ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

রমজান ও রোজা নিয়ে প্রচলিত ভুল

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:০০ এএম
রমজান ও রোজা নিয়ে প্রচলিত ভুল
প্রতীকী ছবি। ইন্টারনেট

রমজান মাসে আমল-ইবাদতের প্রতি মুমিন-মুসলমানদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি থাকে। তদুপরি সাধারণ সময়ের মতো পবিত্র এ মাসেও নানাবিধ ভুলত্রুটি হয়ে যায়। রমজান ও রোজা নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুলের কথা ও সঠিক সমাধান তুলে ধরা হলো—

১. অনেকেই মনে করেন, রোজার নিয়ত মুখে আরবিতে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক। আরবিতে প্রচলিত নিয়ত মুখে উচ্চারণ না করলে রোজা সহিহ হবে না—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রোজার জন্য মৌখিক নিয়ত জরুরি নয়; বরং অন্তরে রোজার সংকল্প করাই যথেষ্ট। (আলবাহরুর রায়েক, ২/২৫৯)

২. কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়, রোজাদারের খাবারের কোনো হিসাব হবে না। এটি একটি ভুল কথা। খাবারের হিসাব বলতে সাধারণত খাবারের অপচয় বোঝায়। আর কোরআন-হাদিসে এমন কোনো কথা নেই—রোজাদার যদি খাবারের অপচয় করে তাহলে তার কোনো হিসাব হবে না। যে ব্যক্তিই খাবার বা যেকোনো বস্তুই অপচয় করুক আল্লাহর দরবারে তাকে এর হিসাব দিতে হবে। 

৩. অনেকে মনে করেন, জাকাত শুধু রমজান মাসে আদায়যোগ্য আমল। এ ধারণা ঠিক নয়। নেসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর এক চান্দ্রবৎসর অতিবাহিত হলেই তখন সেই সম্পদের জাকাত দেওয়া ফরজ। 

৪. সাহরি ত্বরান্বিত করা এবং ইফতার বিলম্বিত করা অথবা সাহরি না করা অথবা মধ্যরাতে তা খাওয়ার মাধ্যমেই যথেষ্ট মনে করা—এসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকনির্দেশনা ও সুন্নাহ পরিপন্থি। 

৫. রোগীর কষ্ট বা ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখাকে জরুরি ভাবা—এটা ভুল। আল্লাহতায়ালা অসুস্থের জন্য রোজা ভাঙা ও পরবর্তীতে তা কাজা করার অনুমতি দিয়েছেন। (সুরা বাকারা, ১৮৫)

৬. সেহরি অর্থ হলো জাদু বা ম্যাজিক, আর সাহরি হলো রোজা রাখার জন্য সুবহে সাদিকের আগে কিছু খাওয়া বা পান করা। সুতরাং সাহরিকে সেহরি বলা ভুল। সেহরি বলা যাবে না, বলতে বা লিখতে হবে সাহরি। 

৭. ইফতার বিলম্ব করে আজানের জবাব দিতে হবে—এটাকে আবশ্যকীয় মনে করা ভুল। ইফতার তাড়াতাড়ি করতে হবে। (বুখারি, ১৯৫৭)

৮. পানীয় দ্বারা ইফতারি শুরু করাকে জরুরি মনে করা ভুল। ইফতারিতে সুন্নত নিয়ম হলো খেজুর দিয়ে শুরু করা; কারণ তা বরকতময় আর খেজুর যদি না থাকে, তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করা যাবে। (তিরমিজি, ৬৯৫)

৯. রমজানে চোখে সুরমা বা ড্রপ দিলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়—এরূপ ধারণা করা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ সুরমা ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৭/৩৭৯৫)

১০. রমজানের ২৭তম রাতকে নির্দিষ্টভাবে শবে কদর ভাবা ভুল। রমজানের শেষে দশ রাতের বিজোড় রাতে কদর তালাশ করতে হবে। 

