১৯৭১ সালের ৬ মার্চ। পরের দিন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণটা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফিল্ম ডিভিশন রেকর্ড করেছিল। ভাষণের আগের দিন বিকেলে আমাদের তৎকালীন পরিচালক সবাইকে ডেকে ক্যামেরা চালানোসহ কে কী কাজ করবেন, তা বুঝিয়ে দিলেন। আমরা যে ক্যামেরা নিয়েছিলাম সেটা ছিল ‘অ্যারিফ্লেক্স’। ওইটা যদি চালাই, খুব জোরে আওয়াজ হবে। এ জন্য আমরা সাউন্ড প্রুভ ব্লিম সংগ্রহ করে নিয়ে ক্যামেরার ওপরে দিয়ে তারপর শুট করলাম। আবার ক্যামেরা যদি ব্যাটারি দিয়ে চালাই, তাহলে ব্যাটারি ডাউন হয়ে যেতে পারে। সে জন্য সিংক মোটর ব্যবহারের কথা চিন্তা করলাম।
সেটা ব্যবহারের জন্য আবার হাইভোল্টেজ লাইনের সঙ্গে ইলেট্রিক তারের সংযোগ প্রয়োজন। পরে ৬ মার্চ সন্ধ্যায় কলরেডির ডাইসে হাইভোল্টেজ লাইন থেকে তাদের সংযোগ করলাম। প্রথমে কলরেডির ওয়ার্কাররা লাইন দিতে না চাইলেও পরে মালিক অনুমতি দেন। বঙ্গবন্ধু আসার ঠিক সময়টাও আমরা জানতাম না। এ জন্য ৭ মার্চ সকাল সকাল যার যার যন্ত্রপাতি নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে চলে এলাম। পরে বঙ্গবন্ধু যেখানে ভাষণ দেবেন, সেই ডায়েস থেকে সাড়ে তিন ফুট দূরে ক্যামেরা বসালাম।
ক্যামেরা লো লেভেলে রাখা হলো। এরপর বঙ্গবন্ধু সরাসরি ডায়েসে এসে বক্তব্য শুরু করলেন। ওই দিন বঙ্গবন্ধু ওখানে এসে কারও সঙ্গে কথাও বলেননি, কেউ তাকে স্লিপও দেন নাই, কানে কানে কেউ কিছু বলেও নাই। বঙ্গবন্ধুর মনে যত ক্ষোভ যত যা ছিল, ভাষণে প্রকাশ করলেন। ওই দিন আরেকটা গুজব ছিল, বঙ্গবন্ধুসহ তার ভাষণের ডায়েস বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে। আমরা যারা ছিলাম, তারা জানতাম, কোনো কারণে ধরা পড়লে বঙ্গবন্ধু ছাড়িয়ে নেবেন। আর মারা গেলে তো গেলামই। এই সাহস নিয়েই কাজ করেছিলাম। আমাদের পরিচালকসহ ওই দিন সাতজন ছিলাম। সেদিন প্রকাশ্যে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করেছি।
বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়ে চলে যাওয়ার পর জনগণও চলে গেলেন। পরে আমরা সচিবালয়ের ২২ নম্বর শেড অফিসে যন্ত্রপাতি নিয়ে চলে গেলাম। তখন মাত্র ১৯ জন স্টাফ ছিল আমাদের। সব কাজ শেষে ভাষণ ডেভেলপ করার জন্য এফডিসিতে যেতে হবে। কারণ আমাদের ডেভেলপার মেশিন ছিল না। ওখান থেকে ডেভেলপার আনতে হলে কার নামে আনব সেটা বুঝতে পারছিলাম না। কারণ বঙ্গবন্ধুর নাম দিলে তো পাকিস্তান সরকার আটকিয়ে দেবে। ওই সময় একবার সাইক্লোনও হয়েছিল। এফডিসি থেকে সাইক্লোন আর নির্বাচনের নামেও ডেভেলপার মেশিন আনা যেত। আমি আবার ওই সেকশনে কাজ করতাম। তখন পরিচালক বললেন, তুমি যখন ওখানে কাজ করছ তুমি এটা নিয়ে আসবে। পরে সাইক্লোন-১, সাইক্লোন-২, নির্বাচন এসব লিখে নোট দিলাম। দুই দিনের মধ্যে ডেভেলপার এনে পরিচালককে বুঝিয়ে দিলাম। তখন আমাদের কোনো স্টোর রুম ছিল না। একটা সিনেমা হল ছিল, ওখানে রাখা একটা আলমারিতে ফিল্ম, ক্যামেরা সব রেখে দিয়ে তালা দেওয়া হলো। চাবি পরিচালকের কাছেই থাকতো সবসময়। পরে সেটি রাখা হলো ট্রাংকে।
নিরাপত্তার জন্য পরিচালকের স্বজন চরকোশনাই গ্রামের দানেশের বাড়িতে ধানের গোলায় ট্রাংকটা রাখা হয়। ওই বাড়িতেই পরিচালকের পুরো পরিবার ছিল। পরে ওই বাড়িতে আমাকে একদিন পাঠালেন তার পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসতে। এর দুই-তিন দিন পরেই পরিচালক ভারতে চলে গেলেন। তখন ভারত ও বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই ট্রাংকটা মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে উদ্ধার ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধকালীন ৯ মাস বঙ্গবন্ধুর ধারণকৃত ভাষণটি ভারতেই সংরক্ষিত ছিল। পরে স্বাধীনতার পরে সেটিকে আবারও বাংলাদেশের ফিল্ম ডিভিশনে ফিরিয়ে আনা হয়। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সংরক্ষণ করেছিলাম।
আমজাদ আলী খন্দকার: একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রগ্রাহক
অনুলিখন: ইমতিয়াজ উল ইসলাম, (সাভার) ঢাকা