ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

আকর্ষণ বাহারি শরবতে

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৪, ১২:২৩ পিএম
আকর্ষণ বাহারি শরবতে
রাজধানীর বাংলামটর এলাকায় হরেক রকম ফলের শরবত বানিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ছবিটি গতকাল তোলা। খবরের কাগজ

ধনী গরিব শ্রেণিভেদে যে যার সাধ্যমতো সামগ্রী সাজিয়ে ইফতারের সময় হওয়ার অপেক্ষায় বসেন। মাগরিবের আজানের পরপরই ইফতারের সময় বেশির ভাগ রোজাদারই অন্যসব রেখে প্রথমেই হাতে তুলে নেন পানীয়। সাধারণত কেউ পানি পান করেন, কেউবা নেন শরবত। প্রথম চুমুকেই শীতল হয়ে ওঠে সারা দিন রোজা রেখে ক্লান্ত মানুষের প্রাণ। ফলে ইফতারে শরবতের কদর থাকে সব সময়ই। যুগযুগ ধরে দেশে-বিদেশে নানান স্বাদের নানান রেসিপির শরবতের প্রচলন রয়েছে আমাদের দেশে। 

ইফতারের প্রস্তুতি পর্বে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা যায়, টেবিলে টেবিলে সাজানো ইফতার সামগ্রির সঙ্গে রাখা হয়েছে বিভিন্ন স্বাদের শরবত। বড় বড় রেস্তোরাঁগুলোতে আবার এই শরবতের ওপর দেওয়া হয় বিশেষ প্রাধান্য। তাদের মেন্যুতে নজর কাড়ে ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভারের রঙিন শরবত।
 
অন্যদিকে পিছিয়ে নেই পথের ধারের শরবতের দোকানগুলোও। রোজাদারদের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি প্রাণে তুষ্টি জোগাতে ইফতারের ঠিক আগে আগে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে রাস্তার ধারে ছোট ছোট সুস্বাদু পানীয়ের এই দোকানগুলো। 

রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় ঘুরে ইফতারের আগে চোখে পড়ে ছোট এই দোকানগুলোতে তরমুজ, পাকা পেঁপে, আনারসসহ বিভিন্ন দেশি ফল ছোট ছোট টুকরো করে কেটে রাখা। ইফতারের ঠিক আগে আগে ব্লেন্ডারে এসব ফলের শরবত বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন দোকানিরা। বিদেশি ড্রাগন ফল ও স্ট্রবেরিরও শরবত পাওয়া যায় এসব দোকানে। আরও পাওয়া যায় বেলের শরবত, দইয়ের শরবত, লাচ্ছি ও মাঠা। কেউ কেউ আবার বিক্রি করেন তরমুজ দিয়ে বানানো বহুল আলোচিত মহব্বতের শরবত। আবার কোথাওবা বালতি, কোথাও বা কাচের বড় পাত্রে করে  বেচাকেনা চলে নানান ধরনের ভেষজ শরবত। এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন প্যাকেটজাত কোমল পানীয়ের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে শরবত বিক্রি করতে দেখা যায় নগরীর বিভিন্ন রাস্তায়। 

এসব দোকানে ফলের প্রাপ্যতা, দাম ও পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এসব শরবত বিক্রি করা হয় বিভিন্ন দামে। দেশি ফলের শরবত ছোট গ্লাস ২০ থেকে ৩০ টাকা দামে বিক্রি করা হয়। বড় গ্লাস বিক্রি করা হয় ৪০ থেকে ৬০ টাকা দামে। আবার বিদেশি ফলের শরবত ছোট গ্লাসের দাম শুরু হয় ৩০ বা ৪০ টাকা থেকে। বড় গ্লাস ৮০ থেকে ১০০ বা ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। ভেষজ শরবত ২০ থেকে ৬০ টাকা দামে বিক্রি করা হয়। 