১১. রোজাবস্থায় ইনজেকশন, ইনসুলিন বা টিকা গ্রহণ করে রোজা ভেঙে গেছে ধারণা করা—এটি একটি ভুল ধারণা। (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/১৮৬)

১২. অনিচ্ছায় বমি হয়েছে বিধায় রোজা ভঙ্গ হয়েছে- এরূপ মনে করে রোজা ভেঙে ফেলাটাও রোজা-বিষয়ক প্রচলিত ভুল। (তিরমিজি, ১/১৫৩)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

বর্তমানের গৃহপরিচারিকা ‘ক্রীতদাস’ বা ‘দাসী’র হুকুমভুক্ত নন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৫ পিএম
বর্তমানের গৃহপরিচারিকা ‘ক্রীতদাস’ বা ‘দাসী’র হুকুমভুক্ত নন
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত গৃহপরিচারিকার ছবি।

ইসলাম মানুষের যৌনক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য দুটি বৈধ মাধ্যম অনুমোদন দিয়েছে। একটি হলো বিবাহিত স্ত্রী। অপরটি হলো অধিকারভুক্ত যুদ্ধবন্দিনী অথবা ক্রীতদাসী। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী ও নম্র। যারা বাজে বা বেহুদা কথা-কাজ থেকে দূরে থাকে। যারা তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধির ব্যাপারে কর্মতৎপর হয়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রীদের ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে তারা তিরস্কৃত হবে না।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ১-৬)


বর্তমানে এই অধিকারভুক্ত দাসীর ব্যাপারটা ইসলামের নির্দেশিত কৌশল অনুসারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে আইনগতভাবে এই প্রথাকে একেবারে এই জন্য উচ্ছেদ করা হয়নি, যেন ভবিষ্যতে এই ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হলে অধিকারভুক্ত দাসী দ্বারা উপকৃত হওয়া যেতে পারে। কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় দাস-দাসী রাখার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ক্রমান্বয়ে ইসলাম তাদের ব্যাপারে এমন কৌশল ও যুক্তিময় পথ অবলম্বন করেছে, যাতে তারা সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে পারে এবং দাসপ্রথার প্রবণতা হ্রাস পায়।

দুটি মাধ্যমে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। ১. কোনো কোনো গোত্র এমন ছিল যাদের পুরুষ ও নারীকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। ক্রয় করা বা  বিক্রি হওয়া নারী-পুরুষকেই ক্রীতদাস ও দাসী বলা হয়। মনিবের অধিকার হতো তাদের দ্বারা উপকার অর্জন করা। ২. যুদ্ধে বন্দি হওয়ার মাধ্যমে। কাফেরদের বন্দি নারীদের মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো এবং তারা দাসী হয়ে তাদের সঙ্গে জীবন-যাপন করত। বন্দিনীদের জন্য এটাই ছিল উত্তম ব্যবস্থা। কারণ তাদের সমাজে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলে তাদের মাধ্যমে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হতো। 


ইসলাম দাসপ্রথা বিলোপে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা না করার কারণ বর্ণনায় মিসরীয় লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ মুসআদ ইয়াকুত তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। যথা—১. প্রাচীনকাল থেকে দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসা সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত ছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে আকস্মিকভাবে তা নিষিদ্ধ না করে ইসলাম এমন পন্থা অবলম্বন করেছে যেন ধীরে ধীরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়। ২. তৎকালীন পৃথিবীর সব রাজ্য, সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাসপ্রথার বৈধতার ওপর একমত ছিল। ফলে ইসলামি রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করলেও সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হতো না। ৩. দাসপ্রথা নিষিদ্ধের সঙ্গে অসহায়, বৃদ্ধ ও দুর্বল দাসদের সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষার প্রশ্নও জড়িত ছিল। দাসদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক প্রয়োজন সাধারণত মনিবদের ওপর বর্তায়। ইসলাম দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করলে বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে যেত। তাদের ভেতর বহুসংখ্যক দাস এমন ছিল, যারা নিজের দায়িত্ব গ্রহণে সক্ষম ছিল না। ফলে ইসলাম দাসপ্রথা নিষিদ্ধ না করে দাস-দাসীর অধিকার সংরক্ষণে অধিক মনোযোগী হয়েছে। দাসপ্রথাকে হ্রাস করতে ইসলামের নানামুখী উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—১. সব মানুষের জন্য অভিন্ন মানবিক অধিকার ও মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। ২. দাসমুক্ত করা ইবাদত ঘোষণা করা হয়েছে। ৩. স্বাধীন ব্যক্তিকে দাস বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৪. দাসমুক্তিকে কাফফারা তথা পাপের প্রতিবিধান ঘোষণা করা হয়েছে। ৫. দাসমুক্তি পরকালীন মুক্তির উপলক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে ইত্যাদি। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) নানাভাবে দাসমুক্তির ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো দাস মুক্ত করল, আল্লাহ দাসের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। এমনকি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে লজ্জাস্থান।’ (মুসলিম, ১৫০৯)


