বাংলা অনুচ্ছেদ লিখন
সুন্দরবন
সুন্দরবনের নামটি শুনলেই যেন বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের কথা চলে আসে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় পৃথিবীর বৃহত্তম ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ (UNESCO World Heritage Committee, 1997) হিসেবে সুন্দরবন বিশ্ব পরিচিতি লাভ করেছে। চিরসবুজ এ বনের ৬২ শতাংশ বাংলাদেশের খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের সমুদ্রোপকূলে এবং বাকি ৩৮ শতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুন্দরবন অতুলনীয় এবং জীববৈচিত্র্যে অসাধারণ। সুন্দরবন একটি একক ইকো সিস্টেম। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান। বর্তমানে এর আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনে ৪টি প্রশাসনিক রেঞ্জ এবং ১৬টি ফরেস্ট স্টেশন রয়েছে। সুন্দরবনে ‘সুন্দরী’ নামে একপ্রকার গাছ বেশি দেখা যায়। তাই এ বনের নামকরণ করা হয়েছে ‘সুন্দরবন’, এটি সাধারণ মানুষের অভিমত হিসেবে বিবেচিত। ব্রিটিশ ইতিহাস লেখক মি. বিভারিজের মতে, বাখেরগঞ্জ জেলার সুগন্ধা নদীর নাম থেকে সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়েছে। কথিত আছে, ইংরেজ আমলের অনেক আগে পর্যটকরা একে ‘Jungle of Sundry’ নামে অভিহিত করতেন। অনেকের মতে, এই ‘সানড্রি’ শব্দ থেকেই পরবর্তী সময়ে এ বনের নামকরণ করা হয়েছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের অনেক ভূমিকা রয়েছে। গো-খাদ্যের জন্য সুন্দরবনের ফল, ঘরের চাল ও বেড়া তৈরিতে গোলপাতা, রান্নায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও কয়লা, চুনের ভালো উৎস শামুক-ঝিনুক ইত্যাদি কাজে লাগে।
আরো পড়ুন : শহীদ দিবস-এর অনুচ্ছেদ লিখন
সুন্দবনের মধুর ওপর এক শ্রেণির মানুষ জীবিকা নির্ভর করে। মৎস্যজীবীরা সুন্দরবন থেকে মাছ ধরে তা স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। সুন্দরবনের বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে খুলনা নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলস উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া এখানে কিছু পর্যটনশিল্প গড়ে উঠেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সমৃদ্ধ করছে। সুন্দরবনে বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে। ২০১৯ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৩টি প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। এ তালিকায় রয়েছে- রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিতাবাঘ, হাতি, অজগর, কুমির, ঘড়িয়াল ইত্যাদি। সুন্দরবনে যে গভীর অরণ্য ছিল, তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। ফলে সেখানে প্রাণীদের বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উপরন্তু প্রায় প্রতি বছর বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ইত্যাদি কারণেও সুন্দরবনে অনেক পশুপাখি মারা যায়। সুন্দরবন এলাকায় বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ থাকলেও শিকারিদের তৎপরতা মোটেই থেমে নেই। শিকারিদের কারণেও প্রতি বছর অনেক প্রাণী মারা যায়। তাই কেবল আইন করে সুন্দরবনের প্রাণী ও বৃক্ষলতা রক্ষা করার চেষ্টা করলে হবে না। পাশাপাশি আইনের যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে। কেননা সুন্দরবন আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ প্রায় বিপন্ন। তাই আমাদের সবার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা উচিত।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর