রাজধানীর সিদ্বেশ্বরীতে ১৯৮৯ সালে খুন হন সগিরা মোর্শেদ সালাম (৩৪)। হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন যুগ পর মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য আছে আজ (৮ ফেব্রুয়ারি)। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক মোহাম্মদ আলী হোসাইনের আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে এই আদেশ দেন।
হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘ দিন স্থগিত ছিল। ওই স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ার পর এই মামলার তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের শুরুতে ঘটনার ৩০ বছর পর ঘটনার মূল প্রত্যক্ষদর্শীকে খুঁজে বের করে পুলিশ। যার পরিপ্রেক্ষিতেই এগিয়ে যায় মামলার বিচারিক কার্যক্রম।
মামলাটির তদন্তের জন্য আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর পিবিআই এর তদন্ত দল পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ থেকে মামলার নথি নিয়ে বসে। পরে পুরো ঘটনা বিশ্লেষণে তদন্ত কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ছিনতাইয়ের জন্য প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে কি-না? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে তারা ঘটনাস্থলে একাধিকবার যায়। গিয়ে তারা জানতে পারেন ওই এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে ছিনতাইয়ের জন্য কখনো খুনখারাবি হয়নি।
সবমিলে বিষয়টি ছিনতাই নাকি হত্যাকাণ্ড– তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একমাত্র উপায় ছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজন রিকশাচালক আবদুস সালামতে খুঁজে বের করা। তদন্তকালে যার বয়স ৫৫ বছর। যার রিকশায় করে যাওয়ার সময়ই খুন হন সগিরা মোর্শেদা।
মামলার নথিতে ওই রিকশাচালকের ঠিকানা লেখা ছিল জামালপুর জেলা। কিন্তু কোনো ফোন নাম্বার লেখা ছিল না। পরে পুলিশ তার অবস্থান নির্ণয়ের করতে গিয়ে জানতে পারে যে তিনি ঢাকায় আছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ টানা কয়েক মাস রাজধানীর ভিকারুন্নেসা নূন স্কুলের আশেপাশের রিকশা গ্যারেজগুলোয় প্রবীণ রিকশাচালকদের কাছ থেকে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন। একদিন এক প্রবীণ রিকশাচালক আবদুস সালামের খোঁজ দেন। অবশ্য তিনি তার কোনো ঠিকানা দিতে পারেননি। তবে আবদুস সালাম প্রতিদিন একটি দোকানে আসেন, পুলিশকে ওই রিকশাচালক সেই দোকানের ফোন নম্বরটি দেন। ওই ফোন নম্বরে তদন্ত কর্মকর্তারা যোগাযোগ করলে দোকান কর্মকর্তা জানান আবদুস সালাম তার পাশেই রয়েছেন। পরে ফোনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, ১৯৮৯ সালের ওই ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কিনা। তখন আবদুস সালাম বলেন যে তিনি এ বিষয়ে জানেন। পরে তাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মামলার এই দফা তদন্ত তদারকির দায়িত্বে ছিলেন পিবিআই এর পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন। ঘটনার জট খোলার পর গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানান তিনি।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে সগিরা মোরশেদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই রিকশায় করে যাওয়ার পথে তার অলংকার ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় বাধা পেয়ে তাকে গুলি করে দুজন।
মামলাটি ২৮ বছর ফাইলবন্দি থাকার পর ২০১৯ সালের ২৬ জুন মামলার ওপর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারক) ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ ওই নির্দেশ দেন।
