মাছ নিয়ে গবেষণায় একের পর এক সাফল্য অর্জন করে চলেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষকরা। দেশীয় যেসব ছোট মাছ বিলুপ্তির তালিকায় চলে গিয়েছিল, সেসব মাছের পোনা সংগ্রহ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছেন তারা। বিলুপ্তপ্রায় অনেক মাছ এখন খামারিরা চাষ করছেন। এতে একদিকে এ খাতে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি মাছেরও দাম কমেছে।
গবেষণার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২০২২ সালে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শাল বাইম মাছের কিছু পোনা উৎপাদনে সফলতা আসে। এখনো পুরোদমে এ নিয়ে গবেষণা চলছে। এ মাছের পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে তা দেশের হ্যাচারিগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। শাল বাইমসহ এ পর্যন্ত ৪০ প্রজাতির মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে হ্যাচারিতে শিং, মাগুর, কই, টেংরা, পাবদা, গুলশা, বৈরালিসহ ১২ প্রজাতির মাছ ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
সরেজমিনে ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহ্যবাহী মেছুয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে দেশীয় প্রজাতির মাছের কমতি নেই। বিলুপ্তির তালিকায় থাকা মাছগুলোও ক্রেতারা ন্যায্য দামে কিনতে পারছেন।
কথা হয় আব্দুস সালাম নামের একজন ক্রেতার সঙ্গে। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘বাজারে দেশীয় মাছের অভাব নেই। বড় মাছগুলোর সঙ্গে ছোট মাছ বিক্রি হচ্ছে। দাম সহনীয় থাকায় আমি নিয়মিত দেশীয় ছোট মাছ কিনতে পারছি।’

সেলিম মিয়া নামের এক বিক্রেতা বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও দেশীয় প্রজাতির মাছ বাজারে বেশি পাওয়া যেত না। আগে এগুলো চাষ হতো না। এখন চাষিরা সেসব মাছ চাষ করায় বাজারে আসছে। এতে কমেছে দাম। আর দাম কমায় খুশি ক্রেতারা।’
বিএফআরআই সূত্র জানায়, দেশে মিঠাপানির ২৬০টি প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ ছিল বিলুপ্তপ্রায়। গবেষণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ৪০ প্রজাতির মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুর থেকে ৮৮ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে বিএফআরআইয়ে অবস্থিত ‘লাইভ জিন ব্যাংকে’ তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। সব দেশীয় মাছকে পর্যায়ক্রমে খাবার টেবিলে ফেরানো হবে।
বিজ্ঞানীরা জানান, দেশীয় ছোট মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে এবং রক্তশূন্যতা, গলগন্ড, অন্ধত্ব প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন, অতি আহরণসহ নানাবিধ কারণে মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়ায় অনেক মাছ ছিল বিলুপ্তপ্রায়।
বিএফআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ডুরিন আখতার জাহান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেকোনো প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফলভাবে সম্পন্ন হলেও চাষাবাদের আওতায় আনতে অনেক সময় লাগে। পোনা উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের গবেষণা চলমান রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় আরও কয়েকটি মাছের কৃত্রিম প্রজনন দ্রুতই সম্পন্ন হবে।’

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বলেন, “আমাদের এখানে লাইভ ‘জিন ব্যাংক’ রয়েছে। দেশীয় মাছ সংগ্রহ করে এই ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে ময়মনসিংহ কেন্দ্রের স্বাদু পানি ছা্ড়াও বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। সব দেশীয় মাছের প্রজনন সম্পন্ন করতে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র বলেন, ‘গবেষণার পাশাপাশি এখন কয়েক প্রজাতির মাছের প্রচুর পোনা উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। যাতে বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলো সারা দেশে চাষাবাদ হয়। চাষাবাদ বাড়লে ক্রেতারা কম দামে এসব মাছ কিনতে পারবেন।’


