একাত্তরের ২৭ মার্চ তৎকালীন নাটোর টাউন পার্কে (বর্তমানের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ) সর্বদলীয় এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ন্যাপের প্রয়াত নেতা খন্দকার আবু আলীকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কাজ।
পাকসেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য আগ্রহী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসেন মহকুমা খাদ্য কর্মকর্তা পাবনার ক্যাপ্টেন (অব.) হাবিবুর রহমান। শহরের শুকলপট্টি এলাকায় নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা কলেজের পুরাতন হোস্টেল চত্বরে (বর্তমানের রানী ভবানী সরকারি মহিলা কলেজ) মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। অন্যদের সঙ্গে তিনিও নেওয়া শুরু করেন ওই প্রশিক্ষণ।
কিন্তু বেশি দিন প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কেননা এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে প্রতিরোধ যুদ্ধ। পাকসেনাদের অবস্থান জানা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য শহরের কান্দিভিটা এলাকার রিক্রিয়েশন ক্লাবে স্থাপন করা হয় কন্ট্রোল রুম। খবর পাওয়া যায়, নাটোরে আসছে পাকসেনা। শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলা হয়। এরই অংশ হিসেবে শহরের তৎকালীন মিনার সিনেমা হলের মোড়ে (বর্তমানের ছায়াবাণী সিনেমা হল) তেলের বড় বড় ড্রাম ও বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। গোপন স্থানে (পাশের জনতা স্টোরের ছাদে) বিভিন্ন হালকা ও তীর-ধনুকসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে রাতে পাহারাও দিতে থাকে সাঁওতালদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু যোদ্ধা। নাটোরের মালখানা ভেঙে অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
পাকসেনাদের ভারী অস্ত্রের মুখেও ১২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু পরে পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অনেকেই পাড়ি জমান ভারতে। আমিও তাদের সঙ্গী হই। সঙ্গে নিই বাবা রশীদুর রহমান ও মা নুরুন নেসা বেগমকে। শুরু হয় ভারতে ট্রেনিং।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক পাবনা বেড়া এলাকার তৎকালীন এমসিএ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার কুড়মাইল এলাকার একটি স্কুল ভবনে ইয়ুথ ক্যাম্প স্থাপন করে তা পরিচালনা করতেন। আমি ওই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিই। পরে মালঞ্চ এলাকায় আরও একটি মুক্তিযোদ্ধাদের ইয়ুথ ক্যাম্প স্থাপন করার পর আমিসহ কয়েকজনকে সেখানে পাঠানো হয়। কয়েক দিন পর আবারও তাদের কুড়মাইল ক্যাম্পে আনা হয়।
পরে গেরিলা ট্রেনিংয়ের জন্য দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ী এলাকার পানিঘাটা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এই ক্যাম্পে আমার সঙ্গে পরিচিত হন বগুড়া নট্রামসের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল মান্নান। এই ক্যাম্পে মাঝে মাঝেই প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতেন আমাদের চলচ্চিত্র জগতের শক্তিমান অভিনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হাসান ইমাম, আনোয়ার হোসেন, চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল এবং চিত্রনায়িকা কবরী। পরে অর্টিলারি ট্রেনিংয়ের জন্য প্রথমে রায়গঞ্জ সেনা ক্যাম্প এবং পরে দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ী এলাকার পানিঘাটায় (বাগডোগরা) ক্যাম্পে পাঠানো হয় আমাদের। সেখানে গেরিলা, অ্যাডভান্স ও জেএলসি (জুনিয়র লিডার কোর্স) বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি।
এরপর ভারতের বাগডোগরা, রায়গঞ্জ হয়ে পানিঘাটাসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলা ও জুনিয়র লিডার কোর্সসহ ভারী অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং শেষে প্রথমে গেরিলা এবং পরে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সেনা কমান্ডারদের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় ‘তুফানিয়া ব্যাটালিয়ন’- ব্র্যাভো সেক্টর নামে একটি ব্যাটালিয়ন।
মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে ওই ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার, আলফা, চার্লি, ডালডা, ব্র্যাভোসহ বিভিন্ন কোম্পানির সমন্বয়ে তুফানিয়া ব্যাটালিয়ন ব্র্যাভো সেক্টর গড়ে তোলা হয়। ওই ব্যাটালিয়নে প্রায় আড়াই হাজার বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই যোদ্ধাদের মধ্যে আমার বয়সী প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় সেনাসদস্য মেজর মতিলাল চৌধুরী। বালুরঘাটের সীমান্ত এলাকা অযোধ্যায় মাটির নিচে বাঙ্কার করে ওই ক্যাম্পে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। এই ক্যাম্প থেকে যৌথবাহিনীর সঙ্গে প্রতিদিন বাংলাদেশের নওগাঁ, জয়পুরহাট, পাঁচবিবি ও হিলি এলাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতাম। এরই ধারাবাহিকতায় তুফানি ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার ভারতীয় সেনাসদস্য মেজর মতিলাল চৌধুরীর কমান্ডে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সেকশন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা বগুড়ার এরুলিয়া গ্রামের জাকারিয়া তালুকদারের নেতৃত্বে সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নিই।
যুদ্ধের একদিনের কথা এখনো মনে পড়ে। অযোধ্যা ক্যাম্প থেকে রাতে ভারতীয় সেনাসদস্য সুবেদার দেলবর সিংয়ের নেতৃত্বে আমিসহ ২০-২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল বাংলাদেশের নওগাঁ সীমান্তের ফার্সিপাড়া-নওগাঁ রাস্তার ব্রিজ ধ্বংস করাসহ গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে রওনা হই। তীব্র শীতের রাতে রওনা হওয়ার পর পথে একটি নদী পড়ায় থামতে হয় সবাইকে। বিবস্ত্র হয়ে নদী পার হতে বাধ্য হলাম। কেননা নির্দেশটি ছিল কমান্ডারের। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নদীটি পার হয়ে ফার্সিপাড়া রাস্তার ব্রিজের কাছাকাছি যেতেই আচমকা পাকসেনাদের আক্রমণের মুখে পড়লে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। যুদ্ধকালীন বিশেষ সাংকেতিক শব্দে একত্রিত হলেও কমান্ডারের নির্দেশ পাওয়া যাচ্ছিল না। বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলির একপর্যায়ে নিজেদের বুদ্ধিতে পাকসেনাদের আনুমানিক অবস্থান লক্ষ্য করে আমাদের সঙ্গে থাকা ৬ ইঞ্চি মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে থাকি। একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকসেনারা। ফেলে যায় দুটি জিপ গাড়ি। সেই গাড়ি দুটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যাই। তবে প্রতিকূল অবস্থার পরও এই যুদ্ধে আমাদের কোনো যোদ্ধা হতাহত হয়নি।
একদিন হিলি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে পাকসেনাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ি। সেখান থেকে পিছু হটে পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে দেশের ভেতর ঢুকে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। ১২ ডিসেম্বর রংপুরের গোবিন্দগঞ্জ মুক্ত হলে আমরা বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হই। পথে বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া শত্রুমুক্ত হয়। এসব যুদ্ধে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর অনেক সদস্য শহিদ হন। পাকসেনাও নিহত হয় অনেক। পরে বগুড়ার পুলিশ লাইনে আমরা ক্যাম্প স্থাপন করি।
সম্মুখযুদ্ধের সময় আমাদের ভারতীয় মিত্রবাহিনীর পোশাক সরবরাহ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার খবরে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হই। নাটোরে আসার জন্য ছটফট করতে থাকি। আমাদের অস্ত্র জমা নেওয়ার পর ১৭ ডিসেম্বর নাটোরের পথে রওনা হই। কিছু পথ হেঁটে এবং কিছু পথ ট্রেনে নাটোরে আসি। নাটোরে আসার সময়ও আমার পরনে ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাক। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর নাটোরে ফিরে আসি। কিন্তু তখনো নাটোর শত্রুমুক্ত হয়নি। নাটোর শত্রুমুক্ত হয় ২১ ডিসেম্বর।
বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন: কামাল মৃধা, নাটোর প্রতিনিধি