ঋতুর রাজা বসন্ত। বসন্তের রূপ, রস, গন্ধ, প্রকৃতি সব কিছুই আকৃষ্ট করে কিশোর ও তরুণদের। বসন্তের সঙ্গে কৈশোরের মিল খুঁজেছেন মুনিরা মাইশা
রঙিন কৈশোর
বসন্তকে বলা হয় উচ্ছ্বাসের ঋতু। বসন্তের আবহাওয়া, প্রকৃতি, রং এসব কিছুই মানুষের মনে জন্ম দেয় আনন্দ। তাই বসন্ত ঋতুতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এ সময় নাচ, গান, বাদ্য-বাজনায় মেতে উঠে ছোট-বড় সবাই। বসন্তের এই উচ্ছ্বাসের রূপ দেখা যায় কিশোর বয়সে। স্বভাবতই কিশোর-কিশোরীরা নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা নিতে আড্ডা, হইচইয়ে মেতে ওঠে ।
কৈশোরের প্রেম
বসন্তকে বলা হয় প্রেম ও ভালোবাসার ঋতু। বাঙালির ভালোবাসা দিবস হিসেবেও পরিচিত পহেলা বসন্ত। কারণ রিক্ত শীতের শেষে প্রকৃতিতে উষ্ণতা নিয়ে আসে বসন্তকাল। সেই উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে। সেখান থেকেই মনে ঘটে প্রেমের সঞ্চার। কোকিলের গান, ফুলের সুবাস আর দখিনা বাতাসও জোগায় প্রেমের জোগান। বসন্ত যেমন প্রেমের উদ্দীপনা নিয়ে আসে তেমনি প্রথম প্রেমের অনুভূতি নিয়ে আসে কৈশোর। বয়ঃসন্ধিতে ছেলে-মেয়েদের শরীর ও মস্তিষ্কে ঘটে যায় হরমোনের এক নাটকীয় পরিবর্তন। এ সময় ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরন, ডোপামিন, এন্ডোরফিন হরমোনের শুধু বিকাশই হয় না। অন্য যেকোনো বয়সের তুলনায় কৈশোরে এই হরমোনগুলোর মাত্রাও সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই কিশোর-কিশোরীরাও উদ্বেলিত হয়ে উঠে বসন্তের মাতাল সমীরণে।
প্রকৃতির বিকাশ
শীতকালজুড়ে প্রকৃতি থাকে রুক্ষ, বিবর্ণ। সূর্যের তাপ ও পানির অভাবে এ সময় ঝরে পড়ে গাছের সব পাতা। বাতাসে মিলে ধূলিকণা আর শুকনো পাতার শব্দ। শীতের পর বসন্ত এসে প্রকৃতিকে দান করে যৌবন। এ সময় পৃথিবী সূর্যের দিকে হেলতে শুরু করে। সূর্যের আলো পেয়ে গাছ ভরে উঠে সবুজ পাতা, রঙবেরঙের ফুল আর সুমিষ্ট ফলের সমারোহে। পূর্ণ হয়ে উঠে প্রকৃতি। তেমনি করে আমাদের শরীর পূর্ণতা পেতে শুরু করে কিশোর বয়সে। কৈশোরে সম্পন্ন হয় শরীরের ৮০ ভাগ হাড়ের গঠন। এ সময় ছেলে-মেয়েদের হাড় ও পেশি দৃঢ় হয়ে উঠে। শরীরের উচ্চতা, গলার স্বর, ত্বক পরিবর্তিত হয়ে পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠতে শুরু করে।
ক্লান্তিহীন কৈশোর
বসন্তের আবহাওয়া হয় নাতিশীতোষ্ণ। অর্থাৎ না শীত না গরম। কাজের সময় শীতের অলসতা আর গরমের ক্লান্তি দুটোই এই ঋতুতে থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এ সময় কাজ করলেও মানুষ সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। অন্য সময়ের তুলনায় বসন্ত ঋতুতে সবাই কর্মোদ্যমী হয়ে উঠে। প্রকৃতিগতভাবেই কৈশোর হলো মানুষের জীবনে বসন্তকাল। বয়ঃসন্ধিকালে আমাদের মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এ সময় শরীরে মেটাবলিজমের পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা, বহির্মুখী কাজে যুক্ত থাকলেও কিশোর-কিশোরীরা সহজে ক্লান্ত হয় না। বরং কৈশোরের কর্মোদ্যমী জীবন শারীরিক, মানসিক বিকাশ ও দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।
কৈশোরে থাকুক চির বসন্ত
বসন্তের প্রেম, উচ্ছ্বাস, পূর্ণতা দিয়েই আমাদের কৈশোরের সময়কে সাজিয়েছে প্রকৃতি। তবুও অনেক সময় কিশোর বয়সে ভর করে বিষণ্নতা, দুর্বলতা, ক্লান্তির ছাপ। এর কারণ কিশোর বয়সে যত্ন ও বোঝাপড়ার অভাব। যেমন বয়ঃসন্ধিতেই শরীরের বেশির ভাগ বিকাশ ঘটে থাকে। এ সময় পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর খাবার না খেলে হাড় এবং মাংসপেশির বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কাজ করতে গেলে ক্লান্তি ও দুর্বলতা কাজ করে। শরীরে হরমোনের ক্রিয়া বেড়ে যাওয়ার কারণেও এ সময় অতিরিক্ত খাবার প্রয়োজন। নাহলে মেজাজ খিটখিটে ও হতাশা অনুভব হতে পারে। আবার কিশোর বয়সের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অনেক সময় আমরা মানসিক টানাপোড়েন, খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। তখন বিষণ্ন ও একাকী অনুভব হয়। তাই কৈশোরে বসন্তকে ধরে রাখতে রুটিন মাফিক জীবন, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া আর দক্ষতামূলক নতুন নতুন কাজ শিখে আনন্দে থাকার এখনই সময়।