ঢাকা ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব শেষে সেরা একাদশে জায়গা পেলেন যারা যাদের নিয়ে নকআউটের প্রথম ম্যাচে নামছে কানাডা-দ.আফ্রিকা ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী সবসময় ‘সুবিধাবাদী’, একাত্তরে তারা স্বাধীনতা চায়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধিবেশনের শেষ সময়ে ওয়াকআউট বিরোধী দলের কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায় ভূমিকম্পের কম্পন ৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল: মির্জা ফখরুল জার্মানি-প্যারাগুয়ে ম্যাচ কে জিতবে, সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর দক্ষিণ কোরিয়ার কোচের পদত্যাগ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুদের টাকা নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৩০ এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ তাপপ্রবাহে ইউরোপে অতিরিক্ত ১৩০০ জনের বেশি মৃত্যুর রেকর্ড : ডব্লিউএইচও আফ্রিকার জয়জয়কার, হতাশ এশিয়া খবরের কাগজের মহিউদ্দিন পলাশ রানারআপ ঘুষ ছাড়া মিলছে না ধান বিক্রির সুযোগ, বিপাকে কৃষকরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের তুলনার সুযোগ নেই: ত্রাণমন্ত্রী নক্ষত্রের পতন হয়নি জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিধ্বস্ত রোনালদোকে নিয়ে বেশি ঝুঁকি নিচ্ছে পর্তুগাল? নাঈম হাসানকে থানায় হেনস্তা: তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: পানিসম্পদ মন্ত্রী হোন্ডার নতুন সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক হ্যাচব্যাক গাড়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্বোধন প্রাণী কি মৃত্যু বুঝতে পারে? যেভাবে তৈরি হয়েছিল গিজার গ্রেট পিরামিড ২৭ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ আঁতুড়ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে তরুণ ফুটবলার গোবিপ্রবির ১৭ শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করল প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে লক্ষ্য পূরণ হলো না জ্যোতিদের অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি ও এসপিসহ ২১ কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব

মনীষার ঝুলিতে ২৬টি গোল্ড মেডেল

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:৫৩ পিএম
মনীষার ঝুলিতে ২৬টি গোল্ড মেডেল

এ যেন কোনো এক জাদুকরের কাঁধে ঝোলানো জাদুর থলে। ভেতরে হাত দিতেই অবিরাম মণিমুক্তা বেরিয়ে আসতেই থাকে। নাহ, আজ আমি কোনো রূপকথার গল্প শোনাতে আসিনি। তবে যা বলতে চাইছি সেটিও শুনতে রূপকথার মতোই শোনাবে। যদি দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থীর স্কুলব্যাগ হাতে নেন তা হলে সেখান থেকে কী বের হতে পারে? কিছু বই, খাতা, পেনসিল আর খেলার সামগ্রী। তার মধ্যে নিশ্চয়ই স্বর্ণ রৌপ্য কিছু থাকবে না। তবে আজ যার কথা বলব তার ব্যাগের মধ্যে শুধু বই-খাতা আর পেনসিল না সত্যি সত্যিই স্বর্ণ রৌপ্যে ভরা। টেবিলের ওপর থেকে ছোট্ট ব্যাগটা এনে সে যখন মেলে ধরল, তখন যেন জাদুকরের জাদুর থলের মতো সেই ব্যাগ থেকে এক এক করে ২৬টি গোল্ড মেডেল বেরিয়ে এল! এগুলো কি সে কুড়িয়ে পেয়েছে? তার কাছে কি আলাদিনের চেরাগের দৈত্য আছে যে তাকে এগুলো এনে দিয়েছে? নাহ, এর সবই সে অর্জন করেছে। ওর নাম মনীষা শংকর পাল। বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আইবিপি মাঠ সড়কে। মনীষা পড়ছে কক্সবাজার সরকারি সেন্ট্রাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তার বাবা উদয় শংকর পাল কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর। মা জয়শ্রী নন্দী গৃহিণী। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট মনীষা।

দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া মনীষা কীভাবে ২৬টি স্বর্ণপদকের মালিক হলো? সে এগুলো দেশে বিদেশে গিয়ে প্রতিযোগিতা করে জিতে নিয়েছে। তাও কিন্তু যে সে প্রতিযোগিতা নয় বরং কারাতে প্রতিযোগিতা! মনীষা তাই দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়লেও বুক ফুলিয়ে হাবীবুর রহমান রচিত বিখ্যাত সেই কবিতার লাইন বলতে পারে ‘আমি কি আর কাউকে ডরাই? ভাঙতে পারি লোহার কড়াই’। মনীষাকে যদি প্রশ্ন করা হয় তুমি তো কারাতে জান। তোমার বন্ধুরা নিশ্চয়ই তোমাকে ভয় পায়? সে তখন মুচকি হেসে বলে- বন্ধুদের তো আর আমি মারব না। তা হলে ওরা আমাকে ভয় পাবে কেন? ওরা বরং আমার সঙ্গে ঘুরতে ভালোবাসে। ওরা মনে করে আমি সঙ্গে থাকলে ওদের কোনো ভয় নেই। আর তা ছাড়া কারাতে মূলত আত্মরক্ষার জন্য। মনীষাকে যদি প্রশ্ন করা হয় তুমি কি ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যান এদের নাম জান? সে মাথা দুলিয়ে বলবে সে এদের নাম জানে না। নাম না জানলেও তাদের সেই বিদ্যায় খুবই পারদর্শিতা অর্জন করেছে।

মনীষার বয়স এখন ১০ বছর। ১০ বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে, বেশ লাজুক স্বভাবের। ঠিকমতো গুছিয়ে কথাও বলতে পারে না। কিন্তু তার পড়ার টেবিলটা ভরে গেছে স্বর্ণপদকে। যার মধ্যে ছয়টি আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক এবং বাকি ২০টি দেশ-বিদেশের। আছে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় হওয়ার আরও ছয়টি রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদক। আত্মরক্ষার কঠিন কৌশল কারাতে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এসব পদক অর্জন করেছে সে।

মাত্র চার বছর বয়সে মনীষা কারাতে শেখা শুরু করেছিল। বাবা কারাতে প্রশিক্ষক হওয়ায় প্রথম দুই বছর সে কারাতের প্রশিক্ষণ নিয়েছে বাসায়। পরের তিন বছর কক্সবাজার সদরে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলার হলরুমে আরও অনেকের সঙ্গে সে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সে প্রশিক্ষণ নিয়েছে শহরের আবু সেন্টারের ইউনাইটেড কারাতে ক্লাব বাংলাদেশে। এখানে তার সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয় দেড় শতাধিক শিশু। এর মধ্যে মেয়ে ৮০ জন। সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার প্রশিক্ষণ চলে। স্কুলের পড়া শেষ করে সে নিয়মিত কারাতে অনুশীলন করে। প্রতিনিয়ত সে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ছয় বছরের প্রশিক্ষণে মনীষার অর্জন ঈর্ষণীয়। ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে সে ছয়টি স্বর্ণপদক জিতেছে।

