শেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

শেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:০২ পিএম
শেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

গত সংখ্যার পর

এসময় হঠাৎ কী ভেবে হালিম শাহের মাইক হাতে নেন কবি হাসান আলী। তার গান এতদিন ধরে হালিম শাহ গেয়ে এসেছেন, গেয়ে মসজিদের জন্য টাকা তুলেছেন, আজ দেখি, কুরবানির এই নির্দয় ভোরে নিজের কণ্ঠে সেই গান কেমন মর্মরিয়া ওঠে। তিনি ধরলেন, কোনো এক উদাসী বিকালে লেখা জীবনের সকালবেলার গান- 

একটা গান গাও জুড়াও এ দেহ মন, 
দিনে দিনে জীবন ক্ষয় আর যদি না পাই সময়,
কেমন হবে গান ছাড়া সেই আঁধার মরণ।

গানে পাই প্রেম সাথি গানে প্রেমের মালা গাঁথি,
গান ছাড়া প্রেম বালা (হায় রে) গান ছাড়া গাঁথা মালা 
শুকাইবে হায় মরুর মতন।

গান দিয়ে শুনি সবি গানে আঁকি প্রেমের ছবি,
গান বিনে শ্রুতি কথা (হায় রে) গান বিনে প্রেম গাঁথা
কে দেখে কে করে শ্রবণ।

স্তব্ধ জনতা, নির্বাক পৃথিবী।
ভোরে, ঈদের দিনের ভোরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন দরিদ্র চালক। হয়তো তাঁর মতোই হতভাগ্য তাঁর গাড়ির যাত্রীরা। ঈদের আনন্দ নেই তাদের ভাগ্যে। তাই কুরবানির খুশি নয়, পরিজনের সঙ্গে ঈদের ছুটিতে মিলনের ব্যাকুল পিয়াসা তাদের চোখেমুখে উপছায়ে পড়ছিল। 

কবি হাসান আলী জানেন, এসব লোকের কাছ থেকে আজ ঈদের চাঁদার বাক্সে কোনো টাকা পড়বে না, তবুও গান তাকে এমন অলৌকিক এক লোকে টেনে নিয়ে গেল, যেখান থেকে মানব লোকে চটজলদি ফিরে আসা সম্ভব নয়। গেয়েই গেলেন তিনি আর চট্টগ্রাম সড়ক অবরুদ্ধ করে মুগ্ধ চালকের সঙ্গে মুগ্ধ যাত্রীর দল রাস্তার ওপর বিহ্বল শুনে গেল সে গান।

গাড়ির লাইন পড়ে গেল মহাসড়কে। কিন্তু কোনো হাঁকডাক নেই। কথা নেই, নিশ্বাস পর্যন্ত নেই। আল ফালাহ মসজিদের ভাঙা মাইক যতটুকু পৌঁছে এক অন্ত্যজ গায়কের গলা বিলোল করে গেল শত শত গ্রামীণ মানুষ- 
একটা গান গাও জুড়াও এ দেহ মন...

গান একসময় বন্ধ হলো, কিন্তু গানের রেশ রইল বহুক্ষণ। দূরপাল্লার গাড়িগুলো চলতে লাগল একসময়। যাত্রীরা, যাদের কাছ থেকে কিছুই আশা করেননি কবি, সে গরিব যাত্রীরাই যতটুকু সামর্থ্য উজাড় করে দিয়ে গেল মসজিদের দানবাক্সে। 

কবি তো দানের জন্য এ গান গাননি। তাই হাত দিলেন না দানবাক্সের টাকায়। ছিটেফোঁটা যা পড়ল তাঁর তহবন্দে তাতেই সন্তুষ্ট থাকলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মনজুড়ে রইল পড়ে এক অপার্থিব শান্তি কপোতের পক্ষ বিধূনন। 

বেলা আরও চড়ে গেলে ক্যানভাসার হালিম শাহ আর গণক হারাধন বাবু এলেন। কিন্তু ঈদের সকালে কি দুপুরে ইনকাম হলো না আর। সকালের সেই আয়টুকুই ভাগযোগ করে নিল তিনজন। 

দুই বন্ধুর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে অল্প টাকায় যতটুকু পারে মেয়ের মসলা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন কবি হাসান আলী। বিকালে আবার আসা যাবে। 

এদিকে দুপুর অবধি বিকালের সেরা রান্নার মানসিক প্রস্তুতিতে কাটল রুকুর। একটু আগে বান্ধবীর থেকে ধার করা মোবাইলে কল দিয়েছেন ‘বাংলা টিভি’র পক্ষ থেকে রুকুর জন্য নির্ধারিত মেন্টর মৃদুল। অদ্ভুত রিনরিনে গলায় বলল মৃদুল- ঈদ মোবারক।
-ঈদ মোবারক।
-ঈদের দিন কেমন কাটছে? 
এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে রুকু? তারা যে গরিব, তাদের বাড়িতে যে কুরবানি হয় না, তা কেমন করে বলে সে। 

কিন্তু আজ বাড়িতে এ লোকটি আসবে। কুরবানির ঈদের মাংস দিয়ে রুকুর রান্না কুরবানির তবারুকের তদারক করবে সে। তারপর রুকুকে নিয়ে, রুকুর রান্নাকে নিয়ে যাবে টিভির প্রতিযোগিতায়- সেরা রাঁধুনি প্রতিযোগিতায়। 
একটু গলা খাঁকারি দিয়ে রুকু বলল, ভালো। আপনাদের কেমন কাটছে। 

