পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন। ২০০২ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষা এবং সিয়েরা লিওনকে জড়িয়ে একটি তথ্য সামনে আসে। দাবি করা হয়, সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা বা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বা সরকারি ভাষা বা দাপ্তরিক ভাষা বাংলা।
এই দাবি এতটাই জোরালো যে মূলধারার গণমাধ্যম, বিভিন্ন মাধ্যমের ওয়েবসাইট, স্কুলের পাঠ্যবই, এমনকি বিসিএসের প্রশ্নেও এই দাবিটি প্রচার হয়ে আসছে।
এই দাবির প্রেক্ষিতে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার টিম দীর্ঘ অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, বাংলা সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় সরকারি, দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রভাষা নয়; বরং দেশটির একমাত্র সরকারি ভাষা হলো ইংরেজি।
সিয়েরা লিওনে ক্রিও, লিম্বা, মেন্দে, এবং তেমনে সহ আরও কয়েকটি ভাষা প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ক্রিও সর্বজনীন ভাষা হিসেবে প্রচলিত।
আলোচিত দাবিটির ব্যাপকতা বিবেচনায় রিউমর স্ক্যানার টিম দীর্ঘ সময় নিয়ে এই কাজটি করেছে। এই সময়ে বিশ্লেষণ করা হয় দেশি-বিদেশি অর্ধশতাধিক গবেষণা প্রতিবেদন। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত দাবির সূত্রও খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
দাবিটির মূল সূত্র খুঁজতে বাংলাদেশ এবং সিয়েরা লিওনের সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে রিউমর স্ক্যানার।
দাবির সূত্রপাত?
এই দাবির সূত্র খুঁজতে গিয়ে ২০০২ সালের ২৭ ডিসেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ভয়েস অফ আমেরিকা’র বাংলা সংস্করণের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, “সিয়েরা লিওনের সরকার দেশের অন্যান্য সরকারি ভাষাগুলোর সঙ্গে বাংলাকেও একটি সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ডিসেম্বরের ১২ তারিখে দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ একটি ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পুনর্নির্মিত সড়কের উদ্বোধন করার সময় এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা করেন। এই সড়কটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর জাতিসংঘের সহায়তায় পুনর্নির্মাণ করেছে।”
প্রায় একই তথ্য পাওয়া যায় ভারতের কলকাতা ভিত্তিক ইংরেজি পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনেও।
২০০২ সালের ২৯ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দেশটিতে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সিয়েরা লিওন বাংলাকে একটি সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ তেজান কাব্বাহ পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নির্মিত ৫৪-কিলোমিটার একটি দীর্ঘ রাস্তা উদ্বোধনের সময় এই ঘোষণা দেন।”
এএফপির বরাতে ২০০২ সালের ২৯ ডিসেম্বর একই তথ্য প্রকাশ করেছিল পাকিস্তানের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ডেইলি টাইমস।
সে বছরের ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশের চারটি পত্রিকা ইত্তেফাক, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং জনকণ্ঠে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, “সিয়েরা লিওন সরকার বাংলা ভাষাকে দেশটির অন্যান্য অফিসিয়াল ভাষার মতো সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।”
২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি বাসসের বরাতে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সংবাদে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের একটি বক্তব্য পাওয়া যায়। তার বক্তব্যটি এসেছে এভাবে, “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সৈন্যরা সিয়েরা লিওনের তিনটি প্রদেশকে যুক্ত করে এমন একটি নতুন সড়ক নির্মাণ করেছে। এ ছাড়াও, সিয়েরা লিওনের সদ্য নির্বাচিত সরকার বাংলা ভাষাকে দেশটির একটি সরকারি ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।”
জিওগ্রাফি বিষয়ক শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাসে সিয়েরা লিওনের ভাষা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সিয়েরা লিওন বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে, সিয়েরা লিওনের বাসিন্দারা এই ভাষা ব্যবহার করে না যেহেতু, এটি বাংলা ভাষার জন্য কেবল একটি অনারারি বা সম্মানজনক মর্যাদা।
কমনওয়েলথ চেম্বার অব কমার্সের ওয়েবসাইটের এক নিবন্ধেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
একই তথ্য পাওয়া যায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত সিয়েরা লিওনের দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।
অর্থাৎ, কিছু সূত্র বলছে- প্রেসিডেন্ট কাব্বাহ বাংলাকে সিয়েরা লিওনের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অপরদিকে কিছু সূত্র দাবি করে, বাংলাকে সিয়েরা লিওনের অনারারি ল্যাংগুয়েজ অর্থাৎ সম্মানজনক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
সিয়েরা লিওনের ভাষা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
দেশটির ভাষা সম্পর্কে জানা যায়, দেশটির সরকারি ভাষা ইংরেজি। তবে সরকারি ভাষা হলেও এর নিয়মিত ব্যবহার শিক্ষিত সংখ্যালঘুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মেন্দে দক্ষিণাঞ্চলে এবং তেমনে উত্তরাঞ্চলে প্রধান কথ্য ভাষা। ক্রিও দেশটির লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা বা যোগাযোগের সাধারণ ভাষা। ক্রিও ভাষা দেশটির মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের প্রধান ভাষা হলেও ৯৫ শতাংশ মানুষ এটি বুঝতে পারে। লেবানিজ ব্যবসায়ী এবং ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে আরবি ভাষা ব্যবহৃত হয়।
আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে যা জানা যাচ্ছে, সিয়েরা লিওনে ইংরেজি হচ্ছে একমাত্র সরকারি ভাষা। যদিও দেশটিতে বিভিন্ন ভাষার প্রচলন রয়েছে, তবে সেগুলো সরকারি মর্যাদা পায়নি। বাংলা ভাষা এবং সিয়েরা লিওন সম্পর্কে বাংলাদেশে প্রচলিত দাবিগুলো শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন, কারণ সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষার কোনো প্রচলন তিনি দেখেননি।
দ্য ইনস্টিটিউট ফর সিয়েরা লিওনিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস-এর (টিআইএসএলএল) প্রোগ্রাম ডিরেক্টর লামিন হেনরি কার্গবো বলেন, বাংলা ভাষা কখনোই সিয়েরা লিওনের সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহার বা ঘোষণা করা হয়নি।
দেশটির প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজন কাব্বাহ বাংলাকে সিয়েরা লিওনের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কার্গবো বলেন, আমি যতদূর জানি প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট শুধু মাত্র উল্লেখ করেছিলেন যে বাংলা ভাষাকে সিয়েরা লিওনের ভাষার মধ্যে বিবেচনা কিংবা অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তবে সেটা সরকারি ভাষা হিসেবে নয়।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের অবদান ও সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট এমন মন্তব্য করেছিলেন।
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলা সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় সরকারি, দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রভাষা দাবিতে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচার হয়ে আসা তথ্যটি সঠিক নয়।