ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

একাত্তরের কিশোর গেরিলা জামি

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৪, ১২:১৬ পিএম
একাত্তরের কিশোর গেরিলা জামি
১৯৭১ সালের নভেম্বরে অপারেশনে যাওয়ার আগে সহযোদ্ধা জামি, টুনি, বাবলু, ইফু, ওমরদের সঙ্গে কমান্ডার বাচ্চু ভাই পরিকল্পনা করে নিচ্ছেন

তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানান আলামতে টের পাওয়া যাচ্ছিল, ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আগে থেকেই বুঝতে পেরে গড়ে উঠল ঢাকায় প্রথম গেরিলা গ্রুপ। দুর্ধর্ষ সেই গেরিলা গ্রুপে ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। নাম তার জামি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েছেন পাকিস্তানিদের হাতে, বন্দি ছিলেন দীর্ঘ সময়, ভোগ করেছেন অসহনীয় নির্যাতন, সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখী হয়েও একসময় মুক্তিও পেয়েছিলেন। আর মুক্তি পাওয়া মাত্রই দেশপ্রেমিক এই তরুণ ছুটলেন রণাঙ্গনে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তপন দেবনাথ

ডাক নাম জামি। পুরো নাম জাহিদুল ইসলাম মাহমুদ। পৈতৃক নিবাস বরিশাল মুসলিম গোরস্থান রোড। বাবা ছিলেন বরিশাল বিএম কলেজের বাংলার শিক্ষক রফিক। জামির জন্ম ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি। বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন পাঠশালায় লেখাপড়া শুরু। তৃতীয় শ্রেণিতে এসে ভর্তি হলেন বিএম স্কুলে। ১০ বছর বয়সে বরিশাল থেকে চলে এলেন ঢাকায়। ভর্তি হলেন ঢাকার সেগুনবাগিচা স্কুলে। এই স্কুল থেকেই এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর এইচএসসিতে ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে। আর ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময়ই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে, কিন্তু তার আগেই ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানান কার্যকলাপে অনেকেই বুঝে ফেলেন, মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন। আর এই বুঝতে পারা কিছু তরুণ ফেব্রুয়ারি মাসেই ঢাকায় গড়ে তুললেন দুর্ধর্ষ এক গেরিলা বাহিনী। এই দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনীর এক সদস্য হলেন জামি।

১৯৭১ সালের নভেম্বরে অপারেশনে যাওয়ার আগে কমান্ডার বাচ্চুর সঙ্গে জামি

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মাধ্যমে এ দেশের সংস্কৃতি ধ্বংসের যে পরিকল্পনা করেছিল পশ্চিম পাকিস্তান, বাঙালিরা সেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। নানাভাবে বাঙালিরা এর প্রতিবাদ করে গেছে। জামি জানাচ্ছেন-
‘১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। সকাল ১০টার সময় আমরা ৭-৮ জন মিলিত হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে। আমাদের লক্ষ্য বি.এন.আর (Bureau of National Reconstruction) যেটা কার্জন হলের পূর্ব দিকে, সেখানে ডা. হাসানুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে আরবি হরফে বাংলা লেখার গবেষণা চলছে। আমি তখন ঢাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রের জবাবে বি.এন.আর ভবন আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয় এবং আমাদের মাতৃভাষার ওপর কোনো আঘাত আমরা সহ্য করব না বলে সিদ্ধান্ত নেই। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে সেটাই ছিল আমাদের চরম বার্তা। বেলা ১১টার দিকে আমরা ছয়জন কার্জন হলের সামনে দিয়ে হেঁটে রাস্তা পেরিয়ে বি.এন.আর ভবনে প্রবেশ করি। অভিযানের যিনি নেতৃত্বে ছিলেন তিনি বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে আমরা একসঙ্গে পেট্রোল এবং দেশি বোমা চার্জ করি। প্রচণ্ড শব্দে আটটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। পুরো ভবনে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। অপারেশন শেষে আমাদের মধ্যে খান নামে একজন বোমা বিস্ফোরণে ভীষণভাবে আহত হয়। তার সারা শরীরে রক্ত ঝরছিল। তোপখানা রোডের কোনায় বর্তমান বৈদেশিক মন্ত্রণালয়, প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে ছিল। সেখান থেকে অনেক পুলিশ দৌড়ে আসছে। তক্ষুনি আমি খানকে উঠিয়ে রাস্তার একটা রিকশা নিয়ে কার্জন হলের সীমানার মধ্যের রাস্তা ধরে শাহবাগের রাস্তা ধরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছেলেমেয়ে অবাক বিস্ময়ে আমাদের দেখছিল। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এমন গেরিলা আক্রমণ হয়নি। শাহবাগের সামনে থেকে রিকশা বদলিয়ে বেবিট্যাক্সি নেই। আমি জানি হাসপাতালে গেলে বিপদ। তাই আমার নিজের এলাকা পল্টনে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার দেখে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে বলল। নিয়ে গেলাম সোজা হলিফ্যামিলি হাসপাতালে। স্ট্রেচারে করে খানকে যখন ভিতরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি ওই বেবিট্যাক্সিতে বের হচ্ছিলাম, পুলিশের জিপ তখন সেখানে ঢুকছিল।’

