ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সুলাখালী গ্রামের এন এ চৌধুরী ও নূর-উন-নেছা খানমের ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বর্তমানে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গর্বের পরিবর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তার জেলার অনেকে। ফেনী-৩ আসনে উন্নয়নের নামে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে তাকে নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তারা ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন।
২০০৭ সালে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। ২০০৮ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে।
অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় ট্রাভেল এজেন্সি ও রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও পরদিন জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র নেন এবং পরে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাঝে মধ্যে এলাকায় এলেও প্রটোকলসহ সংক্ষিপ্ত সময় অবস্থান করে দ্রুত ঢাকায় ফিরে যেতেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, তিনি মানুষের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে পাশে থাকেননি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, তার ছোট ভাই সাইফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী হারুন ও ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্য পরিচালিত হতো। টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ইজিপিপি, টিউবওয়েলসহ বিভিন্ন প্রকল্পে শতাংশ হারে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণে হারুন ‘মিস্টার ফিফটি পারসেন্ট’ নামে পরিচিতি পান।
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে সোনাগাজীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে বাস্তবে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যার সঙ্গে এমপির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন জড়িত।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ফেনীর মহীপালে হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় ইতোমধ্যে পুলিশ চার্জশিট দাখিল করেছে।
ফেনী জজ কোটের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, মাসুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুতর। শুধু গ্রেপ্তার নয়, প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ফেনীর মহীপালে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার সঙ্গে মাসুদ চৌধুরী জড়িত। এসব হত্যা মামলায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ‘মাসুদ চৌধুরী একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় অনেক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে তার অনিয়ম সম্পর্কে জানতে পারছি। এখন সময় এসেছে সব কিছু খতিয়ে দেখার এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার।’ এ ছাড়াও তিনি মানব প্রচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া দাবি জানাচ্ছি।
সোনাগাজী উপজেলার চরখোয়াজ গ্রামের আবদুল করিম বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম তিনি বড় কর্মকর্তা ছিলেন, তাই এলাকায় অনেক উন্নয়ন করবেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কোনো পরিবর্তন দেখিনি, বরং নানা অভিযোগই শুনেছি।’
দাগনভূঁঞা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের রহিমা বলেন, ‘একটি কাজের জন্য বারবার ঘুরতে হয়েছে। কোনো সাহায্য পাইনি। এখন শুনছি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে। এসবের সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত।’