উল্লিখিত ক্রীতদাস বা দাসী আর বর্তমান সময়ের গৃহপরিচারিকা এক নয়। বর্তমানে নানান উপায়ে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে ক্রীতদাস বা দাসীসুলভ যেসব আচরণ বা ব্যবহারের কথা শোনা যায়, তা কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়; বরং হারাম। গৃহপরিচারিকা স্বাধীন মানুষ এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করা শ্রমিক। শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ ইসলামের অন্যতম একটি সৌন্দর্য। ইসলাম বৈধ পন্থায় উপার্জন করাকে সবসময় উৎসাহ দেয়। কাজ বড় হোক বা ছোট—বৈধ পন্থায় হলে অবশ্যই তা সম্মানের।

ঠুনকো অভিযোগে শ্রমিককে অত্যাচার-নির্যাতন বা মারধর করার অধিকার কিছুতেই দেয়নি ইসলাম। আবু মাসউদ (রা.) বলেন, “আমি আমার চাকরকে মারধর করছিলাম। আমি পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘সাবধান আবু মাসউদ! তুমি তোমার গোলামের ওপর যতটুকু ক্ষমতা রাখো, আল্লাহ তোমার ওপর এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখেন।’ আমি পেছনে ফিরে দেখি, তিনি আমার প্রাণের নবি। আমি তখন বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাকে আল্লাহর জন্য আজাদ করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি যদি তাকে মুক্ত না করতে; তবে অবশ্যই তোমাকে আগুনে জ্বলতে হতো।” (মুসলিম, ৯২)


রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘এ‍রা (অর্থাৎ চাকর-বাকর, কর্মচারী, ক্রীতদাস ইত্যাদি) তোমাদের ভাই, তোমাদের খেদমতগার। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীন রয়েছে, তাকে যা সে নিজে খায় তা থেকে খেতে দেবে। যা সে নিজে পরে, তাই তাকে পরাবে। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দেবে না, যা তাদের পক্ষে পালন করা অধিক কষ্টকর। আর যদি তাদের ওপর অধিক কষ্টকর কোনো কাজ চাপিয়ে দিয়ে থাক, তবে তাদের সাহায্য করো।’ (বুখারি, ২৫৪৫, মুসলিম, ১৬৬১)

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শাওয়ালের ছয় রোজা

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:০০ এএম
শাওয়ালের ছয় রোজা
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত আরবিতে শাওয়াল লেখা ছবি

শাওয়াল হিজরি বর্ষের দশম মাস। পবিত্র ঈদুল ফিতরের মধ্য দিয়ে এই মাসের সূচনা হয়। এ মাসে ছয়টি রোজা পালনের কথা হাদিসে এসেছে। নির্দিষ্ট কোনো দিন কিংবা তারিখের বাধ্যবাধকতা ছাড়া রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসজুড়ে ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জিত হয়।