পথের পাশে সাধারণত ঘৃতকমল, তোকমা, ইসুবগুলের ভুসির শরবতের প্রাধান্য থাকলেও রেস্তোরাঁয় থাকে বিভিন্ন ফলযোগে বানানো শরবত। এরমধ্যে সবার আগেই থাকে লেবুর শরবত। এরসঙ্গে থাকে মাল্টা, আনারস, কিউই, স্ট্রবেরি, আপেল, প্যাশন ফ্রুট, বেল, কমলা, পেঁপে, ড্রাগন ফ্রুট, তরমুজ, আঙুর, ব্ল্যাক বেরি, ব্লুবেরিসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফলের রসনা তৃপ্ত করা পানীয়। রেস্টুরেন্ট ভেদে এসব শরবত ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০-৮০০ টাকা বা বেশি দামেও বিক্রি করা হয়।  

বড় রেস্তোরাঁগুলোতে সাধারণত এসব শরবত তৈরি করার সময় পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের দিকে খেয়াল রাখা হয়। তবে এসব শরবতের দাম বেশি রাখার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভিড় থাকে পথের ধারের শরবতের দোকানগুলোতেই। কিন্তু পথের ধারে দোকানগুলোতে শরবতের দাম নাগালে থাকলেও এর স্বাস্থ্যগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বেশির ভাগ দোকানগুলোতেই দেখা যায়, ফল কাটার সময় হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা হয় না। তা ছাড়া ফল রাখার পাত্র ও কাটার সরঞ্জামও অনেক সময় থাকে অপরিষ্কার। শরবত ঠাণ্ডা অবস্থায় পরিবেশন করার জন্য যে পানি আর বরফ ব্যবহার করা হয়, সে পানি আর বরফের বিশুদ্ধতা নিয়েও থাকে সংশয়।

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আজ ইউনেসকো স্বীকৃত ৩ ঐতিহ্য

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩৩ পিএম
ইউনেসকো স্বীকৃত ৩ ঐতিহ্য
নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। ছবি : সংগৃহীত

আজ বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস। একটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধারণ করে চলে। এসব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও এর তাৎপর্য তুলে ধরতে প্রতিবছর ১৮ এপ্রিল পালন করা হয় বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস। ১৯৮২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস’ তিউনিশিয়ায় একটি আলোচনা সভায় ১৮ এপ্রিলকে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে দিনটি ‘বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস’ হিসেবে ইউনেসকোর স্বীকৃতি পায়। এই দিনটি পালন করার উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্থান সংরক্ষণ ও সুরক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। 

প্রতিবছর এই দিনটি পালন করার জন্য নির্দিষ্ট একটি থিম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।  এ বছর বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের থিমটি হলো ‘ডিসকভার অ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স ডাইভারসিটি’। প্রতিবছর এই থিম নির্ধারণ করে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বাধীন সেন খবরের কাগজকে বলেন, ইউনেসকো এ পর্যন্ত ১৬৭টি দেশে মোট ১১৫৫টি স্মৃতিস্তম্ভকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে মনোনীত করেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলো নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বাগেরহাটের মসজিদ শহর এবং সুন্দরবন। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও বাগেরহাট মসজিদ শহর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত প্রত্নস্থল। অপরদিকে সুন্দরবন বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।