আর বলবেন না, প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে দিন কাটছে, এমনিতে আমাদের ঘরে পশু কুরবানির চল নেই। বাবা পশু ক্লেশ নিবারণী সভার সভ্য। তবে কুরবানি হলেও অফিস ছেড়ে আজ বাসায় যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই আপনার তবারুকের মাংসেই আজ হবে আমাদের কুরবানির আহার; বিকালের আগেই আমি চলে আসব। 

ঠিক আছে, বলতেই রুকুর লাইন কেটে গেল। 

-কিন্তু কুরবানির মাংস কোথা থেকে আসবে, কোত্থেকে আসবে মসলা আর কীভাবেই-বা মুখ দেখাবে সেই অচেনা মৃদুল নামের যুবককে- সবকিছু রুকুকে আচ্ছন্ন করে রাখল। তার কানে বাজতে লাগল মৃদুলের শেষ কথা, বিকালের আগেই চলে আসব। 

কিছুক্ষণ পুরোনো সাদা-কালো টিভিতে অনুষ্ঠান দেখল সে, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তার কানে, মনে বাজতে লাগল সেই রিনরিনে গলা, কেমন মানুষ হবে সে গলার অধিকারী? 

তার নিজের তো বহু দিনের চর্চিত গলা। পিতা কবি, গান লেখেন, গানের সুর দেন আর প্রকৃতির উদাস করা মুহূর্তে নিজে গলা মেলান নিজের দেওয়া সুরে। কিন্তু মেয়েকে নিজের সবটুকু উজাড় করে গান শিখিয়েছেন তিনি, যদিও প্রকাশ্যে গান গাওয়ার ব্যাপারে মেয়ের তীব্র অনীহা। সেই সাধিত গলার পরীক্ষায় একজন টিভি উপস্থাপকের সঙ্গে কেমন করে পারবে তুমি রুকাইয়া বেগম, নিজেকে প্রশ্ন করে রুকু।

নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজে দেয় না রুকু। শুধু ভাবে, ভাবতেই থাকে। কিন্তু আচমকা এক অদ্ভুত অনুভবে বিচলিত হয়ে পড়ে সে।

বহুদিন আগের কথা,...
বহুদিনের খর বৈশাখে আদর্শ কলেজের সবুজ প্রকৃতি গৈরিক সন্ন্যাসীর বেশ নিয়েছে। ‘ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল’। প্রকৃতির সঙ্গে ক্যাম্পাসের বাসিন্দারাও এক গণ্ডুষ বৃষ্টির আসায় দিনাতিপাত করছে। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিতা নারী রুকুর তাবৎ প্রেমিককুল বৃষ্টির এন্তেজার করছে যখন শীতল মলয় সমীরে বলবে, কেমন আছ রুকু। 

রুকু এসব জানে। জানে বলে তার সতর্কতায় এতটুকু ঢিলেমি থাকে না। একদিন অনেক অনেক দিনের অপেক্ষার অবসানে বৃষ্টি নেমেছে। রুকুকে কমন রুমে ডেকে নিয়েছেন বাংলার তরুণ শিক্ষক সৈয়দ আফাজ উদ্দিন। রুকু সব জানে, জানে এই শিক্ষকের নয়ন আকাশে তার দর্শনে কেমন করে কামনার বিদ্যুৎ চমকিয়া ওঠে। কিন্তু শিক্ষকের ডাক সে উপেক্ষা করে কীভাবে। রুমে ঢোকার পর শিক্ষক বললেন, বসো রুকু। বসল রুকু। 

কিন্তু শিক্ষক কিছুই বলছেন না। মুহূর্তের পর মুহূর্ত অতিক্রম হলো, কিছুই বললেন না তরুণ শিক্ষক। 
অবশেষে রুকু কোনোমতে বলল, স্যার, আমি কি এখন যেতে পারি? 

শিক্ষক বললেন, যাও। অনেক দিনের রৌদ্রক্লান্ত আমাদের পৃথিবীতে আজ বর্ষা নেমেছে। তাই ভাবলাম এই শুভক্ষণে তোমাকে ডাকি, ডেকে এই বৃষ্টি লগনে তোমার মনের অবস্থার খবর লই। কিন্তু তুমি তো কিছুই বলছ না। 

সুনসান রুমে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল রুকু। এ শিক্ষক মানুষটিকে ভালো করে চেনে সে, কিন্তু আশ্চর্যরকমভাবে তিনি যখন ডাকেন, অন্য একজনের এক অলৌকিক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করে সে। এ কি মনের চোখ, না চর্মচক্ষের দর্শন- তা অবশ্য হলফ করে বলতে পারে না রুকু। তবে সে অলৌকিক মানুষের উপস্থিতিতে তার প্রাণের মধ্যে কেমন করে ওঠে। জগতের সব ভয়-ডরের ঊর্ধ্বে উঠে সে মনভরে পৃথিবীর মানুষজনকে, তাদের নিম্নগামী দৃষ্টিকে উপেক্ষার আবিল চোখে দেখতে থাকে। 

জানালার বাইরে সাপচড়া ছাতিমগাছের ছায়াটি লম্বা হয়ে জানালা গলে রুকুর পায়ের কাছে এসে পড়ে। ঝুম বৃষ্টি শেষে পৃথিবী অন্ধকার। আর আদর্শ কলেজের ছাতিমতলায় সেই একজনের বিমূর্ত ছবি রুকুর চোখে উদ্ভাসিত হয়, সে হাসে, কথা বলে। কিন্তু বহুদূর তো- তাঁর সেই কণ্ঠ রুকুর কান অবধি আসতে পারে না। তবে তাঁর রিনরিনে ধ্বনি তাঁর কর্ণকুহরে প্রতিবিম্বিত হতে থাকে প্রতিক্ষণ। 