মনীষার বাবা উদয় শংকর পালই তার প্রশিক্ষক। বাবা প্রশিক্ষক হওয়ায় খুব ছোটবেলা থেকেই মনীষা মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যাওয়া আসা করত। অন্য ছেলেমেয়েদের কারাতে শিখতে দেখে মনীষারও ইচ্ছা জাগে শেখার। বাবাকে বলে বাবা আমিও শিখতে চাই। মেয়ের এমন আবদারে তিনি না করেননি। কারাতে প্রশিক্ষণে মোট ২৬টি কাতা বা শেডো ফাইট বা ধাপ থাকে। মাত্র দুই বছরের মাথায় মনীষা রপ্ত করে নেয় ১৬টি কাতা। প্রশিক্ষকদের মতে যা ১৬-১৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের পক্ষেও অনেক সময় সম্ভব হয় না। পাশাপাশি ব্ল্যাক বেল্টের জন্য ১০টি ডান থাকে। মনীষা ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ডান সম্পন্ন করেছে। অদম্য ইচ্ছেশক্তি থাকলে যে অনেক কিছুই সম্ভব মনীষা নিজেই তার অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছে।
আগামী ২৬ থেকে ২৮ জুলাই ভারতের কলকাতায় নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ইন্টারন্যাশনাল কারাতে প্রতিযোগিতা ২০২৪। সেখানে বাংলাদেশ দলের হয়ে অংশ নিচ্ছে ব্ল্যাক বেল্টধারী মনীষাও। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়বে সে। যার ঝুলিতে ২৬টি স্বর্ণ পদক শোভা পাচ্ছে সেই মনীষা এবারও যে সফল হবে তা আমরা আশা করতেই পারি। আর মনীষার প্রতিটি সাফল্য যে বাংলাদেশেরই সাফল্য সেটা বলাই বাহুল্য। মনীষা ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কারাতে প্রতিযোগিতা ২০২০’-এ একক কারাতে (কাতা মহিলা) বিভাগে অংশ নেয়। সেই প্রতিযোগিতায় মোট ৯ জন প্রতিযোগী ছিল। তখন মনীষার বয়স মাত্র ৬ বছর! তার বিপরীতে অন্য প্রতিযোগীদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ১৭ বছর! এত বড় মানুষ দেখে ভয়ে যে কেউ মুষড়ে পড়তে পারে, নাম তুলে নিতে পারে। কিন্তু মনীষা একটুও ভয় পায়নি। নিজের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। দূরন্ত সাহসী মনীষা নিজের আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে সেবার সেই প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ হয়েছিল। তখনই ধারণা করা হচ্ছিল ছোট্ট মনীষা একদিন অনেক নাম করবে। ওই বছরই সে চট্টগ্রামে ‘শাহজাদা চ্যালেঞ্জ কাপ ২০২০’-এ দুটি বিভাগে (জুনিয়র গার্লস কাতা ও কুমি) অংশ নেয়। উভয় বিভাগে প্রতিযোগী ছিল ১৫ জন করে। সবাইকে পেছনে ফেলে দুই বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন হয় মনীষা। এরপর শুধু তার এগিয়ে যাওয়ার গল্প। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে অনুষ্ঠিত বিচ ফ্রেন্ডশিপ কারাতে প্রতিযোগিতা ২০২৪-এ মেয়ের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয় সে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে আমরা যেভাবে নির্মাণ করতে চাইব সেটি আসলে সেভাবেই হবে। শিশুরা হলো নরম কাদামাটির মতো। তাকে আমরা যে শেপ দিতে চাই সেটা সেই শেপে গড়ে ওঠে। একটি চারাগাছকে আপনি যত ভালোভাবে যত্ন নিবেন সেই গাছ থেকে তত ভালো ফল পাবেন এটা আশা করাই যায়। আমাদের শিশু কিশোর কিশোরীদের আমরা যেভাবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করব তারাও সেভাবেই গড়ে উঠবে। ওদের মধ্যে বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিতে হবে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে যা করণীয় তা তাদের করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেই কেবল তারা সফল হবে। মনীষা নামের ছোট্ট কিশোরী তারই বাস্তব উদাহরণ।

মনীষার স্বপ্ন কারাতেতে বিশ্ব জয়ের মাধ্যমে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করবে। একদিন অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা হাতে সে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করবে।

জাহ্নবী

আঁতুড়ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে তরুণ ফুটবলার

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
আঁতুড়ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে তরুণ ফুটবলার
লামিনে ইয়ামাল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে প্রতি আসরে তরুণ প্রতিভার জয়জয়কার দেখা যায়। এই তরুণ খেলোয়াড়রা রাতারাতি বিশ্বমঞ্চে তারকা হয়ে ওঠেন না। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন নামি ক্লাবের যুব একাডেমির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর প্রশিক্ষণ। স্পেনের বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের ‘লা ফাব্রিকা’র মতো একাডেমিগুলো বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় সরবরাহ করে আসছে। একই ভূমিকা রাখছে লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোও। ফুটবলার তৈরির এই আঁতুড়ঘরগুলোর নেপথ্য গল্প নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন। 

খেলোয়াড় তৈরির সবচেয়ে সফল কারখানা হিসেবে পরিচিত বার্সেলোনার লা মাসিয়া। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আবাসিক একাডেমি থেকে বিশ্বমানের অসংখ্য ফুটবলার বের হয়েছেন। লিওনেল মেসি, জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেতসের মতো কিংবদন্তিরা এই একাডেমিরই অবদান। ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই লা মাসিয়া। বর্তমান সময়েও লামিন ইয়ামাল, গাভি কিংবা পাউ কুবার্সির মতো তরুণ ফুটবলাররা এই একাডেমি থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক স্তরে পারফর্ম করছেন। লা মাসিয়া মূলত খেলোয়াড়দের ছোটবেলা থেকে নির্দিষ্ট ফুটবল দর্শন, পজিশনাল সেন্স এবং পাসিং গেমের নিখুঁত দীক্ষা দেয়।

অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি লা ফাব্রিকাও প্রতিভার জোগানে দারুণ সফল। লা মাসিয়া যেখানে নিজেদের মূল দলের জন্য বেশি খেলোয়াড় তৈরি করে, লা ফাব্রিকা সেখানে পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্য প্রতিভার জোগান দেয়। রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমি থেকে তৈরি হওয়া ফুটবলাররা স্পেনের জাতীয় দলসহ ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলছেন। দানি কারভাহাল, নাচো ফের্নান্দেজ, আলভারো মোরাতা বা আশরাফ হাকিমির মতো তারকা ফুটবলাররা এই একাডেমিরই সৃষ্টি। এই একাডেমি খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শক্তিমত্তা, আধুনিক ফুটবল কৌশল এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের ওপর বেশি জোর দেয়।

ইউরোপের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার একাডেমিগুলো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় সাপ্লাই চেইন হিসেবে কাজ করে। ব্রাজিলের সান্তোস বা ফ্লামেঙ্গো এবং আর্জেন্টিনার রিভার প্লেট ও বোকা জুনিয়র্সের মতো ক্লাবগুলো ফুটবলারদের আসল খনি। পেলে ও নেইমারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবল তারকাদের উপহার দিয়েছে সান্তোস একাডেমি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের এনজো ফার্নান্দেস বা হুলিয়ান আলভারেসের মতো তারকারা উঠে এসেছেন রিভার প্লেটের একাডেমি থেকে। লাতিন আমেরিকার এই একাডেমিগুলো মূলত তরুণদের সহজাত খেলার শৈলী, বল নিয়ন্ত্রণ এবং অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতাকে পেশাদার রূপ দেয়।

এই একাডেমিগুলোর সফলতার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কার্যপদ্ধতি। তাদের শক্তিশালী স্কাউটিং নেটওয়ার্ক খুব অল্প বয়সে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান শিশুদের খুঁজে বের করে। সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে শিশুদের এই একাডেমিগুলোয় ভর্তি করা হয়। সেখানে শুধু ফুটবল খেলা নয়, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টির বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তা শেখানো এই একাডেমিগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিভিন্ন স্তরের কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে যখন কোনো তরুণ খেলোয়াড় গোল করেন, তখন পুরো বিশ্ব তার প্রশংসায় মেতে ওঠে। কিন্তু সেই গোলের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় অনেক বছর আগে, কোনো এক যুব একাডেমির কর্দমাক্ত মাঠে। ফুটবল এখন কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি বিশাল নিয়মতান্ত্রিক শিল্প। আর এই শিল্পের মূল কাঁচামাল জোগান দেয় লা মাসিয়া বা লা ফাব্রিকার মতো বিশ্বস্ত একাডেমিগুলো। এই আঁতুড়ঘরগুলো কার্যকর আছে বলেই বিশ্ব ফুটবল নিয়মিত নতুন নতুন মহাতারকার দেখা পায়। যুব ফুটবল সংস্কৃতির এই ধারাবাহিকতা বিশ্বকাপ ফুটবলকে চিরতরুণ, গতিশীল ও আকর্ষণীয় করে রাখে।

ডিজিটাল প্রজন্মের বিশ্বকাপ উন্মাদনা

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
ডিজিটাল প্রজন্মের বিশ্বকাপ উন্মাদনা
ছবি: এআই

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উৎসব। তবে সময় বদলেছে। বদলে গেছে এই উৎসব উদযাপনের ধরন। একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বকাপ মানেই পাড়ার মোড়ে বড় পর্দায় একসঙ্গে খেলা দেখা। কিংবা ড্রয়িংরুমে পরিবারের সবাই মিলে টিভির সামনে অধীর আগ্রহে বসে পড়া। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিশ্বকাপ দেখার সেই চেনা ছবি অনেকটাই বদলে গেছে।