এরপর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান সংসদ বাতিলের ঘোষণা দিলে সে রাতেই জামি, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুসহ কয়েকজন গেরিলা মিলে সচিবালয়ে বোমা চার্জ করে এক্সটেনশন ভবনের ছাদ গুঁড়িয়ে দেন। এরপর ৭ মার্চ, রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার না করায় সন্ধ্যায় জিপে করে রেডিও স্টেশনের ভেতরে বোমা ছোড়েন জামিরা। ২৭ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে সংগ্রহ করা আটটি রাইফেল, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত চারটি বন্দুক নিয়ে জামি, শহীদ মানিক, নাসিরউদ্দিনে ইউসুফ বাচ্চু, আলী আফসার, নাট্যশিল্পী আসাদ, টুনিসহ গেরিলা গ্রুপটি বুড়িগঙ্গার ওপারে কোনাখোলায় ক্যাম্প স্থাপন করে। ১ এপ্রিল গানবোটের সাহায্যে এবং এয়াররেইড করে পাকিস্তান সৈন্যরা জামিদের ক্যাম্প আক্রমণ করে। এই আক্রমণে টিকতে না পেরে জামিরা দলের কিছু গেরিলাকে কলাতিয়া বাজারে রেখে ও অস্ত্র দিয়ে, মাত্র আটটি বন্দুক নিয়ে গভীর রাতে কার্ফুর মধ্যে ঢাকায় ফেরেন।

এপ্রিল মাসে টুনি ও আলী আফসারসহ মাদারীপুর যান জামি। মাদারীপুর সদর থেকে ১০-১২ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের একটি গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য কৃষকদের সংগঠিত করেন। ২৪ এপ্রিল মাদারীপুর থেকে ঢাকায় রওনা দেন। একাত্তরের মে মাসে জামি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ছেলে মিতু, আলী আফসার ও টুনি বঙ্গভবনের ভেতরে হাতবোমা ছুড়ে ঢাকা শহরে মারাত্মক আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এই আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছিল কৌশল। যাতে পাকিস্তানিরা বাইরের বিশ্বকে দেশের ভিতরে চলা যুদ্ধাবস্থাকে আড়াল করতে না পারে। এরপর আজিমপুরের পাক আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে বোমা চার্জ করেন জামি ও তার দল। ২৪ মে শান্তিকমিটির মিছিলে যে গাড়িতে চড়ে বোমা চার্জ করেন- যদিও সে বোমা বিস্ফোরিত হয়নি, তবে সেই গাড়ির চালক ধরা পড়ে যান পাকিস্তানিদের হাতে। সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু জামিসহ প্রায় সবার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। আত্মগোপনে চলে যান জামি।

এর মধ্যেই পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় জামিদের বাড়িতে পুলিশ ও আর্মির হামলা হয়। জামিরা তখন থাকতেন শান্তিনগরে শিল্পাচার্জ জয়নুল আবেদিনের পাশের বাড়িতে। সেনাবাহিনীর ভয়ে মাত্র তিন দিনের নোটিসে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয় বাড়িওয়ালা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বোন, সাত ও ১৪ বছর বয়সী দুই ভাই নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান জামির মা। জামির বড়ভাই মনিরুল ইসলাম মণি তখন বরিশালে আর মেজো ভাই মঈদুল ইসলাম চুনি তখন আগরতলার মেলাগড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণরত ছিলেন।

জামিলের এক বন্ধু বাবুলের বাবা ছিলেন আনসারের কর্মকর্তা। বন্ধুর বাবার অফিসিয়াল পিস্তল গেরিলা যুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য বাবুলকে নিয়ে খিলগাঁও সরকারি কোয়ার্টারে যান জামি। কিন্তু গেট দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আর্মির হাতে ধরা পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বাবুল দৌড়ে পালিয়ে যান। জামি ও এমরান বন্দুকসহ পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়েন।

সেগুনবাগিচায় মিলিটারি পুলিশ ক্যাম্পে টানা পাঁচ দিন জানালার শিকের সঙ্গে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয় জামিকে। এর মধ্যে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জামিসহ ছয়জনকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। রাতে ১১তম ইঞ্জিনিয়াঙের কোয়ার্টার গার্ডে সারা রাত নির্যাতনের পর সকালে বন্দিদের নিয়ে যাওয়া হয় জয়দেবপুর রাজবাড়িতে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের পরিত্যক্ত আবাসস্থানের বন্দিশিবিরে। ওখানে প্রায় ২০০ বন্দি ছিল। কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

জামি জানিয়েছেন-
‘প্রত্যেকি দিন সকালে কাজ করার জন্য বের করত, বাথরুমে নেওয়ার সময় ১০ জনের এক একটা লাইন দিতে হতো। তারপর ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে অথবা ডিগবাজি খেতে খেতে বাথরুমে যেতে হতো। যারা পিছিয়ে থাকত তাদের পিঠের ওপর লাঠির বাড়ি পড়ত।’

দুই মাস এরকম নির্যাতন শেষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জামিকে ঢাকার ইন্টেলিজেন্সের হেড কোয়ার্টারে নিয়ে আসে মেজর সাইফুল্লা খান। জামি জানান- ‘এখানে টিফিন ক্যারিয়ারের হাতলসহ একটি বাটি সবার জন্য বরাদ্দ থাকত। ওরা এটাকে মিস্টিন বলত। এর মধ্যে দুপুরে এবং বিকেলে একটু জাউ ভাত এবং লবণ ছাড়া সেদ্ধ ধুন্দুল দিত। ওই বাটি নিয়েই বাথরুমে যেতে হতো। ওই উল্টিয়ে মাথার নিচে দিয়ে ঘুমাতে হতো। গুদামের মধ্যেই রাত্রিকালীন বাথরুম ছিল। নবাবপুর স্কুলের নির্মল মাস্টারকে দিয়ে পায়খানা-প্রশ্রাব পরিষ্কার করানো হতো। অত্যাচারে নির্মল স্যার পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।’

জামিসহ বন্দি ৩০ জনের কোর্ট মার্শাল শুরু হয়। বিচার শেষে জামিদের জেলে পাঠানো হয়। জেলে জামির সঙ্গে দেখা হয় রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ইকবাল আহমেদ, আগরতলার আসামি শামসুল হক, ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে ধরে আনা হাজী মোর্শেদ, হামিদুল হক চৌধুরীর নাতি আরিফুর ইসলামসহ অসংখ্য দেশপ্রেমিকের।