উচ্চআদালত অধিকতর তদন্তের জন্য ১১ জুলাই মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দেন। সংস্থাটি ৬০ দিনের মধ্যে মামলাটির অধিকতর তদন্ত শেষ করা এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রিকশাচালক আবদুস সালাম জানান, ঘটনার দিন বিকেলে ভিকারুন্নেসা স্কুলের কাছে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই যুবক তাদের রিকশার পথ আটকে দাঁড়ায়। ওই সময় দুই যুবক দেখতে কেমন ছিলেন তার শারীরিক গড়নের বর্ণনা দেন আবদুস সালাম। পরবর্তীতে যা পুলিশের কাজে লাগে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবদুস সালাম জানান, প্রথমে তারা সগিরা মোরশেদের হাতব্যাগটি ছিনিয়ে নেয় এবং তার পরনে থাকা স্বর্ণের বালা ধরে টানাটানি করে। তখন সগিরা তাদের একজনকে দেখে বলেন, ‘আমি আপনাকে চিনি’, এবং তার নামটিও বলেন।
এই কথা বলার পরই অপর যুবক পিস্তল বের করে সগিরাকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোঁড়েন। তখন আশেপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে তারা আরও কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে মৌচাকের দিকে পালিয়ে যায়। আবদুস সালাম তাদেরকে তাড়া করলেও রাস্তার কোনো মানুষ অভিযুক্ত দুজনকে থামাতে আসেননি।
সগিরাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান পথচলতি এক ব্যক্তি। তখন চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পিবিআই এর পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, সগিরা মোরশেদ যেহেতু ছিনতাইকারীকে চিনতে পেরেছেন এবং তার পরপরই তাকে হত্যা করা হয়েছে, এর অর্থ খুনিদের কেউ তার পরিচিত হবেন। এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুজনের যে শারীরিক বর্ণনা দিয়েছিলেন রিকশাচালক তার সঙ্গে আসামি মাহমুদ রেজওয়ান ও মারুফ রেজার মিল পায় পিবিআই। পরে রেজওয়ানকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন। ১৩ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন মারুফ রেজা। পরদিন খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তারা।
পিবিআই এর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পারিবারিক কলহের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার তথ্য। নিহতের স্বামী এবং মামলার বাদী সালাম চৌধুরী তার তিন ভাইয়ের মধ্য সবার কনিষ্ঠ।
চাকরি সূত্রে সালাম তার পরিবারকে নিয়ে ইরাকে থাকলেও ১৯৮৪ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়। তখন থেকে তিনি ঢাকায় রাজারবাগ পেট্রল পাম্পের পাশে পৈত্রিক দোতলা বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। বাসার নীচতলায় বড় ভাই সামসুল আলম চৌধুরী থাকতেন। ওপরের তলায় থাকতেন সালাম দম্পতি ও তাদের তিন মেয়ে।
বাদীর মেঝ ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী স্ত্রী-সন্তানসহ লিবিয়ায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে তারাও দেশে ফিরে আসেন। প্রথমে কিছুদিন ওই বাড়ির নিচ তলায় থাকার পর দ্বিতীয় তলায় তারা সালাম দম্পতির বাসার একটি রুমে সপরিবারে থাকতে শুরু করেন। তখন থেকেই শাহিনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সগিরার কলহ শুরু হয়। মাসছয়েক থাকার পর ১৯৮৬ সালে বাড়ির তৃতীয় তলার কাজ সম্পন্ন হলে ডা. হাসান তার পরিবার নিয়ে তৃতীয় তলায় ওঠেন। ওই সময়ে তৃতীয় তলা হতে আবর্জনা ফেলাসহ আরও নানা কারণে দুই জা’র মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়তেই থাকে।
পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন জানান, শাহিনের দাবি তিনি স্বল্প শিক্ষিত বলে তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হতো। অন্যদিকে বাদী সালাম চৌধুরী বলেন, তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিত, চাকরিজীবী হওয়ায় সবাই ঈর্ষান্বিত।
সালামকে শায়েস্তা করতে হাসান আলী চৌধুরীর ও তার স্ত্রী শাহিন এই হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং ২৫ হাজার টাকায় মারুফ রেজার সঙ্গে চুক্তি করেন বলে জানান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সগিরা যখন মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যান তখন সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় সগিরাকে দিনেদুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মাহমুদুল আলম/অমিয়/