এখন তাদের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে খেলা দেখার মূল মাধ্যম। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে তরুণ প্রজন্মের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় এসেছে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা। তারা এখন শুধু সাধারণ দর্শক হিসেবে বসে থাকতে রাজি নন। তারা এখন এই বিশাল আয়োজনের সক্রিয় অংশীদার। স্ক্রিন ছোট হলেও তাদের অভিজ্ঞতার পরিধি এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে দারুণভাবে ত্বরান্বিত করেছে। এখন খেলা চলাকালীন মাঠের উত্তেজনার চেয়ে অনলাইনের উত্তেজনা কোনো অংশে কম থাকে না। তরুণরা খেলা দেখার পাশাপাশি মেতে ওঠেন সরাসরি আলোচনায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা এক্সে প্রতি মুহূর্তের খেলার আপডেট শেয়ার করা হয়। কোনো দল দারুণ গোল করলে বা সহজ সুযোগ মিস করলে সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য মিম। মজার সব ট্রল আর হাস্যরসাত্মক কনটেন্ট মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে নেট দুনিয়ায়। আগের দিনের মতো চায়ের দোকানের আড্ডা বা রাস্তার মোড়ের আলোচনা এখন স্থানান্তরিত হয়েছে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ ও পেজে। সেখানে যুক্তির কঠিন লড়াই চলে। চলে আগের ম্যাচের পরিসংখ্যান নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক।

শুধু খেলা দেখা আর ভার্চুয়াল আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই এই প্রজন্মের তরুণরা। তারা ব্যাপকভাবে যুক্ত হচ্ছেন ই-স্পোর্টস এবং ফ্যান্টাসি লিগে। ফিফা বা ই-ফুটবলের মতো গেমগুলো তাদের এই উন্মাদনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মূল খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই তারা ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের প্রিয় দলের হয়ে খেলতে শুরু করেন। ফ্যান্টাসি লিগগুলোর কারণে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে তারা নিজেদের পছন্দমতো দল গঠন করেন এবং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাস্তব মাঠের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে তারা ফ্যান্টাসি পয়েন্ট পান। বন্ধুদের সঙ্গে প্রাইভেট লিগ তৈরি করে পয়েন্টের প্রতিযোগিতা করেন। ফলে যে দলগুলোর খেলা হয়তো তারা আগে দেখতেন না, ফ্যান্টাসি লিগে পয়েন্ট পাওয়ার আশায় সেই ম্যাচগুলোও তারা প্রবল আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন।

ভৌগোলিক সীমানাও এখন আর একসঙ্গে খেলা দেখার পথে কোনো বাধা নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুরা এখন সহজে একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতে পারেন। লাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখার পাশাপাশি তারা ডিসকর্ড, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ কল চালু রাখেন। ভার্চুয়াল ওয়াচ পার্টির মাধ্যমে সবাই মিলে একযোগে খেলা দেখেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান। একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে মনে হয় যেন সবাই একই ঘরে বসে খেলা দেখছেন। কোনো একটি দারুণ শট, দুর্দান্ত সেভ বা বিতর্কিত ফাউল নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে মতামত আদান-প্রদান করেন। নিজের ঘরে একা বসে খেলা দেখলেও অনলাইনের এই বিশাল কমিউনিটির কারণে তরুণরা কখনোই একাকিত্ব অনুভব করেন না।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তরুণদের কাছে বিশ্বকাপ কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিনোদন নয়, বরং এটি একটি সার্বক্ষণিক ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা। স্মার্টফোন এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট তাদের এই অসাধারণ সুযোগ করে দিয়েছে। আগে যেখানে দর্শকরা শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে খেলা উপভোগ করতেন, এখন তারা সেখানে সক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। নিজেদের মতো করে কনটেন্ট তৈরি করছেন। একই সঙ্গে সারা বিশ্বের লাখো মানুষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। খেলার মাঠের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বকাপ এখন ডিজিটাল দুনিয়ার বিশাল আঙিনায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত ডিজিটাল অংশগ্রহণ বিশ্বকাপ ফুটবলকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক এবং সর্বজনীন করে তুলেছে। আগামী দিনগুলোয় প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের এই বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতায় যে আরও নতুনত্ব আসবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

টিনএজ থেকে গ্লোবাল সুপারস্টার

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
টিনএজ থেকে গ্লোবাল সুপারস্টার
বাম দিক থেকে  আর্লিং হলান্ড, লামিনে ইয়ামাল ও নিকো পাজ।

বিশ্ব ফুটবলে এখন তরুণদের জয়জয়কার। মাত্র ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সে অনেক ফুটবলার বিশ্বজুড়ে তুমুল পরিচিতি পাচ্ছেন। কৈশোর পার না হতেই তারা নাম লেখাচ্ছেন ইউরোপের নামি সব ক্লাবে। তাদের সঙ্গে হচ্ছে কোটি কোটি ইউরো বা ডলারের চুক্তি। মাঠের দারুণ পারফরম্যান্স দিয়ে তারা জয় করছেন কোটি ভক্তের হৃদয়। এমন তিন ফুটবলার হচ্ছেন নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, স্পেনের লামিনে ইয়ামাল ও আর্জেন্টিনার নিকো পাজ। 

কিন্তু এই চোখধাঁধানো সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক কঠিন মানসিক যুদ্ধ। অল্প বয়সে বিশাল খ্যাতি আর আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ সামলাতে হচ্ছে এই তরুণদের। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দেশের হয়ে খেলার মানসিক চাপ তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

একটি বড় চুক্তির পর একজন তরুণ খেলোয়াড়ের জীবন রাতারাতি বদলে যায়। সাধারণ জীবন থেকে তারা সরাসরি চলে আসেন সংবাদমাধ্যম ও ক্যামেরার আলোয়। প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তাদের ওপর প্রবল চাপ থাকে। ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। সামান্য ভুলের জন্য নানারকম ট্রল এবং কটূক্তির শিকার হতে হয় তাদের। এই অল্প বয়সে এমন কঠোর সমালোচনা সামলানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। অনেক সময় একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একজন তরুণ ফুটবলারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খলনায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তাদের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত হানে।

ক্রীড়াবিদদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে অনেক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় অকালে ঝরে পড়েন। মাঠের শারীরিক লড়াইয়ের চেয়েও তাদের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা অনেক বেশি জটিল হয়। বিষণ্নতা, একাকিত্ব এবং পারফরম্যান্সের দুশ্চিন্তা তাদের স্বাভাবিক খেলার ছন্দ নষ্ট করে। বড় টুর্নামেন্টে পেনাল্টি মিস করা বা চোটের কারণে দল থেকে ছিটকে যাওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই বয়সে যখন তাদের সমবয়সীরা পড়াশোনা বা সাধারণ জীবন উপভোগ করে, তখন এই ফুটবলারদের কাঁধে থাকে ক্লাবের সাফল্য ও দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের গুরুদায়িত্ব।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক ফুটবল বিশ্ব এখন মানসিক স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বড় ক্লাবে এখন স্থায়ীভাবে পেশাদার ক্রীড়া মনোবিদ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এই বিশেষজ্ঞরা তরুণ খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ মোকাবিলার বৈজ্ঞানিক কৌশলগুলো শেখান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক সমালোচনা কীভাবে উপেক্ষা করতে হয় এবং মাঠে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, সেই বিষয়ে তাদের নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সিলিং করা হয়। দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রাও তরুণদের আগলে রাখেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তাদের মানসিকভাবে চাঙা রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেন।

তবে ক্লাবের পেশাদার সহায়তার চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করে খেলোয়াড়ের নিজস্ব পরিবার। কোটি টাকার চুক্তি আর প্রচারমাধ্যমের আলোর মাঝে পরিবার তরুণ ফুটবলারদের স্বাভাবিক মাটিতে পা দিয়ে চলতে সাহায্য করে। মাঠের বাইরের সাধারণ পারিবারিক পরিবেশ তাদের বড় ধরনের মানসিক শান্তি দেয়। পরিবারের সদস্যরা তাদের এমন একটি আবেগের জায়গা তৈরি করে দেন, যেখানে ফুটবল নিয়ে কোনো মানসিক চাপ থাকে না। এটি তাদের দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে দারুণ সাহায্য করে। ক্যারিয়ারের কঠিন সময়ে পরিবারের নিঃশর্ত সমর্থন ও ভালোবাসা একজন তরুণ খেলোয়াড়কে দ্রুত মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে মূল শক্তি জোগায়।

টিনএজ থেকে গ্লোবাল সুপারস্টার হয়ে ওঠার এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। এটি কেবল শারীরিক দক্ষতার পরীক্ষা নয়, বরং মানসিক দায়িত্বের এক বড় পরীক্ষা। আধুনিক ফুটবলে শুধু পায়ে ফুটবল জাদু থাকলে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা যায় না, বরং তীব্র স্নায়ুচাপ ধরে রাখার ক্ষমতাও থাকতে হয়। ক্লাব ও পরিবারের সমন্বিত মানসিক সহায়তাই পারে একজন তরুণ প্রতিভাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশ্বমঞ্চের মহাতারকা বানিয়ে রাখতে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান সচেতনতা ফুটবলকে আরও মানবিক করে তুলছে। তরুণদের এই ভেতরের লড়াইয়ের গল্পই আধুনিক ফুটবলের এক নতুন বাস্তব চিত্র।

/আবরার জাহিন

ফুটবল যখন ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
ফুটবল যখন ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত


বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর কিংবা ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের রোমাঞ্চ সবকিছুই বিশ্বজুড়ে তরুণদের দারুণভাবে আলোড়িত করে। মাঠের সেই গতি, নিখুঁত কৌশল আর গ্যালারির উন্মাদনা তরুণদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে আধুনিক যুগে ফুটবল শুধু মাঠের বিনোদন বা নিছক শখের খেলা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ফুটবল এখন একটি আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। বিশ্বমঞ্চের তারকাদের অভাবনীয় সাফল্য দেখে বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বের তরুণরা ফুটবলকে জীবন গড়ার মূল মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে এই খেলার পেশাদার রূপ তরুণদের নতুন পথ দেখাচ্ছে।

বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চগুলো তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখতে শেখায়। কিলিয়ান এমবাপ্পে বা লামিন ইয়ামালের মতো তরুণদের অল্প বয়সে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাতে দেখে সাধারণ কিশোররাও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়। আধুনিক ফুটবলে পেশাদারত্ব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আগের চেয়ে অনেক বেশি। একটি নামি ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি কিংবা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া একজন ফুটবলারের জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। এই পেশায় যেমন রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিপুল খ্যাতি, তেমন রয়েছে উন্নত জীবনযাত্রার টেকসই নিশ্চয়তা। ফলে আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের নানা সুবিধা নিয়ে তরুণরা শৈশব থেকে নিজেদের দক্ষ পেশাদার ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার নিয়মতান্ত্রিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই উন্নয়নশীল চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। একসময় এ দেশে ফুটবলকে শুধু বিকেলবেলার বিনোদন বা শখ মনে করা হতো। কিন্তু এখন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার সুনির্দিষ্ট স্বপ্ন নিয়ে অনেক তরুণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে আসছে। দেশের ঘরোয়া ফুটবল লিগগুলোর মান ও পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ এবং বিভিন্ন করপোরেট লিগের প্রসারের কারণে ফুটবলারদের নিয়মিত আয়ের একটি ভালো পথ তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ তরুণেরা এখন ফুটবলকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে ভাবার সাহস পাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের নারী ফুটবলারদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক জয় তরুণদের মনে নতুন আশার আলো জুগিয়েছে।

এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও তরুণরা আধুনিক ফুটবল একাডেমিতে যোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নিজস্ব একাডেমি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে চমৎকার ফুটবল একাডেমি গড়ে উঠছে। এসব একাডেমিতে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তরুণ ফুটবলাররা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি মাঠের প্রশিক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। অভিভাবকরা এখন আর ফুটবল খেলাকে কেবল সময় নষ্ট মনে করছেন না। অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার সন্তানের ফুটবলার হওয়ার এই বৈশ্বিক স্বপ্নকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে এবং তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

অবশ্য পেশা হিসেবে ফুটবলকে বেছে নেওয়ার এই পথটি মোটেও সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর শারীরিক পরিশ্রম, কড়া নিয়মানুবর্তিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুশৃঙ্খল অনুশীলন। প্রতিটি সফল ফুটবলারকে কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে গুরুতর ইনজুরির বড় ধরনের ঝুঁকি। একটিমাত্র বড় চোট পুরো ক্যারিয়ার সাময়িকভাবে বা চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখেই এ যুগের তরুণরা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা বোঝে যে, আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতা করতে হলে কেবল সহজাত প্রতিভা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক পেশাদার মানসিকতা। সঠিক সময়ে সঠিক নির্দেশনা পেলে এই তরুণরা আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার হতে পারে।

ফুটবল এখন শুধু একটি সাধারণ খেলা নয়, এটি একটি বিশাল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শিল্প। বিশ্বমঞ্চের উত্তেজনা তরুণদের মনে যে তীব্র প্রেরণা জোগায়, তা তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। মাঠের সবুজ ঘাসে বল পায়ে দৌড়ানোর স্বপ্ন এখন জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে। দেশের সামগ্রিক পেশাদার ফুটবল কাঠামোর আরও উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই তরুণ প্রজন্ম ফুটবলকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। স্বপ্ন আর ক্যারিয়ারের এই চমৎকার মেলবন্ধন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন ও উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

তরুণদের সবচেয়ে বড় উৎসব ফুটবল বিশ্বকাপ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
তরুণদের সবচেয়ে বড় উৎসব ফুটবল বিশ্বকাপ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফুটবল সারা বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে এক অনন্য আয়োজন। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্যরকম উদ্দীপনা কাজ করে। খেলাধুলা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর সেই খেলা যদি হয় ফুটবল, তবে আগ্রহের কোনো কমতি থাকে না। চার বছর পরপর আসা এই আসরকে তরুণরা নিজেদের সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে উদযাপন করেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই সময় এক আনন্দমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। এ দেশের তরুণদের কাছে বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক উৎসব।

বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগে থেকেই তরুণদের মাঝে প্রস্তুতির আমেজ লক্ষ করা যায়। প্রিয় দলের জার্সি কেনা থেকে শুরু করে বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় পতাকা উড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, সবখানে ফুটবলের আলোচনা প্রাধান্য পায়। চায়ের দোকানগুলোয় প্রতিদিন বিকেলে ও সন্ধ্যায় প্রিয় দলের শক্তিমত্তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তরুণরা নিজেদের দলের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। কে সেরা খেলোয়াড়, কোন দলের রক্ষণভাগ সবচেয়ে শক্তিশালী, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। এই বিতর্ক কখনো কখনো মজার ছলে হয়, আবার কখনো বেশ সিরিয়াস রূপ নেয়। তবে দিন শেষে সবাই খেলার আনন্দ উপভোগ করেন।

একসঙ্গে খেলা দেখার আনন্দ এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। তরুণরা দলবেঁধে খেলা দেখার জন্য নানা পরিকল্পনা করেন। বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। ক্লাবের মাঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অথবা পাড়ার কোনো খোলা জায়গায় প্রজেক্টর বসানো হয়। গভীর রাতে যখন খেলা চলে, তখনো তরুণদের চোখে ঘুম থাকে না। প্রিয় দল গোল করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে চারপাশ। আবার দল হেরে গেলে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। এই হাসি, কান্না আর উত্তেজনার মধ্য দিয়েই তরুণরা এক মাস পার করে। খেলা দেখার এই সময়টুকু তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে তরুণদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা পরিবর্তনও দেখা যায়। খেলার সময় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বৃদ্ধি পায়। তরুণরা নিজেদের দলের জার্সি, স্কার্ফ, ব্যান্ড কিংবা অন্যান্য সামগ্রী কিনতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। স্থানীয় দর্জিরা বিভিন্ন দেশের পতাকা বানাতে ব্যস্ত সময় পার করেন। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতে খেলা দেখার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে তরুণদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া খেলা উপলক্ষে তরুণরা বিভিন্ন দাতব্য কাজেও অংশ নেয়। অনেক সময় তারা প্রিয় দলের বিজয়ে আনন্দ মিছিল করেন এবং মিষ্টি বিতরণ করেন।

ফুটবল বিশ্বকাপ তরুণদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতেও সাহায্য করে। এই খেলার মাধ্যমে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তাদের সংস্কৃতি ও মানুষ সম্পর্কে জানতে পারেন। যেসব দেশের নাম তারা আগে কখনো শোনেননি, ফুটবলের সুবাদে সেসব দেশের অবস্থান ও ইতিহাস সম্পর্কে তাদের ধারণা তৈরি হয়। খেলোয়াড়দের জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তারা বুঝতে শেখে যে, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া ফুটবলের মাঠে বর্ণবাদবিরোধী ও শান্তির বার্তা তরুণদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখে এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল তরুণদের জন্য এক মহামিলনমেলা। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করতে এই আয়োজন দারুণ ভূমিকা রাখে। পড়াশোনা বা কাজের চাপের মাঝে এক মাসের এই উৎসব তাদের নতুন করে বাঁচার আনন্দ দেয়। জয় বা পরাজয় ছাপিয়ে খেলার মূল চেতনা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। হার জিত থাকবেই, তবে খেলায় অংশগ্রহণ ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সবচেয়ে বড় কথা। তরুণরা এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। তাই বলা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল মাঠের লড়াই নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের এক বিশাল উৎসব। এই উৎসবের রেশ তাদের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়।