মার্চ মাস, ১৯৭১ সাল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পয়লা মার্চ আমি একটা মিটিং করছিলাম। হঠাৎ শুনলাম বঙ্গবন্ধু নাকি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সব জায়গায় কমিটি গঠন করার জন্য। আমরা শুনে কমিটি গঠন করলাম। আমি জয়েন্ট ক্লাবের ভিপি ছিলাম। তিনবার নির্বাচিত ভিপি। আমার বাসা সদরঘাট। আমি তখন মিটিং করছিলাম শাঁখারী বাজারে। শাঁখারী বাজার, তাঁতিবাজার পুরো অঞ্চলটায় অনেক লোক তখন। ছাত্রলীগের ওপর তখন তো মানুষের সাংঘাতিক শ্রদ্ধা ও আস্থা ছিল, বিশ্বাস ছিল। মানুষ বিশ্বাস করত তাদের ন্যায্য অধিকার ছাত্রলীগ ফিরিয়ে আনতে পারবে।
ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার খবর শুনে আমরা বের হয়ে আসলাম। কারণ আমাদের মনে হলো ষড়যন্ত্র হবে। কারণ আমরা অপেক্ষায় ছিলাম বঙ্গবন্ধু পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। উনি মেজরিটি ভোট পেয়েছেন। সেখানে যদি এখন সংসদ বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেটা মানা যায় না। গোটা জাতি তখন আগুনের মতো ফুঁসে আছে। কড়াই গরম করলে যে অবস্থা হয়, তার মধ্যে একটু তেল পড়লে ফুসে উঠে, ঠিক তাই হলো। আমরা মিছিল নিয়ে বের হয়ে দেখি মানুষ আর মানুষ। ইতোমধ্যে পূর্বাণীতে মিটিং চলছে আওয়ামী লীগের। আমরা শুনলাম পূর্বাণীতে যেতে হবে। আমরা গেলাম সেখানে। বঙ্গবন্ধু বললেন আমরা মিটিং এর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমরা আবার মিছিল নিয়ে ইকবাল হলে আসলাম।
সিরাজুল খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল ভাই এরা সবাই আসলেন। মণি ভাই আসলেন। নুরুল আলম সিদ্দিকী, আব্দুল মাখন, আসম আব্দুল রব, শাহজাহান সিরাজ তারাও আসলেন। অর্থাৎ ইকবাল হলটাই ছিল আমাদের কন্ট্রোল রুমের মতো। তখনই সিদ্ধান্ত হলো আমরা কিন্তু আর পেছনের দিকে তাকাব না। শুরু হলো আমাদের কিছু কাজ। সে কাজগুলো আমাদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়া হলো। আমি গেলাম জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজে মানুষ ভিড় করছে। আমরা মিটিংয়ের জন্য সন্ধ্যার পর বিউটি বোর্ডিংয়ে গেলাম। সেখানে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কেমনে কী করতে হবে। রাত্রে আবার সবাই চলে আসলেন বিউটি বোর্ডিংয়ে। আমাদের ওই সময়ে খাবার দাবার সস্তা ছিল। বিউটি বোর্ডিংয়ে আমরা খাইতাম। খুব সম্ভবত ৬ আনা দিলে বা আট আনা দিলে খাওয়া-দাওয়া হয়ে যেত। রাতে মাছের মুড়িঘন্ট, ভাত, ভাজি ইত্যাদিতে। অনেকেই এলেন, সবাই খেলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো এখন থেকে আমাদের প্ল্যানিং হবে, অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে এবং আমাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।
আমাদের সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা দেয় ভালো। আর যদি পার্লামেন্ট তাকে না ডাকে, তাহলে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তারপরে আওয়ামী লীগ যে কথা বলেছে, যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছে, আমরা সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করেছি। এরপর তো ৭ই মার্চ এলো। এক তারিখ থেকে ৭ তারিখ দিনগুলোতে তো এই দেশের সরকার মানে বঙ্গবন্ধুর কথাই সারা দেশের মানুষ ওঠাবসা করছে। তিনি যা চাইছেন, তাই হয়েছে। কলেজ, ব্যাংক সমস্ত কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর কথায় অফিসে গেছেন, ওনার কথায় চলে এসেছেন। গোটা বাংলাদেশ তখন বঙ্গবন্ধুর এক কথায় ওঠাবসা করছে। সে অবস্থার মধ্যে আমরা গেলাম। ৭ই মার্চ তার ভাষণ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন। তার ভাষণ তো ঐতিহাসিক ভাষণ।
যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। যার যা কিছু আছে তা তো বুঝতে বাকি রইল না। যুদ্ধ তো আর খালি হাতে হয় না। অস্ত্র লাগবে। এই আমাদের শুরু হলো। মাটিতে আমাদের ক্যাম্প বানানো হলো। ইপিআর এর একজন হাবিলদার আমাদের পর্যায়ক্রমে ট্রেনিং দিতেন। দুই শিফটে আমাদের ট্রেনিং হতো। সব ইউনিভার্সিটি ছাত্র ছিল। তখনতো ইউনিভার্সিটি বন্ধ, কেউ যেত না। শুধু মানুষ আর মানুষ। এ ট্রেনিং শুরু হলো, তারপর তো ২৫ শে মার্চের ইতিহাস সবাই জানে। এর মাধ্যমে আমরা যুদ্ধের মধ্যে চলে গেলাম। আজকের দিনের স্টার্টিং। তখন অনেকে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে গোটা দেশ তখন অচল হয়ে গেল এক কথায় বলা যায়। তখন সবার মধ্যে যুদ্ধের উৎসাহ চলে আসছে, বঙ্গবন্ধু যা বলবে আমরা তাই করব। যুদ্ধের জন্য আমরা সবাই তখনই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য