কবির গ্রুপের মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’ গত ১২ মার্চ বাংলাদেশি সময় দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল আগে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় সোমালিয়ান জলদস্যুরা। জাহাজটিতে ২৩ জন নাবিক রয়েছে। তারা অক্ষত অবস্থায় থাকলেও দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। এর আগে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে একই কোম্পানির জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি’ জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। ওই জাহাজে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা নাবিকদের একজন মোহাম্মদ ইদ্রিস।
শুক্রবার (১৫ মার্চ) দুপুরে তার সঙ্গে কথা বলে দৈনিক খবরের কাগজ। এ সময় তিনি তার সে দিনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
৪১ জন ভারী অস্ত্রধারী জলদস্যুদের সামনে ভয় আর আতঙ্ক, পানি সংকটে একমাসের বেশি সময় ধরে গোসল না করা, নিরুপায় হয়ে সাগরের পানি ওয়াশরুমে ব্যবহার করাসহ নানা অভিজ্ঞতার কথা জানান এই নাবিক।
মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, আমরা ২০১০ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে প্রথমে ইন্দোনেশিয়ার একটা বন্দর থেকে মালামাল নিয়ে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। সেখানে জাহাজ নোঙর করি। তারপর সেখান থেকে জাহাজের তেল ও আমাদের প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করি।
এরপর আমরা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ভারত সাগরের পাশে লাক্ষাদ্বীপ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওখানেই দুপুর ৩টার দিকে দুদিক থেকে দুটা বোট এসে আমাদের জাহাজের পাশে চলছিল।
তারপর জলদস্যুরা রেলিং এর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসে। তারা সংখ্যায় ১১ জন ছিল। প্রথমে আমরা তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা ব্যর্থ হই। পরে তারা সাড়ে তিন দিন পর আমাদেরকে সোমালিয়া উপকূলে নিয়ে যায়। সবমিলিয়ে আমরা তিনমাস জিম্মি ছিলাম তাদের কাছে।
তিনি বলেন, আমরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি ছিলাম। আমরা যখন সোমালিয়া উপকূলে পৌছালাম তখন আরও ৩০ জন জলদস্যু আসে। তাদের হাতে একে-৪৭ সহ বিভিন্ন ভারী অস্ত্র ছিল। সবমিলিয়ে ৪১ জন লোকের কাছে আমরা জিম্মি ছিলাম। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমরা ২৫ জন নাবিক কতটা ভয় আর আতঙ্কে সময় পার করেছিলাম। সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। উপকূলে পৌছার পাঁচদিন পরে আমরা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
জলদস্যু আর নাবিকরা মিলেমিশে খাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন কোন একটি বন্দরে নোঙর করি সেখান থেকে জাহাজের জ্বালানি ও খাবার সংগ্রহ করি। তাই আমরা প্রথমদিকে খাবার সংকটে পড়িনি। আবার আমাদের খাবার জলদস্যুরাও খেয়েছে। যখন আমাদের খাবার শেষ হয়ে যায় তখন জলদস্যুরা খাবার সরবরাহ করেছিল। তারা সপ্তাহে দুটা দুম্বা নিয়ে আসতো। একটা আমাদের দিতো, আরেকটা তারা খেতো। জিম্মি হবার দেড় মাসের মাথায় আমাদের জাহাজের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। ফ্রিজ, জেনারেটর সব বন্ধ হয়ে যায়। একটা ইমার্জেন্সি জেনারেটর ছিল সেটা আমরা দিনের বেলা চালিয়ে রান্নার কাজ সারতাম।
স্বচ্ছ পানির অভাবে মাসখানেক গোসল করতে না পারার অভিজ্ঞতার কথা জানান এই নাবিক। তিনি বলেন, আমরা পরিস্কার পানির সংকটে ছিলাম। ফ্রেশ ওয়াটার ট্যাংকে যে অল্প পরিমাণ ভালো পানি ছিল আমরা বোতলে করে এনে অল্প অল্প করে ব্যবহার করতাম। সাগরের পানি আমরা ওয়াশরুমের কাজে ব্যবহার করতাম।
এমনও সময় গেছে নিরুপায় হয়ে আমরা এসির পানিও ব্যবহার করেছি। প্রায় মাসখানেক আমরা গোসলও করতে পারি নি।
জিম্মি নাবিকরা নিরাপদে থাকবে এমন আশ্বাসের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, যারা বর্তমানে জিম্মি হয়েছে তাদের কোন ক্ষতি জলদস্যুরা করবে না। তারা যখন মুক্তিপণ পাওয়ার আশ্বাস পাবে, তখন তারা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে। আমাদের সময় একসাথে ৩০টি জাহাজ জলদস্যুদের জিম্মায় ছিল। কবির গ্রুপ চেষ্টা করে আমাদেরকে তিনমাসের মাথায় ছাড়িয়ে আনে।
সমস্যা হলো, এখান থেকে জলদস্যুদের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ নাই। যতক্ষণ জলদস্যুদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাবে না ততক্ষণ কিছু করা যাবে না। তবে জাহাজটি গতকাল সোমালিয়া উপকূলে নোঙর করেছে। আশা করছি তারা শীঘ্রই যোগাযোগ করবে। কবির গ্রুপ এমন পরিস্থিতির শিকার আগেও হয়েছিল। তারা তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নাবিকদের ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করবে বলে আমার ধারণা।
গত ১২ মার্চ বাংলাদেশি সময় দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে ৬০০ নটিক্যাল মাইল আগে বাংলাদেশি পতাকাবাহী ‘এমভি আবদুল্লাহ’ নামক জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় সোমালিয়ান জলদস্যুরা। জাহাজটি গত ১৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে সোমালিয়া উপকূল থেকে ১৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করে। এরপর ১৪ মার্চ বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় এমভি আবদুল্লাহ সোমালিয়া উপকূল থেকে ৭২ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল। একইদিন দুপুর ১টার দিকে (সোমালিয়ান সময় সকাল ১০টা) জাহাজটি সোমালিয়ার গারাকাদ বন্দরের কাছে নোঙর করে। জাহাজটির আবারও স্থান পরিবর্তন করেছে।
তারেক মাহমুদ/ইসরাত চৈতি/