ইয়াহিয়া খানের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার অভিনব কৌশল হিসেবে ২৫ অক্টোবর জেল থেকে বেশকিছু বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। গেরিলা জামি মুক্তি পান। তবে শর্ত ছিল সপ্তাহে এক দিন আর্মি হেড কোয়ার্টারে হাজিরা দিতে হবে।

জেল থেকে বেরিয়েই গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জামি। এবং আবার গেরিলা দলে যোগ দিয়ে বিজয়ের আগ পর্যন্ত অনেকগুলো লড়াইয়ে অংশ নেন।

জাহ্নবী

টিনএজার উৎপত্তি ইতিহাস যত্ন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩৭ পিএম
টিনএজার উৎপত্তি ইতিহাস যত্ন

টিনএজার বা কিশোর-কিশোরীরা তো চিরকালই ছিল। ছিল না শুধু তাদের টিন টাইটেলটা। কবে থেকে তারা টিন টাইটেল পেল তা নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে! জানাচ্ছেন সুলতানা লাবু

টিনএজ বা কিশোর শব্দের উৎপত্তি 

কিশোর-কিশোরী বা টিনএজার শব্দটির আবিষ্কার ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। তবে কিশোর শব্দটি পরিচিতি পেতে সময় লেগেছে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু কিশোর বা টিনএজাররা পরিপূর্ণ পরিচিতি পেয়েছে তারও বেশ কয়েক বছর পর। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের শিক্ষা, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির সংমিশ্রণেই আবির্ভাব ঘটেছিল টিনএজারদের। যদিও কেউ কেউ মনে করেন কিশোর শব্দটি সতেরো শতক থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে।

কী করে তারা টিনএজার উপাধি পেল? আর কেনই বা তাদের আলাদা করা হলো?
এর পেছনে একটি গল্প আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোয় বড় ধরনের এক পরিবর্তন ঘটেছিল। তখন ছোট ছোট শহরগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক পরিবার চলে আসে বড় বড় শহরে। পেছনে ফেলে আসে তাদের পারিবারিক খামারবাড়িগুলো। যেখানে শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক সবাই একসঙ্গে খামারে কৃষিকাজ করত। কিন্তু বড় বড় শহরে এসে তারা যখন বসবাস শুরু করল তখন তারা উপলবব্ধি করতে পারল যে তারা শৈশব-কৈশোরের বিলাসিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ১৬, ১৫, ১৪ এমনকি  ১৩  বছর বয়সেও তাদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা মহিলাদের সঙ্গে কৃষিকাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু শহরে তা করতে হচ্ছে না। কারণ ততদিনে আমেরিকায় শিল্পায়নের অগ্রগতি হয়েছে। তাই কিশোর-কিশোরীদের আর কৃষিকাজ করতে হয় না। কিংবা কারুশিল্প শিখে মেকানিক্যাল কোনো কাজ করে তাদের উপার্জন পরিবারকে দিতে হয় না। কিশোর-কিশোরীরা তাহলে করবেটা কী? যেহেতু সেটা যুদ্ধ-পরবর্তী সময় ছিল, সেহেতু তারা তখন যুক্ত হতে থাকল যুদ্ধফেরত কিশোর ও বিপথগামী যুবকদের সঙ্গে। তাদের আচরণ উগ্র থেকে উগ্র হতে শুরু করল। ১৯৪৩ সালে তো আমেরিকান টিনএজারদের সবাই ভয়ই পেত। সবার কাছে তারা বিদ্রোহী হিসেবেই পরিচিত ছিল। এ সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যেও। শুধু আমেরিকাতেই নয়, কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে পুরো ইউরোপেই ভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৯৩৩ সাল থেকেই। তাদের আচার-আচরণের নানা দিক নিয়ে তখন থেকেই আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছিল। মনোবিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে নানাজন নানা গবেষণায় নেমে পড়ল তাদের নিয়ে। যারা যুদ্ধে গিয়েছিল কিশোর বয়সে আর ফিরে এসেছিল প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তারাও যোগ দিয়েছিল কিশোরদের সংরক্ষণের কাজে। সবার প্রথমে লেখাপড়া তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হলো। সেই সঙ্গে নির্ধারণ হলো কিশোর-কিশোরীদের বয়সসীমা। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের এই দলে ফেলা হলো। ইংরেজি ১৩ (থারটিন) থেকে ১৯ (নাইনটিন) এই সংখ্যাগুলোর শেষে টিন আছে বলে এই বয়সীদের নাম দেওয়া হয় টিনএজার।

স্বীকৃতি পাওয়া প্রথম টিনএজার

১৯৪৫ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘এ টিনএজ বিল অব রাইটস’ নামে একটি স্মারক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে টিনএজারদের অধিকার, স্বাধীনতা, আচরণ নিয়ে মোট ১০টি পয়েন্টে ভাগ করা হয়। এর পর পরই টিনএজারদের অধিকার ও যত্নের বিষয়টি আরও বেশি নজরে আসে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের। টিনএজারদের জন্য নানারকম পোশাক, জুতা, প্রসাধন ইত্যাদির বিজ্ঞাপন শুরু করে ব্যবসায়ীরা। পণ্যব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ব্যবসা ভালো চলতে লাগল বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোরও। ১৯৫০ সালে এসে আমেরিকার ছোট মেয়েরা বিখ্যাত পুলড স্কার্ট এবং বেবি সক্স পরতে শুরু করে। ছোট ছেলেরা পরতে শুরু করে চিনোস পোশাক এবং ব্রিল ক্রিম। এরাই ছিল সত্যিকার অর্থে টিনএজার স্বীকৃতি পাওয়া প্রথম কিশোর-কিশোরী বা টিনএজার।

