খাঁচায় বন্দি গবেষণাগারের ইঁদুরদের প্রকৃতির পরিবেশে ছেড়ে দিলে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের স্বাভাবিক মাত্রার উৎকণ্ঠা বা ভয় ফিরে আসে— এমনই বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছেন গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানীর গবেষণায় দেখা গেছে, তথাকথিত ‘রিওয়াইল্ডিং’ বা প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলে গবেষণাগারে তৈরি হওয়া ভয় বা উদ্বেগজনিত আচরণ শুরুতেই প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল প্রাণীর উদ্বেগ পরিমাপের প্রচলিত পরীক্ষাগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে এটি মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে উদ্বেগ কীভাবে তৈরি হয়, সে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে।
গবেষণার প্রধান জীববিজ্ঞানী ম্যাথিউ জিপল বলেন, আমরা ইঁদুরগুলোকে এক সপ্তাহের জন্য খোলা মাঠে ছেড়ে দিয়েছিলাম। দেখা গেছে, তারা আবার আগের মতো স্বাভাবিক উদ্বেগজনিত আচরণে ফিরে এসেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাস শুধু ভয় তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধা দেয় না, বরং ল্যাবে তৈরি হওয়া ভয়ও ‘রিসেট’ করে দিতে পারে।
সাধারণত গবেষণাগারে ইঁদুরের উদ্বেগ পরিমাপ করা হয় ‘এলিভেটেড প্লাস মেজ’ (ইপিএম) নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে। এতে দুটি বাহু থাকে— একটি বন্ধ, যেখানে ইঁদুর নিরাপদ বোধ করে, আরেকটি খোলা, যেখানে তারা বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে। সাধারণভাবে ইঁদুর প্রথমে কিছুটা ঘোরাফেরা করলেও দ্রুতই নিরাপদ বন্ধ অংশে ফিরে যায়, যা ভয় বা উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়। এই আচরণ এতটাই স্থায়ী যে অনেক সময় তা উদ্বেগনাশক ওষুধেও কমে না।
গবেষণায় ৪৪টি ইঁদুরকে গবেষণাগারের খাঁচা থেকে বের করে একটি বড় খোলা পরিবেশে রাখা হয়, যেখানে তারা গর্ত করতে পারে, ওঠানামা করতে পারে এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। গবেষকরা দেখেন, এই অভিজ্ঞতা ইঁদুরদের জন্য যেন একটি ‘রিসেট বাটন’-এর মতো কাজ করেছে।
পুনরায় ইপিএম পরীক্ষায় ফেরানোর পর দেখা যায়, ইঁদুরগুলো খোলা ও বন্ধ— উভয় অংশই সমানভাবে অনুসন্ধান করছে, যেন তারা প্রথমবারের মতো পরীক্ষাটির মুখোমুখি হয়েছে। এই প্রভাব জন্মের পর থেকেই প্রকৃতিতে থাকা ইঁদুর এবং পরে প্রকৃতিতে ছাড়া ইঁদুর—উভয়ের মধ্যেই দেখা গেছে।
গবেষকরা মনে করেন, পরিবেশের সঙ্গে উদ্বেগের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত অভিজ্ঞতা উদ্বেগ বাড়াতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নিউরোবিজ্ঞানী মাইকেল শিহান বলেন, যদি প্রতিদিন আপনি নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, তাহলে কোনটা সত্যিকারের ভয়ংকর আর কোনটা নয়— তা বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু যদি অভিজ্ঞতা খুব কম হয়, তাহলে নতুন কিছু ঘটলেই তা সহজেই উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
গবেষকদের মতে, গবেষণাগারে উদ্বেগ নিয়ে যেভাবে পরীক্ষা চালানো হয়, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ ইঁদুরের মধ্যে যে উদ্বেগকে আমরা জৈবিক বলে ধরে নিই, সেটি হয়তো পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মানুষের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক সুরক্ষিত ও একঘেয়ে জীবন উদ্বেগ বাড়াতে পারে— এমন ধারণা আগের গবেষণাতেও উঠে এসেছে। বৈচিত্র্যময়, এমনকি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতাও উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে, যদিও উদ্বেগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে।
মাইকেল শিহান বলেন, নতুন কোনো অভিজ্ঞতার প্রতি অযৌক্তিক ভয়ই মূলত উদ্বেগ। আমাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার কীভাবে সেই প্রতিক্রিয়াকে গড়ে তোলে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন অনেক প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।
গবেষণাটি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে।
মেহেদী/


