি ফিরে যাও এবং বলো আসসালামু আলাইকুম। (আবু দাউদ, ৫১৭৬)
    • এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার ওমরার সফরে সাহাবিদের জেব্রা শিকার করে খাওয়ার (তিব্বে নববি, ৭৫) এবং খায়বারের যুদ্ধের সময় গৃহপালিত গাধার গোশত না খেয়ে ঘোড়ার গোশত খেতে অনুমতি দিয়েছেন। (বুখারি, ৪২১৯) আর দবের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দব আমি খাই না আর হারামও বলি না।’ (বুখারি, ৫৫৩৬)

খেজুর
খেজুর ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় খাবার। এটি ছিল আরবের সবচেয়ে সহজলভ্য ও প্রধানতম ফল বা খাবার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে খেজুর নেই, সে ঘরের বাসিন্দা অভুক্ত।’ (আবু দাউদ, ৩৭৫৪) তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে খেজুর খেতেন এবং খাওয়ার কথা বলেছেন। যেমন—

    • সাধারণ খাবার: আয়েশা (রা.) বলেন, ‘উপোস থেকে আমাদের মাস অতিবাহিত হতো। আমরা ঘরে রান্নার আগুন জ্বালাতাম না। আমরা শুধু খুরমা খেজুর ও পানি খেতাম। তবে যৎসামান্য গোশত এসে যেত।’ (বুখারি, ৬৪৫৮)
    • আরোগ্যের খাবার: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদিনার আলিয়া (উঁচু ভূমির) অঞ্চলের আজওয়া খেজুরে শেফা (আরোগ্য) রয়েছে।’ (মুসলিম, ৫১৬৮)
    • ইফতারে: আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মাগরিবের নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত, তা হলে শুকনো খেজুর দিয়ে আর শুকনো খেজুরও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন।’ (তিরমিজি, ৬৩২)
    • সাহরিতে: আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরির সময় আমাকে বললেন, ‘আমি রোজা রাখতে চাই, আমাকে কিছু আহার করাও। এরপর আমি খেজুর এবং পানি পরিবেশন করলাম।’ এ ছাড়া ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের জন্য সাহরির উত্তম খাবার হলো খেজুর।’ (আবু দাউদ, ২৩৪৩)
    • ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে: আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে (নামাজের জন্য) বের হতেন না।’ (বুখারি, ৯৫৩)
    • সদকাতুল ফিতর: আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমরা এক সা (তিন কেজি ৩০০ গ্রাম) খাদ্যবস্তু দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম। তখন আমাদের খাবার ছিল—জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর।’ (বুখারি, ১৫০৩)
    • তাহনিক: আবু মুসা (রা.) বলেন, ‘আমার একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করলে আমি তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি সন্তানের নাম রাখলেন ইবরাহিম। এরপর তিনি তাহনিক করালেন মানে খেজুর চিবিয়ে সন্তানের মুখে দিলেন।’ (বুখারি, ৫০৭১)
    • পুষ্টিতে: আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার মা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংসারে পাঠাতে চাইতেন বলে আমার দৈহিক পরিপুষ্টির জন্য চিকিৎসা করালেন, কিন্তু কোনো উপকার হলো না। অবশেষে আমি তাজা খেজুরের সঙ্গে শসা মিশিয়ে খেলাম এবং উত্তমভাবে দৈহিক পরিপুষ্টি লাভ করলাম।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৩২৪)
    • অলিমায়: খায়বার থেকে ফিরে আসার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) মধ্যবর্তী এক স্থানে তিনদিন অবস্থান করলেন। সেখানে সাফিয়া (রা.)-কে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে মুক্ত করে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বিবাহ করলেন। মোহর নির্ধারণ করা হলো তার মুক্তিপণ। আনাস (রা.) সবাইকে অলিমার দাওয়াত দিলেন। অলিমাতে রুটি বা গোশত কিছুই পরিবেশন করা হলো না। রাসুলুল্লাহ (সা.) চামড়ার দস্তরখান বিছানোর আদেশ দিলেন এবং তাতে খেজুর, পনির ও ঘি পরিবেশন করা হলো।’ (বুখারি, ৫১৬৯)

