আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে এসওয়াতিনির রাজপ্রাসাদে ও রাজ্যে শুরু হয় এক অনন্য উৎসব। রাজ্যজুড়ে তখন শুধু রঙের খেলা, ঢাকের তালে নাচ আর হাজারো তরুণীর কণ্ঠে গাওয়া ঐতিহ্যবাহী সব গান। এ সময়েই আয়োজন করা হয় ‘উমহলাঙ্গা’ বা রিড ডান্স। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ছোট্ট রাজ্যের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপন।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার কুমারী আসে হাতে রিড (এক ধরনের বেতজাত উদ্ভিদ) নিয়ে, মাথায় ফুলের মালা পরে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়। নদী থেকে রিড সংগ্রহ করে রাজমাতাকে উপহার দেয়, যা প্রতীকী ভাবনায় তাদের সতীত্ব, পবিত্রতা ও রাজপরিবারের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ।
রিড ডান্সের উৎপত্তি বহু শতাব্দী আগের। ইতিহাসবিদদের মতে, জুলু রাজা শাকা জাতির সামাজিক সংহতি বজায় রাখা ও নারীদের মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে এই উৎসবের সূচনা করেন।
আরো পড়ুন: গুপ্তচরদের জুতার কৌশল
এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য বলা হয়ে থাকে, তরুণীদের নৈতিকতা বজায় রাখা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যকে জাগিয়ে রাখা। কিন্তু শতবর্ষের এই প্রথা আজ আন্তর্জাতিক সংবাদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কারণ এটি কেবল নাচ-গান বা ঐতিহ্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন রাজা মসওয়াতি তৃতীয়। এসওয়াতিনির এই সম্রাট আফ্রিকার শেষ পূর্ণ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক। তার বাবা রাজা সোবুজা দ্বিতীয়র ছিলেন ৭০ জনেরও বেশি স্ত্রী ও শতাধিক সন্তান। মসওয়াতি তৃতীয়ও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন; তার এখন পর্যন্ত রয়েছে প্রায় ৩০ জন স্ত্রী ও ৩৫ জনেরও বেশি সন্তান!
.jpg)
রিড ড্যান্সের শেষ দিনে রাজপ্রাসাদের সামনে বিশাল নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার তরুণী যখন রাজামঞ্চের সামনে নৃত্য পরিবেশন করে, তখন রাজা রাজকীয় আসনে বসে সেগুলো উপভোগ করেন। এই নাচের মঞ্চ থেকেই রাজা নিজের পরবর্তী স্ত্রী বেছে নেন। তার কয়েকজন স্ত্রী যে রিড ডান্স থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন, তা দেশীয় সংবাদমাধ্যমেও নিশ্চিত করেছে। একবার ১৬ বছর বয়সী এক তরুণীকে বেছে নেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে নারীর স্বাধীনতার পরিপন্থি ও বৈষম্যমূলক প্রথা হিসেবে আখ্যা দেয়।
তবে রাজপরিবারের মতে, রিড ডান্স কোনো সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতীক; একতা, পবিত্রতা ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণের নিদর্শন। তাদের কথা মতে, এটি এমন এক মঞ্চ যেখানে তরুণীরা নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতির গর্ব প্রকাশ করে অবলীলায়। কিন্তু বাইরের দৃষ্টিতে এই উৎসবকে রাজকীয় ক্ষমতা ও বিলাসিতার প্রদর্শন হিসেবে দেখা হয়।
তবুও রিড ডান্স এসওয়াতিনির সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজপ্রাসাদের বিশাল মাঠে যখন হাজারো তরুণী একই ছন্দে নাচে, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, আর দর্শকরা নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে রাজাসনের দিকে; আজ কি রাজা বেছে নেবেন নতুন রানি? এই প্রশ্নটি যতটা রাজনৈতিক, ততটাই সাংস্কৃতিক ও কৌতূহলোদ্দীপক।
বিতর্কের ভেতর দিয়েও রিড ডান্স টিকে আছে এখনও; একদিকে ঐতিহ্যের জৌলুস, অন্যদিকে রাজকীয় রোমান্সের রহস্যময় ছায়া!
তারেক/
.jpg)
.jpg)