শাওয়ালের ছয় রোজা প্রসঙ্গে হাদিসে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে। সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের সব রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করল।’ (মুসলিম, ১১৬৪; তিরমিজি, ৭৫৯; আবু দাউদ, ২৪৩৩)


হাদিসের বর্ণনামতে, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা যথাযথ আদায়ের পর শাওয়াল মাসে ধারাবাহিক বা বিচ্ছিন্নভাবে ছয়টি রোজা রাখে, সে সারা বছর রোজা পালনের সওয়াব পাবে। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাকে অল্পের বিনিময়ে বিপুলসংখ্যক সওয়াব অর্জনের এটি নিশ্চয়ই সুবর্ণ সুযোগ।
কোরআনের সুরা আনয়ামে আল্লাহ বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজের প্রতিদান দশগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।’ (আয়াত, ১৬০)। এ ছাড়াও হাদিস থেকে জানা যায়, প্রতিটি রোজার বিনিময় দশগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। 


অতএব পুরো রমজানে ৩০টি রোজার সওয়াব দশগুণ বেড়ে ১০ মাস বা ৩০০ দিনের সমান হয়। এরপর শাওয়ালের ছয় রোজার দশগুণ ৬০টি রোজা—যা দুই মাসের সমান সওয়াব অর্জিত হয়। এভাবে রমজানে সবগুলো রোজা পূর্ণ করার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখলে খুব সহজে সারা বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। 


রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এ ছয় রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও নির্দেশ দিতেন। সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। (আবু দাউদ, ২৪৩৩) অন্য সাহাবিদের মধ্যে জাবের (রা.), সাওবান (রা.) এবং ইবনে উমর (রা.) থেকেও এ বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।


সাধারণত রমজান মাসজুড়ে রোজা রাখার সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। কিয়ামতের মাঠে এসব ভুলের কারণে যেন রোজার সওয়াবে কোনো অপূর্ণতা না থাকে, সেজন্য শাওয়ালের ছয় রোজা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস থেকে জানা যায়, বিচারের দিন ওজনের পাল্লায় ফরজ ইবাদত যদি অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির নফল ইবাদত থাকলে সেখান থেকে নিয়ে তা পূর্ণ করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ দেবেন। 


বিখ্যাত হাদিসবিশারদ ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজার মধ্যে বিশেষ রহস্য রয়েছে। এই ছয়টি রোজা রমজানের রোজার পরিপূরক। রমজানের রোজায় যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে, শাওয়ালের এই ছয় রোজা সেগুলো দূর করে। ব্যাপারটি যেন ফরজ নামাজের পর সুন্নত ও নফল নামাজের মতো এবং নামাজে ভুল হলে সাজদায়ে সাহু দেওয়ার মতো।’


উল্লেখ্য, শাওয়াল মাসের এ ছয় রোজা পুরুষ ও নারীর জন্য সুন্নত। পুরো শাওয়াল মাসের যে কোনো ছয় দিনে এসব রোজা রাখা যায়। কেউ চাইলে মাসের শুরুতে রাখতে পারে, আবার মাসের মধ্যভাগে বা শেষভাগেও রাখতে পারে। এমনকি একাধারে ছয় দিন অথবা মাঝে বিরতি দিয়ে মোট ছয়টি রোজা রাখা যেতে পারে। 


হাদিস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন, ‘প্রতি মাসে তিন দিন রোজা পালনের মতো শাওয়াল মাসের ছয় রোজাও মুস্তাহাব। কোনো কোনো হাদিসে এই রোজা রমজানের পরপরই রাখার কথা এসেছে।’ এ জন্য তিনি এই ছয়টি রোজা শাওয়াল মাসের শুরুর দিকে পালন করা বেশি পছন্দনীয় মনে করতেন।


সাধারণত পার্থিব কেনাকাটার বেলায় আমরা যেভাবে বিশেষ অফারের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি এবং এ ধরনের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, একইভাবে আখেরাতের অপার্থিব পুণ্যের বেলায়ও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যেসব বিশেষ সুযোগ রয়েছে এবং যেগুলোর 
মাধ্যমে আমরা সীমিত কয়েক দিনের বিনিময়ে সারা বছরের জন্য পুণ্যবান হতে পারি—সেগুলোর প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত। শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জন করার প্রতি বিশেষভাবে সচেতন থাকার মাধ্যমে একজন প্রকৃত ঈমানদার নিজের সর্বময় সাফল্য সুনিশ্চিত করতে পারেন। 

লেখক : অনুবাদক ও গবেষক

 

ইবলিস জিন না ফেরেশতা?

