পাবনায় পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক ‘এয়ার ফ্লো’ প্রযুক্তি। সনাতন পদ্ধতির লোকসান কাটিয়ে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবে বাজারে নিম্নমানের ও মানহীন এয়ার ফ্লো মেশিন ছড়িয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
জেলায় প্রতিবছর গড়ে ৭ থেকে ৮ লাখ টন হালি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। আগে চাষিরা বাঁশের মাচায় সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতেন। প্রকৃতির ওপর নির্ভরতার কারণে এতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হতো। বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হতো। এতে লাভবান হতো অসাধু ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, এয়ার ফ্লো প্রযুক্তিতে একটি সেমিপাকা ঘরের ভেতরে মোটরচালিত ব্লোয়ার মেশিন দিয়ে পেঁয়াজের স্তূপের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত বাতাস প্রবাহিত করা হয়। এতে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে পচন কমে ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। দিনে মাত্র ৬ ঘণ্টা মেশিন চালালেই ৩০০ থেকে ৪০০ মণ পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সতেজ রাখা সম্ভব।
ধারণক্ষমতা অনুযায়ী এয়ার ফ্লো মেশিনের দাম ভিন্ন। ১০ টন বা ২৫০ মণ ধারণক্ষমতার মেশিনের দাম ১৫ হাজার টাকা। ১২ টন বা ৩০০ মণ ধারণক্ষমতার মেশিনের দাম ১৭ হাজার টাকা। ১৪ টন বা ৪০০ মণ ধারণক্ষমতার মেশিনের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রযুক্তিটি ব্যবহারে আগ্রহ থাকলেও মানহীন মেশিনের ভিড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা। সুজানগর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের চাষি কুতুব উদ্দিন ও সুমন হোসেন জানান, নিম্নমানের যন্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে তারা নানা সমস্যায় পড়ছেন।
একই অভিযোগ করেন সাঁথিয়া উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের চাষি মাহমুদুল হাসান সাগর। তিনি বলেন, প্রযুক্তিটি ভালো হলেও সঠিক যন্ত্র চেনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মিয়াপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমরা সাধারণ চাষি। বাজারে অনেক রকম মেশিন পাওয়া যাচ্ছে। কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ, দেখে বোঝা কঠিন। ভুল মেশিন কিনে লোকসান দেওয়ার ভয় কাজ করছে।’
স্থানীয় প্রকৌশলী মামুন হোসেন জানান, আদর্শ এয়ার ফ্লো মেশিনে হাফ হর্স পাওয়ারের বিএলডিসি মোটর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাজারে থাকা অনেক নিম্নমানের মেশিনে এক হর্সপাওয়ার মোটর লাগানো। এতে প্রতি মাসে যন্ত্রপ্রতি অন্তত দুই হাজার টাকা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল গুনতে হয়। তিনি বলেন, ‘এতে চাষিদের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার অবস্থা হবে।’
২০২০ সাল থেকে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তা সিদ্দিক মোল্লা বলেন, ‘২০২৩ সাল থেকে কৃষি বিভাগের সহায়তায় আমরা ভালো মানের মেশিন সরবরাহ করছি। কিন্তু সস্তা ও নিম্নমানের যন্ত্রের কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আধুনিক প্রযুক্তির ওপর আস্থা হারাবেন। এতে পেঁয়াজ চাষে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, ‘পেঁয়াজ পাবনার চাষিদের প্রধান অর্থকরী ফসল। নিম্নমানের মেশিন দিয়ে তাদের প্রতারিত করা বড় সমস্যা। কৃষি বিভাগের দ্রুত বাজার মনিটরিং জরুরি।’
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, ‘আমরা চাই চাষিরা সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করুক। বাজারে যেন নিম্নমানের বা ক্ষতিকর যন্ত্র বিক্রি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।’