পনির
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘তাবুকের যুদ্ধকালে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কিছু পনির নিয়ে আসা হলো। তিনি বিসমিল্লাহ বলে একটি চাকু দিয়ে সেগুলো কেটে তা থেকে খেলেন।’ (আবু দাউদ, ৩৮১৯)

মাখন
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার ইবনাই বিস আল মুসলিমাইন নামক দুইজন সাহাবির ঘরে গেলেন। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আপ্যায়নে মাখন ও খেজুর পরিবেশন করলেন। কারণ তারা জানত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাখন ও খেজুর পছন্দ করতেন।’ (বুখারি, ৫১১৫)

মধু ও মিষ্টি
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিষ্টিজাতীয় খাবার পছন্দ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মিষ্টান্ন ও মধু খেতে পছন্দ করতেন।’ (বুখারি, ৫১১৫)

ঘিয়ে ভাজা বা মাখা রুটি
আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘উম্মে সুলাইম (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ঘি দিয়ে রুটি তৈরি করলেন। এরপর তাঁকে দাওয়াত দিলেন এবং তিনি এসে বললেন, তুমি যা তৈরি করেছ, তা নিয়ে এসো। ঘি দিয়ে তৈরি করা রুটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দেওয়া হলে তিনিসহ সবাই তা খেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৩৪২)

দুধ
মিরাজের রাতে বায়তুল মাকদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে জিবরাইল (রা.) তাঁর সামনে আলাদা দুটি পাত্রে শরাব ও দুধ পেশ করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুধের পাত্রটি বেছে নিলেন। এটা দেখে জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি প্রকৃত ও স্বভাবজাত জিনিস বেছে নিয়েছেন।’ (বুখারি, ৩১৬৪)

নাবিজ
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য মশকে কিশমিশ ভিজিয়ে রাখা হতো। (কিশমিশ পানিতে ভিজিয়ে রেখে যে পানীয় তৈরি করা হয়, তাকে নাবিজ বলা হয়)। তিনি সেই নাবিজ সেদিন, পরের দিন এবং তার পরের দিন মানে তৃতীয় দিন সন্ধ্যা বেলায়ও পান করতেন। এর পরও কিছু থেকে গেলে তা ঢেলে ফেলে দিতেন।’ (মুসলিম, ২০০৪) ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) লাউ বা মিষ্টি কুমড়ার খোসায় এবং আলকাতরা মাখানো পাত্রে নাবিজ তৈরি করতে নিষেধ করেছেন।’ (বুখারি, ৫৫৮৭)

কালোজিরা
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কালোজিরা ব্যবহার করো বা খাও। কারণ এতে মৃত্যু ছাড়া সব রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।’ (তিরমিজি, ২০৪৮)

সারিদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পুরুষের মধ্যে অনেকেই কামালিয়াত অর্জন করেছে। কিন্তু নারীদের মধ্যে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া, ইমরানের কন্যার মরিয়ম ছাড়া কেউ কামালিয়াত অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তবে আয়েশার মর্যাদা রমণীদের মধ্যে তেমন, সব ধরনের খাদ্যের মধ্যে সারিদের (গোশতের ঝোলে ভেজানো টুকরো টুকরো রুটি দিয়ে তৈরি বিশেষ খাদ্যকে সারিদ বলা হয়) মর্যাদা যেমন।’ (বুখারি, ৩১৭২)

তালবিনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তালবিনা (জব পিষে বা গুঁড়া করে দুধ দিয়ে জ্বাল দিয়ে বা পাকিয়ে তাতে মধু মিশিয়ে তৈরিকৃত এক প্রকার খাবারকে তালবিনা বলা হয়) শোকাতুর হৃদয়কে শান্ত করে এবং অসুস্থ হৃদয়কে সেভাবে পরিষ্কার করে, তোমরা মুখ থেকে নোংরা ধুয়ে ফেলো যেভাবে।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৪৪৫) এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘তালবিনা রোগীর কলিজা মজবুত করে এবং নানাবিধ দুশ্চিন্তা দূর করে।’ (বুখারি, ৫৬৮৯)