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৫ পিএম
ইবলিস জিন না ফেরেশতা?
আরবিতে 'ইবলিস' লেখা ছবি। ইন্টারনেট

মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহর সৃষ্টিতে ছিল ফেরেশতা ও জিন। ইবলিস আগুনের তৈরি। থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। এই ইবলিস জিন নাকি ফেরেশতা—এ নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। তাদের জন্য এ লেখা কাজে দেবে। 

আল্লাহতায়ালা বলেন, “আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সেজদা করো’; তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল। সে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৪)

কোরআনের এই বর্ণনা থেকে কারও কারও মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, ইবলিসকে কেন ফেরেশতাদের সঙ্গে সেজদা করতে আদেশ করা হলো? ইবলিস কি তাহলে ফেরেশতাদের দলভুক্ত?

ইবলিস জিনদের একজন, তার মৌলিক উপাদান আগুন। ইমাম রাজি (রহ.) তিনটি দলিল উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘ইবলিসের জিন প্রমাণিত হওয়ার জন্য এই দলিলগুলো যথেষ্ট।’ (আত-তাফসিরুল কাবির, ফখরুদ্দিন রাজি, খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৪২৯-৩০) 

এক. ইবলিসকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। কোরআনে এসেছে, ইবলিস বলেছে, ‘আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে (আদমকে) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহতায়ালা) জিনজাতিকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন আগুন থেকে।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ১৫)

আল্লাহ আগুন থেকে জিনদের সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের সৃষ্টির মৌলিক উপাদান আলো, তাই ইবলিস ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর বা আলো থেকে। জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন আগুন থেকে। আর আদম-সৃষ্টির বিবরণ তোমাদের কাছে বলা হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৬)

দুই. ইবলিসের ছেলেমেয়ে আছে, সে বংশবিস্তার করে। ফেরেশতারা এসব বিষয় থেকে মুক্ত। তাদের স্ত্রী-সন্তান নেই। তাদের মধ্যে নেই নারী-পুরুষের বিভাজনও। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি তাকে (ইবলিসকে) এবং তার বংশধরকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করছ?’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫০)

তিন. ফেরেশতারা আল্লাহর সব আদেশ মেনে চলে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তারা (ফেরেশতারা) কখনোই আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না; বরং যেই কাজে তাদের নিয়োজিত করা হয়েছে, সর্বদা সেই কাজই করে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

মানব সৃষ্টির আগে ফেরেশতারাই ছিল সৃষ্টির সেরা। আল্লাহতায়ালা সেই ফেরেশতাদের যখন আদেশ করলেন আদমকে সেজদা করতে, তখন তাদের থেকে নিম্নস্তরের জিনও সেই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহতায়ালা আদমকে সৃষ্টির আগেই ফেরেশতাদের আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং আমি যখন আদমের সৃষ্টি সম্পন্ন করব এবং তার মধ্যে রুহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেও।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ৭২) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা জান্নাতে আদমের প্রতিকৃতি তৈরি করার পর নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রেখে দেন। তখন ইবলিস আদমের মাটির প্রতিকৃতির চারপাশ ঘুরে ঘুরে যখন দেখল এর মধ্যে ফাঁকা আছে। সে বুঝতে পেরেছিল এটা এমন এক সৃষ্টি, যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬১১)

