একাত্তরে বাঙালির অবিস্মরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের বীর বাঙালিদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা চা-শ্রমিকরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ করেছেন আমার মতো অনেক চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তান।
আমার বাবা ভগত রাজভর ছিলেন চা-বাগানের সর্দার। ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পাসের পর ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় আর লেখাপড়া করা হয়নি আমার। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোজাফফর ন্যাপের কুঁড়েঘরের পক্ষে নির্বাচনি প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করি। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়লাভ করে। কিন্তু তাদের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ায় সারা দেশে প্রতিবাদ গণবিক্ষোভ শুরু হয়। তখন আওয়ামী লীগের সব আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যাই।
একাত্তরের মার্চে টেংরাবাজার ইউনিয়ন সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর আমরা পাক সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। সেই সময়ে চা-শ্রমিকদের নেতা হিসেবে আমি রাজনগর পোর্টিয়াস হাইস্কুল মাঠে শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করি। ২৫ মার্চের পরে পাকসেনারা যখন সিলেট থেকে মৌলভীবাজারের দিকে আসছিলেন, তখন আমরা শত শত সাধারণ মানুষ নিয়ে শেরপুরে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হই। তবে শত্রুদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি।
পরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারতের কৈলা শহরে গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠি। সেখানে কয়েক দিন থাকার পর কৈলা শহর ইয়ুথ ক্যাম্পে ভর্তি হই। সেখানে ২০ দিন থাকলাম। তারপর মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের লোহারবন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। সেখানে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন চাঁদকে কমান্ডার করে আমাদের ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা কোম্পানি গঠন করা হয়। এই কোম্পানির ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুর রব সাদী। তারপর আমাদের অস্ত্র দিয়ে ভারতের কাছাড় জেলার জালালপুর অপারেশন ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এখান থেকে আমরা বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন শত্রু ক্যাম্পে আক্রমণ করে আবার নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে যেতাম। একবার ডান ঊরুতে শত্রুদের গ্রেনেড হামলায় স্প্লিন্টারের আঘাত পাই। ১৫ দিন বিছানায় ছিলাম, সুস্থ হয়ে আবারও যুদ্ধে যাই।
এই সময় আমরা সিলেট জেলার কালীগঞ্জে একটা ব্রিজ ধ্বংস করতে সক্ষম হই। এক মুসলিম লীগ নেতার বাড়ি ও দোকানে রেড করে খাবার নিয়ে এসে শরণার্থী শিবিরে বিতরণ করি। জালালপুর ক্যাম্পে এক মাস থাকার পর কমান্ডার সাদীর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করি।
সিলেটের কানাইঘাটে পাকসেনাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। শত্রুরা মাঝে মাঝে কানাইঘাট থেকে লোভাছড়া চা-বাগানের বাংলোতে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে আশপাশের গ্রামে অপারেশন করত। আমাদের ক্যাম্প ছিল লোভাছড়া চা-বাগান থেকে এক মাইল দূরের একটি গ্রামে। শত্রুরা পুনরায় লোভাছড়া চা-বাগানে এলে তাদের ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা হয়। আমরা খোঁজখবর রাখতে শুরু করলাম। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে খবর পেলাম, ২৫ জন পাকসেনা লোভাছড়া চা-বাগানে এসেছে।
এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমান্ডার সাদীর নেতৃত্বে আমরা ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধা দিনের বেলায় চারদিক থেকে ঘিরে শত্রুদের ওপর আক্রমণ শুরু করি। শত্রুরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের সামনে টিকতে না পেরে শত্রুরা পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কানাইঘাট থানাকে শত্রুমুক্ত করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সিলেট শহরে গিয়ে হাজির হই। পরে মৌলভীবাজারে ফিরে আসি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা মৌলভীবাজার সরকারি স্কুলের ক্যাম্পে এসে জড়ো হন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে পাকসেনাদের ফেলে যাওয়া মাইন ও গ্রেনেড উদ্ধার করে এনে স্কুলের এক পাশে জড়ো করে রাখা হয়। ১৯ ডিসেম্বর আমি বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাই। পরের দিন খবর পাই স্কুলে মাইন বিস্ফোরণ ঘটেছে। আমি গিয়ে দেখি, অনেক মুক্তিযোদ্ধার দেহ ছিন্নবিছিন্ন হয়ে এদিকে-ওদিকে ছিটকে পড়ে আছে। সেদিন আমার পরিচিত প্রদীপ চন্দ্র দাসসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধার দেহভস্ম একত্র করে ওই স্কুলের মাঠেই সমাধিস্থ করা হয়। সেদিন যদি মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে না যেতাম, তবে হয়তো আমারও মৃত্যু হতো। যে দেশপ্রেমের টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, দেশের প্রতি সেই প্রেম আজও অটুট আছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, চা-জনগোষ্ঠীর সদস্য
মাথিউরা চা-বাগান, রাজনগর, মৌলভীবাজার
অনুলিখন: পুলক পুরকায়স্থ