অধিকার আদায়ে টিনএজারদের সহযোগিতা করা ও পাশে থাকা


এই সেতু পেরোনোর সময়টা শুধু টিনএজারদের জন্যই কঠিন নয়, কঠিন তাদের বাবা-মায়ের জন্যও। তবে বুদ্ধিমান বাবা-মায়ের জন্য বিষয়টা কঠিন নয়। যেমন, একজন আমেরিকান টিনএজার তার মায়ের কাছে অনুমতি চাইল, সে তার বন্ধুদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাবে। সারা দিন বন্ধুদের নিয়ে অনেক মজা করবে। মা জানেন, বন্ধুরা মজা করতে গিয়ে তার ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড করবে। তাহলে মা তখন কী করবেন? অনুমতি দেবেন! নাকি বাধা দেবেন। যেহেতু মজা করার অধিকার তার আছে তাহলে বাধা তো দেওয়াই যাবে না। অনুমতি দিতেই হবে। তবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সে অনুমতি দিতে হবে। মা বলবেন, ‘অবশ্যই বন্ধুরা আসবে। অনেক মজা করবে। তবে ঘরবাড়ি এলামেলো করা চলবে না। আর নিজেদের মজা করার জন্য যাতে অন্য কারও অসুবিধা না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা তোমার এবং তোমার বন্ধুদের কর্তব্য। তোমার বন্ধুদের জন্য আমি বিশেষ কোনো খাবারের ব্যবস্থা করব কি?’ এরকম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই টিনএজারদের পাশে থাকতে হবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে।

শুধু তাদের আনন্দ করার অধিকারে পাশে থাকলেই চলবে না। তাদের সব ধরনের অধিকারেই পাশে থাকতে হবে। যেমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। ভুল করার অধিকার। অনেকে মনে করেন ভুল করা আবার অধিকার হয় কী করে? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, টিনএজারদের অবশ্যই ভুল করার অধিকার রয়েছে। তাদের ভুল করতে দিতে হবে। কারণ ভুলের মাধ্যমেই সে নিজেকে আবিষ্কার করতে শিখবে। আর ভুল করতে না দিলে বড় হয়ে বড় বড় ভুল করবে। এবং ভুল সিদ্ধান্তে নিয়ে জীবনে অনেক কষ্ট ভোগ করবে। টিনএজারদের তারা যত্নের সঙ্গে লালন পালন করে। কারণ এরাই ভবিষ্যতের সম্পদ। তারাই একদিন নেতৃত্ব দেবে। আরও সফলভাবে এই ভবিষ্যৎ সম্পদকে রক্ষার জন্য বর্তমানে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের তারা প্রি-টিন উপাধি দিয়েছে। কারণ এ সময় থেকেই অনেকের বয়ঃসন্ধির লক্ষণগুলো শুরু হয়ে যায়। পুরো বিশ্ব এখন টিনএজারদের যত্ন নিচ্ছে। আমরাও আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পদ রক্ষার জন্য আমাদের টিনএজারদের যত্ন নেব।

টাইটেল পাওয়ার আগে টিনএজাররা কোন দলে ছিল? 

শব্দের ব্যবহার যেদিন থেকেই হোক না কেন বিশ শতকের আগে তারা টিন উপাধিটি পায়নি। তখনই টিনএজারদের আলাদা করা হয়েছিল। আর এই আলাদা করার ফলে তারা শিশু এবং বড়দের মধ্যে একটা সেতু তৈরি করেছে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সেতুর তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব হয়। তার আগে টিনএজারদের কেউ কেউ ছিল শিশুদের দলে। কেউবা আবার বড়দের দলে। কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক গঠন বা সক্ষমতা একটু বেশি হলেই তারা পড়ে যেত বড়দের দলে। বড়দের সঙ্গে বড়দের মতো নানা কাজ করতে হতো।  

টিনএজ বয়স কেন গুরুত্বপূর্ণ

আলাদা করার পর থেকেই টিনএজারদের নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। শুরু হয় টিনএজারদের জন্য মুভি, নানারকম ফ্যাশনের জিনিস, খেলাধুলা ইত্যাদি।

মনোবিজ্ঞানীরা খুঁজে বের করলেন, কেমন হওয়া উচিত কিশোর-কিশোরীদের আচরণ? তাদের সঙ্গেই বা অন্যরা কেমন আচরণ করবে? টিনএজ বয়সে তাদের মনের কী কী পরিবর্তন হতে পারে? স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরাও থেমে থাকেননি। তারাও নানা গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করলেন টিন বয়সীদের শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তনের সামঞ্জস্য। তারা এর নাম দিয়েছিলেন বয়ঃসন্ধিকালীন বয়স। এই সময়টি তাদের জন্য একটি বিশেষ সময়। টিন-এ প্রবেশ করে তারা শৈশবের ইতি টানছে। আর টিন পেরোলেই যোগ দেবে বড়দের দলে। এই সময় যেহেতু তাদের শরীরিক পরিবর্তন ঘটে, সেহেতু মনেরও অনেক রকম পরিবর্তন ঘটে। তাই তাদের শরীর এবং মনের ওপর দিয়ে বিশাল এক ঝড় ও চাপ বয়ে যায়। তাদের জন্য এটি একটি সেতু।

জাহ্নবী

পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৬ পিএম
পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে

পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে নামলেন সাইফুল ইসলাম শান্ত। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণে বের হন তিনি। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৯৩টি দেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা আছে তার। ঢাকা থেকে হাঁটা শুরু করে যশোর-বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে যাবেন কলকাতা। এরপর ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ হয়ে পৌঁছাবেন দিল্লি। তারপর উজবেকিস্তান। সেখান থেকে মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান ঘুরে যাবেন মঙ্গোলিয়া। সেখান থেকে রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এশিয়ার বাকি দেশগেুলো ঘুরবেন। এশিয়া ঘোরা শেষ করে যাবেন আফ্রিকা। তারপর ইউরোপ। ইউরোপের পর উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের পর যাবেন অ্যান্টার্কটিকায়। সেখানেই তাঁর বিশ্ব ভ্রমণের ইতি টানবেন। এবং এ পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনা।

শান্তকে সহায়তা করছে বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন। কেন এই পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ? জবাবে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরেক বিখ্যাত পর্যটক যিনি সত্তরটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন, তিনি জানান, ‘ভ্রমণের সময় যখন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন সব কিছু অনেক বেশি উপভোগ করা যায়। শেখা যায়, জানা যায় অনেক বেশি। হেঁটে ভ্রমণ সব সময়ই আনন্দের। আমাদের দেশে অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেল তুলনামূলক কম হয়। তাই বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশের যে কোনো অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলের পাশে থেকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে চায়। আমরা এটাও চাই, কেউ অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলে আরও আগ্রহী হোক এবং তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখুক। এতে সবাই জানতে পারবে এবং ভ্রমণে অনুপ্রাণিত হবে।’

বিশ্বভ্রমণের চিন্তা কিন্তু অনেক আগে থেকেই ছিল শান্তর। সে কারণে নিজেকে তৈরিও করছিলেন কয়েকবছর ধরে। ২০২২ সালে ৭৫ দিনে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার তিন হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেন পায়ে হেঁটে। এ সময় তিনি প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪২ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতেই সচেতনতা তৈরির জন্য তিনি কিছু বিষয়ের উপর জোর দিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে জীবন বাঁচাতে রক্তদান, প্লাস্টিক ব্যবহারে সতর্কতা এবং বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ওই সময় স্কুলকলেজে গিয়ে এসব নিয়ে কথা বলার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তখন স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। সে কারণে সচেতনতার কাজটি করতে পারেননি ঠিক মতো। তবে ভ্রমণের সময় প্রতিটি জেলার মাটি সংগ্রহ করেছেন। সেই থেকে তিনি ‘হাঁটাবাবা’ হিসেবে পরিচিতি পান।

এ ছাড়া ওই বছরেই তিনি ৬৪ দিনে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার হেঁটে বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ভারতের সান্দাকফু ও দার্জিলিং ভ্রমণ করেন। তাঁর হাঁটাহাটির শুরু ২০১৬ সাল থেকে। ২০১৮ সালে বান্দরবানের আলীকদম হয়ে বাড়ি ফেরেন ১০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে।  কিন্তু এই বিশ্বভ্রমণের বিশাল খরচ কিভাবে মেটানো হবে, সেটার কথাও জানিয়েছেন শান্ত। হেঁটে বিশ্বভ্রমণ হলেও থাকা-খাওয়ার জন্য খরচ তো আছে। সেই খরচের টাকা তিনি স্পন্সরের মাধ্যমে জোটাবেন। এবং এর মধ্যেই হাজার খানেক ডলারও পেয়েছেন।

এ ভ্রমণ শেষ করতে তাঁর বারো বছরের বেশি সময় লাগবে। অর্থাৎ তিনি ২২ বছরের তরুণ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন। আর যখন বিশ্বভ্রমণ শেষ হবে তখন তিনি ৩৪ বছরের যুবক হয়ে যাবেন।

শান্তর প্রয়োজনীয় জিনিস থাকবে তার পিঠে থাকা প্রায় ২৫ কেজি ওজনের ব্যাগের মধ্যে। তবে একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বিশ্বভ্রমণে যাচ্ছেন শান্ত। সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে শান্ত বলেন, ‘আমার এই বিশ্বভ্রমণের স্লোগান হচ্ছে “গাছ বাঁচান, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনুন”। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সমগোত্রীয় দেশগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আমি এটিকে আমার বিশ্বভ্রমণের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করেছি। আর তাই ভ্রমণের সময় বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কমিউনিটি ও স্কুল-কলেজে পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো এবং গাছ সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।’

সাইফুল ইসলামের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম এবং মায়ের নাম করুণা বেগম। তাদের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সাইফুল মেজো সন্তান। তিনি ঢাকার দনিয়া কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করেন মো. ওসমান গনি। পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ইরান তারপর দীর্ঘ ৭ বছরে একের পর এক ২২টি দেশ ও ২১ হাজার মাইল পথ পায়ে হেটে সফর করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববাসিকে।

 

আর্থার ব্লেসিত

আর্থার ব্লেসিত ছিলেন ধর্মপ্রচারক। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশ ও মানুষ বসবাসকারী প্রত্যেক দ্বীপে পা রাখার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করেন তিনি। ২০০৮ সালের ১৩ জুন তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছান। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখান ‘দীর্ঘ তীর্থ যাত্রী’ হিসেবে। তিনি পিা রাখেন ৩২১টা রাষ্ট্রে, যার মধ্যে দ্বীপ, অঞ্চল এবং এমন দেশও ছিল যেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং প্রায় ৫৪টা এলাকায় যদ্ধ চলছিল। সবমিলিয়ে তিনি ৩৮ বছর, পাঁচ মাস ২০ দিন হেঁটে অতিক্রম করেন ৬৫ হাজার ৩১৯ কিলোমিটার বা ৪০ হাজার ৫৮৭ মাইল পথ।