আজ বহুদিন পর সেই বহুল শ্রুত কণ্ঠস্বর নিজের কানে প্রত্যক্ষ শুনতে পেয়ে বিমূঢ় হয়ে গেল মেয়েটি। 
‘এও কি সম্ভব!’ নিজের ভেতর তড়পায় সে। 

‘আজ এতদিন পর এই পূতদিবসের পবিত্র লগনে আল্লাহ তাঁর ঈপ্সিত মানুষকে মিলিয়ে দিতে যাচ্ছেন’- এমনতর ভাবনা বিশ বৎসর বর্ষীয়া রুকু নামের মেয়েটিকে আশা এবং আশঙ্কার মাঝামাঝি কোনো মোকামে এতটুকু করে রাখল। 

‘কেমন দেখতে হবে সে? নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক লম্বা হবে। উচ্চশিক্ষিত হবে- সে ব্যাপারে তো সন্দেহ নেই’- ইত্যাকার হাজারো প্রশ্ন তার মস্তিষ্কে জট পাকাতে লাগল। 

কিন্তু সেই জট দীর্ঘ হওয়ার আগেই বাড়ির গেটে কেউ আওয়াজ তুলল। 
গেট খুলতেই এক ঝলক লিলুয়া বাতাসের মতো তার বন্ধু পায়েল তার বুকে ঝুঁকে পড়ে। 
-কি রে, ঈদের দিনে এমন আনমনা যে! যে রাজকুমারীকে আদর্শ কলেজের কোনো ছাত্র-শিক্ষক টলাতে পারেনি, আজ কার কাছে তোর শক্ত হৃদয়কে কুরবানি দিলি? 

রুকুর ভেতরে ভাঙচুর হয়, ‘ও টের পেল কীভাবে?’ তবে মুখে কিছুই বলে না সে; কিন্তু বুঝতে পারে, হয়তো তার চোখে-মুখে ভেতরের ছায়া পড়েছে, তাই মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলে-

ঈদের দিন ফাজলামো করিস না। আমাদের মতো মানুষের প্রেম করার সময় আছে নাকি? 
পায়েল কিছুই বলে না। শুধু স্মিত হাসে। রুকুর কপোলে জমা প্রেমরাগ একজন মেয়ে হয়ে তার চোখ এড়াবে কীভাবে! কিন্তু কিছুই বলে না সে।

কলেজের বাইরে এই বন্ধুটির সঙ্গেই রুকুর যা একটু বন্ধুত্ব। একই গ্রামে বাড়ি ওদের। সম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ে পায়েল। তবে সবচেয়ে বড় কথা, রুকুদের অবস্থা সে জানে, আর জানে বলেই সে এমন কিছু করে না, পাছে রুকুর মনে কষ্ট জমাট বাঁধে। যেমন অন্য ঈদের মতো আজও সে রুকুর জন্য কুরবানির মাংস নিয়ে এসেছে। সে জানে, রুকুরা কুরবানি করে না, করবার সামর্থ্য নেই, তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিবারের মতো বলল-

বাবাকে কতবার বললাম, পশু কুরবানি না করতে, কে শোনে কার কথা। হজরত ইব্রাহিম তো নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, তাঁর শিশু পুত্রকে কুরবানি দিয়েছিলেন, পারলে নিজের ছেলেমেয়েদের কুরবানি দেন, তা কিন্তু করবে না। এ হচ্ছে এ সমাজের কুরবানির নমুনা।

-আমার বাবা যদি তোর বাবার মতো হতো! তুই বুঝবি নাহ; কত বড় ভাগ্যবতী তুই এরকম পশু কুরবানিবিরোধী বাবা পেয়েছিস।

রুকু চুপ করে থাকে। সে জানে, তার প্রাণের এ বন্ধু তাকে ভালোবেসে এসব বলে। একবার তার মনে হয়, পায়েল হয়তো অন্তর থেকেই চায় পশুবিহীন কুরবানি, সে নিজে অবশ্য চায় একদিন সম্পন্ন গৃহস্থ হলে তার বাবাও গ্রামের সেরা কুরবানি দেবে। ভাবনার এ পর্যায়ে নিজেকে পায়েলের কাছে ছোট মনে হয়।

বন্ধুর হাত ধরে সে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। হরীতকী-বহেরা দিয়ে বানানো তার জাদুর চা খাওয়ায়, আর পায়েল বলতে থাকে-

জানিস তো আম্মুর হাতের রান্না একবারের বেশি দুই বার মুখে তোলা যায় না। তবুও প্রতিদিন খেতে হয়। এইবার আম্মুকে বলে কিছু মাংস নিয়ে এসেছি তোকে দিয়ে রাঁধাব বলে। তুই আর আমি মিলে হাত ডুবিয়ে খাব। সাদা চালের রুটিও এনেছি। দারুণ মজা হবে।

রুকু কোনোমতে কান্না চেপে রাখে। এ যে তাকে কুরবানির মাংস দেওয়ার জন্য পায়েলের বাঁধা গল্প সে বেশ বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, ধনী মানুষেরা কুরবানির থালি নিয়ে গরিবের বাড়ি বাড়ি যেভাবে ভিক্ষার মতো বিতরণ করে তার বিপরীতে পায়েলের এই প্রাণান্ত প্রয়াস।

বন্ধুর বিচক্ষণতা ও আন্তরিকতায় সে খুশি হয়। কিন্তু নিজের অসামর্থ্যতা তার ভেতরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। আবার নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলে, হয়তো আসলেই তার মায়ের রান্না খারাপ।

পায়েল চলে গেলে তার আনীত মাংস নিয়ে বসে রুকু। মাংসের পরিমাণ ভালোই, তবে খাসির মাংস নেই। তার রেসিপির জন্য যে খাসির মাংস লাগবে! কী করবে সে এখন।

পরবর্তী দুই-তিন ঘণ্টা ধরে একের পর এক ধনী গৃহের কাজের লোকেরা ডালিতে সাজানো মাংসের ভাগ দিয়ে গেল তাকেসহ গ্রামের দরিদ্রদের!