সিরকা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সিরকা (সিরকার ইংরেজি হলো ভিনেগার। আরবি শব্দ খললুন)। এটি একটি সুন্নতি খাবার। ভালো তরকারি। চমৎকার তরকারি সিরকা।’ (মুসলিম, ৫১৮০) তিনি আরও বলেছেন, ‘সিরকা খুব মজাদার সালুন বা তরকারি।’ (মুসলিম, ৫১৮২) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ঘরে সিরকা আছে, সে ঘর তরকারিশূন্য নয়।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, ২২২০)

লাউ বা মিষ্টি কুমড়া
একবার এক দর্জি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দাওয়াত করলেন। আনাস (রা.) সে দাওয়াতে অংশগ্রহণ করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে বার্লির রুটি, গোশতের টুকরা ও লাউ বা মিষ্টি কুমড়া মেশানো ঝোল পরিবেশন করা হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) পাত্র থেকে খুঁজে খুঁজে লাউ বা মিষ্টি কুমড়া খেলেন। এটা দেখে আনাস (রা.) লাউ বা মিষ্টি কুমড়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন।’ (বুখারি, ২০৯২)

জয়তুন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জয়তুনের তেল দিয়ে রুটি খাও এবং তা দেহে মাখো। কারণ, তা বরকতপূর্ণ গাছ থেকে নির্গত হয়।’ (তিরমিজি, ১৮৫১) অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তোমরা জয়তুন খাও এবং এর তেল শরীরে মাখো।’ (ইবনে মাজাহ, ১০০৩)

মাশরুম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাশরুম জান্নাতি এক প্রকার খাবার। এর রস চোখের জন্য নিরাময়।’ (বুখারি, ২২৯০)

টিড্ডি বা পঙ্গপাল
আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে গিয়েছি এবং তাতে পঙ্গপাল খেয়েছি।’ (বুখারি, ৫৪৯৫) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের জন্য দুই প্রকার মৃত প্রাণীর গোশত এবং রক্ত খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রাণী দুটি হলো—মাছ ও পঙ্গপাল। রক্ত দুটি হলো—কলিজা ও হৃৎপিণ্ড।

সামুদ্রিক মাছ
আবু উবায়দা ইবনুল জাররা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সামুদ্রিক মাছ পছন্দ করতেন।’ (বুখারি, ৪৩৬১) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়লা আদম সন্তানের জন্য সমুদ্রের সকল মাছ জবাই করে খাওয়াকে হালাল করে দিয়েছেন।’ (দারা কুতনি, ৪৭১০)

শসা
আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি তাজা খেজুরের সঙ্গে শসা খেতে দেখেছি।’ (মুসলিম, ৫১৫৭)

তরমুজ
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তরমুজের সঙ্গে রাতাব খেজুর খেতেন। তিনি বলতেন, এটার (তরমুজ) ঠান্ডা ওটার (খেজুর) গরম কমাবে এবং এটার (খেজুর) গরম ওটার (তরমুজ) ঠান্ডা কমিয়ে দেবে।’ (বুখারি, ৫১৩৪)

আঙুর
ফায়রুজ দায়লামি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কাছে অনেক আঙুর আছে। আমরা এগুলো কি করব? তিনি বললেন, তোমরা সেগুলোকে কিশমিশ বানাও। আমরা আবার জিজ্ঞাসা করলাম, কিশমিশ দিয়ে কি করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, কিশমিশ দিয়ে নাবিজ তৈরি করবে। ভিজিয়ে রেখে বিকেলের আহারে পান করবে অথবা সন্ধ্যায় ভিজিয়ে রেখে সকালের খাবারের পর পান করবে। মাটির পাত্রে না রেখে মশকে রাখবে এবং বেশি দেরি হলে তা সিরকা হয়ে যাবে।’ (নাসায়ি, ৫৭৩৬)

 

লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

 

কুনুতে নাজেলার উচ্চারণ, অর্থ ও কেন পড়া হয়?

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৪, ১০:২৪ এএম
কুনুতে নাজেলার উচ্চারণ, অর্থ ও কেন পড়া হয়?
মুসল্লিদের নামাজরত ছবি

মানুষের জীবনে বিপদাপদ আসতেই পারে। বিপদ এলে প্রথমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। বিপদ-আপদে বা ইসলামের শত্রুদের জন্য হেদায়াতের দোয়া বা বদদোয়া করাই হলো ‘কুনুতে নাজেলা’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময় ফজরের নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সময় কুনুতে নাজেলা পড়েছেন। (বুখারি, ২/৬৫৫; মুসলিম, ১/২৩৭)

কোনো জাতির জন্য দোয়া বা বদদোয়ার প্রয়োজন হলে ফজরের নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে রুকু থেকে মাথা উঠানোর সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) কুনুতে নাজেলা পড়তেন। (ইবনে খুজাইমা, ১০৯৭; আসারুস সুনান, ২/২০)

হানাফি মাজহাব মতে কাফের, মুশরিক ও জালেমদের পক্ষ থেকে বা আসমানি কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে কুনুতে নাজেলা পড়া উচিত। (ফাতওয়ায়ে শামি, ২/৪৪৮-৪৪৯)

কুনুতে নাজেলা কখন পড়তে হয়
ফজরের নামাজের ফরজের দ্বিতীয় রাকাতে রুকু থেকে উঠে ইমাম আওয়াজ করে কুনুতে নাজেলা পড়বেন, এ সময় মুসল্লিরা আস্তে আস্তে আমিন বলবেন। দোয়া শেষে নিয়মানুযায়ী নামাজের অবশিষ্ট সেজদা, শেষ বৈঠক ইত্যাদির মাধ্যমে নামাজ শেষ করবেন। (এলাউস সুনান, ৬/৮১)

কুনুতে নাজেলা

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَا ، وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ ، وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ ، وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِهِمْ ، وَانْصُرْهُمْ عَلَى عَدُوِّكَ وَعَدُوِّهِمْ، اللَّهُمَّ الْعَنْ كَفَرَةَ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِكَ ، وَيُكُذِّبُونَ رُسُلَكَ ، وَيُقَاتِلُونَ أَوْلِيَاءَكَ اللَّهُمَّ خَالِفْ بَيْنَ كَلِمَتِهِمَ ، وَزَلْزِلْ أَقْدَامَهُمْ، وَأَنْزِلْ بِهِمْ بَأْسَكَ الَّذِى لاَ تَرُدُّهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِى عَلَيْكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ، وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ، وَلَكَ نُصَلِّى وَنَسْجُدُ، وَلَكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ ، نَخْشَى عَذَابَكَ الْجَدَّ، وَنَرْجُو رَحْمَتَكَ، إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكَافِرِينَ مُلْحَقٌ.

বাংলা উচ্চারণ

আল্লাহুম্মাগ ফিরলানা ওয়ালিল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাত, ওয়াল মুসলিমিনা ওয়াল মুসলিমাত, ওয়া আল্লিফ বাইনা কুলুবিহিম, ওয়া আসলিহ জাতা বাইনিহিম, ওয়াংসুরহুম আলা আদুওয়িকা ওয়া আদুওয়িহিম, আল্লাহুম্মাল আন কাফারাতা আহলিল কিতাবিল্লা জিনা ইয়াসুদ্দুনা আন সাবিলিকা, ওয়া ইউকাজজিবুনা রুসুলাকা, ওয়া ইউকাতিলুনা আওলিয়াআকা, আল্লাহুম্মা খালিফ বাইনা কালিমাতিহিম, ওয়া জালজিল আকদামাহুম, ওয়া আনজিল বিহিম বাসাকাল্লাজি লা তারুদ্দুহু আনিল কাওমিল মুজরিমিন, আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতায়িনুকা ওয়া নাসতাগফিরুকা ওয়া নুসনি আলাইকা ওয়ালা নাকফুরুক ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই-ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইইয়াকা নাবুদু ওয়া লাকা নুসাল্লি, ওয়া নাসজুদু, ওয়া লাকা নাসআ, ওয়া নাহফিদু, নাখশা আজাবাকালঝাদ্দা, ওয়া নারজু রাহমাতাক। ইন্না আজাবাকা বিল কাফিরিনা মুলহিক।’ 

বাংলা অর্থ

হে আল্লাহ, ক্ষমা করুন আমাদের এবং মুমিন নারী-পুরুষদের, আর মুসলমান নারী-পুরুষদের। তাদের অন্তরসমূহ জুড়িয়ে দিন আর তাদের মাঝে মীমাংসা করে দিন। তাদের সাহায্য করুন আপনার ও তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে। হে আল্লাহ, অভিসম্পাত বর্ষণ করুন কাফের সম্প্রদায়ের ওপর, যারা আপনার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং যারা অস্বীকার করে রাসুলদেরকে আর যুদ্ধবিগ্রহ করে ওলিদের সাথে। হে আল্লাহ, বিভেদ সৃষ্টি করে দিন তাদের ঐক্যের মাঝে এবং কম্পন সৃষ্টি করুন তাদের পদযুগলে আর নাজিল করুন এমন শাস্তি যা অপরাধী থেকে অপসারণ করা হয় না। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম, হে আল্লাহ, আমরা আপনার নিকট সাহায্য এবং ক্ষমা চাই, সকল মঙ্গল আপনার দিকেই ন্যস্ত করি। আপনার অকৃতজ্ঞ হই না। যারা আপনার নাফরমানি করে আমরা তাদের পরিত্যাগ করে চলি। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম, হে আল্লাহ, আমরা আপনারই দাসত্ব করি, আপনার জন্যে নামাজ পড়ি এবং  আপনাকেই সিজদাহ করি। আমরা আপনার দিকে দৌড়াই ও এগিয়ে চলি। আপনার কঠিন আজাবকে ভয় করি এবং রহমতের আশা রাখি আর আপনার আজাব তো কাফেরদের জন্যই র্নিধারিত। (বা্ইহাকি, হাদিস: ২৯৬২)

লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক

 

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ০৮:৫৪ পিএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ০৮:৫৪ পিএম
লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান
ছবি : সংগৃহীত

‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে শনিবার মুখরিত ছিল ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দান। সেখানে সমবেত হয় বিশ্বের ১৬০ দেশের ১৫ লাখের বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মক্কা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৪ বর্গমাইল আয়তনের এই আরাফাত ময়দান। এখানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেলাইবিহীন দুই খণ্ড সাদা কাপড় পরে হাজির ছিলেন হজযাত্রীরা। এ সময় আরাফাত ময়দানে হাজীযাত্রীরা তাসবিহ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের প্রার্থনা করেন। খবর বাসসের।

ইসলামী রীতি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নবম দিনটি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হলো হজ। শ্বেতশুভ্র পোশাকে আবৃত লাখ লাখ হজযাত্রী আরাফাত ময়দানের জাবালে রহমতের পাদদেশ ও মসজিদে নামিরার আশপাশে অবস্থান নিয়ে জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত হজ পালন করেন। জান্নাত থেকে বিতাড়িত মানবজাতির পিতা হজরত আদম (আ.) ও মাতা হজরত হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে দীর্ঘদিন একাকী ঘুরতে ঘুরতে এ আরাফাতের ময়দানে এসেই মিলিত হন। এই ময়দানে ‘রব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা লানাকুন্না মিনাল খসিরিন’- এ দোয়া পড়ার পর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। ১৪০০ বছরেরও আগে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এখানেই বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এ কারণে আরাফাতে উপস্থিত না হলে হজের আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণাঙ্গ হয় না। এখানে হজযাত্রীরা ফজর ছাড়াও এক আজান ও দুই ইকামতে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন।

