লক্ষ্মীপুর পৌর এলাকার বাঞ্চানগর গ্রামে থাকেন ১১২ বছর বয়সী সৈয়দ আহাম্মদ ভূঁইয়া। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি দুটি রুম নিয়ে তার ঘর। মাথার ওপরে টিনের চালা। ভাঙা খাটের ওপর শুয়ে ওই টিনের দিকে তাকিয়ে দিন পার করেন তিনি। ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে আসা রোদ তার অন্যতম সঙ্গী। বয়সের কারণে ন্যুব্জ আহাম্মদ ভূঁইয়ার ঘরে আছেন স্ত্রী ও দুই নাতি। তাদের নিয়েই তার সংসার। সকালে খাবার খেলে দুপুরে কী খাবেন তারও নিশ্চয়তা নেই।
আহাম্মদ ভূঁইয়ার দিন একসময় এমন ছিল না। তরুণ বয়সে তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন পুরো লক্ষ্মীপুর শহর। পত্রিকা বিক্রি করে ভালোই চলত দিন। সকাল থেকে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন ধরনের হাঁকডাক দিয়ে পুরো শহরে বিক্রি করতেন পত্রিকা। বয়স বাড়লে শহরের রহমতখালী খালের ওপর বসে খবরের কাগজ বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু গত চার বছর ধরে সেটাও বন্ধ। বয়সের কাছে হেরে বিছানাই এখন তার আশ্রয়স্থল।
প্রায় শত বছর ধরে জেলার মানুষের কাছে খবরের কাগজ বিক্রি করা এ প্রবীণের খবর এখন আর কেউ রাখেন না। পরিবার নিয়ে তার দিন কাটে এখন অনাহারে। দুই ছেলের মধ্যে একজন মারা গেছেন ১০ বছর আগে। ওই ঘরের দুই নাতিও থাকেন আহাম্মদ ভূঁইয়ার সঙ্গে।
আরেক ছেলে আবুর এক চোখ নষ্ট। তিনিও একসময় পত্রিকা বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন সব ছেড়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। তাই তিনিও বাবাকে সাহায্য করতে পারেন না। বয়স্ক ভাতার টাকায় চারজনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সৈয়দ আহাম্মদ ভূঁইয়া।
তার এমন দুর্দিনে কেউ এগিয়ে আসবেন, এমনটাই প্রত্যাশা তার। সংশ্লিষ্টরা সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও স্থানীয়রা বলছেন, সবাই শুধু প্রতিশ্রুতি দেন, কেউ সাহায্য করেন না।
সৈয়দ আহাম্মদের জন্ম বর্তমান লক্ষ্মীপুর পৌর এলাকার বাঞ্চানগর গ্রামে। এই গ্রামের হাবীব উল্যাহ ভূঁইয়া বাড়ির হতদরিদ্র মকরম আলী ও আম্বিয়া ভানু দম্পতির ঘরে ১৯১১ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবার দারিদ্রতার কারণে তার লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি।
তার সংবাদপত্র হকার জীবনের শুরুর দিকে বর্তমান বাংলাদেশ থেকে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো না। কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সে পত্রিকার কোনো কোনোটির দাম ছিল দুই পয়সা।
সৈয়দ আহাম্মদের দেওয়া তথ্য মতে, তখনকার দৈনিক পত্রিকা দৈনিক পাওয়া যেত না, বরং অন্তত এক সপ্তাহ পরে আসত। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হলো। প্রথম দিকে এসব পত্রিকাও পাওয়া যেত দু-এক দিন পর। তিনি পত্রিকা
শহরের বাইরেও বিভিন্ন পাঠকের কাছে হেঁটে পৌঁছে দিতেন। কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা হাতে পেতে পাঠকরা অপেক্ষায় থাকতেন সৈয়দ আহাম্মদের। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় তিনি পৌঁছে যেতেন বর্তমান লক্ষ্মীপুর শহরের চকবাজার পত্রিকার এজেন্সিতে। চুচ্ছা ব্যাপারী নামের জনৈক ব্যক্তি ছিলেন জেলার একমাত্র সংবাদপত্রের এজেন্ট।
পরবর্তী সময়ে যোগাযোগব্যবস্থা ও সংবাদপত্র প্রকাশনার প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটলে পত্রিকার সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। প্রথম দিকে দিনের পত্রিকা দিনে আসতে শুরু করে। পরে আসা শুরু করে ভোর বেলায়। সৈয়দ আহাম্মদের কর্ম ব্যস্ততাও তখন বেড়ে যায়।
লক্ষ্মীপুরের সংবাদপত্র এজেন্ট রাকিব হোসেন বলেন, ‘আমার দাদা গোলাম রহমান পত্রিকার এজেন্ট হওয়ার পর থেকে তিনি (আহাম্মদ ভূঁইয়া) আমাদের এজেন্সি থেকে পত্রিকা বিক্রি করে আসছিলেন। তিনি আমাদের কাছে এলে আমরা তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করি।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন জানান, বৃদ্ধ সৈয়দ আহাম্মদের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তিনি আমাদের কাছে এলে আমরা তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করব।
লক্ষ্মীপুর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্বাস হোসেন বলেন, ‘বৃদ্ধ সৈয়দ আহাম্মদকে অনেকেই সহায়তার আশ্বাস দিলেও পরবর্তী সময়ে তারা কেউ কথা রাখেনি।’
এমএ/এআর