রুকুর একবার মনে হলো, এক-একজন লোক তাদের দুয়ারে মাংস নিয়ে আসে আর সবার কাছে তাদের দরিদ্রতা, অপরাগত নতুন করে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। খোদা, কথিত আনন্দের ঈদের দিন তোমার বান্দাদের সঙ্গে এমন খেলা কেন খেলো? কেন খোদা?

চলবে...

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব

পঞ্চম পর্ব

ষষ্ঠ পর্ব

সপ্তম পর্ব

অষ্টম পর্ব

নবম পর্ব

দশম পর্ব

একাদশ পর্ব

দ্বাদশ পর্ব

ত্রিয়োদশ পর্ব

এ সপ্তাহের নতুন বই

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ০১:০৩ পিএম
এ সপ্তাহের নতুন বই
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

জ্ঞানসমুদ্রে পিপাশা নিবারণের অন্যতম  হাতিয়ার হলো বই। একটি ভালো বই মানুষের জানাশোনার পরিসরকেই বিস্তৃত  করে না বরং বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ঘটিয়ে জীবনকে বদলে দিতে পারে। কবি ও ছড়াকার রেদোয়ান মাসুদ বলেছেন, ‘বই হচ্ছে জোনাকি পোকার মতো, চারদিকে অন্ধকার অথচ নিজে জ্বলে থাকে।’...

সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা 
যতীন সরকার
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ১৫০; মূল্য: ৪০০ টাকা 

যতীন সরকার এ যুগের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ। অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল ধরে তার শানিত লেখনী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠককে সমৃদ্ধ করে এসেছে। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান এই প্রাবন্ধিকের চিন্তাচর্চার পরিসর সুদূরবিস্তৃত। সংস্কৃতি, সমাজ, সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে তার ক্ষুরধার বিশ্লেষণ পাঠকের সামনে নতুন ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা তার গভীর মননচর্চার উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভাস্বর। এই চিন্তানায়ক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে কোনো সংকটমুক্তির পূর্বশর্ত সাংস্কৃতিক জাগরণ। তিনি শুধু সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা করেননি, সে লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত উপায় নির্দেশ করেছেন। রুচির অবক্ষয়ের এ যুগে চিন্তাউদ্দীপক ও প্রসাদগুণসম্পন্ন প্রবন্ধ দুর্লভ হয়ে উঠেছে। শক্তিমান প্রাবন্ধিক যতীন সরকারের প্রবন্ধসম্ভার বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

লোনা মাটির ফসল 
মৃত্যুঞ্জয় রায় 
শ্রেণি: ফসল ও শাকসবজি চাষ
প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ২৪০; মূল্য: ৬০০ টাকা 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, এ কথা আমরা সবাই জানি। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় তা উপকূলীয় অঞ্চলের নদী-খাল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। তাই সেসব পানি ও জোয়ারের পানি এসব অঞ্চলের মাটিকে প্লাবিত করার ফলে মাটি দিন দিন অধিক লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর, কৃষি ও পরিবেশের ওপর। লোনা মাটিতে ফসল চাষ করতে হলে আগে লোনা মাটি ও লবণাক্ততার কারণ সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেন লবণাক্ততা বাড়ছে তা জানলে লবণাক্ততা কমানোর কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এই গ্রন্থে লোনা মাটি ও লবণাক্ততা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দেওয়া হয়েছে, সে মাটির ব্যবস্থাপনা কী হবে, কী কী ফসল চাষ কীভাবে করা যাবে সেসব বিষয়ে আলোচনা আছে এ গ্রন্থে।...

জীব-জন্তু 
সুকুমার রায়
শ্রেণি: প্রাণী ও জীবজগৎ (বয়স ৪-৮)
প্রকাশনী: গ্রন্থিক প্রকাশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ১০৮; মূল্য: ৩৩০ টাকা 

গরিলা থাকে আফ্রিকার জঙ্গলে। গাছের ডালপালার ছায়ায় সে জঙ্গল দিনদুপুরেও অন্ধকার হয়ে থাকে, সেখানে ভালো করে বাতাস চলে না, জীবজন্তুর সাড়াশব্দ নেই। পাখির গান হয়তো কচিৎ কখনো শোনা যায়। তারই মধ্যে গাছের ডালে বা গাছের তলায় লতাপাতার মাচা বেঁধে গরিলা ফলমূল খেয়ে দিন কাটায়। সে দেশের লোকে পারতপক্ষে সে জঙ্গলে ঢোকে না- কারণ গরিলার মেজাজের তো ঠিক নেই, সে যদি একবার ক্ষেপে দাঁড়ায়, তবে বাঘ ভালুক হাতি তার কাছে কেউই লাগে না। বড় বড় শিকারি, সিংহ বা গন্ডার ধরা যাদের ব্যবসা, তারা পর্যন্ত গরিলার নাম শুনলে এগোতে চায় না। পৃথিবীতে প্রায় সবরকম জানোয়ারকেই মানুষ ধরে খাঁচায় পুরে চিড়িয়াখানায় আটকাতে পেরেছে- কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো বড় গরিলাকে মানুষ ধরতে পারেনি। মাঝে দু-একটা গরিলার ছানা ধরা পড়েছে, কিন্তু তার কোনোটাই বেশি দিন বাঁচেনি।...