বোঝা গেল সকল ঘটনা ঘটছিল ইবলিসের উপস্থিতিতেই। তাছাড়া যখন আদমের রুহ ফুৎকার দেওয়ার পর সৃষ্টিজগতের সব জ্ঞান দিয়ে সব সৃষ্টিকুলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করলেন এবং ফেরেশতাদের সেজদার আদেশ দিলেন, তখন ইবলিস সেই মজলিসেই উপস্থিত ছিল। তাই ইবলিস ফেরেশতা না হলেও সে ওই আদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। 

আবার আল্লাহ যখন ইবলিসকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘(হে ইবলিস) আমি আদেশ করার পরও কীসে তোমাকে সেজদা থেকে বিরত রাখল।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

উত্তরে সে এটা বলেনি যে, হে আল্লাহ আপনি তো আমাকে আদেশ করেননি, বরং ইবলিস বলেছিল, ‘আমি তার (আদমের) চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে (আদমকে) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

এই কথা থেকেও প্রমাণ হয় স্বয়ং ইবলিসও বুঝেছিল আদমকে সেজদার আদেশে সেও অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কোরআনে অধিকাংশ স্থানে ইবলিসকে ‘শয়তান’ বলে সম্বোধন করেছেন। শয়তান শব্দটি দিয়ে কট্টরভাবে অবাধ্য হওয়াকে বোঝায়। 

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

সুরা ইখলাস পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৪ এএম
সুরা ইখলাস পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
সুরা ইখলাস। ইন্টারনেট

ইসলাম কল্যাণের ধর্ম। ইসলাম মানুষের জন্য সবকিছু সহজ করে দিয়েছে, কঠিন কিছু রাখেনি। অল্প আমলে রেখেছে অধিক সওয়াব। সহজ আমলের সওয়াব বড় করে দিয়েছে। কোরআনের ছোট্ট সুরা ইখলাস। খুব বেশি আয়ান এতে নেই। কিন্তু এর ফজিলত অনেক বেশি। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, “রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক রাতে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করা দুঃসাধ্য মনে করো?’ এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। তারা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে এমনটি করার?’ তিনি বললেন, ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’, অর্থাৎ সুরা ইখলাস কোরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশ।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৭) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা কোরআনকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এর পর ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’-কে করেছেন কোরআনের ভাগসমূহের একটি।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮১১) 

কত সহজ একটি আমল! ছোট্ট একটি সুরা। তেলাওয়াত করতে এক মিনিটও লাগে না। ছোট্ট এই সুরা কোরআনের তিন ভাগের এক ভাগ, কথাটি শুনে সাহাবিরা বিস্মিত হবেন; তা জানতেন রাসুল (সা.)। তিনি একবার বলেছেন, “তোমরা জমায়েত হও, আমি তোমাদের সামনে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করব। ফলে যাদের পক্ষে সম্ভব তারা জমায়েত হলো। এরপর রাসুল (সা.) বের হয়ে এলেন এবং তেলাওয়াত করে আবার ঘরে গেলেন।’ তখন আমাদের একজন অন্যজনকে বলতে লাগল, ‘মনে হয় আসমান থেকে (এখনই) কোনো সংবাদ এসেছে আর সে জন্যই তিনি ঘরে প্রবেশ করেছেন।’ পরে রাসুল (সা.) বের হয়ে এসে বললেন, আমি তোমাদের বলেছিলাম যে, ‘তোমাদের সামনে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করব। শোনো, সুরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।” (মুসলিম, হাদিস: ৮১২) 

সাহাবিরা সুরা ইখলাসের গুরুত্ব বুঝলেন। তারা এটি বেশি করে পাঠ করতেন। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ পড়তে শুনলেন। সে বারবার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। (তিনি মনে করলেন এভাবে বারবার পাঠ করা যথেষ্ট নয়) পরদিন সকালে তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বিষয়টি খুলে বললেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন। এ সুরা হচ্ছে সমগ্র কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৬) 

সুরাটি অসামান্য মূল্যবান হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এই সুরায় আল্লাহর গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসুল (সা.) এক সাহাবিকে একটি মুজাহিদ দলের প্রধান করে জিহাদে পাঠালেন। নামাজে তিনি যখন তার সাথিদের ইমামতি করতেন, তখন সুরা ইখলাস দিয়ে নামাজ শেষ করতেন। মুজাহিদরা সেই অভিযান থেকে ফিরে রাসুল (সা.)-এর খেদমতে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি বললেন, ‘তাকেই জিজ্ঞাসা করো কেন সে এই কাজ করেছে।’ এরপর তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দিলেন, এ সুরায় আল্লাহতায়ালার গুণাবলি রয়েছে। আর তাই এ সুরা তেলাওয়াত আমার বড় পছন্দ।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহতায়ালাও তাকে পছন্দ করেন।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৬)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

ইবলিস কে?

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৫ পিএম
ইবলিস কে?
ইংরেজিতে ‌'ইবলিস' লেখা ছবি। ইন্টারনেট

মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহর সৃষ্টিতে ফেরেশতা ও জিন ছিল। ইবলিস ও ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা বলেন, “যখন আমি ফেরেশতাদের আদেশ করলাম, ‘আদমকে সেজদা করো’; সবাই সেজদা করল, কিন্তু ইবলিস দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করল; ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৪)

কে এই ইবলিস? যে মহান আল্লাহর হুকুম অমান্য করল। আল্লাহ তার পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘সে ছিল জিনদের একজন।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫০) 

ইবলিস ছিল জিন জাতির সদস্য। আগুনে তৈরি। থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। জিনদের আদি পিতা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ইবলিস জিনজাতির পিতা।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তাবরানি: ৬১৭৪) 

ইবলিসকে কোরআন ও হাদিসের অধিকাংশ স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে শয়তান বলে। তবে কখনো কখনো তার অনুসারী মানুষ ও জিনদেরও শয়তান বলা হয়েছে। ইবলিসের আসল নাম ছিল ‘আজাজিল’। অহংকার ও সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় সে আল্লাহতায়ালার দয়া ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত হয়ে যায়। তাই তাকে ইবলিস নাম দেওয়া হয়। কারণ অধিকাংশ মুসলিম ভাষাবিদের মতে, ইবলিস শব্দটি আরবি। আল-ইবলাস শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; অর্থ নিরাশা, ভ্রষ্টতা, গোমরাহি। (লিসানুল আরব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪৩) 

অমুসলিম ভাষাবিদরা মনে করেন, ইবলিস গ্রিক শব্দ ডিয়াবুলুস থেকে এসেছে। এই শব্দ থেকেই ফরাসি ভাষায় Diable এবং ইংরেজিতে Devil শব্দের উৎপত্তি। গ্রিক ভাষায় এর মৌলিক অর্থ কুৎসা রটনাকারী, বিশ্বাসঘাতক। ইবলিস শব্দটি কোরআনে ১১ বার এসেছে। অহংকার ও আদম (আ.)-কে সেজদা না করার বিষয়ে এসেছে ৯ বার।

ইবলিসের আরও কিছু উপনাম আছে, হারিস, আবু লুবাইনা, আবু মুররা, আবু কুরদুস, নায়িল, আবুল জান। ইবলিস আল্লাহ ও ফেরেশতাদের কথা গোপনে শুনতে গেলে, ফেরেশতারা আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে তাকে বিতাড়িত করে দেয়। ইবরাহিম (আ.) মিনা প্রান্তরে ইবলিসকে প্রতিহত করতে পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন, এই জন্য তাকে রজিম বা প্রস্তরনিক্ষিপ্ত বা বিতাড়িত শয়তান বলা হয়। 

প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, “পাপে লিপ্ত হওয়ার আগে ইবলিস শয়তানের নাম ছিল ‘আজাজিল’। সে ছিল পৃথিবীর বাসিন্দা। অধ্যবসায় ও জ্ঞানের দিক থেকে সেই ছিল সবার সেরা।” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪২)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক