ভারতের কাশ্মীরে ভ্রমণে গিয়ে হাউসবোটে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি তিন পর্যটকের একজন রাঙামাটির গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অনিন্দ্য কৌশল। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুরে। বাবা স্বপন কুমার নাথ সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তা ছিলেন। ছেলের শোকে বাবা, মা ও স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা রানী শোকে মুহ্যমান। বাবার মৃত্যুর খবর এখনো জানে না চার বছরের মেয়ে স্পৃহা। ছেলে আরাধ্যর বয়স ১৫ মাস।
নিহত অনিন্দের সহকর্মী প্রকৌশলী তৌকির হোসেন জানান, বিনয়ী ও সহযোগী মানসিকতার এই প্রকৌশলীর বাসা চট্টগ্রামের জামালখানে। এর আগে বহদ্দারহাটে সরকারি কোয়ার্টারে বাবার সঙ্গে থাকতেন। তার অবসরের পর গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের শরীর আগুনে এতটাই ঝলসে গেছে যে তাদের মরদেহের অবশিষ্টাংশের ডিএনএ টেস্ট করানো ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রীনগর পুলিশের জারি করা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনিন্দ্য কৌশলসহ তিন বাংলাদেশির মরদেহ শনাক্ত হয়েছে; যারা ‘সাফিন’ নামে একটি হাউসবোটে অবস্থান করছিলেন।
কাশ্মীরের দুর্ঘটনার খবর পেতে পরিবারের সদস্যদের এক দিন পার হয়ে গেছে। এখন সবাই জানেন কেউই বেঁচে নেই। কেবল বুঝে উঠতে পারছে না ছোট্ট স্পৃহা। বাসায় শনিবার রাত থেকে কেন এত মানুষ আসছে, কেনইবা মা, দাদু, দিদি কাঁদছেন, তাও বুঝতে পারছে না ছোট্ট মেয়েটি। অন্যের কান্না দেখে কখনো নিজেও কাঁদছে। আবার কখনো জানতে চাচ্ছে বাবা কখন ফিরবে?
স্পৃহার ছোট ভাইয়ের বয়স ১৫ মাস। তার নাম আরাধ্য। এ বছরের ১০ মে স্পৃহার চতুর্থ জন্মদিনের একটা ছবিতে দেখা যায় আরাধ্য মায়ের কোলে বসা। আর স্পৃহা যথারীতি বাবাভক্ত। এই শোক আরাধ্যকে ছোঁয়নি। সে এই কোল ওই কোল ঘুরছে। তবে বাবাকে খুঁজছে স্পৃহা।
অনিন্দ্যর বাবা স্বপন নাথ বলেন, ‘আমার ছেলে বলছিল, বাবা আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। একটু রিল্যাক্স করে আসি। আমি তাকে বললাম, বাবা একা যেও না। তখন সে ইমন ও মাইনুদ্দিনের কথা বলল। জিও (সরকারি অনুমতি) পেতেও সময় লেগেছে। বাধা পেয়েছে সেখানেও। আহা বাধাটা যদি মানত।’
৩ নভেম্বর তারা তিনজন ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর জয়পুর, দিল্লি, আজমির শরিফ, আগ্রাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। শুক্রবার তারা পা রাখেন শ্রীনগরে। সেখানে ওই দিন বিকেলে ওঠেন ডাল লেকের একটি হাউসবোটে। তবে বোটটি তাদের পছন্দ হয়নি বলে শুক্রবারই জানিয়েছিলেন স্বজনদের।
স্বপন নাথ বলেন, ‘আমার ভাগনের সঙ্গে ছেলের খুব ভাব। সে তাকে ফোনে বলেছে, কাশ্মীর পোঁছেছে। এরপর রাতে তার স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলে। বোটটি পছন্দ হয়নি বলে জানায়। সকালেই ওখান থেকে একটা ভালো হোটেলে চলে যাবে বলে জানায় সে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।’
অনিন্দ্যর মা উমা নাথ শনিবার রাত থেকে থেমে থেমে কাঁদছেন। তিনি ক্লান্ত, তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে অনিন্দ্য ছিল বড়। মেয়ে তূর্ণা কানাডাপ্রবাসী। এখন দেশে আছেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) পড়াশোনা করেছেন অনিন্দ্য কৌশল। তিনি ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তার বাড়ি মিরসরাইয়ে।
স্বপন নাথ আরও বলেন, ‘ইমনের স্ত্রী এসেছিল। আমার মনে হয় না মরদেহগুলো আনার মতো পরিস্থিতি আছে। এক আত্মীয়কে শ্রীনগর পাঠিয়েছি। আমি সোনার ছেলে হারিয়ে ফেললাম।’
আর অনিন্দ্যর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা কী হারালেন, সেটা তিনি ছাড়া আর কে ভালো বুঝবেন। শুক্রবার রাতে স্বামীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। এর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই শনিবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত হয়ে যান অনিন্দ্য আর ফিরবেন না। আগামী মাসে পৃথিবীর আলো দেখতে যাওয়া তাদের তৃতীয় সন্তানটি কোনো দিনই বাবার দেখা পাবে না।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় ভারতের বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন অফিসের নথি থেকে এবং হাউসবোট অপারেটরদের রক্ষণাবেক্ষণের রেকর্ড অনুসারে নির্ণয় করা হয়েছে।
আ. রহিম