১৯৭১ সালের মার্চে আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলাম। দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত ছিলাম। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা আমরা সেদিন শুনতে পাইনি। পরের দিন সকালবেলা পুনঃপ্রচার হওয়ার পর আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি।
যেহেতু এখানে একটি নির্দেশনামূলক বক্তব্য ছিল, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। একদিকে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন, একদিকে গেরিলা যুদ্ধের কথা বলেছেন, আরেক দিকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। এখান থেকে একটি নির্দেশনা পাওয়া যায় যে আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় কী। আমরা ঠিক সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে থাকি। আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলাম, সেখানে সবাই বাঙালি। আমরা ছয়জন অফিসার ছিলাম। তিনজন বাঙালি, বাকিরা পাকিস্তানি।
আমরা বাঙালিরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, যদি আমাদের ওপর কোনো আক্রমণ আসে, তাহলে সবাই মিলে প্রতিহত করব। যদি আমাদের অস্ত্র জমা নিতে চায়, তাহলে কোনোভাবেই অস্ত্র দেওয়া হবে না। বিশেষ করে ১৮ মার্চে জয়দেবপুরে যে ঘটনা হলো, তারপর আমরা সতর্ক হয়ে গেলাম। আমরা ধরে নিলাম, যেকোনো সময় আমাদের ওপর আক্রমণ আসতে পারে। এমন বাস্তবতায় দুটি সিদ্ধান্ত নিলাম- এক. আমরা কোনোভাবেই অস্ত্র জমা দেব না। দুই. আমাদের ওপর আক্রমণ এলে তা প্রতিহত করব।
পাকিস্তানিরা কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, আমরা সে অপেক্ষায় ছিলাম। মার্চে যে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তা আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ভালোভাবে বুঝতে পারছিলাম না। তবে মিডিয়ায় যতটুকু প্রচার হতো, তা থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। যেকোনো মুহূর্তে আমাদের অস্ত্র হাতে নিতে হতে পারে।
২৫ মার্চে যখন পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার আমাদের অস্ত্র হাতে নিতে হবে। আমরা তখন ছড়ানো-ছিটানো ছিলাম। আমাদের কিছু অংশ ছিল টাঙ্গাইলে, কিছু অংশ সিলেটে, কিছু অংশ ছিল শাহবাজপুরে, কিছু অংশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তখন খালেদ মোশাররফ ছিলেন আমাদের সহ-অধিনায়ক। আর অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তানি খিজির হায়াত খান। আমরা খালেদ মোশাররফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। ২৭ মার্চ সকালে আমরা তৎকালীন মেজর শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করি। পাকিস্তানি যে অফিসাররা ছিল, তাদের বন্দি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেসামরিক প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেই আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। এটি ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলে।
১৯৭১-এর মার্চ অত্যন্ত ঘটনাবহুল একটি মাস। এ মাসেই স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছে, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৪৭ সাল থেকে আমাদের যে স্বাধীনতার আন্দোলন, তা মার্চে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করি।
সাবেক সেনাপ্রধান
অনুলিখন: তৈমুর তুষার