মহান স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে কুমিল্লার অধিকাংশ বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লায় নানা শ্রেণি-পেশার হাজারও মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেয় পাকবাহিনী। কিন্তু এসব গণকবর ও বধ্যভূমির অধিকাংশই এখনো শনাক্ত কিংবা সংরক্ষণ করা হয়নি। কয়েকটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর কোনোটিতে পশু বিচরণ করতে দেখা যায়। আবার কোথাও কোথাও বধ্যভূমির স্থানগুলো পরিণত হয়েছে ঝোপ-জঙ্গলে।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৫০টি বধ্যভূমি থাকলেও ৩৩টিতেই নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। বছর চারেক আগে জেলার ৯টি বধ্যভূমিতে সরকারি উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ কাজেরও তেমন অগ্রগতি নেই। এরমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র দুটিতে এবং দুটি সংস্কার করা হয়েছে।
জেলা গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৯টি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২০ সালের ৪ নভেম্বর কুমিল্লা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত প্রকল্প পরিচালক বরাবর গণকবর বিষয়ে এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জেলার সদর উপজেলার রসুলপুর (রামনগর কাটানিসার), কৃষ্ণপুর ধনঞ্জয়, লালমাই, শাকতলা, লাকসামের বেলতলী, দেবিদ্বার সদর গণকবর, উদারগাজী বাড়ি, মানরা মুন্সীবাড়ি গণকবরে বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত আছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিঠিতে উল্লেখ করা ৯টি বধ্যভূমির মধ্যে শুধুমাত্র শাকতলার সার্ভে কলেজের পাশের বধ্যভূমি ও লালমাই এলাকার বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ চলমান আছে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভোরে পাক হানাদার বাহিনী যখন শাকতলা-রামমালা এলাকায় আক্রমণ চালায়। তখন ওই এলাকার অনেক মানুষ সার্ভে কলেজের ভেতরে আশ্রয় নেন। তখন পাকিস্তানি সেনারা ব্রাশ ফায়ার করে গণহারে সাধারণ মানুষ ও আনসারদের হত্যা করে। ওই বধ্যভূমিতে রয়েছে কমপক্ষে ৫০০ লোকের সমাধি।
কুমিল্লা সদর উপজেলার রসুলপুর বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও নেই কোনো সীমানা প্রাচীর। সেখানে পাঁচ শতাধিক নিরীহ লোক ও মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে ধরে এনে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে এখানে মাদকের আসর বসে।
লাকসাম রেলওয়ে জংশনের অদূরে একটি বধ্যভূমির অবস্থান। কুমিল্লা জেলার দক্ষিণাংশ, বৃহত্তর নোয়াখালী এবং চাঁদপুরের বাঙালি তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধা, শিশুদের এখানে এনে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হতো। চান্দিনার হারং গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বাড়ির পাশে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গণকবর দেওয়া হয়।
আদর্শ সদর উপজেলার ধনঞ্জয় গ্রামের অন্তত ৩৫ জনকে ব্রাশফায়ার করে গণকবর দেওয়া হয়।
কুমিল্লা সেনানিবাসের বধ্যভূমিতে বাঙালি অফিসার, সৈনিক, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, গৃহবধূ এবং মসজিদের ইমামকেও কবর দেওয়া হয়েছিল। ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অমানুষিক নির্যাতনের পর এই ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টেই হত্যা করে হানাদার বাহিনী। এ বধ্যভূমিতে মোট ১২টি গণসমাধি খনন করে কয়েক হাজার নরকঙ্কাল পাওয়া যায়। সেখানে ‘তুমি রবে নীরবে মম’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
এ ছাড়া জেলার মুদাফফরগঞ্জে একদল রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনা ৩৭ জনকে হত্যা করে। তারা একটি বাড়ি থেকে চার বালিকাকে ধরে এনে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। তিন-চার দিন পর তাদের লাশ পাশের একটি খালে ভাসতে দেখা যায়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা গণকবর। ১৯৭১ সালে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৯ জন বীর যোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহিদ হন। এখানে ৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কবর দেওয়া হয়। বেতিয়ারার শহিদদের সমাধিস্তম্ভ এখন আগের জায়গায় নেই। মহাসড়কের চার লেনের কাজ হওয়ায় সেটি মহাসড়ক থেকে একটু পাশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহমেদ বাবুল বলেন, আমরা দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে যে সকল গণকবর শনাক্ত করতে পেরেছি, এগুলোতে সরকারি উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে। এরমধ্যে শাকতলা সার্ভে কলেজের পাশের বধ্যভূমি ও লালমাই এলাকার বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণকাজ চলমান আছে। ক্রমান্বয়ে বাকিগুলোতেও কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া গত বছর বেলতলী ও রসুলপুর স্মৃতিস্তম্ভ সংস্কার করা হয়েছে।