জাঁ বিলিভিউ

টানা এগার বছর ১ মাস ২৯ দিন হেঁটে ৭৫ হাজার কিলোমিটার বা ৪৭ হাজার মাইল পথ পাড়ি দেন জাঁ বিলিভিউ। ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট কানাডার মন্ট্রিয়ল থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তাঁর এই হাঁটার লক্ষ্য ছিল শিশুদের জন্য শান্তিপূর্ণ বিশ্ব। উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড হয়ে শেষে কানাডায় ফেরেন জাঁ।

টম টুরকিচ

পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণকারী টম টুরকিচ। ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল নিউ জার্সির হ্যাডন টাউনশিপের নিজের বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করে ২০২২ সালের ২১ মে যাত্রা শেষ করেন টুরকিচ। সাত বছর ১ মাস ২০ দিনে তিনি ৪৫ হাজার ৬১ কিলোমিটার বা ২৮ হাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফেরেন। একমাত্র অস্ট্রেলিয়া বাদে তিনি সবগুলো মহাদেশে পা রাখেন। ২০১৫ সালের আগস্টে টেক্সাসের অস্টিন থেকে একটি অস্ট্রেলিয়ান শেফার্ড কুকুর তার সঙ্গী হয়। তিনি কুকুরটা নাম রাখেন সাভানাহ। এরপর থেকে টুরকিচের ভ্রমণের পুরো সময়টা সাভানাহ ছিল তার ভ্রমণসঙ্গী। এর মাধ্যমে প্রথম কুকুর হিসেবে বিশ্বভ্রমণের গৌরব অর্জন করে সাভানাহ।


ফিয়োনা ক্যাম্পবেল


পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণকারীর মধ্যে তৃতীয় এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম ফিয়োনা ক্যাম্পবেল। ১৯৮৫ সালের ১৭ আগস্ট নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত হেঁটে যান। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি যানবাহন ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এরপর আবার হাঁটা শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে পার্থ পর্যন্ত হেঁটে যান। এরপর তিনি আফ্রিকার এ মাথা থেকে ও মাথা অতিক্রম করার জন্য পাড়ি দেন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে মরক্কোর ট্যাঙ্গিয়ারস পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি হাঁটা শেষ করেন। ৯ বছর ১ মাস ২৮ দিন হেঁটে তিনি পাড়ি দেন ৩২ হাজার ১৮৬ কিলোমিটার বা প্রায় ২০ হাজার মাইল পথ।

জাহ্নবী

 

তারুণ্যের ঈদ

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২২ পিএম
তারুণ্যের ঈদ

ঈদ মানেই খুশি আর আনন্দ। খুশি আর আনন্দ সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য হয় তরুণ বয়সে। এ বয়সে পারিবারিক শাসনের রাশ অনেকটাই ঢিলে থাকে অনেক পরিবারে। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় উঠতি তরুণরা। আর তা যদি ঈদের সময় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

একটা সময় ঈদের সময় কিশোর আর তরুণরা চলে যেত কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। সেই সকালে ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাত। তারপর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি বাড়ি যেত। সেটা কিন্তু যতটা না সৌজন্য রক্ষায় তারচেয়ে বেশি ঈদ সালামি। ঈদ সালামি বিশেষ জরুরি। বিশেষ করে তরুণ বয়সের জন্য। এ বয়সে তো আর বায়না ধরলেই কেউ কিছু কিনে দেবে না। নিজের খরচ নিজেকেই জুটিয়ে নিতে হয়। ঈদ হচ্ছে এই খরচের টাকা তোলার উত্তম সময়। সে কারণে পারতপক্ষে কেউ ঈদ সালামির সম্ভাবনা আছে, এমন বাড়ি এড়িয়ে যেত না। ঈদের দিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় তরুণদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলত, টাকার অঙ্কে কে কতটা ঈদ সালামির মালিক। তারপর দুই, তিন বা কয়েকবন্ধু মিলে পরিকল্পনা চলত- পরদিন কোথায় এই টাকার শ্রাদ্ধ করা যায়।

