ছাত্রাবস্থা থেকেই পাকিস্তানিদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে মনের মধ্যে একটা ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় বাঙালিদের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা চালায়, তাতে ঘৃণা আরও বেড়ে যায়। পরে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা করা হলে আমিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। এক দিন পরই ২৭ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শুরু হওয়া প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি।
রাজশাহীতে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন মেজর গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ও গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার শফিকুর রহমান রাজা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করার এই আন্দোলনে তাদের নেতৃত্বে রাজশাহীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সবগুলোতেই আমি অংশ নিই।
ইপিআর, আনসার, মুজাহিদের বাইরেও সাধারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ২৭ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। মেজর গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে অন্যদের সঙ্গে আমিও অংশ নিই। পরে ৫ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আমরা রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে আবদ্ধ করে রাখি। পরে সেই প্রতিরোধ ভেঙে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আমিও গোদাগাড়ীতে ফিরে এসে ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে যাই।
এক মাস ১৭ দিন ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। ফিরে এসে রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ শুরু করি। এর মধ্যে ২২ জুন নগরীর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিকল্পিত আক্রমণ চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এখানে জহুরুল ইসলাম স্বপনের নেতৃত্বে আমিসহ হানিফ, মুকুল ও কামাল অংশ নেন। কিছুদিন পরই রাজশাহীর মোহনপুর থানার শাকোয়া রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করে ১৩ জন রাজাকারকে হত্যা করি আমরা।
এরপর রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মেজর গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা গোদাগাড়ী থানার ওভেয়া ব্রিজে আক্রমণ চালাই। এতে তৌহিদ নামে আমাদের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। আমরা ১০-১৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করি। এরপর ৩ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইসলামপুরে বদিউজ্জামান টুনুর নেতৃত্বে আমরা ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা আরেকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই।
এই যুদ্ধে আমাদের ৯জন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ দেন। এরপর আমরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে ১২ থেকে ১৫ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু করি। এই যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মর্টার প্লাটুনের আমিনুল ইসলাম ও সারোয়ার শহিদ হন। আহত হন আরও চার মুক্তিযোদ্ধা। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ক্ষোভ ও কান্না লুকিয়ে আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাকিস্তনি বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি বিডি হলে আক্রমণ করি। এতে তারা রাজশাহীর দিকে পালিয়ে যায় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ জোহা হলে অবস্থান নেয়। তখন তাদের ধাওয়া দিয়ে যে ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা রাজশাহীতে প্রথম প্রবেশ করেন, তাদের মধ্যে আমি অন্যতম। আমাদের নেতৃত্বে ছিলেন ইপিআর-এর হাবিলদার আবুল। রাজশাহী এসে ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রথমে আমরা বেতার কেন্দ্র দখল করি। এরপর রাজশাহীজুড়ে অভিযান চালাতে শুরু করি। এ সময় প্রাণভয়ে রাত ৮টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা জোহা হল ছেড়ে নাটোরের দিকে পালিয়ে যায়। তবুও সারারাত আমরা রাজশাহীজুড়ে অভিযান চালাই। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সকালে পুরো রাজশাহী আমাদের দখলে চলে আসে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন: এনায়েত করিম, রাজশাহী প্রতিনিধি