এ ছাড়া বিশ্বের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জায়গা পেয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং শীতলপাটি, ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকেও ইউনেসকো আওতাভুক্ত করেছে ২০১৭ সালে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি বিশ্বের দেশগুলোকে পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করেছে। এগুলো হলো- ১. আফ্রিকা ও আরব অঞ্চল (মধ্যপ্রাচ্যসহ) ২. এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া এ অঞ্চলভুক্ত) ৩. ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা ৪. ল্যাটিন আমেরিকা ও ৫. ক্যারিবীয় অঞ্চল। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির অনুমোদনক্রমে প্রতিবছরই নতুন নতুন ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত হয়। আবার যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হলে ঘোষিত ঐতিহ্যস্থল তালিকা থেকে বাদ হয়ে যেতে পারে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি বিশ্বের ২১টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত। কমিটি চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। এ কমিটি পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যস্থলগুলোর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারক করে। ঘোষিত ঐতিহ্যগুলোকে ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ফান্ড থেকে অর্থায়ন করা হয়। অর্থায়নের এই সিদ্ধান্ত ১৯৭২ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর বিশেষ সভায় গৃহীত হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৮৬টি দেশ ‘কনসার্নিং দ্য প্রোটেকশন অব ওয়ার্ল্ড কালচারাল অ্যান্ড নেচারাল হেরিটেজ কনভেনশনে’ স্বাক্ষর করেছে।

এসব ঐতিহ্যকে জানার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর অনেক পর্যটক বাংলাদেশে আসছে। যা একটি দেশের পরিচিতি এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যের প্রতীক কটিয়াদীর মহামায়া গাছতলা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৪৮ পিএম
বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যের প্রতীক কটিয়াদীর মহামায়া গাছতলা
নববর্ষ উপলক্ষে কটিয়াদীতে শ্রী শ্রী মহামায়া গাছতলার মেলা। ছবি : খবরের কাগজ

বাংলা নববর্ষে ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চলভেদে কিছু ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতি রয়েছে। সেই ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এক এলাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের শ্রদ্ধা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভালবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা সদরের শ্রী শ্রী মহামায়া গাছতলা বেদিটি, উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। 

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বেদিটিকে প্রতিবছরই নতুন সাজে সাজানো হয়। পহেলা বৈশাখের দিন (পঞ্জিকা মতে) সকাল থেকেই এটি হাজারো ভক্ত, পূণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মনের ইচ্ছা পূরণ ও শ্রী শ্রী মা মহামায়া দেবীর কৃপা লাভের আশায় এখানে বিভিন্ন প্রাণী (পাঁঠা, কবুতর) উৎসর্গ করে থাকেন। 

এ মেলা উপলক্ষে এলাকার অনেকেই  আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ জানায়। বাড়িতে বাড়িতে বানানো হয় খই, মুড়কি, নারকেল ও দুধের নাড়ু । নানা ধর্ম-বর্ণের স্থানীয়  মানুষেরা মেলা থেকে কিনে নেন বিভিন্ন জিনিস। 

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও বিভিন্ন গ্রন্থ মতে, মহামায়া হলো হিন্দু দর্শনে বর্ণিত পরমেশ্বরী শক্তি। ঈশ্বর এ মহাশক্তির সাহায্যেই সৃষ্টি, পালন, সংহার, জন্মলীলা প্রভৃতি কাজ করে থাকেন। এ মহাশক্তিকেই দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী প্রভৃতি নামে পূজা করেন ভক্তরা। 

নাগোজীভট্ট টীকা অনুসারে, মহামায়া ‘বিসদৃশ-প্রতীতি-সাধিকা ঈশ্বরশক্তি’। তত্ত্বপ্রকাশিকা টীকা মতে, মহামায়াই হলো ‘অঘটন-ঘটন-পটীয়সী ব্রহ্মাত্মিকা শক্তি’। তিনি শিবকে স্বামীরূপে গ্রহণ করেন। তিনিই দক্ষ কন্যা সতী ও হিমালয়ের কন্যা পার্বতী রূপে জন্ম নেন। 

দেবী ভাগবত গ্রন্থে, ব্রহ্মা নারদকে মহামায়া তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এ গ্রন্থে মহামায়া ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবতী নামে বর্ণিত। শ্রী শ্রী চণ্ডীতে রাজা সুরথ মেধা ঋষির কাছে মহামায়া তত্ত্বব্যাখ্যা জানতে চাইলে, সমগ্র চণ্ডীপুস্তকটির কাহিনির অবতারণা করা হয়। এ গ্রন্থে মোট আটবার মহামায়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বৈষ্ণবেরা মহামায়াকে ভগবান বিষ্ণুর বহিরঙ্গা বলেন।