নানান প্রস্তাব আসত। সিনেমা। অমুক জায়গায় যাওয়া। কিংবা দূরে কোথাও অচেনা জায়গায়। অথবা দূরের কোনো বন্ধুর বাড়ি। 
দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা হলে পরদিন ভোরেই রওনা হতে হতো। তারপর তো অ্যাডভেঞ্চার...
এখনকার তরুণরা কি সেই রোমাঞ্চ অনুভব করে?
বেশির ভাগই করে না, তবে কেউ কেউ করে। আর আনন্দ করে অন্যরকমভাবে। হইহুল্লোড়ে কেউ কেউ পাড়া মাতিয়ে রাখে। আগের মতো তরুণদের আড্ডা দিতেও দেখা যায় পাড়ায় পাড়ায়। তবে সে আড্ডা যেন প্রাণহীন, গতিহীন। কারণ একটাই- মোবাইল আসক্তি।
এখন বেশির ভাগ তরুণই মোবাইলে চ্যাটিং করে কিংবা গেম খেলে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। ঈদের সময়, যখন আনন্দ করার মোক্ষম একটা উপলক্ষ আসে, তখনো তারা চ্যাটিং বা গেমেই আনন্দ খুঁজে নেয়।
গ্রাম বা শহর, যেকোনো জায়গার তরুণদের অবস্থা প্রায় একই রকম। এর মধ্যেও কিছু তরুণ আনন্দের জন্য অন্য কিছুর অন্বেষণ করে। গ্রামের তরুণরা হয়তো নৌকা ভাড়া করে, বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। তারপর সেই নৌকায় বিশাল বিশাল সাউন্ডবক্স বসিয়ে নাচ-গান করতে করতে ঘুরতে থাকে নদীপথে।
অন্যদিকে শহুরে তরুণরাও ঠিক একই কাজ করে। তবে শহরে তো আর নৌকা নেই। তারা ভাড়া করে ছোট ট্রাক বা পিক-আপ। যদিও অনেকেই এদের একটি বিশেষ নামে ডাকে। কেউ কেউ আবার দল বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পাড়া কাঁপিয়ে বেড়ায়। আর কেউ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রেস কিংবা লং ড্রাইভে।
কিছু তরুণ আবার এসবের মধ্যে আনন্দ কোথায় আছে- সেটাই খোঁজার চেষ্টা করে। আর একটু রোমান্টিক বা অন্যরকম ভাবনাচিন্তার তরুণরা রিকশায় ঘোরে।
আসলে আনন্দ যে কীসে নির্ধারিত নয়। কেউ নিজে আনন্দ করে আনন্দ পায়, আবার কেউ অন্যের আনন্দ দেখে আনন্দ পায়। কেউ আবার অন্যের আনন্দ তৈরি করে আনন্দিত হয়। দেশের অনেক জায়গায় তরুণরা ঈদের দিন গরিব ও অসহায় মানুষকে একবেলা ভালো খাওয়ানোর চেষ্টা করে নিজেদের উদ্যোগে। অন্যের মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই তারা বেশি আনন্দ পায়। ঈদের দিন দুস্থ ও পথশিশুদের জন্য কোনো কোনো তরুণ আবার দলবেঁধে উদ্যোগ নিয়ে নতুন জামা-কাপড় উপহার দেয়। 
আবার কোনো কোনো তরুণ ঈদে বই উপহার দেয়। ঈদের বই উপহার দেওয়ার রীতিটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে বাংলাদেশে। এবং এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছে তরুণরাই।
ঈদ আনন্দ উদযাপনে আবহাওয়াও একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 
ঋতুভিত্তিক দেশ বাংলাদেশ। ঈদও বছর বছর ঘুরতে ঘুরতে একেক ঋতুতে আসে। আর ঋতুর সঙ্গে ঈদ আনন্দ উদযাপনও হয় একেক রকম। ঋতুবৈচিত্র্যময় এমন ঈদ উদযাপন দুনিয়ার খুব বেশি দেশে কিন্তু নেই। আমাদের তরুণরা ঈদ উদযাপনে বছর বছর নতুন মাত্রা যোগ করে নিঃসন্দেহে।

জাহ্নবী

টিনফ্যাক্ট

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২১ পিএম
টিনফ্যাক্ট

টিনএজ বয়স হচ্ছে মানুষের জীবনের শৈশব থেকে সাবালক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দশ বছর মেয়াদী এই ধাপটা শুরু হয় দশ বছর বয়সে আর পূর্ণতা পায় সাধারনত ১৯ বছর বয়সে। এসময় মানুষের বড়বড় শারীরিক, আবেগিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। 

ছেলেদের আগে মেয়েদের বয়:সন্ধি শুরু হয়ে যায়। মেয়েদের বয়:সন্ধি সাধারণত আট থেকে ১৪ বছরের মধ্যে শুরু হয়ে যায়। আর ছেলেদের দশ বছরের আগে শুরু হয় না। তবে এটা ব্যক্তি, জেনেটিকস, খাদ্যাভ্যাস ও কায়িক শ্রমের ওপরও নির্ভর করে। ছেলেদের পবির্তনের মধ্যে রয়েছে বগলের তলায় অবাঞ্চিত লোম, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, গুপ্তলোম, দাড়ি-গোঁফের রেখা, পিটুইটারি থলি তৈরি হয়। আর মেয়েদের পিটুইটারি থলি তৈরি, গুপ্ত ও বগলের তলায় লোম গজানোসহ কিছু শারীরিক পরিবর্তন।

টিনএজ বয়সে মানুষের মস্তিষ্ক কাটছাঁট হয়। তার মানে প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের উন্নয়ন ঘটে। আমাদের মস্তিষ্কে এমন অনেককিছুই থাকে যেগুলো আসলে কোনো কাজের নয়। বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই অব্যবহৃত তথ্যগুলোর মলিন হতে থাকে এবং একসময় সেগুলোর মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে বহুল ব্যবহৃত তথ্যগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে।

জাহ্নবী

আসাদের জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪, ১১:৪৬ এএম
আসাদের জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড
সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড নিচ্ছেন আসাদ

ইচ্ছাশক্তি, অটুট লক্ষ্য ও একাগ্রতা- এই তিন গুণের সম্মিলিত শক্তিই পারে মানুষকে যেকোনো প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে। যদিও এর সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে আসে। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে ‘জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২২’ জয় করেছেন এক স্বপ্নবাজ তরুণ শেখ মোহাম্মদ আতিফ আসাদ। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাসড়া মাজালিয়া প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আসাদের। বাবা-মা আর সাত ভাইবোনের অভাবের সংসারে তিনি সবার ছোট। পড়াশোনা করছেন জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষে। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে প্রাইমারি স্কুল থেকে এখন পর্যন্ত ধানকাটা, দিনমজুরি, রং বার্নিশ, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রির কাজ এমনকি ভ্যান চালিয়ে খরচ জোগাচ্ছেন লেখাপড়ার। অনেক সময় মায়ের সঙ্গে নকশিকাঁথায়ও সুই ফুটিয়েছেন। এসব কাজ করে পড়ালেখার পাশাপাশি হাল ধরেছেন পরিবারের। 

অর্থাভাবের এই কষ্টগুলো ছোট থেকেই তার বিবেককে নাড়া দিত। তিনি ভাবতেন সমাজের জন্য শিক্ষার আলো দরকার। কারণ তার মতোই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ। অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেতে দেখেছেন অনেককে। তাদের জন্য  ছোট থেকেই কিছু করার ইচ্ছা ছিল আসাদের। তিনি ভাবেন ভালো কিছু করতে হলে প্রয়োজন যথাযথ জ্ঞানার্জনের। আর জ্ঞানকে বিকশিত করার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। এর জন্য প্রয়োজন পাঠাগারের। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাঠাগার সুবিধা নেই। আবার টাকা দিয়ে বই কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই অনেকের।