শুক্রবার রাতেই অধিকাংশ হজযাত্রীকে মোয়াল্লিমরা গাড়িতে করে নিয়ে আসেন আরাফাতে নির্ধারিত তাদের তাঁবুতে। তবে অনেকে শনিবার সকালে আসেন। তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। 
আরাফায় অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে হজের মূল খুতবা দেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ মাহের বিন হামাদ আল-মুআইকিলি। 

মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধানকারী জেনারেল প্রেসিডেন্সি বিভাগ জানায়, এ বছর আরাফার ময়দান থেকে প্রচারিত হজের খুতবার অনুবাদ প্রচারিত হয় বিশ্বের ৫০টি ভাষায়। এবারে হজের খুতবার বাংলা অনুবাদের দায়িত্বে ছিলেন সৌদি আরবে অধ্যয়নরত বাংলাদেশের চার শিক্ষার্থী ড. খলীলুর রহমান, আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান মাক্কী, মুবিনুর রহমান ফারুক ও নাজমুস সাকিব। গত বছরও তারা এ দায়িত্বে ছিলেন। 

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে মাগরিব না আদায় করেই মুজদালিফার উদ্দেশে আরাফাত ময়দান ছাড়েন হজযাত্রীরা। সেখানে যাওয়া মাত্র মাগরিব ও এশা এক আজানে, দুই ইকামতে আদায় করেন। এরপর মুজদালিফায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে মাথা খোলা অবস্থায় রাত্রি যাপন করেন হজযাত্রীরা। আজ রবিবার তারা মুজদালিফার মিনায় প্রতীকী ‘শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের' জন্য নুড়ি সংগ্রহ করবেন। এ জন্য পুরো মুযদালিফাজুড়ে বিশেষ ধরনের ছোট ছোট পাথর ছড়িয়ে রাখা হয়। 

প্রতিবছরের মতো এবারও হজের দিন ভোরে কাবা আচ্ছাদিত করা হয় নতুন চাদরে।

প্রসঙ্গত, গত বছর সৌদি আরবে ১৮ লক্ষাধিক লোক হজ পালন করেন। যাদের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশী।

 

 

তাকবিরে তাশরিক কী, কেন ও কখন পড়তে হয়?

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ০১:১৮ পিএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ০১:২০ পিএম
তাকবিরে তাশরিক কী, কেন ও কখন পড়তে হয়?
মসজিদে হারামে নামাজ পড়ছেন মুসল্লিরা। ছবি : হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয়

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজ থেকে ১৩ তারিখ আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর তাকবির বলতে হয়। একে তাকবিরে তাশরিক বলে। এ সময়ে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার বলা ওয়াজিব। তিনবার বললে সুন্নতের সওয়াব পাওয়া যায়। পুরুষরা উচ্চৈঃস্বরে এবং নারীরা নিচুস্বরে বলবে। (হেদায়া, ১/২৭৫)

ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়া হোক বা একাকী, ওয়াক্তের মধ্যে পড়া হোক বা কাজা, নামাজি ব্যক্তি মুকিম হোক বা মুসাফির, শহরের বাসিন্দা হোক বা গ্রামের—সবার ওপর ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। ফরজ নামাজের পর তাকবির বলতে ভুলে গেলে, স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকবির পড়ে নেবে। (দুররে মুখতার, ২/১৮০)

তাকবিরে তাশরিকের বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

তাকবিরে তাশরিকের বাংলা অর্থ
আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, তিনি ছাড়া সত্যিকার আর কোনো উপাসক নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আর সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁরই জন্য। (দারু কুতনি, ১৭৫৬)