সুন্দর মনের সর্বনাশে 
আদিল মাহমুদ 
শ্রেণি: কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশনী: নালন্দা, ঢাকা
প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ৬৪; মূল্য: ২০০ টাকা 

এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতা তাসবি দানার মতো এক সুতোয় গাঁথা। কাছাকাছি সময়ে লেখা। এজন্য কবিতাগুলোর আর আলাদাভাবে নাম দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি কবি। তবে বৃষ্টি বা নদীর বয়ে যাওয়া পানির মতো একের পর এক কবিতা মিল রেখে সাজানো। এখানে আছে আপন আল্পনার আঁকা একটি কাল্পনিক প্রেমের অভ্যর্থনা, আলাপ, পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা এবং তার শেষ পরিণতির উপাখ্যান। প্রেমের অন্তরঙ্গ রূপ এঁকেছেন তিনি নিবিড় সূক্ষ্মতায়। প্রেমানুরাগী মনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে, এমনটাই দেখতে পাবেন কবিতাগুলোর সর্বাঙ্গে।

The Garden
দ্য গার্ডেন
ক্লেয়ার বিমস
প্রকাশক: ডাবলডে, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র    
প্রকাশকাল: ৯ এপ্রিল ২০২৪  
পৃষ্ঠা: ৩০৪; মূল্য: ২২.৭৫ ডলার 

আমেরিকার তরুণ কথাসাহিত্যিক ক্লেয়ার বিমস এ মাসেই প্রকাশ করেছেন তার নতুন উপন্যাস ‘দ্য গার্ডেন’। এ উপন্যাসের কাহিনিতে বলা হয়েছে, প্রধান চরিত্র ইরিন উইলার্ডের চারবার গর্ভপাত হয়েছে। পঞ্চমবারের মতো গর্ভধারণ করার পর তার স্বামীর সঙ্গে যায় বার্কশায়ারের এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। চিকিৎসক দম্পতি তাদের বাড়িতেই চালায় ডক্টরস হল নামের হাসপাতাল। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যায় ইরিন। এখানে আসার পর তার মনে পড়ে যায় অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া এক বাগানের কথা। অন্যদিকে ইরিনের জটিল অবস্থা সারানোর ব্যাপারে চিকিৎসক দম্পতির একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইরিন বুঝতে পারে, ওই বাগানের নিজস্ব শক্তিই তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির পথে অন্তরায়। হাসপাতালের অন্যান্য রোগীর সঙ্গে পরামর্শ করে ইরিন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সবাই মিলে বাগানের অশুভ শক্তির প্রভাব তাদের ওপর থেকে দূর করে ফেলবে।

পাপেট

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:৩৩ পিএম
পাপেট
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নাতালীর বিদায়ের সময় বাবা যখন নাতালীর হাত সাইফের হাতের মধ্যে দিয়ে বলতে লাগলেন, বাবা আমাদের অতি আদরের নাতালীকে এতদিন আমরা খাইয়ে-পরিয়ে শিক্ষাদীক্ষায় বড়ো করেছি। আজ থেকে ওর ভরণ-পোষণের সব দায়িত্ব তোমার কাঁধে তুলে দিলাম। প্রাণভরে দোয়া করি তোমরা সুখী হও। বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে থেকো। স্রষ্টা তোমাদের মঙ্গল করুন। বাবা খুব বেশি কথা বলতে পারলেন না। বাবা নাতালী আর সাইফের হাত ছেড়ে দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। এই ফাঁকে নাতালী এক ঝটকায় সাইফের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। সাইফের মধ্যে ভাবোদয় হয়, নাতালী কী লজ্জা পেয়ে হাত সরিয়ে নিল! নাতালীর অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাইফের চোখে। এত অস্থির হয়ে উঠছে কেন নাতালী? সাইফ গাড়িতে ওঠে। নাতালীর মামা একরকম জোর করেই নাতালীকে গাড়িতে সাইফের পাশে বাসিয়ে দেয়। বরের গাড়ি চলতে থাকে। নিরাপদ দূরুত্বে সরে বসে নাতালী। বর-কনের গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়া অন্য কেউ নেই। সাইফ নাতালীর সান্নিধ্য পেতে চায়। কথা বলতে চায়। পেছনে বরযাত্রীদের গাড়ি। শহরের উপকণ্ঠে নাতালীদের বাড়ি। সেখান থেকে সাইফদের বাড়ির দূরত্ব পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হবে। পাকা রাস্তা। শান্ত নিবিড় রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষাদি দাঁড়িয়ে আছে ছবির মতো। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ দেখা যায়। দিগন্তের কাছে নত হয়ে আছে সুনীল আকাশ। উত্তর দিকে নিঃসঙ্গ একটা রেলস্টেশন। স্টেশনের পাশে কৃঞ্চচূড়া গাছের নিচে ছোট্ট একটা বাজার। বাজারে মানুষের আনাগোনা। নাতালী কথা বলছে না দেখে নাতালীর দিকে আর না তাকিয়ে গাড়ির জনালা দিয়ে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য উপভোগ করছিল সাইফ। বেলা ডুবুডুবু করছে। গরম যেন কমছেই না। এসি ছেড়ে দিয়েছে ড্রাইভার। তারপরও ঘামছে নাতালী। ঘামছে সাইফ। নাতালীর মাথাটা ভারী হয়ে ওঠে। সাইফ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করে নাতালীর সাথে। নাতালী সেই-যে মুখ নিচু করে বসে আছে আর মুখ উপরে তুলছে না। সাইফের দিকে মিঠা নয়নে একনজর দৃষ্টি দেবে তাও দিচ্ছে না। সাইফ ভাবে, এ কেমন মেয়েরে বাবা, বিয়ের ফুল ফোটা থেকে শুরু করে স্বামীর সান্নিধ্য পাওয়া পর্যন্ত মেয়েদের মধ্যে যে এক ধরনের অবেগ-অনুভূতি কাজ করে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না! দুই বছর চাকরি করার পর বিয়ে করলাম। ত্রিশের কোঠায় বয়স। শুনেছিলাম সবুরে মেওয়া ফলে, এখন দেখছি মাকাল ফলতে শুরু করেছে। কোথাও কী ভুল হয়ে গেল! কী সব ছাইভস্ম ভাবছি!