মহামায়া গাছতলার এ পূজা ও পাঠাবলীর প্রচলন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে লিখিতভাবে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য না জানা গেলেও এলাকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক রতন ঘোষ বলেন, ‘তান্ত্রিক সাধক গগন চন্দ্র মোদকের পূর্ব পুরুষেরা সর্বপ্রথম এই পূজার প্রচলন করেন। পরবর্তীতে এ পূজার মূল তত্ত্বাবধান করেন মৃত নরেন্দ্র চন্দ্র বণিক, মৃত রাম দয়াল ঘোষ, মৃত হীরা লাল সাহা প্রমুখ। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে এলাকার নবীন-প্রবীণেরা এ পূজা আয়োজন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রায় চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এ পূজা উদযাপন হচ্ছে।’

কটিয়াদী পাইলট বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক নিরঞ্জণ বণিক বলেন, ‘আগে এখানে কাঁঠালি বট ছিল। তবে বর্তমানেরটি অশ্বথ বট। পহেলা বৈশাখের পূজা ছাড়াও অমাবস্যা-পূর্ণিমা তিথিতে এখানে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়া। বিধি অনুযায়ী, নিয়মিত পূজার পাশাপাশি কার্তিক মাসে মা মহামায়ার বেদীতে জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজনও করা হয়। এ ছাড়া দীপাবলীতে কালীপূজা এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে হরগৌরি ও শীতলা মায়ের পূজা করা হয়। এ বছরও তিন শতাধিক পাঠা বলী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’ 

বর্তমানে দীলিপ কুমার ও শিক্ষক নিরঞ্জনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মহামায়া গাছতলার পূজার সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। 

এ ছাড়া এলাকার তরুণ শান্ত বণিক ও হিমেল দাস দীর্ঘদিন ধরেই শ্রী শ্রী মা মহামায়া গাছতলার নিয়মিত ত্বত্ত্বাবধান ও পরিচর্যা করে আসছেন।

নববর্ষের উৎসব ছাড়াও স্থানীয় অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নতুন বউকে ঘরে তোলার আগে প্রণাম করতে মা মহামায়ার এ বেদিতে নিয়ে যান। অনেকে ছোট শিশুদের অন্নপ্রাশনের (শিশুর মুখে প্রথম অন্ন দেওয়ার অনুষ্ঠান) আনুষ্ঠানিকতাও এই মহামায়া বেদি তলায় করে থাকেন। 

সনাতন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় শিশু-কিশোরদের কাছেও এটি ধর্মীয় উপাসনালয় ও ঐতিহ্যের অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

সুমিত বণিক/পপি/অমিয়/

পুণ্ড্রনগর: দর্শক-পর্যটকদের জন্য শত বছরেও নিশ্চিত হয়নি সুযোগ-সুবিধা

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২৯ এএম
পুণ্ড্রনগর: দর্শক-পর্যটকদের জন্য শত বছরেও নিশ্চিত হয়নি সুযোগ-সুবিধা
মহাস্থান দুর্গনগরীর বেষ্টনী প্রাচীরের একাংশ। ছবি: খবরের কাগজ

বগুড়ায় পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থান জাদুঘর পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অর্থাভাবসহ নানা সমস্যার কারণে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারছে না প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা এ সাইটটিতে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ দর্শক ও পর্যটক আসেন। কিন্তু তাদের থাকা-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই।

জাদুঘরসংলগ্ন এলাকায় একটি ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণ করা হলেও সেটি চালু হচ্ছে না। হাইকোর্টের নির্দেশে নিরাপত্তার জন্য ২০১১ সালে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় ২০২১ সালের ৬ এপ্রিল। এ অবস্থায় নিরাপত্তার অভাবে এ সাইটের অনেক স্থানেই দর্শক-পর্যটকরা যেতে তেমন একটা উৎসাহবোধ করেন না। 

দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন এ দুর্গনগরী ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট হিসেবে গেজেটভুক্ত করার পর ১৯৬৭ সালে জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। ৪৪টি শোকেসে ৮২৮টি প্রত্নবস্তু বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রাখা হলেও গুদামে পড়ে আছে অন্তত ৩ হাজার প্রত্নবস্তু। জাদুঘরে রাখার স্থান না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সব নিদর্শন পড়ে আছে গুদামে। দর্শকদের একই প্রত্নবস্তু দেখতে হচ্ছে বারবার। 

‘মহাস্থান জাদুঘর’এর কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, দুর্গনগরীর খুব কাছে আন্ততবালা এলাকায় গেস্ট হাউস, ডরমিটরি, পার্কিং, নতুন জাদুঘর নির্মাণসহ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে ৬ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যেই ৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আরও আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। 

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দর্শক পর্যটকদের থাকা খাওয়ার সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে। সাইট এলাকায় নিরাপত্তাও বাড়বে। আগে একটি প্রকল্পের আওতায় ক্যাফেটেরিয়াসহ আরও যেসব অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোও দুর্গনগরীসংলগ্ন এবং দর্শকদের সুবিধার জন্য অনেক আগেই খুলে দেওয়া হয়েছে। 

খবর নিয়ে জানা গেছে, পর্যটন করপোরেশন ক্যাফেটেরিয়া চালু করে লোকসান গুনে প্রায় এক বছর আগে বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় ওই সাইটে এখন খাবার পাবার কোনো সুযোগ আপাতত নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন কয়েক মাস আগে দুর্গনগরীতে বেড়ানোর সময় তার পরিবারের সদস্যরা ইভটিজিংয়ের শিকার হন। জাদুঘরসংশ্লিষ্টরাও জানান, বখাটেদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আবদুল খালেক জানান, বিভিন্ন সময় খননে পাওয়া গেছে মৌর্যপূর্ব, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম আমলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বেশ কয়েক বছর আগে দুর্গনগরীর দক্ষিণ দিকে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকরা খনন করে পান একটি মন্দির, ইটবিছানো রাস্তাসহ আরও অবকাঠামো। এর আগেও দুর্গনগরীর ভেতরে খননের সময় ফ্রান্স ও বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি মাটির প্রাচীন চুলা পান। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাটির এ চুলাটির বয়স অন্তত ২ হাজার ৪০০ বছর অর্থাৎ যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে নির্মিত।

তিনি আরও জানান, খননে পাওয়া গেছে পঞ্চমার্ক কয়েন, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন ইটের দেয়ালসহ অনেক অবকাঠামোর পাশাপাশি নানা ধরনের নিদর্শন। আবদুল খালেক খবরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন সময় দুর্গনগরী ও তার আশেপাশের এলাকায় খননে পাওয়া নিদর্শন থেকে প্রমাণ হয়েছে এখনে মৌর্যপূর্ব, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম আমলের ধারাবাহিকতা আছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইট উন্নয়নে কয়েক বছর আগে এক হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণসহ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুই করা সম্ভব হয়নি অর্থের অভাবে। দেশি-বিদেশ পর্যটকরা মনে করেন প্রায় ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৫ বর্গমিটার মিটার আয়তনের এ সাইটের ভেতর ও বাইরে খননে যা পাওয়া গেছে, সেসব নিদর্শন জাদুঘরে রাখা সম্ভব হলে পর্যটক ও দর্শকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়বে। 

তাদের দাবি, প্রত্নবস্তুর সঙ্গে একটি করে সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকা প্রয়োজন, যাতে দর্শক ও পর্যটকরা সহজেই বুঝতে পারেন নিদর্শনটি কী এবং কোথায় ছিল, কীভাবে পাওয়া গেছে এবং তার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব কতখানি। এখন জাদুঘরে রাখা নিদর্শনগুলোর পাশে শুধু লেখা আছে শতাব্দী ও নাম, যা থেকে ওই নিদর্শন সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। দুর্গনগরীর ভেতর ৩৯৩ একর জমির মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জমি আছে মাত্র ৮৬ একর। বাকি সব জমিই ব্যক্তিগত। 

এ কারণে যার যখন যেমন প্রয়োজন, তিনি সেভাবেই নির্মাণ করছেন তার বাড়িঘর আর অবকাঠামো। অথচ হাইকোর্টের নির্দেশ আছে প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো খনন বা অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। 

স্থানীয় জনসাধারণের অনেকেই এ আদেশ লঙ্ঘন করে নির্মাণ করেছেন অনেক বাড়িঘর। ফলে সাইটটি হারিয়েছে স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য। ফসল আবাদ বা অন্যান্য কারণে খনন করা হচ্ছে সাইটের ভেতরে থাকা জমি।

ইফতারে পছন্দের শীর্ষে বিউটির ফালুদা

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১৯ এএম
ইফতারে পছন্দের শীর্ষে বিউটির ফালুদা
পুরান ঢাকার জনসন রোডের বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদার দোকানে ইফতারের আগ মুহূর্তে মানুষের ভিড়। ছবি : খবরের কাগজ

রমজান মাসে বাঙালির ইফতারে থাকে নানা খাবার। মুখরোচক খাবারের পাশাপাশি তৃপ্তি ও প্রশান্তি দেয় এমন খাবারও অনেকেই রাখেন ইফতারির তালিকায়। সেই তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে বিউটি লাচ্ছি অ্যান্ড ফালুদার ফালুদা। শত বছরের বেশি সময় ধরেই পুরান ঢাকার ভোজনরসিকদের তৃপ্তি মেটাচ্ছে এই ফালুদা।

ফালুদা আমাদের দেশীয় কোনো খাবার নয় তবে বর্তমানে নানা আয়োজনে ফালুদা ছাড়া যেন অর্থহীন মনে হয়। ফালুদার জন্ম পারস্যে। পারস্যের লোকেরা ফালুদেহ নামে একটি ডেজার্ট খেয়ে থাকেন যা সেখানে খুবই বিখ্যাত। ভারতবর্ষে এর আগমন মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে। তবে ফালুদার তীর্থস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়। 

১৯২২ সালে ঢাকার ফুটপাতে প্রথম ফালুদার ব্যবসা শুরু করেন আব্দুল আজিজ মিয়া। চার পুরুষ ধরে চলমান রয়েছে সেই ব্যবসা। জনসন রোড, নাজিরাবাজার, লক্ষ্মীবাজারে শাখা রয়েছে বিউটি লাচ্ছি অ্যান্ড ফালুদার। শুরু থেকেই শরবত ও ফালুদা বিক্রি করে বেশ সুনাম অর্জন করেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি। 

ইফতারের আগে এবং পরে ফালুদার জন্য বিশেষ চাহিদা থাকে ভোজনরসিকদের। ফালুদার জন্য অনেক সময় লম্বা লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয় ক্রেতাদের। স্পেশাল ও রেগুলার দুই ধরনের ফালুদা পাওয়া যায় এখানে। স্পেশালের দাম ১২০ এবং রেগুলার দাম ৯০ টাকা। 

বিউটি লাচ্ছিতে যারা ফালুদা তৈরি করেন তাদের একাধিক কারিগরের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিনিধি। তারা খবরের কাগজকে এর স্বাদের রহস্য জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের এখানে সব ফ্রেশ আইটেম দেওয়া হয় এবং পরিমাণেও বেশি দেওয়া হয়। অন্যদের চেয়ে আমাদের ফালুদার গুণগত মান ভালো এবং আমাদের কারিগররা অনেক বছরের অভিজ্ঞ।’ 

ফালুদাতে সাধারণত জেলি, গোলাপ জল, সেমাই বা নুড্লস, আনার, কিশমিশ, কলা, পেপে, দুধের মিশ্রণ দেওয়া হয়। সঙ্গে থাকে আইসক্রিম ও বরফ। বিউটি লাচ্ছির ফালুদায়, দইয়ের ওপরে ছোট ছোট করে কলা দেওয়া হয়, সঙ্গে দেওয়া হয় বাদাম, কিশমিশ, নুড্লস, সাবুদানা, আনার, আপেল, গোলাপ জল, জেলিসহ বিভিন্ন উপকরণ। রেগুলার আইটেমের সঙ্গে স্পেশাল আইটেমের পার্থক্য শুধু আইসক্রিমে। 

ইফতারের জন্য ফালুদা কিনতে এসেছিলেন কুলুটোলা লেনের বাসিন্দা হাসিব রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানকার ফালুদা প্রায়ই খেয়ে থাকি। অনেক আগে থেকেই ইফতারে আমাদের ফালুদা আইটেম থাকে। মাঝে মাঝে স্টারের ফালুদাও খেয়ে থাকি। 

শাহজাহানপুর থেকে ফালুদা খেতে আসা আনিস আহমেদ বলেন, প্রায়ই ফালুদা খেতে আসি বিউটি লাচ্ছিতে। ইফতার করে বা রাতে বন্ধু-বান্ধব মিলে চলে আসি। 

এ বিষয়ে বিউটি লাচ্ছির লক্ষ্মীবাজার শাখার মালিক জাবেদ হাসান বলেন, আমাদের রোজায় সবকিছু বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে, তবে ফালুদাটা এখন বেশি চলে। আমাদের কারিগররা যত্ন নিয়ে ফালুদা তৈরি করেন। আমরা মান ও গুণ ধরে রেখে এগিয়ে যেতে চাই। 

বাটার মোড়ের জিলাপির কদর ৬৪ বছর ধরে

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৩২ এএম
বাটার মোড়ের জিলাপির কদর ৬৪ বছর ধরে
রাজশাহী নগরীর বাটার মোড় এলাকায় জিলাপি ভাজছেন এক দোকানি। ছবি : খবরের কাগজ

জাঁকজমকপূর্ণ কোনো সাজসজ্জা নেই, নেই কোনো সাইনবোর্ডও। দোকানটি রাজশাহী নগরীর বাটার মোড় এলাকায় বলে এ দোকানের জিলাপির নাম হয়ে গেছে ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’। স্বাদে-গুণে অনন্য ও রসে ভরা মুচমুচে এই জিলাপি সুদীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ফলে নামহীন এই দোকানে সারা বছরই ভিড় লেগে থাকে। রমজানে ইফতারের জন্য এই ভিড় কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে ছোট্ট দোকানটির ভেতরে গিজগিজ করে মানুষ। গরম গরম জিলাপি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়। কড়াই থেকে জিলাপি তোলার ফুরসত পাচ্ছেন না কারিগররা। ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, রাজশাহীতে এ জিলাপির দোকানের যাত্রা ১৯৬০ সালে। ব্যবসা শুরু করেন সোয়েব উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী। তখন থেকেই ধীরে ধীরে প্রচলিত হতে থাকে এ জিলাপি। তখন দোকানটির নাম ছিল রানীবাজার রেস্টুরেন্ট। সাইনবোর্ড নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আর সাইনবোর্ডের দরকার পড়েনি। বাটার মোড়ের জিলাপি নামেই পরিচিতি পায় দোকানটি। তখন এই দোকানের একমাত্র কারিগর ছিলেন যামিনী সাহা। পরে যামিনী সাহার কাছ থেকে জিলাপি বানানো শেখেন তার ছেলে কালিপদ সাহা। ১৯৮০ সালে বাবার মৃত্যুর পর প্রধান কারিগর হন কালিপদ সাহা। কালিপদের হাতে তৈরি এই জিলাপি একসময় রাজশাহী শহরের মানুষের কাছে ‘কালিবাবু’ নামেও পরিচিত হয়ে ওঠে। কালিপদ সাহা মারা যান ২০১৭ সালে। এখন তার দুই শিষ্য সাফাত আলী ও শফিকুল ইসলাম জিলাপি বানাচ্ছেন।

২০০২ সালে সোয়েব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার চার ছেলে সোহেল, শামীম, নাইট ও এমরান আলী নাহিদ বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন। স্বাধীনতার পর রাজশাহী ছিল পদ্মা নদীবিধৌত একটি ছোট্ট শহরের নাম। সেই শহর কালের পরিবর্তনে এখন পরিণত হয়েছে মহানগরে। কিন্তু শহরের পুরোনো সেই জিলাপির ঐতিহ্য আছে আগের মতোই। 

সরেজমিনে দেখা যায়, রমজানে সেই জিলাপির চাহিদা বেড়ে যায়। রোজাদারদের কাছে ইফতারে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’। সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত ও কোনো প্রকার রং ছাড়াই আড়াই প্যাঁচের জিলাপি তৈরি হয় বলে প্রতিদিনের ইফতারের সময় ক্রেতাদের মন টানে। ফলে ছোট্ট দোকানটিতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।

কথা হয় নগরের শিরোইল এলাকা থেকে জিলাপি কিনতে আসা হাসনাত আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বাদ ও ঐতিহ্য মিলেমিশে আছে এই জিলাপিতে। তাই প্রতিবছরই ইফতারের জন্য জিলাপি এখান থেকেই কিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬০। ৩০ বছর বয়স থেকে এই জিলাপি খেয়ে আসছি। এখন ডায়াবেটিসের ভয়ে কম খাই। কিন্তু ইফতারে এই জিলাপি থাকাই লাগে। তা না হলে মনে হয় ইফতারিটা পরিপূর্ণ হলো না।’

বর্তমানে দোকানের মালিকানায় সোয়েব উদ্দিনের ছেলেরা। তাদের মধ্যে দোকানটি দেখাশোনা করেন মো. শামীম। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দাম বাড়ানো হলেও মান ধরে রাখা হয়েছে। গত বছর রোজার সময়েও ১৮০ টাকা কেজিদরে জিলাপি বিক্রি হয়েছে। এখন প্রতি কেজির দাম ২০০ টাকা রাখা হচ্ছে। কারণ জিলাপি তৈরির সব উপাদানের দামই বেড়ে গেছে। তবে কারিগররা মান ধরে রেখে বছরের পর বছর জিলাপি তৈরি করে আসছেন। স্বাদেও কোনো হেরফের নেই। তাই সাধারণ সময়ে দোকানটিতে দিনে ৮০ থেকে ৯০ কেজি জিলাপি বিক্রি হলেও রোজায় তা বেড়ে ২০০ কেজি ছাড়িয়ে যায়।

জিলাপি তৈরির উপাদান সম্পর্কে তিনি বলেন, এতে চালের আটা, ময়দা ও মাষকলাইয়ের আটা ব্যবহার করা হয়। এ উপাদানগুলো পানিতে বিভিন্ন পরিমাণে মিশিয়ে রাখা হয় ৬-৮ ঘণ্টা। আর এর পরই তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী বাটার মোড়ের জিলাপি। তবে ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার করা হয় পামঅয়েল ও ডালডা।

কারিগর সাফাত আলী বলেন, ‘কয়েক ধরনের ময়দা আর ভালো তেল দিয়ে জিলাপি ভাজি। বছরের পর বছর একই কৌশল, একই স্বাদ।’

তিনি আরও জানান, সাধারণ সময় দিনে দুই মণ জিলাপি বিক্রি হয়, এই রোজায় বিক্রি হচ্ছে পাঁচ মণ করে। সকাল ৯টায় কাজ শুরু করি, চলে ইফতারের আগ পর্যন্ত।