দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা। তারা পৃথকভাবে এক একর করে জমিতে দার্জিলিং, চায়না থ্রি, ও মান্দারিন জাতের কমলা চাষ করেছেন। একজন উদ্যোক্তা অপর জনের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে কমলা চাষ শুরু করেন। এতে তারা সফলতা পেয়েছেন। এখন তারা স্থানীয় যুবকদের জন্য এক নতুন আইডল হয়ে উঠেছেন।
দিনাজপুরের আবহাওয়া কমলা চাষের জন্য বেশ অনুকূল, ফলে এই অঞ্চলে কমলার বাম্পার ফলন হয়েছে। কমলার আকৃতি, রং ও তার রসালো স্বাদ ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চায়না থ্রি জাতের কমলা চাষে অসাধারণ সফলতা পেয়েছন এই দুই উদ্যোক্তা। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তারা কমলা চাষ শুরু করেন। এবার তারা প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ফলন পেয়েছেন।
ঘোড়াঘাট উপজেলার নূরজাহানপুর এলাকায় উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম প্রায় এক বিঘা জমিতে এবং উপজেলার নিতাইশা মোড় এলাকায় বদরুল আলম বুলু প্রায় এক একর জমিতে কমলা চাষ করেছেন। তিন বছর আগে, দেশের বিভিন্ন স্থান এবং বিদেশ থেকেও সাত ধরনের কমলার চারা এনে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন তারা। এর মধ্যে দার্জিলিং এবং চায়না থ্রি জাতের কমলার ফলন সবচেয়ে ভালো হয়েছে।
নিজেদের বাগানে চারা উৎপাদন শুরু করার পর তারা বাগানের আকার বাড়িয়েছেন। বর্তমানে তাদের প্রতিটি গাছেই ২০-২৫ কেজি কমলা ধরেছে, যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। সমতল ভূমিতে কমলা চাষ করার ফলে কমলার স্বাদ এবং গুণগত মান যেকোনো পাহাড়ি অঞ্চলের চেয়ে কম নয়, তা প্রত্যেক দর্শনার্থী এবং ক্রেতা দেখেই নিশ্চিত হচ্ছেন।
দর্শনার্থীরা এই কমলা বাগানে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই চারা কিনতে এবং বাগান দেখতে আসছেন। বিশেষ করে ছোট গাছগুলোর মধ্যে কমলা থোকায় থোকায় ঝুলে পড়ছে, যা শিশুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। তারা আনন্দের সঙ্গে গাছ থেকে কমলা ছিঁড়ে খাচ্ছেন। রফিকুল ইসলাম নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলের ফল সমতল ভূমিতে হতে দেখে খুবই ভালো লাগছে। কমলার স্বাদও খুব সুমিষ্ট, তাই চারা কিনতে এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘বাড়ির ছাদে বা পতিত জমিতে কমলা চাষ করতে চান।’
উদ্যোক্তা বদরুল আলম বুলু বলেন, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শ এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখে আমরা দার্জিলিং ও চায়না থ্রি কমলা চাষে উদ্যোগী হয়েছিলাম। এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। প্রথম বছরেই বড় বড় কমলা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, যদি প্রতিটি উপজেলায় এ ধরনের বাগান তৈরি হয়, তাহলে দেশে কমলার চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে এবং বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজনও পড়বে না। বরং আমরা বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।’
উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক পতিত জমি রয়েছে। যদি আমরা এই জমিগুলোতে কমলার চারা রোপণ করি ও সঠিক পরিচর্যা করি, তবে দেশীয় কমলার গুণগত মান বিদেশ থেকে আমদানি করা কমলাকে ছাড়িয়ে যাবে। তা ছাড়া এতে বেকারত্ব কমবে এবং কৃষকদের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘উপজেলায় সাইট্রাস-জাতীয় ফল চাষের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, এই ফলের রোগবালাই কম এবং কৃষকদের এই ফল চাষে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কৃষি অফিস সব সময় কৃষকদের রোগবালাই সম্পর্কিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তাই কৃষকরা এখন সাইট্রাস চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।’