মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে টেকনাফ সীমান্তজুড়ে প্রবাহিত নাফ নদী দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম মাদক প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত। এই সীমান্ত দিয়ে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত বাহক ও খুচরা কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও অভিযোগ রয়েছে, পাচার চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বড় একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও থামছে না পাচার; বরং নতুন নতুন রুট ও কৌশলে বিস্তৃত হচ্ছে অবৈধ এই নেটওয়ার্ক।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্তে মাদকের কারবার টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত, সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা, সীমান্তবর্তী জনপদের ভৌগোলিক সুবিধা এবং দ্রুত লাভের প্রলোভন উল্লেখযোগ্য।
কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায়ই লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছেন শত শত ব্যক্তি। তবুও থামছে না পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তজুড়ে অর্ধশতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে এখনো বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে। নাফ নদী, পাহাড়ি পথ, ছড়া, উপকূলীয় এলাকা, মাছ ধরার ট্রলার এবং দুর্গম সীমান্ত করিডরকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটগুলো মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে।
গত ২২ জুন রাতে উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের কাটাখাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ জাকির হোসাইন (৩২) নামে এক মাদক কারবারিকে আটক করে বিজিবি। তিনি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখাল এলাকার বাসিন্দা। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হলেও সীমান্তজুড়ে সক্রিয় সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কারণে এই চক্রের অপতৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
অর্ধশতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ করিডর
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের অসংখ্য সীমান্ত পয়েন্ট দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাতের অন্ধকার, প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীপথ, মাছ ধরার ট্রলার, পাহাড়ি ছড়া ও দুর্গম জনপদকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের চালান পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, জালিয়াপাড়া ও ঘোলারচর; সাবরাংয়ের খুরেরমুখ, আচারবনিয়া ও নোয়াপাড়া বেড়িবাঁধ; টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কেরনতলী, মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতুলী, রাজরছড়া ও মিঠাপানির ছড়া; বাহারছড়ার নৌয়াখালীপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙ্গা, শীলখালী ও মারিশবনিয়া এলাকাকে মাদক প্রবেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া, লেদা, চৌধুরীপাড়া, ফুলের ডেইল, ওয়াব্রাং, আনোয়ার ফিশারিজ প্রকল্প এলাকা ও মৌলভীবাজার এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের হারাংখালী, মিনাবাজার, উলুচামরি, ঝিমংখালী, উংচিপ্রাং, বাজারপাড়া ও নয়াবাজারসহ বেশ কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পাচারকারীদের নজরে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ–সীমান্তজুড়ে একাধিক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, ডাকাতি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। ফলে গ্রেপ্তার হয় মূলত বাহক ও ছোট সদস্যরা, আর সিন্ডিকেটের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা থেকে যায় আড়ালে।
নৌপথ ও মেরিন ড্রাইভে সক্রিয় পাচার চক্র
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী, শাহপরীর দ্বীপের নৌঘাট এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে মাছ ধরার আড়ালে নানা কৌশলে মাদকের চালান সাগর ও নদীপথে দেশে প্রবেশ করছে। এ কাজে কিছু রোহিঙ্গা জেলে ও স্থানীয় জেলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বড় বড় কারবারিরা এসব পয়েন্টকে তুলনামূলক নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে প্রবেশ করায়। পরে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে।
পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে স্থানীয়রা জানান, মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে কারবারিরা প্রায়ই বিলাসবহুল প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে থাকে। সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের একাধিক অভিযানে কয়েকটি যানবাহনসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়।
তারা জানান, প্রভাবশালী মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাধারণত আড়ালে থেকে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট নৌঘাট, উপকূলীয় এলাকা ও মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন রুটগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
জব্দ হচ্ছে লাখ লাখ ইয়াবা, তবুও থামছে না পাচার
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে কক্সবাজার জেলায় মোট ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ পিস ইয়াবা, ৫ দশমিক ২৫০ কেজি আইস, ৪০ দশমিক ৩ কেজি গাঁজা এবং ৬৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯৮ জনকে আটক করা হয়। জব্দ মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪২ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বিএন) সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।’
এদিকে এত বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হওয়ার পরও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তালিকায় কক্সবাজার জেলার ১ হাজার ১৫১ জন মাদক কারবারির নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে ৯১২ জনই টেকনাফের বাসিন্দা। তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে ৬৫ জনের অবস্থানও টেকনাফে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্তদের বাইরে গত কয়েক বছরে নতুন করে আরও অনেক ব্যক্তি ও সংঘবদ্ধ চক্র মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে, যাদের বড় অংশ এখনো শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছে।
আত্মসমর্পণের পরও থামেনি মাদক চক্র
মাদক নির্মূলে বিভিন্ন সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমান্তকেন্দ্রিক ইয়াবা পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, আত্মসমর্পণকারী ও মাদক মামলার অনেক আসামির একটি অংশ পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে আত্মসমর্পণ কর্মসূচি আলোচনায় এলেও সীমান্তভিত্তিক মাদক সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় মাদক বিস্তারের পেছনে কয়েকটি কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, মিয়ানমারভিত্তিক চক্রগুলো বর্তমানে বাকিতে ইয়াবা ও আইস সরবরাহ করায় সহজেই নতুন কারবারি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক বিক্রির বিপুল অর্থ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল ও হুন্ডির মাধ্যমে সীমান্তের ওপারে চলে গেলেও সেই আর্থিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
এ ছাড়া মাদক মামলাগুলোর তদন্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহক বা ক্ষুদ্র পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও মাদকের উৎস, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন কিছু এলাকা মাদক পাচার ও সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে সীমান্তের এক প্রান্তে অভিযান চললেও অন্য প্রান্তে নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠছে পাচারকারীরা, যা মাদকবিরোধী লড়াইকে আরও জটিল করে তুলছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে সহজ শর্তে ও বাকিতে মাদক সংগ্রহের সুযোগ থাকায় নতুন নতুন ব্যক্তি এই অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক কারবারিদের নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মাদকের এই বিস্তার রোধে শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ চেইন ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও ভেঙে দিতে হবে।’
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত মাদক প্রবেশ শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। যে ইয়াবা সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে, তা আগামীতে একটি পরিবার ধ্বংস করছে। মাদকের কারণে অপরাধ বাড়ছে, শিক্ষার্থীরা বিপথে যাচ্ছে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু অভিযান নয়, সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস এবং পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’
দেড় বছরে হাজারের বেশি গ্রেপ্তার
মাত্র দেড় বছরে কক্সবাজার সীমান্ত থেকে প্রায় আড়াই কোটি পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন এক হাজারের বেশি ব্যক্তি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আসা এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে, সীমান্তজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও ইয়াবা পাচারের প্রবণতা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বিজিবির কক্সবাজারের রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সীমান্ত এলাকায় পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে ২০২৫ সালে মোট ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৩১ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৯০০ টাকা। এ সময় মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৭৮৪ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসেই উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৩ পিস ইয়াবা, যার আনুমানিক মূল্য ৩১৬ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। একই সময়ে আটক হয়েছেন ৪৩৮ জন।
কক্সবাজারের শিক্ষাবিদ মুফিদুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সীমান্তে নজরদারির পাশাপাশি তরুণদের জন্য বিকল্প ইতিবাচক কর্মকাণ্ড বাড়ানো জরুরি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, ‘প্রতিবার বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হওয়ার খবর আসে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এই বিশাল চালানের মূল হোতারা কারা? তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তের অর্ধশতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রুটে কঠোর নজরদারি, সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের মুখোমুখি করা গেলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য অনেকটাই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘কক্সবাজার সীমান্তকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের অপচেষ্টা দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় পাচারের চেষ্টাকালে প্রায় ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক নারী যাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত গোয়েন্দা তৎপরতা, অভিযান এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। মাদকের উৎস, সরবরাহ চেইন এবং এর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করতে আমরা কাজ করছি।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক অধ্যুষিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
[প্রতিবেদনটি করতে টেকনাফ প্রতিনিধি মো. শাহীন সহযোগিতা করেছেন]