গাড়ি চলছে। সাইফ আবারও নাতালীর গা ঘেষে বসার চেষ্টা করে। হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নেয়। নাতালী তীর্যক নয়নে সাইফের দিকে নেত্রপাত করে। কর্কশ স্বরে বলে, হাত ছেড়ে দিয়ে সরে বসেন। আমার খুব খারাপ লাগছে। কালবিলম্ব না করে দ্রুতই হাত ছেড়ে দিয়ে সরে বসে সাইফ। সাইফ ভাবে, যে গরম পড়ছে তাতে খারাপ তো লাগতেই পারে। তারপরও ভাবনারা পিছু ছাড়ে না সাইফের। নতুন বউ বলে কথা! গলার স্বরটা একটু নিচু করেও তো বলতে পারত কথাটা। বেশ উঁচু গলায় কত সহজেই বলে ফেলল, হাত ছেড়ে দেন। ড্রাইভার কী শুনে ফেলেছে নাতালীর কথা?

সাইফের ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই নাতালীকে নিয়ে বরযাত্রীরা মহা ধুমধামে নিশাপুরে সাইফদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো। নতুন বউ দেখার জন্য গ্রামের নারী-পুরুষ উপচে পড়ে বাড়িতে। প্রাইভেটকার থেকে নামানো হলো বর-কনেকে। শরবত ও মিষ্টি খাইয়ে ছেলে ও ছেলের বউকে বরণ করে নিল সাইফের মা। এসব আয়োজন নাতালী আড়চোখে দেখে। মৃদু হাসে। উৎসুখ চোখজোড়া কী যেন খুঁজে ফেরে। ঈদের পর থেকেই প্রচণ্ড দাবদাহে অস্থির জনজীবন। নাতালীর মুখ ঘেমে বাজে একটা অবস্থা হয়েছে। মেকআপ করা মুখে কোথাও সাদা কোথাও ভেজা কাদার মতো লেপটে আছে বিউটিশিয়ানের পালিশ করা কালারফুল পাউডার। সাইফের মা শাড়ির আঁচল দিয়ে আলতো করে নাতালীর মুখের ঘাম, ভেজা পাউডার মুছে দিল। সাইফের মা-বাবা দুজনই স্কুলশিক্ষক। মা সাইফ আর নাতালীকে বুকের সঙ্গে আগলে নিয়ে একতলা বাড়ির বারান্দায় পাশাপাশি রাখা দুটো চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন নতুন বউ দেখে যাচ্ছে। এ ওর কাছে বলাবলি করছে, দেখো দেখো সাইফের বউ কি সুন্দর! ডাগর ডাগর চোখ। উঁচু নাক। গোলগাল মুখ। না মোটা না পাতলা। বাহ্ বাহ্, দুজনকে খুব মানিয়েছে!

প্রতিবেশী-স্বজনদের মুখে প্রশংসার কথা শুনে সাইফের মা কোমল কণ্ঠে বলেন, তোমরা আমার সাইফ আর বউমার জন্য দোয়া করো আল্লাহ যেন ওদের সংসারজীবন সুখে-শান্তিতে ভরিয়ে দেন। মায়ের এমন স্নিগ্ধ আবেগময় কথা শুনে সাইফের মনটা উতলা হয়। তার মনজুড়ে যেন বিষণ্ন সন্ধ্যা নামে।

ভানু সারা দিন তেজ দেখিয়ে ডুব মেরেছে। জোনাকজ্বলা রাত আসে সবুজ কলার পাতায়। বারান্দায় বসে আছে দুজন। স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাসও গরম। এভাবে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না সাইফের। মন ভালো নেই তার। সারা পথ নতুন বউ একটি কথাও বলেনি। কেবলই নিঝুম অস্থিরতা। বিয়ে বাড়ির ঝারবাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। 

বাড়িতে প্রতিবেশীদের বিচরণ কমে এসেছে। সাইফের চাচাতো ভাবীরা নাতালীকে নিয়ে ঘরে যায়। বিয়ের শাড়ি পাল্টিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাতালী ভাবীদের সঙ্গে কথা বলে। সাইফও উঠে পোশাক পরিবর্তন করে হাত-মুখে পানি দেয়। সাইফের বড় চাচার বড় ছেলের বউ স্থানীয় একটি কলেজের বাংলার লেকচারার। ভীষণ মিশুক। অল্প সময়ে মানুষকে আপন করে নেয়। নাতালীর পাশে বসে সে মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে। নাতালীকে সে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে বলে, তোমার ভাগ্যটা খুব ভালো নাতালী, সাইফের মতো সৎ, স্মার্ট, ভদ্র, বিনয়ী, করিৎকর্মা বর তোমার কপালে জুটেছে। 

ভাবীর কথা শুনে নাতালী চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, তাই! আমার তো কোনো গুণই নেই, তাহলে কেমন করে থাকব আপনার গুণধর দেবরের সঙ্গে!

