আমরা চার ভাই। তার মধ্যে সবার ছোট ভাইকে রেখে আমরা তিন ভাই যুদ্ধে যাই। যুদ্ধে যাওয়ার পথে আমার দুই ভাইকে রাস্তা থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দিই। তারা বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিল না। আমি তাদের জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিই। কারণ ওই সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে পাকবাহিনীর হাতে অনেক মানুষ মারা গেছেন। আমি বলেছি, তোরা নতুন বিয়ে করছস, তোরা বাড়ি ফিরে যা। মরলে আমি একাই মরব।
তারা আমার কথা শোনে এবং চলে আসে। এরপর আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ওই সময়টায় ঝড়-বৃষ্টি আর রাতের অন্ধকারে কত কষ্ট করে যে থেকেছি, কত গাছের কাঁটা যে গায়ে বিঁধেছে, কাঁটাতার পায়ে ঢুকে রক্ত পড়েছে, বলে বোঝানো কঠিন। তখন হাতের কাছে বনের লতাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে রক্তমাখা শরীরেই যুদ্ধ করেছি। আমার হাতিয়ার ছিল এসএলআর রাইফেল। এতে ২০ রাউন্ড গুলি থাকত। ১৮ রাউন্ড গুলি করতাম, আর দুই রাউন্ড গুলি রেখে দিতাম। খুব কষ্ট করেছি দেশকে পাকবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। আমার মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেকেই দেশকে ভালোবেসেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।’
আমি হদি সম্প্রদায়ের লোক। বয়স এখন ৮৬ বছর। আমার তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। আমার জন্মস্থান শেরপুর সদরের ধলা ইউনিয়নের পাঞ্জরভাঙা। বর্তমানে আমি শহরের গৃর্দ্দানারায়ণপুর মহিলা কলেজ বাগানবাড়ি রোডে সন্তানদের নিয়ে থাকি। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় ১১ নম্বর সেক্টরে ট্রেনিং শেষে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যুদ্ধ চলাকালে নালিতাবাড়ী উপজেলার হাতিপাগার, বারোমারি, বুরুঙ্গা, ঝিনাইগাতী উপজেলার নকশী, হলদিবাটা, জামালপুরের নান্দিনা ও শরিফপুরে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছি।
আমাদের টিমে ১২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। হালুয়াঘাটের তেলিখালীতে যুদ্ধে আমরা ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতের মিত্রবাহিনীর সদস্যরা মিলে যুদ্ধ করি। পরে আমরা পাকবাহিনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করি। সেখানে কয়েকজন যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হন। সে সময় আমার কাছে বাক্সভর্তি গোলাবারুদ ছিল, সেসব নিয়ে গজারিগাছের ঝোপে ওত পেতে থাকতাম। মাঝে মাঝে ঝোপের ভেতর থেকে পাকবাহিনীর লোকদের উদ্দেশে গুলি ছুড়তাম। এরপর আমরা যাই নকশী। সেখানে পাকবাহিনীর সদস্যরা থেমে থেমে ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় আমরাও তাদের টার্গেট করে গুলি ছুড়ে পরাস্ত করি।
জামালপুরের নান্দিনায় পাকবাহিনীর ক্যাম্প ঘেরাও করি এবং তাদের পরাস্ত করার জন্য গুলি ছুড়তে থাকি। এখানে তীব্র লড়াই হয় আমাদের। গোলাগুলির পর একপর্যায়ে পাকসেনারা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এরপর শরিফপুরে আক্রমণ করি, সেখানে রাতভর গোলাগুলির পর ভোরে আমার ছোড়া গুলিতে পাকবাহিনীর পাঁচ সদস্য নদীতে পড়ে যায়। পরে আমি কাছে গিয়ে দেখি, তারা গুলির আঘাতে লাশ হয়ে নদীতে পড়ে আছে।
যুদ্ধের পর তো খুব কষ্ট করেছি। অভাব-অনটনে আছিলাম। অস্ত্র জমা দেওয়ার পর যে যার মতো করে আগের পেশায় ফিরে যায়। কেউ দিনমজুর, শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালানো শুরু করে। তখন সংসার চলানো খুব কষ্ট হয়ে পড়েছিল। লবণ ছিল না, মরিচ ছিল না, খাবার কিছু ছিল না, খুবই অভাব ছিল সে সময়।
মানুষ চালের গুঁড়া খেয়ে দিন পার করেছে। এ রকম অভাব আছিল। পরে আস্তে আস্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সুদিন ফিরতে শুরু করল। এখন আমি ২০ হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই। অন্যান্য সহযোগিতা পাই। খুব ভালো আছি এখন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, হদি নৃগোষ্ঠীর সদস্য
অনুলিখন: শাকিল মুরাদ