১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে আবেগাপ্লুত, উদ্দীপ্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি।
মে মাসের ১৬ তারিখে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে গাইবান্ধা থেকে বোয়ালিয়া চরে যাই। নদী পার হওয়ার জন্য মাঝির সঙ্গে যোগাযোগ হয়। একসঙ্গে আরও ছয়টি নৌকা যাত্রা শুরু করে। কিছুদূর এগোনোর পর মাঝনদীতে বাকি ছয়টি নৌকাই ডুবে যায়। নদীটির নাম ধরলা। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার পর আমাদের মাঝি নৌকা চালানো বন্ধ করে রাখেন। ঘণ্টা দুয়েক পর আবার যাত্রা শুরু হয় আমাদের।
বিকেল নাগাদ মৌলার চর ট্রানজিট ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে ১৫ দিনের ট্রেনিং গ্রহণ করি। ক্যাপ্টেন হামিদ পালোয়ানের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন অপারেশন টিমের সঙ্গে অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। গাইবান্ধার কুপতলা, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর তুলসী ঘাট বল্লমঝড়সহ আরও বিভিন্ন স্থানে আমরা অপারেশন পরিচালনা করি।
আগস্ট মাসের শেষের দিকে বাস ও লঞ্চযোগে ভারতের ধুবড়ির উদ্দেশে রওনা হই।
সেখানে পৌঁছার পর ট্রেনযোগে ভোরবেলা কুচবিহারে পৌঁছাই। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করি। সেখান থেকে একদিন রাত দুইটায় ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাকেসহ ১৫ জনকে তাদের গাড়িতে করে জলপাইগুড়ি পাঙ্গা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে দেয়। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের গ্রহণ করে। থালা-বাসন ও ইউনিফর্ম দেওয়া হয় আমাদের। পরের দিন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরু হয়। আমাদের দলের প্রত্যেকেই মুজিব বাহিনীর গাইডলাইন অনুযায়ী অস্ত্রবিধ্বংসী ও গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রায় দুই মাস আমাদের নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এই প্রশিক্ষণ শেষে আমরা ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদসহ নীলফামারীর ডোমার থানার ঠাকুরগঞ্জ এলাকায় অপারেশন পরিচালনা করি। এই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন টিম লিডার মোহাম্মদ নাসিমউদ্দিন। ডেপুটি লিডার হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করি।
আমরা যৌথ ও আলাদাভাবেও অপারেশন পরিচালনা করি। ডোমার এলাকার সোনারায় গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করেছিল। প্রশিক্ষিত কর্মীদের মাধ্যমে গোপনে রেকি করে সবকিছু নিশ্চিত হয়ে নিই আমরা। রাত্রে প্রথম পার্টি, দ্বিতীয় পার্টি ও তৃতীয় পার্টিকে পজিশনে রেখে রাত ১২টার দিকে আমরা ওই ক্যাম্পে আক্রমণ চালাই। কিছুক্ষণ গোলাগুলি করার পর পাকিস্তানি সেনারা প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।
ডোমার থেকে ডিমলা যাওয়ার রাস্তায় পুরো টিমসহ অ্যামবুশের স্থান নির্ধারণ করি। রাস্তার মধ্যে আমরা মাইন স্থাপন করি। অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন, প্রেসার রিলিজ টাইমবোমা, পুল টাইম বোমা স্থাপন করে আমরা পজিশন গ্রহণ করি।
আমাদের টিমের একজনের বাড়ি ছিল সেই এলাকায়। ওই পথের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার বাবা আমাদের দেখে ফেলেন। তিনি পাকসেনাদের গাড়ি আমাদের অ্যামবুশ করা জায়গায় আসতে বাধা দেন। ফলে আমাদের মিশন ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় আমাদের টিমের মুক্তিযোদ্ধা আশরাফউদ্দিন তার বাবাকে নিজে গুলি করে হত্যা করেন।
ইতোমধ্যে আমরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে নীলফামারীর উদ্দেশে যাত্রা করি। সেখানে পৌঁছে অন্য মুক্তিযোদ্ধা দলসহ যৌথভাবে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হই। সেই সহযোদ্ধা আশরাফউদ্দিন সৈয়দপুরে শত্রুদের আক্রমণে গুলিবিদ্ধ হন। তাকে উদ্ধার করে গাড়িতে করে রংপুর মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথে তিনি শহিদ হন। তার লাশ রংপুরের বদরগঞ্জে বালুয়াভাটা কবরস্থানে নিয়ে আমজাদ ব্যাপারীর সহযোগিতায় দাফনকাজ সম্পন্ন করি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি বাড়িতে ফিরে আসি। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে মুজিব বাহিনীর অস্ত্র জমা দেওয়া অনুষ্ঠানে যোগদান করি। আমার নামে ইস্যুকৃত অস্ত্র এসএমজি জমা দিয়ে দিই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন: সাইফুর রহমান রানা, রংপুর প্রতিনিধি