কে বলেছে তোমার গুণ নেই, তোমার ঠোঁটের যে স্নিগ্ধ হাসি, সেটি দিয়েই তো তুমি সাইফের মাথা খারাপ করে দেবে। কথা বলেতে গেলে দুই গালে টোল পড়ে। এতে যে তোমাকে আরও বেশি মোহনীয় দেখায়, তা কি তুমি জানো?

এসব তো আমার জানার কথা নয়। যে আমাকে ভালোবাসবে সে জানলেই হবে।

তুমি তো সুন্দর করে কথা সাজিয়ে উত্তর করতে পার। শুনেছি তুমি মেধাবী মেয়ে।

আমার মতো বোকা মেয়ে এই ধরাধামে আর একটিও আছে বলে আমার মনে হয় না। বই পড়ে খাতায় লিখে ভালো রেজাল্ট করা এক বিষয় আর জীবনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে চলা অন্য এক বিষয়। জীবনকে সাজাতে পারলাম না। গার্ডিয়ানের হঠকারী সিদ্ধান্তের বলী হয়ে আপনাদের বাড়িতে এলাম। কেন এলাম, কী করব, এখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

মধুময় শুভদিনে এমন করে হতাশার কথা বলছ কেন?

আপনাকে আমি ম্যামই বলি। ম্যাম, মানুষের জীবনে অনেক গল্প থাকে, কিন্তু আমার জীবনের গল্পটা একটু অন্যরকম।
তোমার জীবনের অন্যরকম গল্পটা শুনতে পারি-

আপনাকে বলা যাবে না ম্যাম। কষ্ট পাবেন। সাইফ সাহেবকে সব বলব।
সাইফ কষ্ট পাবে না?
জানি না ম্যাম। তারপরও তাকেই বলতে হবে। 

সাঈফের বড় ভাবী নাতালীর কথা শুনে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ভাবোদয় হয়, একটা সুবোধ ছেলের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে! চোখের বর্ষায় ভিজল ভাবীর মায়াবী মুখের চারপাশ। দিন শেষে ক্লান্তির মধ্যে যে ভালোলাগাটুকু ছিল তাও মুহূর্তে উড়ে যায়। অবস্বাদে ভরে ওঠে মন। তাহলে কী সাইফের এতদিনের লালিত স্বপ্নগুলো সজনে পাতার মতো ঝরে যাবে!

বিয়ে বাড়ির হইচই থেমে গেছে। ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁইছুঁই করছে। একবুক হতাশা নিয়ে ভাবী নাতালীকে বাসর ঘরের খাটে বসিয়ে দিলেন। সাইফকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে গেলেন।

ভাবী উঠোনে নেমে গেলে সাইফ বাসর ঘরের দরোজায় সিটকিনি লাগিয়ে খাটের দিকে এগিয়ে আসে। আবহমানকাল ধরে বাঙালি মেয়েরা খাট থেকে নেমে বরের পা ছুঁয়ে সালাম করে। নাতালী এসব করল না। সাইফ খাটের কিনারে বসতেই নাতালী নড়ে উঠল। সাইফ ভাবে, আনন্দময় দ্বিধা নিশ্চয় নাতালীর মধ্যে কাজ করছে। ঘেমে ভিজে গেছে নাতালীর শরীর। মাথায় ঘোমটা নেই। সাইফ অনেক কথা বলতে চায়। নাতালী আগের মতোই নীরব। সাইফ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। কেউ যদি কথা না বলে তাকে তো বোঝাও মুশকিল। সাইফ বিরক্ত হয়ে বলল, কথা বলবেন না, ঠিক আছে আপনি ঘুমান আমি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমাই। সাইফ ছিটকিনি খুলছিল। নাতালী ডাকল, দাঁড়ান-

সাইফ বলল, আমি তো সেই কখন থেকে দাঁড়িয়েই আছি।
ওই সোফাটায় বসুন।

সাইফ শান্ত ছেলের মতো একবুক আশা নিয়ে বসে। তার বুকটার মধ্যে বাকবাকুম রব ওঠে। এতক্ষণে বিবির মুখে কথা ফুটল!

নাতালী সাইফের মুখের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি আপনাকে কয়েকটি কথা বলব, শুনবেন?
অবশ্যই শুনব। বউয়ের কথা কেউ না শুনে পারে!

আমি তো আপনার বউ হইনি আর আপনি বউ বানিয়ে ফেললেন-
বরের সঙ্গে ফাজলামো করছেন, তিন শর্তে কবুল বলে বিয়ে করেছেন আর বলছেন বউ হননি। বাসর ঘরে বসে নাটক করছেন। বাসর ঘরে এসব কথা মানায়? আমার জীবনকে জীবন বলে মনে হচ্ছে না! আমি কি পাপেট?