যেই ভাবনা সেই কাজ। ২০১৮ সালে প্রতিবেশী এক আপুর দেওয়া ২০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয় আসাদের পাঠাগারের।  শুরুতে পাঠাগারটির কোনো নাম না থাকলেও পরবর্তীতে পাঠাগারটির নামকরণ করা হয় বড় ভাই অকালপ্রায়ত মিলনের নামে। ২০টি বই নিয়ে আসাদের শুরু করা পাঠাগারের নামকরণ হয় ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’। ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠাগার পরিচালনা করার টাকা ছিল না তার। যেহেতু শিক্ষার ও জ্ঞানের আলো ছড়ানোই তার মূল লক্ষ্য, সেহেতু অবকাঠামো কোনো বাধা হতে পারে না, এমন চিন্তা থেকেই  নিজের ঘরের বারান্দায় পাটকাঠির বেড়া দিয়ে পাঠাগার শুরু করেন। বইগুলো  সংরক্ষণ করার জন্য বাবার পরামর্শে ঘরে থাকা কাঠ দিয়ে তৈরি করেন নড়বড়ে একটা বুকশেলফ।

আসাদ বলেন, শুরুর দিকে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে চেয়ে দু-একটা করে বই নিয়ে বই সংখ্যা বাড়ানো আর পাঠকদের নতুন বই দেওয়ার চেষ্টা করি। এরপর গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কে এইচ মালেক স্যার পাঠাগারের এই ভালো কাজ দেখে খুশি হয়ে ১০০ বই উপহার দেন এবং ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ ম্যাম বই কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। এতে আমার পাঠাগার সমৃদ্ধ হয়।

সেই থেকে শুরু। সমাজের ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, প্রবাসী  সবার দেওয়া বই নিয়ে আমার পাঠাগারে বর্তমানে বই সংখ্যা ৮ হাজার। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণ করি সপ্তাহে দু-তিন দিন। এ ছাড়া কেউ যদি ১০-১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও ফোন করে। তাকে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে বই দিয়ে আসি। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পাঠক আছেন আমার  পাঠাগারে।  শুরুর দিকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতাম। অনেকে উপহাস করত টিটকারি দিয়ে কথা বলত, এখনো বলে। তাতে আমার কষ্ট লাগত কিন্তু দমে যাইনি। আমার অবসর সময়টুকু মানুষের জন্যই কাজে লাগাচ্ছি এবং সেটা বই দিয়ে আলোকিত করার মাধ্যমে। আমি চাই সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।

আসাদ জানান, পাঠাগারের সব বই কুরিয়ারে আসে উপজেলায়। তাকে ৮-১০ কিলোমিটার সাইকেল অথবা ভ্যান চালিয়ে নিয়ে আসতে হয় সেসব বই। আবার কোনো কারণে আসাদ বাড়ি না থাকলে, তার মা পাঠকদের বই দেন এবং বই সংগ্রহ করেন। কারণ  লেখাপড়ার খরচের জন্য তাকে এখনো মাঝে-মাধ্যেই দূরে কোথাও দীর্ঘ  সময় কাজ করতে যেতে হয়। আসাদের ইচ্ছে  নিজ উপজেলা সরিষাবাড়িতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হবে বইমেলা। প্রচণ্ড মনোবলের কারণে তার কাছের এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় ২০২০ সালের ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী নিজ উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয় বইমেলা।  দেশের অনেক গুণী মানুষ তার বইমেলায় অতিথি হিসেবে আসেন। তার ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস থেকেই পাঠাগার ও বইমেলা শুরু করা। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তিনি আটটি গ্রামভিত্তিক পাঠাগার, চারটি পথ পাঠাগার, পাঁচটি স্টেশন পাঠাগার, একটি শিশু পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। আর তার এই ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং বইপড়া আন্দোলন নিয়ে কাজ করায় আসাদ ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২২’ অর্জন করেন। এ ছাড়া পেয়েছেন আইভিডি বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২১, আলোর প্রদীপ সম্মাননা ২০২২, বছরের সেরা নায়ক-২০২২ ইত্যাদি সম্মাননা।

এর মাধ্যমে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বহু তরুণের মাঝে। টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া আসাদ আজ বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। বর্তমানে তিনি সফল একজন উদ্যোক্তা ও সমাজের আলোচিত মুখ। আসাদ বলেন, পাঠাগারের জন্য একটা ফাউন্ডেশন ও দুজন ব্যক্তি মিলে একটা ভ্যান কিনে দেন। সেটা পাঠাগারের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি নিজে অবসর সময়ে ভ্যান চালাই। সেটা থেকে গত বছর ৬০ হাজার টাকা ইনকাম করি। যেটা দিয়ে পাঠাগার উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু জমিও বন্ধক রেখেছি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে অদম্য সাহসী স্বপ্নবাজ এই তরুণ বলেন, বই পড়ার আন্দোলন আমার গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম এবং সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রত্যেকটি গ্রামেই একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক। লাখ লাখ পাঠাগারে সারা দেশ ভরে যাক। সবাই বই পড়ুক। বই পড়ার বিকল্প কিছু নেই। তাই বলব বই পড়ো, পড়ো এবং পড়ো। মৃত্যুর আগে হলেও দেখে যেতে চাই সব গ্রামেই একটি করে পাঠাগার হয়েছে। তাতেই আমার মৃত্যু সার্থক হবে।

জাহ্নবী