বিশ্বের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ হোমিনিন জীবাশ্ম ‘লিটল ফুট’ মানুষের পূর্বপুরুষের সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রজাতি হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা মানব বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার স্টার্কফন্টেইন গুহা থেকে প্রথম এর পায়ের ছোট হাড় আবিষ্কৃত হয়। সেই সূত্র ধরে এর নাম দেওয়া হয় ‘লিটল ফুট’। দীর্ঘ ২০ বছরের প্রচেষ্টায় জোহানেসবার্গের সেই গুহা থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার করা হয় প্রায় পূর্ণাঙ্গ এই কঙ্কালটি। এর পর ২০১৭ সালে প্রথমবার এটি জনসমক্ষে আনা হয়।
দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ‘লিটল ফুট’ পরিচিত কোনো প্রজাতির অংশ। এই খননকাজের নেতৃত্ব দেওয়া জোহানেসবার্গের উইটওয়াটারসরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোনাল্ড ক্লার্ক দাবি করেছিলেন, এটি ‘অস্ট্রালোপিথেকাস প্রোমিথিউস’ প্রজাতির। অন্যদিকে, অনেক বিজ্ঞানী মনে করতেন এটি ‘অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস’ প্রজাতির অন্তর্গত। উল্লেখ্য, ‘অস্ট্রালোপিথেকাস’ শব্দের অর্থ ‘দক্ষিণের বানর’। এই প্রাণীরা প্রায় ৪২ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় বসবাস করত।
‘আমেরিকান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত অস্ট্রেলীয় গবেষকদের নতুন একটি গবেষণা এই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, লিটল ফুটের বৈশিষ্ট্য পূর্বের কোনো প্রজাতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। গবেষণার প্রধান লেখক ও মেলবোর্নের লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ফেলো ড. জেস মার্টিন বলেন, ‘আমরা মনে করছি এটি মানুষের পূর্বপুরুষের সম্পূর্ণ অজানা ও অনাবিষ্কৃত একটি প্রজাতি। এটি দেখতে অস্ট্রালোপিথেকাস প্রোমিথিউস প্রজাতির মতো নয়, আবার আফ্রিকানাসের অন্যান্য নমুনার সঙ্গেও এর মিল নেই।’
গবেষকরা লিটল ফুটের সঙ্গে পরিচিত প্রজাতির প্রধান পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন খুলির পেছনের অংশে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নুকাল প্লেন’ বলা হয়। ড. মার্টিনের মতে, বিবর্তনের ধারায় খুলির এই অংশটি সাধারণত খুব ধীরে পরিবর্তিত হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘যদি খুলির নিচের অংশে কোনো সুনির্দিষ্ট পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তা ভিন্ন প্রজাতির লক্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। লিটল ফুটের ক্ষেত্রে আমরা যত পার্থক্য পেয়েছি, তার সব এই অঞ্চলে অবস্থিত।’ স্টার্কফন্টেইনের মতো জায়গায় চোখের সামনে একটি নতুন প্রজাতি এতদিন লুকিয়ে ছিল- বিষয়টিকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
এত বড় আবিষ্কার সত্ত্বেও গবেষকরা নতুন এই প্রজাতির কোনো আনুষ্ঠানিক নাম দেননি। তারা জানিয়েছেন, যে গবেষক দল দুই দশকের বেশি সময় ধরে এটি উদ্ধারে শ্রম দিয়েছেন, নতুন নামকরণের অধিকার তাদেরই।
লিটল ফুটের বয়স নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। রেডিওমেট্রিক ডেটিং অনুযায়ী এটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার বছরের পুরোনো দাবি করা হলেও, অনেক বিজ্ঞানীর মতে এটি ২৮ লাখ বছরের বেশি পুরোনো নয়। নতুন এই গবেষণা সেই বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করল।
/আবরার জাহিন