নাতালী দেখল সাইফ রেগে যাচ্ছে। কথাগুলো এখনই বলতে হবে। কোনোরকম রাখঢাক না করে নাতালী বলল, আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসি। তাকেই বিয়ে করব। আত্মহত্যা করব না বিধায় বাবা-মায়ের চাপে আপনার ঘরে ভুল করে চলে এলাম। ক্ষমা করবেন। আপনার অনেক ক্ষতি আমি করে ফেললাম। যার মাসুল আপনাকে অনেক দিন ধরে দেওয়া লাগবে। ক্ষমা করবেন। ওই যে আপনি বললেন, আমি তিন শর্তে কবুল বলেছি। আসলে আমি কবুল বলিনি।

রাগতস্বরে সাইফ বলল, তবে কী বলেছেন?
আবুল বলেছি আবুল। আ আস্তে বলেছি আর বুল জোরে বলেছি, তিনবারই বলেছি আবুল আবুল আবুল-
শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি আপনি আমাকে পাপেট বানিয়ে ছাড়লেন! আপনার কাছে আমি পাপেট! আমার এতদিনের স্বপ্ন-সাধ-আহ্লাদ, ভালোবাসা এক নিমেষেই ধুলিসাৎ করে দিলেন। শেষবারের মতো নাতালীর মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাসতে হাসতে বাসর ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল সাইফ।

ভাবী এতক্ষণ না ঘুমানোর দলে ছিলেন। সাইফের পাগলা হাসির শব্দে দরোজা খুলে বাইরে বেরোতেই সাইফকে দরোজার সামনে দঁড়িয়ে হাসতে দেখেন। হতভাগা সাইফকে ভাবী কী বলে সান্ত্বনা দেবেন?
কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারল না।

পশ্চিম আকাশে কালবোশেখির ঝোড়ো মেঘ। গুড়ুম গুড়ুম শব্দ করে মেঘ ডাকছে। অবিরাম ডেকেই চলেছে।

পাখি

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:২৪ পিএম
পাখি
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ডানা আছে বলেই উড়তে হবে নাকি 
                                       পাখি

এই যে পাতার সংসারে 
সবুজের ভেতর সুখ ডেকে ওঠে
সুরেলা সুরে,
খরকুটোর গল্পটা নীড়ের রন্ধ্রে ছড়িয়ে
সুগঠিত হয় রোদ-ছায়ার ফ্রেমে। 
হাওয়ার তালে জ্যোৎস্না দোলে
নদীর পাললিক অবয়বে। 

অফুরন্ত নীলের বিস্তৃত বুকে
যেখানে আকাশ নিজেই নোঙর ফেলে
বসতি গড়তে চেয়ে
নক্ষত্র জড়ো করে পাঁজরে,
রংধনুটা রঙের প্রতি বাঁকে
উড়াল রাখে ভিন্ন কারুকাজে। 

চোখের কোণে জমা মায়ার গোধূলি 
বিকেলের দিগন্ত থেকে কোন অংশে 
কম কী?

ডানা আছে বলেই উড়তে হবে নাকি 
                                         পাখি।

একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:১৯ পিএম
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা
অলকরণ: নাজমুল আলম মাসুম
বিলেতি গাবের মতো মখমলে মোড়া
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা
আমার প্রত্যাবর্তনে নিত্যদিন ফিরে আসে-
শৈশবের স্মৃতিধন্য অর্জুন ছায়ায়।
 
ওদের কণ্ঠে চঞ্চল উচ্ছ্বাস উল্লাস!
বিমূর্ত চিত্রকলার মতো সুবাসিত গান-
মায়াবতী সুরধারা যেন জলতরঙ্গের!
আমাকে নন্দিত করে ঋদ্ধ করে-
প্রেমময় খুনসুটি।
 
কার্পেটের মতো বোনা সবুক উঠোনে
পাখিগণ খুঁটে খায় নিজস্ব আহার
দিনান্তে নাচের মুদ্রা পায়ে উড়ে যায়
মেহগনি বুনো অন্ধকারে…
 
ওরা কোথা থেকে আসে, ফের 
কোথা চলে যায়-
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা?

আজি হতে সহস্র বর্ষ পরে

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:১৭ পিএম
আজি হতে সহস্র বর্ষ পরে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

কবিসভা পথ হারাইয়াছে। সহস্র বছর ধরিয়া তাহারা পথ খুঁজিতেছে। ইতিমধ্যে কাফেলা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়াছে। বড় অস্থির, তাই তাহাদের কণ্ঠের পারদ ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে।

কত বিচিত্র সব কবি! একজন বলিলেন, আমি সম্মুখে এক মহাপর্বতের অস্তিত্ব অনুভব করিতেছি- যাহা আকাশ ভেদ করিয়া নীরবে দণ্ডায়মান। অন্যজন (যিনি নিরন্তর নিজেকে দেখিয়া এবং নিজ কণ্ঠসুধা পান করিয়া তাহাতে সমাধিস্থ হইয়া থাকেন) বলিলেন- জনাব, আপনার চোখের সমস্যা রহিয়াছে। যাহা দেখিতেছেন তাহা টিলারও যোগ্য নহে!

‘আমরা তো চতুর্দিকে কেবল অভ্রভেদী পর্বতই দেখিতেছি! স্নিগ্ধ, মৌন।’ -হাহাকার করিয়া উঠিলেন বিপন্ন কবিসভা। ‘তবে কি আমরা পথ হারাইয়াছি?’ সমাধিস্থ কবি গর্জন করিয়া উঠিলেন, যতসব মূর্খের দল! আমাকে অনুসরণ করুন। আমিই পৃথিবীর সর্বশেষ কবি ও পণ্ডিত! 

পর্বত হাসে। দিবসের প্রথম আলো তাঁহাকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানায়। টাইগার হিলের কনকনে ঠান্ডায় জমে যেতে যেতে অলৌকিক সেই আলোর আরতি দেখেন সহস্র বর্ষ পরের কোনো এক কবি।