যেভাবে এলো তাকবিরে তাশরিক
তখন ইবরাহিম (আ.) ছেলে ইসমাইল (আ.)-কে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গলায় ছুরি রাখলেন। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নবি ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য পরীক্ষা। তিনি এ পরীক্ষায় পাস করলেন। আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-কে একটি দুম্বা নিয়ে ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। জিবরাইল (আ.) ছুটলেন দুনিয়ার দিকে। জিবরাইল (আ.) আশঙ্কা করছিলেন, তিনি যেতে যেতেই ইবরাহিম (আ.) ছেলেকে জবাই করে বসবেন। তিনি আসমান থেকে আওয়াজ করে বললেন, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার।’ ইবরাহিম (আ.) আওয়াজ শুনে আসমানের দিকে তাকালেন। দেখলেন জিবরাইল আসছেন দুম্বা নিয়ে। তিনি আনন্দে আওয়াজে বললেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।’ পিতার কণ্ঠে এ কথা শুনে ইসমাইল (আ.) উচ্চারণ করলেন, ‘আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ তাদের এ কথা আল্লাহর পছন্দ হয়। তিনি মুসলিমদের জন্য এই বাক্যমালা আইয়ামে তাশরিকে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পড়াকে আবশ্যক করে দেন। এটি পড়া ওয়াজিব। (ফাতাওয়ায়ে শামি, ২/১৭৮, ইনায়া শরহুল হিদায়া, ১/৪৬৪)

তাকবিরে তাশরিকের ফজিলত
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যেন তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৮)। বিখ্যাত সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এখানে ‘নির্দিষ্ট দিন বলতে ‘আইয়ামে তাশরিক’ ও ‘আল্লাহর স্মরণ’ বলতে তাকবিরে তাশরিক বোঝানো হয়েছে। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই দিনগুলোতে তাকবিরে তাশরিকের আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল উত্তম নয়...। ’ (বুখারি, হাদিস: ৯৬৯)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

 

মিনায় গমন, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:৪৭ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:৪৭ এএম
মিনায় গমন, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৪ জুন)। আজ ভোরে ইহরামের কাপড় পরে তাঁবুর শহর মিনায় গমনের মাধ্যমে পাঁচ দিনের হজ কার্যক্রম শুরু হবে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকেই হজযাত্রীদের মিনায় নেওয়া শুরু করেছেন অনেক মুয়াল্লেম। এশার নামাজের পর মক্কার নিজ নিজ আবাসন থেকে মিনার উদ্দেশে রওনা হন হাজিরা। 

আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র হজ। এদিন ভোররাতে মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হবেন হাজিরা। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে হজযাত্রীরা সৌদি আরব পৌঁছেছেন। এবার বাংলাদেশসহ ১৮০টির বেশি দেশের প্রায় ২০ লাখ মুসল্লি হজ পালন করবেন। বাংলাদেশ থেকে হজ পালন করবেন ৮৫ হাজার ২৫৭ জন। 

মিনায় পৌঁছে হাজিরা আজ ফজর থেকে শুরু করে এশা অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন নিজ নিজ তাঁবুতে।

৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিনকেই হজের দিন বলা হয়। এ দিনের নাম ইয়াওমুল আরাফা। আগামীকাল ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর হাজিদের আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার রাতেই নিয়ে যাবেন মুয়াল্লিমরা। সেখানে আগে পৌঁছে গিয়ে ফজর, জোহর-আসর আদায় করবেন আরাফাতের ময়দানে।

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা চলে পাঁচ দিন। তার মধ্যে আরাফাতের দিবসকে ধরা হয় মূল হজ হিসেবে। মিনা থেকে ৯ জিলহজ শনিবার ভোর থেকেই হজযাত্রীরা ‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হবেন। তাদের সমস্বরে উচ্চারিত ‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হবে আরাফাতের আকাশ-বাতাস। দুপুরে হজের খুতবা শুনবেন তারা। তারপর এক আজানে হবে জোহর ও আসরের নামাজ। সূর্যাস্তের পর হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে যাত্রা করবেন মুজদালিফার পথে। সেখানে আবার তারা এক আজানে আদায় করবেন মাগরিব ও এশার নামাজ। এ রাতে মুজদালিফায় তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করবেন।

এ সময় তারা মুজদালিফা থেকে পাথর সংগ্রহ করবেন জামারায় প্রতীকী শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য। এরপর শনিবার সকালে সূর্যোদয়ের পর জামারায় প্রতীকী বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন হজযাত্রীরা। এরপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করবেন। কোরবানি করে মাথা মুণ্ডন করবেন। এহরাম খুলে পরবেন সাধারণ পোশাক। এরপর কাবাঘর তাওয়াফ করবেন। সাফা-মারওয়ায় সাতবার সাঈ (চক্কর) করবেন। পরে আবার ফিরে যাবেন মিনায়। এরপর দিন এবং তারপর দিন অর্থাৎ টানা দুদিন দ্বিতীয় ও ছোট শয়তানকে পাথর মারার মধ্য দিয়ে হাজিরা শেষ করবেন হজের আনুষ্ঠানিকতা। 

ঈদুল আজহায় করণীয়-বর্জনীয়

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০৭:১১ পিএম
ঈদুল আজহায় করণীয়-বর্জনীয়
ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া আবশ্যক। ছবি : ফ্রিপিক

কোরবানির দিন বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কোরবানির দিন। এরপর এর পরের তিন দিন।’ (আবু দাউদ, ১৭৬৫)। এই কোরবানির দিনে কিছু করণীয়-বর্জনীয় রয়েছে। এখানে সেগুলো তুলে ধরা হলো—

  • খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা।
  • মিসওয়াকসহ অজু করে ভালোভাবে গোসল করা। 
  • যথাসাধ্য উত্তম পোশাক পরা। 
  • শরিয়তসম্মত সাজসজ্জা গ্রহণ করা।
  • আতর কিংবা অ্যালকোহলমুক্ত সুগন্ধি ব্যবহার করা। 
  • কোরবানির ঈদে নামাজের আগে কোনো কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। নামাজের পরে প্রথমে কোরবানি করা পশুর গোশত খাওয়া সুন্নত। (তিরমিজি, ৫৪৫)
  • সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া। ঈদুল আজহার নামাজ ঈদুল ফিতরের নামাজের তুলনায় আগে আগে পড়া ভালো। 
  • পুরুষ হোক বা নারী, সবার জন্য ঈদের নামাজের আগে কোথাও কোনো ধরনের নফল নামাজ না পড়া এবং নামাজের পর ঈদগাহেও না পড়া। 
  • ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া। (বুখারি, ৯৬৫)
  • রিকশা, ভ্যান, ঘোড়া, উট বা অন্য কোনো কিছুতে চড়ে ঈদগাহে না যাওয়া; বরং হেঁটে যাওয়া ভালো। তবে ফেরার পথে কোনো কিছুতে চড়ে ফিরলে তাতে দোষের কিছু নেই। (তিরমিজি, ১২৯৫)
  • ঈদগাহে যাওয়ার সময় মধ্যমপন্থায় উচ্চ শব্দে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা। তাকবিরে তাশরিক হলো—
    বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ্। 
  • সম্ভব হলে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া, আরেক রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা। (বুখারি, ৯৮৬)
  • ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করা, বেশি বেশি সদকা করা, আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিনন্দন গ্রহণ করা মুস্তাহাব। (ফাতহুল কাদির, ২/৫১৭)
  • ঈদের দিন একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে শুভেচ্ছা বাক্য বলা। এরকম বলা যেতে পারে— বাংলা উচ্চারণ: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।’ বাংলা অর্থ: আল্লাহ কবুল করুন আমাদের এবং আপনার পক্ষ থেকে।’ (বায়হাকি, ৩/৪৪৬) 
  • ঈদের দিনকে খেলাধুলা, অহেতুক ও অবৈধ বিনোদন এবং পাপাচারে পরিণত না করা।

লেখক: গবেষক